ইতিহাস

জিম করবেট

জিম করবেট (Jim Corbett) ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের একজন বিখ্যাত শিকারী এবং প্রকৃতিবাদী যিনি মূলত ভারতের জঙ্গলে বেশ কিছু নরখাদক বাঘ শিকারের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন।  শিকার জীবনের নানান ঘটনা এবং অন্যান্য অভিজ্ঞতা নিয়ে রয়েছে তাঁর একাধিক বই। জন্মসূত্রে ব্রিটিশ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কাজ এবং আন্তরিকতার জন্য ভারতবর্ষের সঙ্গে তাঁর এক অদ্ভুত আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এমনকি, বিদেশি হয়েও ভারতীয় বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের জন্য তিনি সোচ্চার হন এবং বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নেন।

১৮৭৫ সালের ২৫ জুলাই পরাধীন ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের (North-western Province) নৈনিতাল শহরের কুমায়ুন, অধুনা উত্তরাখন্ডে জিম করবেটের জন্ম হয়। তাঁর প্রকৃত নাম এডওয়ার্ড জেমস করবেট। তাঁর বাবার নাম ছিল ক্রিস্টোফার উইলিয়াম করবেট এবং মায়ের নাম মেরি জেন। বাবা ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের পোস্টমাস্টার এবং মা ছিলেন একজন প্রভাবশালী রিয়েল এস্টেট এজেন্ট (Real Estate Agent)। ছয় বছর বয়সে বাবা মারা গেলে জিম করবেট এবং তাঁর বাকি ভাইবোনেদের একা হাতে বড় করতে থাকেন তাঁদের মা।

জিম করবেট ওক ওপেনিং বিদ্যালয়ে (Oak Opening School) পড়াশোনা করতেন। পরবর্তীকালে এই বিদ্যালয়টির নাম হয় হ্যালেট ওয়ার বিদ্যালয় (Halett War School) এবং এখন এটির নাম বিড়লা বিদ্যা মন্দির, নৈনিতাল (Birla Vidya Mandir, Nainital)।

খুব অল্প বয়সেই সাংসারিক দায়দায়িত্ব জিম করবেটের কাঁধে এসে পড়ে। সেই কারণেই মাত্র উনিশ বছর বয়সে বিদ্যালয় ছেড়ে জিম করবেট ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরি করতে শুরু করেন। প্রথমে তিনি বাংলা এবং উত্তর পশ্চিম রেলওয়েতে (Bengal and North Western Railway) ছিলেন। শুরুর দিকে পাঞ্জাবের মানকপুরে একজন জ্বালানি পরিদর্শক (Fuel Inspector) হিসেবে নিযুক্ত হন। পরবর্তীকালে বিহারের মোকামে ঘাটে গঙ্গার দুই পারে জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত নানা কাজের (Trans-shipment) ঠিকাদারের দায়িত্ব পান। তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সৈন্যদলের (British Indian Army) কর্নেলের (Colonel) মর্যাদাক্রমে উন্নীত হয়েছিলেন।

শীতকালে জিম করবেটরা নৈনিতালের বাড়ি ছেড়ে কালাধুঙ্গি (Kaladhungi) গ্রামে তাঁদের কটেজ ‘আরুন্ডেল’-এ (Arundel) চলে যেতেন। বাড়ির পাশেই ছিল জঙ্গল এবং প্রচুর বন্যপ্রাণী। ছোটবেলা থেকেই অরণ্য এবং অরণ্যচারী প্রাণীদের সঙ্গে জিম করবেটের দারুণ সখ্যতা ছিল। একাধিকবার এই গ্রামের বাড়িতে আসার সূত্রে তিনি বেশিরভাগ পশু চিনে ফেলেছিলেন, সঙ্গে ডাক শুনে বলে দিতে পারতেন পাখির নাম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি একজন দারুণ ট্র্যাকার এবং শিকারী হয়ে ওঠেন।

তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তি, শ্রবনশক্তি এবং ঘ্রাণশক্তি তাঁকে জঙ্গলে অনায়াস ঘোরাফেরা করতে সাহায্য করেছিল প্রভূতপরিমাণে। শিকারের প্রতি তীব্র ঝোঁক থাকলেও তিনি শখের শিকারী ছিলেন না। কুমায়ন অঞ্চলের যে বাঘ এবং চিতাদের শিকার তিনি করেছেন সেগুলির প্রায় সবগুলিই ছিল নরখাদক। কুমায়ুন পার্বত্য এলাকায় রুদ্রপ্রয়াগ, কেদারনাথ, বদ্রীনাথের মতো বেশ কিছু তীর্থক্ষেত্র আছে। এই নরখাদকেরা এখানকার তীর্থযাত্রীদের ভয় দেখাত এবং সুযোগ বুঝে শিকারও করত। তাদের হাত থেকে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে তিনি প্রাণীগুলিকে হত্যা করেন। গোটা জীবনে তিনি ১৯টি বাঘ এবং ১৪টি চিতা শিকার করেছেন। তাঁর বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায় এই নরখাদকেরা সবমিলিয়ে মোট ১২০০ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। যে শিকারগুলির জন্য জিম করবেট বিশেষভাবে পরিচিত সেগুলি হলো, চম্পায়ত এলাকার একটি বাঘিনী, রুদ্রপ্রয়াগের চিতা, থাক জঙ্গলের নরখাদক, মুক্তেশ্বরের নরখাদক, চৌগড়ের বাঘিনী ইত্যাদি।

জিম করবেট তাঁর শিকার জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা এবং ভারতবর্ষে থাকার সূত্রে এখানকার মানুষজনের সঙ্গে কাটানো দীর্ঘ সময়ের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছেন বেশ কিছু বইএর মধ্যে। তাঁর লেখা বইগুলি হল, ‘জাঙ্গল স্টোরিজ’ (Jungle Stories), ‘ম্যান-ইটার্স অফ কুমায়ন’ (Man-Eaters of Kumayun), ‘দ্য ম্যান-ইটিং লেপার্ড অফ রুদ্রপ্রয়াগ’ (The Man-eating Leopard of Rudraprayag), ‘মাই ইন্ডিয়া’ (My India), ‘জাঙ্গল লোর’ (Jungle Lore), ‘দ্য টেম্পল টাইগার অ্যান্ড মোর ম্যান-ইটার্স অফ কুমায়ুন’  (The Temple Tiger and More Man-eaters of Kumayun), ‘ট্রি টপ’ (Tree Tops), ‘জিম করবেট’স ইন্ডিয়া’- আর. ই. হকিন্সের দ্বারা নির্বাচিত (Jim Corbett’s India – Selcetions by R. E. Hawkins), ‘মাই কুমায়ুন’ – অসংগৃহীত লেখা ( My Kumayun: Uncollected Writings)।

১৯২৮ সালে নিউ ইয়ার অনর্সের (New Year Honours) তরফ থেকে জিম করবেটকে ‘কাইজার-ই-হিন্দ’ (Kaisar-i-Hind) মেডেল দেওয়া হয়। ১৯৪৬ সালে কিংস বার্থডে অনর্সের (King’s Birthday Honours) তরফ থেকে তাঁকে অর্ডার অফ দ্য ইন্ডিয়ান এম্পায়ারের (Oreder of the Indian Empire) একজন সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করে নেওয়া হয়।

১৯২০ এর শেষের দিকে বন্ধু ফ্রেডেরিক ওয়াল্টার চ্যাম্পিয়নের (Frederick Walter Champion) দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে করবেট তাঁর প্রথম ক্যামেরাটি কেনেন, যার সাহায্যে কুমায়ুন এলাকার বাঘের হিসাব রাখা শুরু করেন তিনি। চ্যাম্পিয়নের সঙ্গে মিলিতভাবে ১৯৩৬ সালে তিনি কুমায়ুন পার্বত্য এলাকায় ভারতের প্রথম জাতীয় উদ্যান, হেইলি ন্যাশনাল পার্ক (The Hailey National Park) গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা নেন। পরে ১৯৫৭ সালে জিম করবেটের প্রতি সম্মান জানাতে এই উদ্যানটির নামকরণ করা হয় জিম করবেট জাতীয় উদ্যান (Jim Corbett National Park)।

জিম করবেট ছোটি হলদোয়ানিতেও (Chotti Haldwani) বেশ কিছুদিন থেকেছেন। সেখানে একটি গ্রামকে দত্তক নিয়েছিলেন তিনি। এই গ্রামটির নাম দেওয়া হয় করবেট গ্রাম (Corbett Village)। বন্য প্রাণীদের হাত থেকে গ্রামবাসী এবং তাঁদের সম্পত্তি রক্ষা করতে ১৯২৫ সালে এই গ্রামের চারিদিকে ৭. কিমি দীর্ঘ একটি দেওয়াল তুলে দেওয়া হয়, যার নাম দেওয়া হয় করবেট দেওয়াল (Corbett Wall)। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সেই বছরেই নভেম্বর মাসে তিনি আর তাঁর বোন তাঁদের বাড়িটি বিক্রি করে দিয়ে ভারত ছেড়ে চলে আসেন। বর্তমানে সেই বাড়িটিতে একটি জাদুঘর করা হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে জিম করবেট জাদুঘর (Jim Corbett Museum)।

দেশ ছাড়ার পরে জিম করবেট তাঁর বোনের সঙ্গে কেনিয়ার (Kenya) নিয়েরিতে (Nyeri) চলে যান। সেখানে হোটেল আউটস্পানের (Hotel Outsapn) মাঠে পাক্সতু (Paxtu) নামে একটি কটেজে থাকতে শুরু করেন। কেনিয়াতে গিয়েও জিম করবেট বনববিড়াল এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণীর ক্রমহ্রাসমান সংখ্যা নিয়ে লাগাতার লেখালেখি এবং আলোচনা করতে থাকেন।

১৯৫৫ সালের ১৯ এপ্রিল হার্ট অ্যাটাকে জিম করবেটের মৃত্যু হয়। নিয়েরির সেন্ট পিটার্স অ্যাঙ্গলিকান চার্চে (St. Peter’s Anglican Church) তাঁকে কবর দেওয়া হয়। ১৯৬৮ সালে ইন্দো-চাইনিজ প্রজাতির একটি বাঘের নামকরণ করা হয় জিম করবেটের নামে। ১৯৯৪ সালে জিম করবটের দীর্ঘ উপেক্ষিত সমাধিটির সংস্কার এবং পুনরুদ্ধার করেন জিম করবেট ফাউন্ডেশনের (Jim Corbett Foundation) প্রতিষ্ঠাতা এবং অধিকর্তা জেরি এ. জলিল। (Jerry A. Jallel)।    

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।