ইতিহাস

হটী বিদ্যালঙ্কার

পুরুষশাসিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন পরিবেশে আঠেরো-উনিশ শতাব্দীর সামাজিক অবহেলা ও উপেক্ষাকে জয় করে নিজেদের ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভায় স্বতন্ত্রতার পরিচয় রেখেছিলেন যে কয়েকজন বঙ্গীয় রমণী তাঁদের মধ্যে অন্যতমা হলেন রাঢ়দেশীয় হটী বিদ্যালঙ্কার (Hoti Vidyalankar)। তাঁর প্রকৃত নাম জানা যায় না। তবে শাস্ত্রজ্ঞ ও বিদূষী হবার জন্য তিনি ‘বিদ্যালঙ্কার’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। 

অনুমান করা হয়, অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে তৎকালীন বাংলার রাঢ় অঞ্চলে বর্ধমান জেলার সোঁঞাই গ্রামে এক কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারে হটী বিদ্যালঙ্কারের জন্ম হয়। তাঁর বা তাঁর বাবা মায়ের প্রকৃত নাম সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। হটী বিদ্যালঙ্কার নাম প্রসঙ্গে নারায়ণ সান্যাল তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস রূপমঞ্জরীতে (২য় খন্ড) লিখেছেন “হটী কখনো কোন বাঙালী মেয়ের নাম হিসাবে আর কোথাও পাইনি। শব্দটা চলন্তিকা অভিধানে নেই। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রামাণ্য অভিধানে অবশ্য ‘হট’ শব্দের কিছু প্রাচীন যুগ প্রচলিত অর্থর হদিস দিয়েছেন। ‘হট’ সেখানে এইসব শব্দের সমার্থ হিসাবে ব্যবহৃত: দ্রোহবুদ্ধি, বিদ্বেষ, শত্রুতা, বিবাদ এবং চলিত বাংলায় ‘জিদ্দিবাজি’। … তাই আন্দাজ করছি ‘হট’ শব্দটিকে ‘জিদ্দিবাজি’-র সমার্থ ধরে নিয়ে বালিকাবয়সে বিদ্যালঙ্কারের পিতৃদেব এই নামকরণ করেন। নিঃসন্দেহে ‘ডাকনাম’। তাঁর ভাল নামটা হারিয়ে গেছে।”

শৈশবে মাতৃহারা হটীকে বাল্যকাল থেকেই ঘর গৃহস্থালির কাজ সামলাতে হত। তাঁর বাবা শাস্ত্রচর্চা করতেন এবং নিজস্ব টোলে অধ্যাপনা করতেন। নারীশিক্ষার বিষয়ে তিনি উদারমনস্ক ছিলেন বলে জানা যায়। সামাজিক বিধি মেনে তিনি বাল্যবয়সে এক কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারে কন্যার বিবাহ দেন। কিন্তু হটীর স্বামীর একাধিক স্ত্রী থাকায় তখনকার দিনের স্বাভাবিক রীতি অনুসারে তিনি পিতৃগৃহেই থাকতেন। বিবাহের খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর স্বামী বিয়োগ ঘটে।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভারতীয় সমাজে শিক্ষাবিস্তারের প্রধান মাধ্যম ছিল হিন্দুদের পাঠশালা ও মুসলমানদের মক্তব। মুসলমানদের ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষার মাধ্যম ছিল মৌলবীগণ পরিচালিত মাদ্রাসা এবং হিন্দুদের ক্ষেত্রে ব্ৰাহ্মণ পণ্ডিতগণ পরিচালিত চতুষ্পাঠীসমূহ। পাঠশালা যে কোন জাতির লোক প্ৰতিষ্ঠা ও পরিচালনা করতে পারলেও চতুষ্পাঠীগুলি সাধারণতঃ ব্ৰাহ্মণপণ্ডিতগণই পরিচালনা করতেন। সেইসময় চতুষ্পাঠীগুলির শ্ৰেষ্ঠ কেন্দ্র ছিল নবদ্বীপ। তবে নবদ্বীপই একমাত্র শিক্ষাকেন্দ্ৰ ছিল না। পশ্চিমবঙ্গে শাস্ত্ৰ অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার জন্য ত্ৰিবেণী, কুমারহট্ট (কামারহাটি), ভট্টাপঞ্জী (ভাটপাড়া), গোন্দলীপাড়া (চন্দ্রনগর), ভদ্ৰেশ্বর, জয়নগর-মজিলপুর, আব্দুল, বালী, বর্ধমান প্ৰভৃতির ও পূর্ববঙ্গে কোটালিপাড়ার বিশেষ প্ৰসিদ্ধি ছিল। দক্ষিণ ভারত, ওড়িশা, মিথিলা ও বারাণসী থেকে দলে দলে ছাত্র বর্ধমানের চতুষ্পাঠীতে অধ্যয়ন করতে আসত। চতুষ্পাঠীগুলিতে জ্যোতিষ, আয়ুৰ্বেদ, ন্যায়, কোষ, নাটক, গণিত, ব্যাকরণ, ছন্দোসূত্র প্রভৃতি ও দণ্ডী, ভারবী, মাঘ, কালিদাস, প্ৰমুখদের কাব্যসমূহ এবং মহাভারত, কামন্দকীদীপিকা, হিতোপদেশ প্রভৃতি পড়ানো হত।

আঠেরো শতকের বাংলার তথা ভারতের সমাজ ছিল নানা কুসংস্কারের অন্ধকারে আচ্ছন্ন। বাংলার গ্রামীণ সমাজের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল টোল ও চতুষ্পাঠী নির্ভর। শিক্ষার মাধ্যম ছিল সংস্কৃত ভাষা এবং বিষয়গুলি ছিল ন্যায়, স্মৃতি, ব্যকরণ, কাব্য এবং আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা শাস্ত্র ইত্যাদি। জাতিভেদ প্রথার মতো সামাজিক ব্যাধির প্রকোপে শিক্ষার অধিকার কেবলমাত্র ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সমাজে বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, কৌলিন্য প্রথা ও সতীদাহ প্রথার মতো রীতি নীতি ও আচার অনুষ্ঠান ছিল বহুল প্রচলিত। নারী জাতির না কোন ব্যক্তি স্বাধীনতা ছিল, না ছিল সামাজিক মর্যাদা। এই অবস্থায় নারী শিক্ষা ছিল অলীক কল্পনার মতো বিষয়। সমাজপতিদের বিধান ছিল শিক্ষা লাভ করলে নারীরা বিধবা হবে। তাই বাল্যকালে প্রথাগত শিক্ষা পাননি হটী। তাঁর উৎসাহ দেখে তাঁর বাবা তাঁকে লেখাপড়া শেখাতে চাইলেও সামাজিক চাপে তাও হয়ে ওঠেনি। তবে কাজকর্মের ফাঁকে টোলে বাবার পাঠদান শুনে শুনে তিনি শিখে ফেলেন ব্যকরণ, ন্যায়, কাব্য। বৈধব্যের পর তিনি বাবাকে যুক্তি দিলেন, কোন পুঁথি পাঠ তো দূর, স্পর্শ না করেই যখন তিনি বিধবা হয়েছেন, তখন তাঁর শিক্ষা লাভের পথে আর কোনো বাধা থাকে না। তাঁর শাস্ত্রজ্ঞ বাবা জানতেন শাস্ত্র মতে কন্যাকেও পুত্রের মতো পালন করতে হয় এবং তাঁকে সযত্নে বিদ্যাশিক্ষাও দিতে হয়। এরপর থেকে বাবার কাছে গোপনে তিনি পড়াশোনা করতে থাকেন। এইভাবে তিনি নানা বিষয়ের সঙ্গে ‘নব্যন্যায়’ নামক বিষয়ে অত্যন্ত পারদর্শী হয়ে ওঠেন।

বাবার মৃত্যুর পর তাঁর টোলে অধ্যাপনার কাজ দিয়ে শুরু হয় হটীর কর্মজীবন। কিন্তু পারিপার্শ্বিক ব্রাহ্মণ সমাজ বিধবা নারীরা অধ্যাপনা মেনে নিতে পারল না। সামাজিক চাপে ছাত্ররা টোলে আসা বন্ধ করে দিলে তীব্র আর্থ সামাজিক সংকটে পড়লেন হটী। সাহস আর আত্মবিশ্বাসে ভর করে তিনি পৌঁছালেন কাশীতে। কাশী একদিকে ছিল সহায়হীন বিধবাদের শেষ আশ্রয়, অপরদিকে তৎকালীন ভারতের শ্রেষ্ঠ শাস্ত্র অধ্যায়ণ ও অধ্যাপনার কেন্দ্র। সেখানের বিখ্যাত বিখ্যাত সব পণ্ডিতদের চতুষ্পাঠীতে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে একাগ্র চিত্তে কঠিন অধ্যায়ন করে তিনি আয়ত্ব করলেন জ্যোতিষ বিদ্যা, ন্যায়শাস্ত্র, গণিত, ছন্দোসূত্র প্রভৃতির পাঠ। এরপর কাশীতে এক চতুষ্পাঠী প্রতিষ্ঠা করে সেখানে তৎকালীন গৌড়, কাশী ও নানা দেশের ছাত্রদের পাঠদান করতে থাকেন। স্মৃতি, ব্যকরণ ও নব্যন্যায়শাস্ত্রে তাঁর বুৎপত্তিতে মুগ্ধ কাশীর পণ্ডিত সমাজ এক সম্বর্দ্ধনা সভার আয়োজন করে হটীকে ‘বিদ্যালঙ্কার’ উপাধিতে ভূষিত করলেন। শোনা যায় পেশার প্রতি সততা ও নিষ্ঠার কারণে মস্তক মুণ্ডন করে টিকি রাখতেন হটী। অধ্যাপনার পাশাপাশি নানা বিচারসভায় অন্যান্য পণ্ডিতদের সঙ্গে হটী বিদ্যালঙ্কার সসম্মানে আমন্ত্রিত হতেন ও বিদায় দক্ষিণা নিতেন। 

যে সময়ে শঙ্কর তর্কবাগীশ ও জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননরা খ্যাতির মধ্যগগনে বিরাজমান, তখন এক সহায়হীন বাল্যবিধবার কাশীতে চতুষ্পাঠী প্রতিষ্ঠা, অধ্যাপনা এবং অসামান্য কর্মজীবন দক্ষতা, প্রতিভা ও সাহসের এক বিরল ও বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত। রাজনারায়ণ বসুর তাঁর ‘সেকাল আর একাল’ গ্রন্থে যথার্থই বলেছেন,”আমাদের স্ত্রীলোকেরা উচ্চতর বিদ্যায় পারদর্শিতা লাভ করিতে সক্ষম তাহা হটী বিদ্যালঙ্কারের দৃষ্টান্ত দিয়া বিলক্ষণ প্রমাণিত হইতেছে।” শ্রীরামপুর মিশনের উইলিয়াম ওয়ার্ড ‘হিন্দু’ বইটি যখন রচনা করেন তখন জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন ও হটী বিদ্যালঙ্কার দুজনেই জীবিত ও তাঁদের নামের উল্লেখ পাওয়া যায় (১৮০৬-০৭)। ১৮১৭ সালে স্থাপিত স্কুল বুক সোসাইটি প্রকাশিত ‘স্ত্রীশিক্ষা বিষয়ক’ পুস্তকে হটীর সাফল্য ও সম্মানের কথা বর্ণিত হয়েছিল।

আনুমানিক ১৮১০ সালে কাশীধামে হটী বিদ্যালঙ্কারের মৃত্যু হয় অর্থাৎ তখনও বাংলার নবজাগরণের পথিকৃৎগণদের মধ্যে রাজা রামমোহন ‘ব্রাহ্মসমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেননি আর ডিরোজিও এক বছরের শিশু।

ভারতীয় স্ত্রী শিক্ষার ইতিহাসে হটী বিদ্যালঙ্কারের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো। সেই যুগে একজন সহায় সম্বলহীন বাঙালি বিধবা কাশী-বারাণসীর মত বিদ্যাকেন্দ্রে গিয়ে বিপুল যশের অধিকারিণী হয়েছিলেন এ কথা ভেবে বাঙালি মাত্রেই গৌরব বোধ করা উচিত।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


তথ্যসূত্র


  1. http://www.joydhak.com/
  2. https://www.ebanglalibrary.com/
  3. সুবোধ সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত, সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, মে ১৯৬০, পৃষ্ঠা-৫৮৪
  4. ১৭৯৬ সালে বাল্মীকি মুদ্রণযন্ত্রে কালীকিঙ্কর চক্রবর্ত্তি কর্ত্তৃক মুদ্রিত 'সেকাল আর একাল' রাজনারায়ণ বসু পৃষ্ঠা-৫০
  5. রূপমঞ্জরী - দ্বিতীয় খন্ড, নারায়ণ সান্যাল, পৃষ্ঠা ২৩৩-৩৪।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন