বিচারপতি কে এস পুট্টাস্বামী বনাম ভারত মামলা

বিচারপতি কে এস পুট্টাস্বামী বনাম ভারত মামলা

ভারতের ইতিহাসে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী একটি ঘটনা হল বিচারপতি কে এস পুট্টাস্বামী বনাম ভারত মামলা (Justice K. S. Puttaswamy Vs. Union of India Case) যেখানে প্রথম ভারতীয় নাগরিকের গোপনীয়তার তথা ব্যক্তি পরিসরের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই মামলার চূড়ান্ত রায়েই বলা হয়েছিল প্রথম যে নাগরিকের ব্যক্তি পরিসরের অধিকার তার ব্যক্তি স্বাধীনতারই প্রকাশমাত্র আর এই অধিকার সংবিধানের থেকেও প্রাচীন। নাগরিকের ব্যক্তি পরিসরের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবেই স্বীকৃতি দেওয়া হয় এই মামলায় এবং বলা হয় এই অধিকার আসলে ভারতীয় নাগরিকের মর্যাদা, স্বায়ত্তশাসন এবং স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য এক অঙ্গ।

২০১৫ সালে আধার ডেটাবেসের আইনি বৈধতা বিষয়ে প্রশ্ন তুলে শুরু হয়েছিল এই মামলা। যদিও ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্ট। এই মামলায় রায় দিয়েছিলেন নয়জন বিচারপতির একটি বেঞ্চ। সেই বেঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি জে এস খেহার, বিচারপতি জাস্তি চেলমেশ্বর, ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়, রোহিনটন নারিমান, আর কে আগরওয়াল, সঞ্জয় কিষাণ কল, এ নাজির, সা ববডে এবং সবশেষে এ এম সাপ্রে। বিচারপতি কে এস পুট্টাস্বামী মাদ্রাজ উচ্চ আদালতের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ছিলেন যিনি আধার প্রকল্পের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এই মামলার ভিত্তিতে। তিনিই প্রথম দেখান যে আধার প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতীয় নাগরিকের ব্যক্তি পরিসরের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। তার ফলে প্রথমে তিনজন বিচারপতির একটি বেঞ্চ এই মামলা পরিচালনা করলেও পরে নয়জন বিচারপতির বেঞ্চের প্রয়োজন হয় এবং সেভাবেই মামলার রায় ঘোষণা হয়।

মাদ্রাজ উচ্চ আদালতের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক কে এস পুট্টাস্বামী আধার প্রকল্পের বিরুদ্ধে এই মামলাটি দায়ের করেছিলেন। আধার প্রকল্পটির সরকারি নাম ছিল ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (UIDAI) যা আসলে একটি ১২ সংখ্যার শনাক্তকরণ চিহ্ন। ভারতবাসীদের সকলের জন্য এই শনাক্তকরণ চিহ্ন পরিষেবা চালু করা ও বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। আধার কার্ডের সাংবিধানিক বৈধতাকে প্রশ্ন করেছিল এই মামলা। এম. পি শর্মা এবং খড়ক সিং মামলার রায়ের ভিত্তিতে ভারতের অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যক্তি পরিসরের মৌলিক অধিকারের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এই মামলার প্রাথমিক পর্বে তিন বিচারপতির বেঞ্চ সুপ্রিম কোর্টের এমন বহু মামলার দৃষ্টান্ত পুনর্বিবেচনা করেছিল যেখানে ব্যক্তি পরিসরকে সাংবিধানিকভাবে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। ফলে বোঝাই যায়, বিচারপতি কে এস পুট্টাস্বামী বনাম ভারত মামলা কেবলমাত্র ব্যক্তি পরিসরের অধিকার ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ের অন্তর্গত মৌলিক অধিকার কিনা সে ব্যাপারেই আলোচনা করেছে। বিবাদী পক্ষ মূলত এম. পি শর্মা এবং খড়ক সিং মামলার রায়ের উপরই ভিত্তি করে মত প্রকাশ করেছে যেখানে সংবিধান বিশেষভাবে গোপনীয়তার অধিকার রক্ষা করেনি।

সরকার সমস্ত প্রকার সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্যে আধার পরিষেবাকে সকলের জন্য বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করেছে আর এখানেই তিনি আপত্তি তোলেন এই মর্মে যে, এই কাজ ব্যক্তি পরিসরের অধিকারের পরিপন্থী। নয় বিচারপতির বেঞ্চের সামনে অভিযোগকারী পুট্টাস্বামী যুক্তি দিয়েছিলেন যে, সংবিধানের ২১ নং ধারায় মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের যে অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, ব্যক্তি পরিসরের অধিকার তার মধ্যেই নিহিত আছে। কিন্তু এর বিপরীতে আদালত প্রাথমিকভাবে জানায় যে সংবিধানে কেবলমাত্র ব্যক্তিগত স্বাধীনতার স্বীকৃতি রয়েছে সীমিত পরিমাণে, তবে গোপনীয়তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত নেই। এই মামলায় মূলত যে প্রশ্নগুলি উঠে আসে তা হল  

ক. সংসদ আধারকে অর্থ বিল হিসেবে পাশ করতে সক্ষম কিনা

খ. বায়োমেট্রিক তথ্যের রক্ষণাবেক্ষণ গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন করে কিনা

গ. সমতা ও মর্যাদার ধারার অধীনে ভর্তুকি ও অন্যান্য সুবিধা পাওয়ার জন্যে আধার বাধ্যতামূলক করা যুক্তিযুক্ত

   কিনা

ঘ. ভারতের সকল নাগরিকের জন্য কি আধার কার্ড বাধ্যতামূলক করা যায়!

এই সকল দিক বিবেচনা করে আদালতের বিচারপতিরা বলেন যে, ব্যক্তি পরিসরের অধিকার স্বীকৃত, কিন্তু তা শর্তহীন নয়। জনগণের কল্যাণের জন্য সরকার চাইলে এই অধিকার খর্ব করতে পারে। বেশিরভাগ বিচারপতি এই মর্মে জানিয়েছেন যে সরকারি কাজের নিরিখে ব্যক্তিগত তথ্য প্রয়োজন হয়। প্রতিরক্ষা, দণ্ডনীয় অপরাধের তদন্ত, পুলিশি তদন্তের জন্য অপরাধীর বিস্তারিত তথ্য যেমন প্রয়োজন, তেমনি সরকারি অনুদান দেওয়ার সময়েও যাতে একই ব্যক্তি একবারই মাত্র অনুদান পান সেদিকে নজর রাখার জন্য এই ব্যক্তিগত তথ্যের প্রয়োজন হয়। তবে এই অজুহাতে সরকার যদি অনৈতিকভাবে অহেতুক তথ্য সংগ্রহ বা বিতরণ করে তবে তা অসাংবিধানিক বলে স্বীকৃত হয়। বিচারপতিরা বলেন যে ব্যক্তি পরিসর এবং গোপনীয়তার ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যবহারের উপর এই মামলার রায়ের অনেক প্রভাব পড়তে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ইন্টারনেটে আমরা অনেক সময়ই জেনে বা না জেনে ব্যক্তিগত তথ্য আদান-প্রদান করে থাকি যার অপপ্রয়োগে ব্যক্তি পরিসর ক্ষুণ্ণ হতে পারে। গোপনীয়তার মধ্যে পড়ে নাগরিকের ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস। নাগরিক কী খাবে আর কী খাবে না, তার উপর সরকার কোনও রকম নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে না। আবার নাগরিক কী ধরনের পোশাক পরবে তাও সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। সর্বোপরি মানুষের যৌন পছন্দ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত মাত্রায় গোপনীয়তা তথা ব্যক্তি পরিসরের অধিকার কার্যকরী রয়েছে। ৩৭৭ ধারা অনুসারে সমকামিতাকে যেভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ ঘোষণা করা হয়েছিল, তা সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে বহাল থাকেনি। এই আলোচনা থেকেও ব্যক্তির নিজস্ব লিঙ্গ পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রটিও ব্যক্তি পরিসরের অন্তর্গত তা উঠে আসে। সমগ্র বিষয়টি বিচার করে সুপ্রিম কোর্ট ৫৪৭ পৃষ্ঠার একটি রায় ঘোষণা করেছে যেখানে সর্বসম্মতিক্রমে গোপনীয়তার অধিকারকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

আপনার মতামত জানান