ইতিহাস

বিজয় কার্ণিক

১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের ক্রমান্বয়ী বোমা বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল ভুজ বিমানবন্দর, কিন্তু অসীম সাহসে এবং দক্ষতায় ভুজের মাধোপুর গ্রামের ৩০০ জন মহিলার সহায়তায় স্কোয়াড্রন লিডার ক্যাপ্টেন বিজয় কার্ণিক (Vijay Karnik) মাত্র তিন দিনের মধ্যেই ভুজ বিমানবন্দর পুনর্নির্মাণ করেছিলেন। ভারতীয় বায়ুসেনার উইং কমাণ্ডার হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। ভারতীয় সেনাবাহিনীর বীরত্বের প্রতীক বিজয় কার্ণিকের জীবন এবং ১৯৭১ সালের ভুজ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে একটি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে ‘ভুজ : দ্য প্রাইড অফ ইণ্ডিয়া’ যেখানে ক্যাপ্টেন বিজয় কার্ণিকের চরিত্রে অভিনয় করছেন অজয় দেবগণ।

১৯৩৯ সালের ৬ নভেম্বর মহারাষ্ট্রের নাগপুরে বিজয় কার্ণিকের জন্ম হয়। তাঁর বাবা শ্রীনিবাস কার্ণিক একজন সরকারি কর্মাধ্যক্ষ ছিলেন এবং তাঁর মা ছিলেন তারাবাঈ কার্ণিক। তাঁদের আরো তিন পুত্রের মধ্যে লক্ষণ কার্ণিক, বিনোদ কার্ণিক এবং অজয় কার্নিক প্রত্যেকেই পরবর্তীকালে ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিভাগের নিযুক্ত হয়েছেন। বিজয় কার্ণিকের একটি মাত্র বোন, তাঁর নাম বাসন্তী কার্ণিক। মহারাষ্ট্রের চন্দ্রসেনীয় কায়স্থ প্রভু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল তাঁদের পরিবার।

নাগপুরের স্থানীয় বেসরকারি স্কুলে বিজয় কার্ণিকের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। তারপর স্কুলশিক্ষা শেষ করে তিনি ভর্তি হন ওয়ার্ধায় নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বিজ্ঞানে অনার্সসহ স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন বিজয় ঐ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। পরে দাদা এবং ভাইদের মতো তিনিও ভারতীয় সেনাবিভাগে যোগ দেন।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


১৯৬২ সালের ২৬ মে মাত্র তেইশ বছর বয়সে ভারতীয় বায়ু সেনায় যোগদানের মধ্য দিয়ে বিজয় কার্ণিকের কর্মজীবন শুরু হয়। এর মধ্যে ১৯৬৫ সালে একবার ইন্দো-পাকিস্তান সংঘাত বাধে এবং দক্ষ সেনা হিসেবে সেই সংঘাত জয় করেন বিজয়। ১৯৬৭ সালে কর্মসূত্রে মহারাষ্ট্রের ছয়টি দলের সঙ্গে তাঁকেও পুনে পাঠানো হয়। এক তরুণ স্কোয়াড্রন লিডার হিসেবেই ভারতের ইতিহাসে এক অসামান্য বীরত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হল সেসময় বাংলাদেশকে সৈন্য সরবরাহ থেকে শুরু করে অন্যান্য সব রকম সহায়তা করেছিল ভারত। ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বেধে গেল ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হয় ভারতের মিত্র বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম। এই সময় গুজরাটের ভুজে বেস কমাণ্ডার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন বিজয় কার্ণিক। ৩ ডিসেম্বর রাত থেকে শুরু করে ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিনই বোমা নিক্ষেপ করতে থাকে পাকিস্তানি সেনারা। বিজয় বার্ণিকের নেতৃত্বে ভারতীয় সেনারা রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে নিজেদেরকে রক্ষা করছিলেন। একইসঙ্গে তারা করাচিতেও প্রবলভাবে আক্রমণ করছিলেন, প্রায় অর্ধেক করাচিতে জ্বলছিল আগুন। পাকিস্তানিদের নৌ-বন্দর, বিমানবন্দর সবই ধ্বংস করেছিলেন ভারতীয় সেনারা। ৫ ডিসেম্বর এবং ৬ ডিসেম্বরে গুজরাটের ভুজের উপর চলে আসা পাকিস্তানি দুটি বিমানকে ধ্বংস করেন তারা। কিন্তু বিজয় কার্ণিক এবং তার বাহিনী স্পষ্টই বুঝতে পারছিলেন কচ্ছ অঞ্চল ক্রমশ পাকিস্তানি সেনারা দখল করতে চাইছে। কারণ এর আগেও ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পাকিস্তানি ট্যাঙ্কার কচ্ছের রান বরাবর ভারতের সীমানায় অনুপ্রবেশ করেছিল। ৮ ডিসেম্বরের রাতে পাকিস্তানি সেনারা ক্রমান্বয়ে সাবের জেট বিমান থেকে ১৪টি নাপাল্ম বোমা নিক্ষেপ করে একেবারে ধূলিসাৎ করে দেয় ভুজ বিমানবন্দর। ফলে বিমানবন্দর থেকে ভারতীয় বায়ুসেনার বিমান উড়ানে বিপুল সমস্যা দেখা দেয় আর সেটাই পাকিস্তানি সেনাদের উদ্দেশ্য ছিল। এই সঙ্কট মুহূর্তে ভারতীয় সেনারা বাংলাদেশি সেনার সাহায্য চাইলেও ফ্রন্টে দ্রুত এসে সহায়তা করার মতো যথাসংখ্যক জওয়ান উপস্থিত ছিল না। সেইসময় বোমা বিস্ফোরণের খবর পেয়ে সেখানকার মহিলারা বিন্দুমাত্র ভয় পাননি, বরং তাঁরা দ্রুত সেনাদের গাড়িতে করে বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন, নিজেদের নিরাপত্তা বা পরিবারকে নিয়েও বিন্দুমাত্র চিন্তিত হননি তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য ছিল যদি তাঁরা মারাও যান তাহলে সেই মৃত্যু হবে সম্মানের এবং গর্বের। এলাকার ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর এবং পঞ্চায়েত প্রধানের পাশাপাশি বিজয় কার্ণিক নিজেই সেই মহিলাদের সহায়তা করেন। যুদ্ধের সময় ভুজ বিমানবন্দরের দায়িত্বেই ছিলেন স্কোয়াড্রন লিডার বিজয়। দুজন উর্ধ্বতন অফিসার, ৫০ জন ভারতীয় বায়ুসেনা এবং ৬০ জন প্রতিরক্ষা নিরাপত্তাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে বোমা বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত বিমানবন্দরটিকে উড়ানের জন্য প্রস্তুত করে তুলতে সমর্থ হন বিজয় কার্ণিক। প্রায় প্রাণ হাতে নিয়ে এই সময় কাজ করতে হয়েছে তাঁদের সকলকে, প্রতি মুহূর্তে পাকিস্তানি বোমারু বিমানের আগমণের কোনোরকম সঙ্কেত পেলেই ভারতীয় বায়ুসেনারা তাঁদের সাইরেনের মধ্য দিয়ে সতর্ক করছিলেন। বিজয় তাদের যথাযথভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে বিপদসঙ্কেত পেলে কীভাবে বাঙ্কারের মধ্যে লুকিয়ে পড়তে হয়, এমনকি বিভিন্ন ঝোপ-ঝাড়েও লুকিয়ে পড়তে শিখিয়েছিলেন তাঁদের। আদতে মাধোপুর গ্রামের প্রায় সকলেই কম-বেশি বাড়ি-ঘর নির্মাণের কাজে অভ্যস্ত ছিলেন আর এই দক্ষতাই কাজে লাগাতে সমর্থ হয়েছিলেন বিজয় কার্ণিক। ২৪ ডিসেম্বর ভুজ বিমানবন্দর পুনরায় কার্যকর অবস্থায় ফিরে এলে বিমানবন্দর পরিভ্রমণে এসে বিজয় কার্ণিক সহ ভারতীয় বায়ুসেনার সমস্ত জওয়ান এবং ঐ তিনশো দুঃসাহসী মহিলাকে সাধুবাদ জানান তিনি। ইন্দিরা গান্ধীর ভাষায় ‘তিনশো ঝাঁসির রানি’র মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভলবাঈ সেহ্‌গনি, ভীরু লচ্ছনি, হিরুবেন ভুদিয়া।

বিজয় কার্ণিকের এই দুঃসাহসিক অভিযান এবং মাধোপুর গ্রামের মহিলাদের অকুতোভয় সহায়তার কাহিনি নিয়ে সম্প্রতি ২০২১ সালের ১৩ আগস্ট ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেয়েছে ‘ভুজ : দ্য প্রাইড অফ ইণ্ডিয়া’ নামে ছবিটি যেখানে বিজয় কার্ণিকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অজয় দেবগণ।

১৯৮৫ সালের ১ অক্টোবর ভারতীয় বায়ুসেনার উইং কমাণ্ডার পদে উন্নীত হন বিজয় কার্ণিক। আর ঠিক তার পরের বছরই উইং কমাণ্ডার হিসেবেই অবসর গ্রহণ করেন তিনি।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য