ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যে বিবাহিত মহিলাদের দ্বারা পালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রত হল ‘ কারাদাইয়ান ননবু ‘(Karadaiyan Nonbu)। এই ব্রতটি ‘সাবিত্রী ননবু বিট্রাম’ নামেও পরিচিত। অনেকে এই ব্রতকে আবার ‘দক্ষিণ ভারতের করবা চৌথ’ নামেও অভিহিত করে থাকেন। এই ব্রতের মাধ্যমে বিবাহিত মহিলারা তাঁদের স্বামীর আয়ু ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করে থাকেন। কারাদাইয়ান ননবু শুধু ভারতের তামিলনাড়ু অঞ্চলেই নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়ায় বসবাসরত তামিলদের মধ্যেও পূর্ণ আনন্দ এবং উৎসাহের সাথে পালিত হয়।
২০২৫ সালের কারাদাইয়ান ননবু কবে?
- বাংলা তারিখ: ২৭ ফাল্গুন, ১৪৩১
- ইংরাজি তারিখ: ১২ মার্চ, ২০২৫
এই ব্রতটি সাধারণত পালিত হয়ে থাকে তামিল ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ‘পাঙ্গুনি’ ও ‘মাসি’ মাসের সন্ধিক্ষণে। ঠিক যেসময় পাঙ্গুনি মাসের শেষ ও মাসি মাসের আরম্ভ সেই সন্ধিক্ষণে এই ব্রত পালিত হয়। ইংরেজি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহেই সাধারণত এই উৎসব পালিত হয়।
পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় একটি ব্রত ‘সাবিত্রী চতুর্দশী‘র মতো এই কারাদাইয়ান ননবু উৎসবটির প্রচলনের মূলেও জড়িয়ে আছে সাবিত্রী ও সত্যবানের কাহিনী। এই কাহিনীর উল্লেখ পাওয়া যায় মহাভারতের বনপর্বে। অনেকদিন আগে, মদ্রদেশে অশ্বপতি নামে এক রাজা ছিলেন। রাজার কোনো সন্তান না থাকায় তিনি ও তাঁর স্ত্রী মালবী দেবী সাবিত্রীর পুজো শুরু করেন। দেবীর বরে মহারানী মালবী একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দিলেন। সাবিত্রী দেবীর কৃপায় মেয়েটির জন্ম বলে রাজা তাঁর নাম রাখলেন ‘সাবিত্রী’।
বড় হয়ে ওঠার পর সাবিত্রীর অতুলনীয় সৌন্দর্য্য দেখে সব রাজা ও রাজপুত্ররা ভীষণ লজ্জা পেতে লাগলেন। তাই আর কেউই তাঁকে বিয়ে করতে রাজি হলেন না। মেয়ের জন্য উপযুক্ত বর পাওয়া যাচ্ছে না দেখে অশ্বপতি নিজেই যোগ্য পাত্র খুঁজে নেওয়ার জন্য সাবিত্রীকে অনুমতি দিলেন। রাজকন্যা সাবিত্রী তখন যোগ্য স্বামীর খোঁজে দেশভ্রমণে বার হলেন। এক বছর পরে সাবিত্রী ফিরে এসে বাবাকে জানালেন যে তিনি শাল্ব দেশের রাজা দ্যুমৎসেন ও রানি শৈব্যার একমাত্র ছেলে সত্যবানকে পছন্দ করেছেন। শত্রুদের চক্রান্তে দ্যুমৎসেন নিজের রাজ্য এবং চোখের দৃষ্টি হারিয়ে এখন বনে বাস করছেন। তা সত্ত্বেও সাবিত্রী সত্যবানকেই বিয়ে করতে চান।
রাজা অশ্বপতির রাজসভায় সেদিন উপস্থিত ছিলেন দেবর্ষি নারদ। সব শুনে তিনি বললেন, সব দিক দিয়ে বিচার করলে সত্যবানই যে সাবিত্রীর যোগ্য বর তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু একটি বিশেষ কারণের জন্য আজ থেকে এক বছর পরেই তাঁর মৃত্যু হবে। এই কথা শুনে সবাই সাবিত্রীকে অনুরোধ করলেন যাতে তিনি সত্যবানকে বিয়ে না করেন। কিন্তু রাজকন্যা নিজের মতেই স্থির থাকলেন। তারপর এক শুভদিনে সত্যবানের সঙ্গে সাবিত্রীর বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পর রাজকন্যা সাবিত্রী তাঁর বহুমূল্য পোশাক ও গয়নাগাটি খুলে রেখে স্বামী ও শ্বশুর-শ্বাশুড়ির মতোই গেরুয়া কাপড় পরে বনে চলে গেলেন। সেখানে সবার সেবা করে তাঁর দিন কাটতে লাগল।
এইভাবে প্রায় এক বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর সাবিত্রী গুণে দেখলেন যে, দেবর্ষি নারদের কথামত আর চারদিন পরেই তাঁর স্বামী সত্যবানের মৃত্যু হবে। তখন তিনি স্বামীর মঙ্গল কামনা করে ও তাঁর আয়ু বৃদ্ধির ইচ্ছায় তিন দিন ধরে উপবাস করে ব্রত পালন করলেন। সত্যবানের মৃত্যুর দিন সকালে যখন সত্যবান কাঠ ও ফলমূল আনতে বনে যাচ্ছেন, সাবিত্রী তাঁর সঙ্গে গেলেন। সেদিন কাঠ কাটতে কাটতে হঠাৎই সত্যবান ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়লেন এবং সাবিত্রীর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন।
সূর্য ডুবে গিয়ে অন্ধকার হয়ে আসার পর সাবিত্রী দেখলেন সূর্যের মত তেজস্বী একজন পুরুষ সত্যবানের পাশে এসে দাঁড়ালেন। সাবিত্রী বুঝতে পারলেন ইনিই যমরাজ। যম সত্যবানের প্রাণহীন দেহকে কাঁধে তুলে নিয়ে চলা শুরু করতেই সাবিত্রীও তাঁর পিছনে পিছনে চলতে শুরু করলেন। যম সাবিত্রীকে ফিরে যেতে অনুরোধ করলে সাবিত্রী বললেন যে, স্বামীকে ছেড়ে কোন নারীর পক্ষেই একা ধর্মাচরণ করা সম্ভব নয়। তাই তিনি স্বামীর সঙ্গেই যাচ্ছেন। সাবিত্রীর কথা শুনে খুশি হয়ে যম সত্যবানের জীবন ছাড়া যে কোন বর চাইতে বললেন। সাবিত্রী তখন বললেন তাঁর অন্ধ শ্বশুর যেন তাঁর দৃষ্টি ফিরে পান। যম তাঁকে এই বর দিয়ে আবারও ফিরে যেতে বললেন।
কিন্তু সাবিত্রী বললেন যে তিনি তাঁর স্বামীর সঙ্গে আছেন, তাই তাঁর ক্লান্ত হওয়ার কথা নয়। সাবিত্রী অনেক ধর্মের কথা বললেন। খুশি হয়ে যম সাবিত্রীকে আবার সত্যবানের জীবন ছাড়া যে কোন বর চাইতে বললেন। সাবিত্রী বললেন যে, তাড়াতাড়ি যেন তাঁর শ্বশুর রাজ্য ফিরে পান। এই বরও যম সাবিত্রীকে দিলেন।
এইভাবে সাবিত্রী চলতে চলতে যমকে সনাতন ধর্মের অনেক কথা শোনালেন। সাবিত্রীর জ্ঞান ও ধর্মপ্রাণ মনের পরিচয় পেয়ে যম সাবিত্রীকে একশোটি ছেলে এবং একশোটি ভাইয়ের বর দিলেন। এরপর যখন সাবিত্রী সত্যবানের প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করলেন, তখন খুব খুশি হয়েই যম সত্যবানের জীবন দান করলেন। এর কয়েকদিন পরেই রাজা দ্যুমৎসেন তাঁর রাজ্য ফিরে পেলেন। রাজা অশ্বপতি ও সত্যবান দুজনেরই একশোটি করে ছেলে হল।
মনে করা হয়, সাবিত্রী যেমন উপবাস করে ব্রত পালন করেছিলেন এবং স্বামীর জীবন বাঁচাতে যমের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন, সেইভাবেই বিবাহিত মহিলাদেরও এই শুভ দিনে উপবাস করা উচিত। তাহলে তাঁদের স্বামীদের মঙ্গল হবে। অবিবাহিত মেয়েরাও সুযোগ্য স্বামী পাওয়ার আশায় এই ব্রত করে থাকে।
কারাদাইয়ান ননবু ব্রত পালনের দিন মহিলারা সকালে উঠে স্নান করে নতুন পোশাক পড়েন। ঠাকুর ঘরের সামনে আলপনা দেন। নৈবেদ্য হিসেবে চালের গুঁড়ি, রোমা কলাই, নারকেল ও গুড় দিয়ে এক প্রকার খাদ্যবস্তু তৈরি করা হয় যা ‘আদাই’ নামে পরিচিত। এটি মিষ্টি এবং নোনতা এই দুই স্বাদেরই হয়। এ ছাড়াও আরও নানা রকম খাবার ও মিষ্টি তৈরি করা হয়। মহিলারা উপবাস করে সাবিত্রী দেবীর সঙ্গে দেবী গৌরীরও পুজো করেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, এই দিনটিই হল গৌরী দেবীর জন্মদিন। পুজো হয়ে যাওয়ার পর মহিলারা একটি হলুদ সুতোতে ছোট ছোট ফুল গিট দিয়ে বাঁধার পর এই সুতোর কিছুটা অংশ দেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদন করার পর বাকি সুতোটা বাড়ির সব মহিলারা হাতে বা গলায় পরে নেন। বিশ্বাস করা হয় যে, এই সুতো তাঁদের সমস্ত রকম অমঙ্গলের হাত থেকে বাঁচাবে। তারপর প্রসাদ খেয়ে তাঁরা উপবাস ভঙ্গ করেন। যে সব মহিলারা ব্রতের জন্য নির্দিষ্ট দিনে পুজো করতে পারেন না বা উপবাস রাখতে পারেন না, তাঁরা এর পরের মঙ্গলবার বা শুক্রবারেও সাবিত্রী দেবীর পুজো করতে পারেন। সেই দিনেও সমস্ত অনুষ্ঠান এই প্রকারেই করতে হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান