সববাংলায়

জোহানেস কেপলার

বিভাগঃ , ,

বিখ্যাত জার্মান গণিতবিদ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলারই (Johannes Kepler) সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেছিলেন যে পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহগুলি একটি উপবৃত্তাকার কক্ষপথে সূর্যের চারদিকে ঘুরছে। গ্রহের গতি সম্পর্কিত তিনটি সূত্র দিয়েছেন তিনি। আলোকবিদ্যা এবং জ্যামিতি বিষয়েও তাঁর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা রয়েছে। তাঁর এই গবেষণা নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কারের ভিত্তিভূমি হিসেবে কাজ করেছে। কেপলার তাঁর জ্যোতির্বিদ্যাকে ‘মহাজাগতিক পদার্থবিদ্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। গ্যালিলিও আবিষ্কৃত প্রতিসারক দূরবীনের কর্মক্ষমতার উন্নতিসাধন করেছিলেন কেপলার। যে সময়ে কেপলার জ্যোতির্বিদ্যা চর্চা করেছেন, সেই সময়ে জ্যোতিষশাস্ত্রের সঙ্গে এই জ্যোতির্বিদ্যার কোনো পার্থক্য করা হত না। কেপলারই নিজের দক্ষতায় পদার্থবিদ্যা এবং জ্যোতির্বিদ্যার মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন প্রমাণ করেন। কেপলারের চিঠিপত্রগুলি একটি বৈজ্ঞানিক জার্নালের চাইতে কম কিছু ছিল না, এই চিঠিপত্রের মধ্য দিয়েই তাঁর জীবনের এক বড় অংশ এবং তাঁর গবেষণা সম্পর্কে জানা যায়।

১৫৭১ সালের ২৭ ডিসেম্বর জার্মানির স্টুটগার্ট শহরের কাছে ওয়েল ডার স্ট্যাটে ফ্রি ইম্পেরিয়াল সিটিতে জোহানেস কেপলারের জন্ম হয়। তাঁর বাবা হাইনরিখ কেপলার পেশায় একজন সৈনিক ছিলেন এবং প্রভূত অর্থ উপার্জন করেছিলেন। কেপলারের আরও দুই ভাই এবং এক বোন ছিল। তাঁর ঠাকুরদা সেবাল্ড কেপলার শহরের মেয়র ছিলেন। জোহানেস কেপলারের পাঁচ বছর বয়সে তাঁর বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যান। অনেকে মনে করেন আশি বছর বয়সে নেদারল্যাণ্ডের দীর্ঘ আট বছর ব্যাপী যুদ্ধে তিনি মারা যান। কেপলারের মা ক্যাথরিনা গোল্ডেনম্যান ছিলেন এক সরাইখানার মালিকের কন্যা এবং পেশায় তিনি ছিলেন একজন ভেষজ-চিকিৎসক। নির্ধারিত সময়ের আগে জন্মানোর কারণে ছোটোবেলায় শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল ছিলেন কেপলার। মাত্র ৬ বছর বয়সে ১৫৭৭ সালের বিশাল ধূমকেতুটি নিজের চোখে দেখেছিলেন তিনি। ছোটোবেলা থেকেই জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু শৈশবে গুটিবসন্ত হওয়ার কারণে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে যায় যা মহাকাশকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য তাঁর ক্ষমতাকে সীমিত করে তোলে। পরবর্তীকালে ১৫৯৭ সালের ২৭ এপ্রিল বারবারা মুলারের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁদের প্রথম দুই সন্তান হেনরিখ ও সুজানা শৈশবেই মারা যায় এবং পরে তাঁদের আরো দুই পুত্র জন্মায় ফ্রেডরিখ এবং লুডউইগ নামে।   

১৫৮৯ সালে মলব্রনের গ্রামার স্কুল, লাতিন স্কুল এবং সেমিনারিতে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। এরপরে তুবিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তুবিঞ্জার স্টিফটে ভর্তি হন তিনি। সেখানে ভিটাস মুলারের কাছে দর্শন এবং জ্যাকব হারব্র্যাণ্ডের কাছে ধর্মতত্ত্ব পড়েন কেপলার। ক্রমেই একজন দক্ষ গণিতজ্ঞ হিসেবে নিজের পরিচয় গড়ে তোলেন তিনি এবং তাঁর ছাত্রদের রাশিফল বিচার করে দক্ষ জ্যোতিষ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন। তুবিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক মাইকেল ম্যাসটিলিনের কাছে গ্রহের বিন্যাস সংক্রান্ত টলেমীয় ধারণা এবং কোপারনিকাসের ধারণার সঙ্গে পরিচিত হন কেপলার। সৌরজগতের কেন্দ্রে যে সূর্য রয়েছে এই ধারণাটি তখনই তিনি তাত্ত্বিক এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সূর্যই হল এই মহাবিশ্বের সকল শক্তির উৎস। তাঁর ইচ্ছে ছিল তিনি দেশের প্রশাসক হবেন, কিন্তু তাঁর পড়াশোনার শেষ দিকে গ্রাজের প্রোটেস্ট্যান্ট স্কুলে গণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যার শিক্ষক হিসেবে তাঁর নাম সুপারিশ করা হয়।

১৫৯৪ সালে ২২ বছর বয়সে গ্রাজের প্রোটেস্ট্যান্ট স্কুলে শিক্ষকতা করতে শুরু করেন। এই সময়ে তিনি বহু আনুষ্ঠানিক বর্ষপঞ্জী তৈরি করেন এবং বহু পূর্বাভাস দেন যা তাঁকে একজন জ্যোতিষ হিসেবে বিখ্যাত করে তোলে। ১৫৯৬ সালে তাঁর প্রথম বই ‘মিস্টেরিয়াম কসমোগ্রাফিকাম’ প্রকাশ পায়। এই বই প্রকাশের পরেই গ্রাজ স্কুলে তাঁর খ্যাতি আরো বেড়ে যায়। এরপর চারটি বই লেখার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি যার মধ্যে মহাবিশ্বের সূর্য এবং স্থির নক্ষত্র, গ্রহ ও তার গতি, একটি গ্রহের গঠন ও তার ভৌত প্রকৃতি এবং বায়ুমণ্ডলীয় আলোকবিদ্যার বিষয়গুলি নিয়ে গবেষণা করতে চেয়েছিলেন কেপলার। আরেক বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী টাইকোব্রাহের সঙ্গে কেপলারের মতাদর্শগত বিরোধ দেখা দেয়। বিভিন্ন জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিষয় নিয়ে টাইকোর নির্মীয়মান মানমন্দিরে উভয়ের মধ্যে বহু আলোচনা হয়। টাইকোব্রাহের মঙ্গল গ্রহ সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণগুলিকে কেপলার বিশ্লেষণ করেছিলেন এবং উভয়ের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। জোহানেস জেসেনিয়াসের সাহায্যে ঘটা সেই চুক্তির ফলও ভালো হয় না। টাইকোব্রাহের মানমন্দির ছেড়ে গ্রাজে ফিরে আসেন কেপলার। ঐ বছরই ১০ জুলাই চন্দ্রগ্রহণ দেখা যায় গ্রাজে এবং সেই সময় নিজের উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে তা পর্যবেক্ষণ করে আলোকবিদ্যার উপর একটি বই লিখে ফেলেন ‘অ্যাস্ট্রোনমিয়া পার্স অপটিকা’ নামে।

এদিকে ১৬০০ সালে গ্রাজের প্রোটেস্ট্যান্ট গির্জা কেপলারকে ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করে এবং তিনি সেই কথা না শুনলে গির্জা কেপলার ও তাঁর পরিবারকে গ্রাজ থেকে বের করে দেয়। অদ্ভুতভাবে যে টাইকোব্রাহের সঙ্গে তাঁর মতানৈক্য হয়েছিল, তিনি এই সময় কেপলারকে অর্থসাহায্য করেন। ১৬০১ সালে টাইকোব্রাহের মৃত্যু হলে রোমান সম্রাট দ্বিতীয় রুডল্‌ফের দরবারে রাজানুগ্রহ প্রাপ্ত গণিতবিদ হিসেবে কাজ পান জোহানেস কেপলার। সম্রাটকে জ্যোতিষশাস্ত্রের বিষয়ে নানাবিধ পরামর্শ দিতেন কেপলার। কিন্তু তাঁর পরামর্শের মধ্যে কোনো অযৌক্তিক পূর্বাভাস থাকতো না, বরং জ্যোতির্বিজ্ঞানের গণনা আর বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি একটি সিদ্ধান্তে এসে উপনীত হতেন। আলোকবিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর গবেষণা এবং তাঁর বইটি ১৬০৪ সালে কেপলার সম্রাটের কাছে পেশ করেন। সমতল দর্পণ আর বক্র দর্পণে আলোর প্রতিফলন, মানুষের চোখের গঠন ইত্যাদি বিষয়ে কেপলার গবেষণা করেছিলেন। সম্রাট রুডলফ তাঁকে একটি জ্যোতিষ্ক তালিকা প্রণয়নের কাজ দিয়েছিলেন যার মূল ভিত্তি হবে কোপারনিকাসের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। কেপলার ভেবেছিলেন গ্রহগুলি সম্ভবত বৃত্তাকার কক্ষপথে ঘোরে, কিন্তু ১৬০৫ সালে মঙ্গল গ্রহের গতিপথ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তিনি পূর্বতন ধারণা নস্যাৎ করে এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, গ্রহদের কক্ষপথ আসলে উপবৃত্তাকার। এই উপবৃত্তের দুটি ফোকাসের মধ্যে একটিতে থাকে সূর্য। গ্যালিলিওর দূরবীন আবিষ্কারের পরে জোহানেস কেপলারও কলোনের ডিউকের কাছ থেকে একটি দূরবীন আনিয়ে তা দিয়ে বৃহস্পতির চারটি উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ করেন এবং এ বিষয়ে ১৬১১ সালে ‘ডায়োপট্রাইস’ নামে একটি প্রবন্ধও লেখেন তিনি। এই প্রবন্ধেই প্রথম কেপলার পৃথিবীর বদলে সৌরজগতের কেন্দ্রে সূর্যের অবস্থান স্বীকার করেন। যদিও এই প্রবন্ধ কেপলারের মৃত্যুর আগে প্রকাশিত হয়নি। অন্যদিকে ১৬১০ সালে পাড়ুয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্যালিলিও অবসর গ্রহণ করায় সেই জায়গায় কেপলারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, কিন্তু কেপলার জার্মানিতেই থাকতে চান।

সম্রাট রুডলফের মৃত্যুর পরে ১৬১২ সালে লিনৎসে গিয়ে সম্রাটের আদেশমাফিক সেই জ্যোতিষ্কের তালিকা সম্পূর্ণ করেন জোহানেস কেপলার। ১৬১৭ থেকে ১৬২৪ সালের মধ্যে কেপলার মোট ৬টি জ্যোতিষশাস্ত্রীয় বর্ষপঞ্জী তৈরি করেন যার কারণে সমগ্র বিশ্বে কেপলারের খ্যাতি বহুগুনে বেড়ে যায়। অনেকে বলে থাকেন, এই বর্ষপঞ্জীতে কিছু ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন কেপলার যা প্রথমদিকে সত্য বলে প্রমাণিত হতে থাকলেও, পরে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয় এবং গ্রাজের জনগণ এই বর্ষপঞ্জী পুড়িয়ে দেয় প্রকাশ্যে। শুধুই জ্যোতির্বিজ্ঞান নয়, সঙ্গীত, আলোকবিদ্যা, জ্যোতিষশাস্ত্র ইত্যাদি বিদ্যাচর্চার নানা জগতে কেপলার নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন। জীবৎকালে ক্যাথলিকদের কাছে বারবার লাঞ্ছিত হতে হয়েছে তাঁর পরিবারকে।

তাঁর অন্যতম বিখ্যাত গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘এপিটোম অফ কোপারনিকান অ্যাস্ট্রোনমি’ যা তিনটি খণ্ডে প্রকাশ পায় ১৬১৭, ১৬২০ ও ১৬২১ সালে। এছাড়াও ১৬১৫ সালে প্রকাশ পেয়েছিল তাঁর আরেকটি বই ‘নোভা স্টিরিওমেট্রিয়া ডলোরিয়াম ভিনারোরিয়াম’। ১৬২১ সালে তাঁর লেখা ‘মিস্টেরিয়াম কসমোগ্রাফিকাম’ বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ পায় এবং এর আগে ১৬১৯ সালে প্রকাশিত হয় কেপলারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বই ‘হারমোনি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’। জ্যোতিষশাস্ত্রের উপর লেখা তাঁর ‘অ্যাস্ট্রোনমিয়া নোভা’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বই। ১৬২৭ সালে সম্রাট রুডলফের নির্দেশ মাফিক ‘রুডলফিয়ান টেবল’ প্রকাশ করেন জোহানেস কেপলার।

১৬৩০ সালের ১৫ নভেম্বর ৫৮ বছর বয়সে জোহানেস কেপলারের মৃত্যু হয়।    


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading