বিশ্বসঙ্গীতের ইতিহাসে মুষ্টিমেয় কয়েকজন সঙ্গীতশিল্পীর আবির্ভাব হয়েছে যাঁরা সঙ্গীত জগতে এক যুগান্তকারী ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য হয়েছে, সঙ্গীতের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে তাঁদের হাত ধরে। সেই মুষ্টিমেয় কয়েকজনের একজন হলেন জার্মান সঙ্গীতকার জোহান সেবাস্টিয়ান বাখ (Johann Sebastian Bach)। বারোক সঙ্গীত-যুগের প্রখ্যাত এই সুরকার অর্গান ও বেহালাবাদক হিসেবে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁকে অনেকেই সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতকার বলে মনে করেন। কেবলমাত্র অপেরা ব্যতীত বাখ নিজের সময়কার সমস্তরকম সঙ্গীত ঘরানার ওপর কাজ করেছিলেন এবং সঙ্গীতের নতুন কোন রীতির উদ্ভাবন না করলেও, সুরের জটিল বিন্যাস, কাউন্টার পয়েন্ট ইত্যাদির দ্বারা গুণমান এবং প্রযুক্তিগত নির্ভুলতার দিক দিয়ে সঙ্গীত নির্মাণকে এক অসাধারণ উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি। বারোক যুগের সঙ্গীতশিল্পীদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ীই বাখের সঙ্গীতও ছিল আসলে ঈশ্বরের প্রতি নিবেদন। ঈশ্বরকে সঙ্গীতের মাধ্যমে মহিমান্বিত করাই ছিল তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
১৬৮৫ সালের ক্যালেন্ডারের ওল্ড স্টাইল অনুযায়ী ২১ মার্চ এবং নিউ স্টাইল অনুযায়ী ৩১ মার্চ মধ্য জার্মানির আইসেনাচ নামক একটি শহরের একটি অসাধারণ সঙ্গীতসাধকদের বংশে জোহান সেবাস্টিয়ান বাখের জন্ম হয়। তাঁর পিতা জোহান অ্যামব্রোসিয়াস বাখ নিজেও একজন সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন। অ্যামব্রোসিয়াস স্যাক্স-আইসেনাচের রাজসভার ট্রাম্পেটর এবং শহরের সঙ্গীতশিল্পীদের মধ্যে গণমান্য এক ব্যক্তি ছিলেন। জোহান অ্যামব্রোসিয়াসের প্রথম স্ত্রী ছিলেন মারিয়া এলিজাবেথ ল্যামারহার্ট, যিনি মোট আট সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। এই আটজনের মধ্যে চারজন পরবর্তীকালে সঙ্গীতশিল্পী হয়ে উঠেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন জোহান সেবাস্টিয়ান বাখও। ১৬৯৪ সালে বাখ তাঁর মাকে হারান এবং সেবছরই নভেম্বর মাসে অ্যামব্রোসিয়াস বাখ বারবারা মার্গারেথাকে বিবাহ করেছিলেন। অবশ্য ১৬৯৫ সালে সেবাস্টিয়ান বাখের পিতারও মৃত্যু হয়েছিল।
দশ বছর বয়সী অনাথ বাখ তখন তাঁর বড়দাদা জোহান ক্রিস্টোফ বাখের সঙ্গে পাশের শহরে চলে যান। সেখানে তিনি তাঁর দাদার কাছে সঙ্গীত শিক্ষা গ্রহণ করেন, অনুলিপি, অধ্যয়ন এবল সঙ্গীত পরিবেশনও করেন। এই সময়েই সম্ভবত বাখ দক্ষিণ জার্মানির বিখ্যাত সুরকার যথা, জোহান প্যাচেলবেল, জোহান জ্যাকব ফ্রোবার্গার-দের কাজের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। এছাড়াও উত্তর জার্মানির সঙ্গীত এবং ফ্রান্সের বিখ্যাত সুরকার জিন-ব্যাপটিস্ট লুলি, লুই মার্চ্যান্ড ও মারিন মারাইসের কাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হয়েছিলেন। এই সময়েই অর্গান নিয়ে নাড়াঘাঁটা করা শুরু করেছিলেন তিনি।
মাত্র পনেরো বছর বয়সে জোহান সেবাস্টিয়ান বাখ তাঁর স্কুলের পুরোনো বন্ধু জর্জ এর্ডম্যানের সঙ্গে জার্মানির বৃহত্তম শহর হামবুর্গ থেকে অনেক দূরে একটি ছোট শহর লুনেবার্গে সেন্ট মাইকেল স্কুলে পড়বার জন্য কোরাল স্কলারশিপ পেয়েছিলেন। বন্ধুর সঙ্গে এই দীর্ঘ ভ্রমণে কখনও পায়ে হেঁটে কখনও গাড়িতে যাত্রা করেছিলেন তিনি। সেখানে ইউরোপীয় সংস্কৃতি বিস্তৃতভাবে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। গায়কদলের কোরাসের অংশ হয়ে একটি ক্যাপেলা গাওয়ার পাশাপাশি তিনি স্কুলের থ্রি-ম্যানুয়াল অর্গান এবং হার্পসিকর্ড বাজিয়েছিলেন। সেখানে সম্ভবত তিনি ফরাসি ও ইতালীয় ভাষা শিখেছিলেন এবং ধর্মতত্ত্ব, ল্যাটিন, ইতিহাস, ভূগোল এবং পদার্থবিদ্যায় তাঁর ভিত দৃঢ় হয়েছিল। সম্ভবত তিনি লুনেবার্গের অরগ্যানিস্ট-কম্পোজারদের সঙ্গে বিশেষত জর্জ বোহাম-দের মতো মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন এবং হামবুর্গেরও বেশ কয়েকজন যথা, জোহান অ্যাডাম রেইনকেন এবং নিকোলাস ব্রুহন্স-দের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। এঁদের নিকটে থাকা সঙ্গীতের পান্ডুলিপি এবং সঙ্গীততত্ত্বের বইগুলি থেকে উত্তর জার্মানির ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতের সঙ্গে পরিচিতি লাভ করেন বাখ।
এক নজরে জোহান সেবাস্টিয়ান বাখ:
- জন্ম: ৩১ মার্চ, ১৬৮৫
- মৃত্যু: ২৮ জুলাই, ১৭৫০
- কেন বিখ্যাত: জোহান সেবাস্টিয়ান বাখ সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সুরকারদের মধ্যে একজন। তিনি ক্যান্টাটা, ফিউগ, প্রিলুড, স্যুইট, পাসাক্যালিয়া ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের সঙ্গীত রচনা করেছেন। বাখের সঙ্গীতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল তার জটিল কাঠামো এবং বিভিন্ন সুরের মিশেলে সৃষ্ট সৌন্দর্য। তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি “দ্য ওয়েল-টেম্পারড ক্ল্যাভিয়ার,” “ম্যাস ইন বি মাইনর,” এবং “ব্রান্ডেনবার্গ কনসার্টোস।
স্নাতক ডিগ্রি লাভ করবার পরেই বাখ ১৭০৩ সালের জানুয়ারি মাসে থুরিঙ্গিয়ার একটি বড় শহর ওয়েইমারের ডিউক জোহান আর্নেস্ট চ্যাপেলে দরবারী সঙ্গীতশিল্পীর পদ গ্রহণ করেছিলেন। ওয়েইমারে মাত্র সাত মাসের মধ্যেই একজন কীবোর্ড বাদক হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁকে আর্নস্ট্যাডের সেন্ট বনিফেস চার্চে তাঁকে উদ্বোধনী আবৃত্তি দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এই শহরের সঙ্গে বাখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ১৭০৩ সালের আগস্ট মাসে তিনি উক্ত চার্চে অর্গানিস্টের পদে যোগদান করেছিলেন। এই সময়েই বাখ অর্গান প্রিলিউডগুলির মধ্যে দুর্দান্ত কয়েকটি সৃষ্টি করেছিলেন, সেগুলির মধ্যে বিখ্যাত হল ‘টোকাটা অ্যান্ড ফিউগ ইন ডি মাইনর’। যদিও এই রচনাগুলির সময়তে সুরকার তাঁর কনট্রাপুন্টাল রচনাশৈলী আয়ত্ত করতে পারেননি, যেখানে দুই বা ততোধিক সুর একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে।
বেশ কয়েক বছর পদে থাকবার পর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মনোমালিন্য এবং কোরাসে নিম্নমানের সঙ্গীতশিল্পীদের উপস্থিতি বাখকে বিরক্ত করে তোলে৷ এমনকি ১৭০৫ – ১৭০৬ সময়কালে আর্নস্ট্যাডে বাখের ধারাবাহিক অননুমোদিত অনুপস্থিতি ছিল। সেইসময় তিনি উত্তরের শহর লুবেকের মহান মাস্টার বুক্সটেহুডের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। এই বুক্সটেহুডের শৈলী বাখের প্রথমদিককার কাজের ভিত্তি নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করেছিল। পরিকল্পিত এই সফরে বৃদ্ধ বুক্সটেহুডের সঙ্গে কয়েকমাস বেশি সময় কাটিয়েছিলেন বাখ, যা থেকে বোঝা যায় সেই বৃদ্ধের সঙ্গ বাখের শিল্পের ক্ষেত্রে কতখানি মূল্যবান হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আর্নস্ট্যাডের আরামের চাকরি সত্ত্বেও বাখ ১৭০৬ সালের মধ্যেই বুঝতে পেরেছিলেন এখান থেকে তাঁকে পালাতে হবে এবং তাঁর সঙ্গীতের কেরিয়ারকে আরও দূরে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এরপর উত্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর মুহলহাউসেনের সেন্ট ব্লাসিয়াসে একজন অর্গানিস্টের পদগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়। ভাল বেতন এবং সুদক্ষ একটি কোরাস দিতে হবে, এই শর্তে তিনি এই পদটি গ্রহণ করেছিলেন। এই নতুন শহরে আসার চার মাস পরে তিনি তাঁর খুড়তুতো বোন মারিয়া বারবারাকে বিবাহ করেছিলেন। নতুন এই শহরের চার্চ বাখকে পেয়ে খুবই সন্তুষ্ট ও খুশি হয়েছিল। সেন্ট ব্লাসিয়াসের অর্গানের ব্যয়বহুল সংস্কারের যে পরিকল্পনা ছিল বাখের, তাতে কর্তৃপক্ষ অনায়াসে রাজি হয় এবং ১৭০৮ সালে নতুন কাউন্সিলের উদ্বোধনের জন্য তিনি রচনা করেছিলেন ‘গড ইজ মাই কিং’, যেটির মধ্যে স্পষ্টতই বুক্সটেহুডের শৈলীর প্রভাব ছিল।
মুহলহাউসেনে একবছর কাটানোর পর জোহান সেবাস্টিয়ান বাখ ওয়েইমারের ডুকাল কোর্টে একজন কোর্ট এবং কনসার্ট মাস্টারের পদ গ্রহণের জন্য চলে যান। বেতন পূর্বের তুলনায় ছিল বেশি এবং কোরাসও ছিল সুদক্ষ। বাখ পরিবার নিয়ে ডুকাল প্রাসাদের নিকটেই একটি বাসায় উঠেছিলেন। পরের বছর বাখ এবং মারিয়ার প্রথম সন্তানের জন্ম হয় এবং তাঁদের সঙ্গে বারবারার অবিবাহিত বড় বোন সংযুক্ত হয়ে পড়েন, যিনি ১৭২৯ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত এই পরিবারকে যত্নে-আদরে আগলে রেখেছিলেন।
এই ওয়েইমারে বাখ অনেকগুলি কীবোর্ড এবং অর্কেস্ট্রাল কম্পোজিশন নির্মাণ করেছিলেন, যেগুলিতে তাঁর প্রযুক্তিগত দক্ষতা, বৈদেশিক প্রভাব ও আত্মবিশ্বাস প্রকট ছিল এবং এর মাধ্যমে তিনি বিদ্যমান বৃহৎ-আকারের সঙ্গীত-কাঠামোকে প্রসারিত করতে পেরেছিলেন। আন্তোনিও ভিভালদি, আর্কাঞ্জেলো কোরেলি এবং জিউসেপ্পে তোরেলির মতো ইতালীয়দের সঙ্গীত থেকে তিনি কীভাবে নাটকীয় সূচনা লিখতে হয় তা শিখেছিলেন, তাঁদের গতিশীল মোটর-রিদম, হারমনি ইত্যাদি আয়ত্ত করেছিলেন। বাখ আন্তোনিও ভিভালদির কনসের্টো দ্বারা খুবই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। ভিভালদির কনসের্টোর প্রতিলিপি করে সেই শৈলীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন বাখ। বিশেষ করে ইতালীয় শৈলীর প্রতি ভীষণ আকৃষ্ট হয়েছিলেন বাখ।
ওয়েইমারে থাকতেই জোহান সেবাস্টিয়ান বাখ প্রিলিউড এবং ফিউগস লিখতে শুরু করেন যা পরে তাঁর উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি ‘দ্য ওয়েল-টেম্পার্ড ক্ল্যাভিয়ার’-এ একত্রিত করা হয়েছিল। বাখ ওয়েইমারের লিটল অর্গান বুক-এর ওপরেও কাজ শুরু করেছিলেন, যেখানে একটু জটিল টেক্সচার-সহ ঐতিহ্যবাহী লুথেরান কোরাল সুরের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। ১৭১৩ সালে হ্যালে-তে একটি পদের জন্য বাখকে প্রস্তাব দেওয়া হয়, যখন তিনি ক্রিস্টোফ কান্টজিয়াসের নেতৃত্বে মার্কেট চার্চ অব আওয়ার ডিয়ার লেডী-র পশ্চিম গ্যালারিতে প্রধান অর্গানের সংস্কারের সময় কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দিচ্ছিলেন।
১৭১৪ সালে বাখকে কনজারটমিস্টার হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। ওয়েইমারে রচিত বাখের নতুন সিরিজের প্রথম তিনটি ক্যান্টাটা হল, ‘হিমেলস্কোনিগ, সেই উইলকোমেন বিডব্লিউভি ১৮২, ওয়েইনেন, ক্লাগেন, সর্জেন, জাগেন, বিডব্লিউভি ১২ এবং আরশালেট, ইর লাইডার, আর্কলিঙ্গেট, ইর সাইটেন! বিডব্লিউভি ১৭২।
রাজসভার সচিবের এক প্রতিবেদন অনুসারে বাখ ১৭১৭ সালে বরখাস্ত হওয়ার আগে প্রায় এক মাস কারাবন্দী ছিলেন। ২রা ডিসেম্বর তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন৷
আনহাল্ট-কোথেনের প্রিন্স লিওপোল্ড বাখকে তাঁর ক্যাপেলমিস্টার বা সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করার জন্য নিয়োগ করেছিলেন। লিওপোল্ড নিজে ছিলেন একজন সঙ্গীতজ্ঞ ফলে বাখের সঙ্গীত-রচনার তিনি প্রশংসা করেন এবং ভালরকম অর্থও প্রদান করেন। বাখের এই পর্যায়ের কাজগুলি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। এই পর্যায়ের অর্কেস্ট্রাল স্যুট, সেলো স্যুট, সোলো ভায়োলিনের জন্য সোনাটা ও পার্টিটাস এবং ব্র্যান্ডেনবার্গ কনসার্টোস-এর মতো কাজ করেছিলেন। এমনকি বাখ রাজজসভার জন্য ধর্মনিরপেক্ষ ক্যান্টাটাও রচনা করেছিলেন, যেমন, ডাই জেইট, ডাই ট্যাগ উন্ড জাহরে মাচ্ট, বিডব্লিউভি ১৩৪এ।
১৭১৯ সালে, জোহান সেবাস্টিয়ান বাখ বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ হ্যান্ডেলের সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে কোথেন থেকে হ্যালে পর্যন্ত ৩৫-কিলোমিটার (২২ মাইল) যাত্রা করেছিলেন ; তবে, হ্যান্ডেল শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
১৭২০ সালে জোহান সেবাস্টিয়ান বাখ যখন লিওপোল্ডের সঙ্গে কার্লসব্যাডে গিয়েছিলেন তখন তাঁর স্ত্রী মারিয়া বারবারার মৃত্যু হয়। ১৭২১ সালের ডিসেম্বরে আনা ম্যাগডালেনা উইলকের সঙ্গে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন বাখ। ১৭২১ সালে লিওপোল্ডের সঙ্গে ভ্রমণের সময় বাখ তাঁর বিখ্যাত মিউজিক পিস ‘ব্রান্ডেনবার্গ কনসার্টোস’ সৃষ্টি করেছিলেন।
১৭২৩ সালে বাখকে লাইপজিগের গির্জার সঙ্গীত পরিচালক থমাসকান্টর হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তাঁকে সেন্ট থমাস স্কুলও পরিচালনা করতে হয়েছিল এবং সেইসঙ্গে চারটি গির্জার সঙ্গীত-সরবরাহের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। সেই সময় তিনি কোথেন এবং ওয়েইসেনফেলসের রাজসভায় সম্মানসূচক পদে নিয়োজিত হয়ে অনেক প্রতিপত্তি অর্জন করেন। লাইপজিগের সিটি কাউন্সিলের সঙ্গে প্রায়শই বাখ দ্বিমত পোষণ করতেন।
বাখের আগে জোহান কুহনাউ ছিলেন থমাসকান্টর। কুহনাউয়ের সময়ে তিনি লাইপজিগ পরিদর্শন করেছিলেন। ১৭১৪ সালে সেন্ট থমাস চার্চে সেবায় যোগদান করেন। উল্লেখ্য যে লাইপজিগের থমাসকান্টরের পদটি বাখের আগে আরও দুজনকে অফার করা হয়েছিল কিন্তু তাঁরা নিজেদের তৎকালীন ঠিকানা ছেড়ে আসতে রাজি হননি। কেবল ছাত্রদের গান শেখানো বা গির্জার জন্য সঙ্গীত সরবরাহই নয়, বাখকে ল্যাটিন শেখানোর জন্যও নিযুক্ত করা হয়। লাইপজিগের অনেকগুলি ক্যান্টাটা রচনা করেন এবং সেগুলি পারফরম্যান্সের নেতৃত্বও দেন। থমাসকান্টর হিসেবে যোগদানের পর তিনি নতুন ক্যান্টাটা ডাই এলেনডেন সোলেন এসেন, বিডব্লিউভি ৭৫ উপস্থাপন করেন। লাইপজিগে প্রায় ৩০০টিরও বেশি ক্যান্টাটা রচনা করেন তিনি।
১৭২৯ সালের মার্চ মাসে টেলিম্যানের শুরু করা কলেজিয়াম মিউজিয়ামের পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই কলেজিয়াম মিউজিয়াম নানা জায়গায় পারফরম্যান্স করত এবং সেসব জায়গায় বাখের ‘কফি ক্যান্টাটা’ কিংবা কীবোর্ড কনসার্টগুলিও পারফর্ম করা হত।
লাইপজিগ কাউন্সিলের সঙ্গে অনেক দরকষাকষি করে কোর্ট কম্পোজার হিসেবে নিযুক্ত হন বাখ। ১৭৩৫ সালে বাখ তাঁর অর্গান মিউজিকের প্রথম প্রকাশনা প্রস্তুত করতে শুরু করেন, যা ১৭৩৯ সালে ক্ল্যাভিয়ের-উবুং থ্রী হিসাবে মুদ্রিত হয়েছিল। সেই বছর থেকেই তিনি হার্পসিকর্ডের জন্য প্রিলুড এবং ফুগুসের সেট সংকলন ও রচনা করতে শুরু করেন, যেটি তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ হিসেবে ‘দ্য ওয়েল-টেম্পার্ড ক্লেভিয়ার’ নামে প্রকাশ পায়। ১৭৩৬ সালে তৃতীয় অগাস্টাস-এর কাছ থেকে তিনি ‘রয়্যাল কোর্ট কম্পোজার’-এর উপাধি পেয়েছিলেন।
১৭৪০ থেকে ১৭৪৮ সালের মধ্যে বাখ পুরোনো পলিফোনিক স্টাইলে সঙ্গীত অনুলিপি, প্রতিলিপি এমনকি প্রসারণের কাজ করেছিলেন। জীবনের শেষ দশকে বাখের নিজস্ব শৈলীর পরিবর্তন হয়ে যা দাঁড়ায় সেটি মূলত ছিল পলিফোনিক কাঠামো এবং ক্যানন ও স্টাইল অ্যান্টিকোর অন্যান্য উপাদানগুলির একটি বর্ধিত একীকরণ। তাঁর চতুর্থ এবং শেষ ক্লেভিয়ার-উবুং ‘গোল্ডবার্গ ভ্যারিয়েশনস’ ১৭৪১ সালে প্রকাশিত হয়। ১৭৪৬ সালে বাখ লরেঞ্জ ক্রিস্টোফ মিজলারের সোসাইটি অফ মিউজিক্যাল সায়েন্সে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ১৭৪৭ সালের মে মাসে, বাখ পটসডামে প্রুশিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের দরবারে যান। রাজা একটি থিমকেন্দ্রিক ফিউগস নির্মাণের জন্য চ্যালেঞ্জ করেন বাখকে। লাইপজিগে ফিরে এসে রাজার দেওয়া থিম রেজিয়ামের ওপর ভিত্তি করে একটি ফিউগস ও ক্যাননসের সেট এবং ট্রায়ো সোনাটা সৃষ্টি করেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই সঙ্গীত ‘দ্য মিউজিক্যাল অফারিং’ হিসেবে প্রকাশিত হয়। ১৭৪২ সালের দিকে লিখেছিলেন ‘দ্য আর্ট অব ফিউগ’।
১৭৪৯ সাল থেকেই বাখের স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছিল যা অবশেষে তাঁকে অন্ধত্ব এনে দিয়েছিল। ১৭৫০ সালের মার্চ এবং এপ্রিলে জন টেলর তাঁর চোখে অস্ত্রোপচার করেন। তবে সেই অস্ত্রোপচার অসফল হওয়ার কারণে, নানারকম শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি হয় এবং ১৭৫০ সালের ২৮ জুলাই ৬৫ বছর বয়সে এই বিশ্ববিখ্যাত সঙ্গীতসাধক জোহান সেবাস্টিয়ান বাখের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান