ধর্ম

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পুজো

রাজরাজেশ্বরীর যোদ্ধৃবেশে দেবী দুর্গা পূজিত হন কৃষ্ণনগরের রাজবাড়িতে। সুপ্রাচীন বনেদী ঐতিহ্য বহন করে আজও সমানভাবে চলে আসছে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পুজো । মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র, মহারাজা গিরিশচন্দ্র কত না ঐতিহাসিক নাম জড়িয়ে আছে এই পুজোর সঙ্গে। সিংহবাহিনী দুর্গার বাহন এখানে অশ্বমুখী। সন্ধিপুজোর একশো আটটি প্রদীপসজ্জা, একশো আটটি নীলপদ্ম অর্পণের প্রাচীন রীতি আজও অক্ষুণ্ন আছে এখানে। দশমীর যাত্রামঙ্গল থেকে শুরু করে প্রতীকী শত্রুনিধন আর নানা বাহারের ভোগের ডালির সৌন্দর্য্যে কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ির দুর্গাপুজো বাংলার অন্যতম প্রাচীন বনেদি পুজোগুলির মধ্যে একটি।

কৃষ্ণনগর মানেই রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দরবার, কৃষ্ণনগর মানেই সেই কার্টুনে-গল্পে বিখ্যাত গোপাল ভাঁড়ের কথা। কিন্তু এসবের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছেন দেবী দুর্গা। কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাস অতি প্রাচীন। কৃষ্ণনগর শহরটিও বেশ প্রাচীন স্থাপত্যমণ্ডিত। শোনা যায় মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র সবার প্রথমে অন্নপূর্ণার পুজো করতেন। ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম অনুযায়ী নদীয়ার যে বিখ্যাত রাজবংশ শুরু হয়েছিল ভবানন্দ মজুমদারের হাত ধরে, সেই ভবানন্দ মজুমদার নদীয়ার রাজা হন তৎকালীন মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুমোদনে। তিনিই প্রথম রাজপরিবারে দুর্গাপুজো শুরু করেন। পরবর্তীকালে নদীয়া রাজবংশেরই উত্তরসূরি রাঘব রায় রাজত্বের রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যান রেউই গ্রামে, আগে যা ছিল মাটিয়ারাতে। এই রেউই গ্রামের নামই পরে কৃষ্ণনগর নাম হয়। তখন মহারাজা রুদ্র রায় রাজত্বভার নিয়েছেন কাঁধে। তাঁর উদ্যোগেই ঢাকা থেকে কারিগর এসে কৃষ্ণনগরে তৈরি করে চকবাড়ি, কাছারিবাড়ি, হাতিশালা, আস্তাবল আর উল্লেখযোগ্যভাবে রুদ্র রায় নির্মাণ করান পঙ্খসজ্জিত ঠাকুরদালান। পঙ্খসজ্জিত মানে হল ঠাকুরদালানের মাথায় ছিল হাতে টানা পাখা আর সেই পাখায় হাওয়া করা হতো দেবীকে। যদিও রুদ্র রায়ের উত্তরপুরুষ মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের আমলেই কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির দুর্গাপূজা জনপ্রিয়তা লাভ করে। আর মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আগে এই পুজো সীমাবদ্ধ ছিল জমিদারবাড়ির অন্দরের মধ্যেই। কিন্তু কৃষ্ণচন্দ্রই প্রথম রাজবাড়িতে সার্বজনীন দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন। পারিবারিক পুজোর ঐতিহ্য বদলে তাঁর আমলেই সার্বজনীন পুজোর স্বীকৃতি পায় কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির দুর্গাপুজো। আর এই রাজবাড়িতে পূজিত হন দেবী রাজরাজেশ্বরী, সারা বাংলার মধ্যে একমাত্র এখানেই সাবেক রীতিতে নির্মিত দেবী প্রতিমায় লক্ষ করা যায় যোদ্ধৃবেশ। দেবী এখানে মহিষমর্দিনী রূপে নয়, রাজরাজেশ্বরী রূপেই পূজিতা। উজ্জ্বল লাল শাড়িতে সজ্জিত দেবীর গায়ে বর্ম এবং হাতে অস্ত্র। লক্ষণীয় যে দেবীর সামনের দু হাত তুলনায় অন্য আটটি হাতের থেকে বড়ো। দেবীর বাহন সিংহ এখানে অশ্বমুখী আর সিংহের গড়নটিও অনেকটা ঘোড়ার মতো। দেবী প্রতিমার পিছনে চালার মধ্যে আঁকা থাকে দশমহাবিদ্যার প্রতিটি রূপ। চালচিত্রের আকার অর্ধগোলকের মতো যা সাবেক বাংলার একচালার বৈশিষ্ট্যস্বরূপ। তবে বনেদী পুজো হলেও কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ির দেবী প্রতিমায় ডাকের সাজ দেখা যায় না। বিশেষ রীতিতে সজ্জিত এই প্রতিমায় দেখা যায় ‘বেদেনি ডাক’-এর সাজ। প্রাচীনকালে পুজোর সময় দেবীকে সোনার অলঙ্কারে সাজিয়ে তোলা হতো। আর এই কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ির পুজোর সবথেকে আকর্ষণীয় অংশ হল সন্ধিপুজো আর যাত্রামঙ্গল। একশো আটটি প্রদীপ আর একশো আটটি পদ্মফুলে সেজে উঠতো সন্ধিপুজোর আসর। আগে যদিও নীলপদ্ম আনা হতো যা আর এখন হয় না। বাকি সমস্ত রীতিই আগের মতোই আছে। এছাড়াও রয়েছে যাত্রামঙ্গল। বিজয়া দশমীর দিন অনুষ্ঠিত হয় এই যাত্রামঙ্গল যেখানে আসলে সারা বছরের জন্য মঙ্গলকামনা এবং প্রজাদের হিতাকাঙ্ক্ষাই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। এই যাত্রামঙ্গলের সময়েই হতো ‘শুভদৃষ্টি’। না না এটা বিবাহের শুভদৃষ্টির কোনো আচার-উপাচার নয়, তবে তার সঙ্গে খানিক সাদৃশ্য আছে। দশমীর পুজো শেষ করে এসে দেবী মূর্তির সামনে এনে দেখানো হতো মোষ, ঘোড়া, হাতি, জ্যান্ত মাছ, সদ্য কাটা মাংস, আগুন, ঘি ইত্যাদি নানা উপাদান। শাস্ত্রীয় ভাষায় সবৎস্য ধেনু, মেষ, বৃষ, ধেনু, গণিকা বলা হত এগুলিকে। রাজ পরিবারের সকলকেই এগুলি ঐ যাত্রামঙ্গলের সময় দর্শন করতে হয়, সেটাই হল রীতি। আর দশমীতে সিঁদুর খেলা তো রয়েইছে। কত দূরের পথ পাড়ি দিয়ে ভক্তরা দেবীকে সিঁদূর পরাতে আসতেন কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে। আর পুজো শেষে বিসর্জনের পর আরেকটি ঐতিহ্যবাহী সংস্কার পালন করা হতো কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে। বোধনের স্থানে সদ্য মাটির তৈরি একটা প্রতীকী শত্রুর মূর্তিকে বধ করা হতো তীর-ধনুকের সাহায্যে। বর্তমানে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বংশধর অমৃতা রায় এবং সৌমীশচন্দ্র রায় এই পুজো পরিচালনা করে থাকেন।

শোনা যায় প্রতিপদ থেকেই এখানে হোম শুরু হয়ে যেতো আর পুজোর গঙ্গাজল আনা হতো সেই নবদ্বীপ থেকে। ভোগের বৈচিত্র্যেও কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পুজো জনপ্রিয় ছিল প্রাচীন বাংলায়। সপ্তমীতে পাঁচ রকম ভাজা, অষ্টমী পোলাও, ছানার ডালনা, আটরকম ভাজা ইত্যাদি আর নবমীতে তিন রকম মাছ তো থাকতোই। এছাড়াও পুজোর মূল তিনদিন ভোগে আবশ্যিকভাবে থাকতো খিচুড়ি, ভাজা, তরকারি, চাটনি ও সুজির পায়েস।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


রাজবাড়ির পুজো নিয়ে আরেকটি মজাদার জনশ্রুতি আছে। রাজরাজেশ্বরী দেবীকে বৈকালিক ভোগ হিসেবে দেওয়া হতো দোলে গুড়ের পাক আর সে পাক এতোই শক্ত হতো যে তা কুড়ুল দিয়ে কাটতে হতো। কৃষ্ণনগরের মহারাজ গিরিশচন্দ্রের ফরমানে প্রত্যেক কর্মচারীর বাড়িতেই দুর্গাপূজার চল শুরু হয়। তাঁর সময় পুজোর আড়ম্বরের রকম-সকমই বদলে যায়। কর্মচারীর বাড়িতে দুর্গাপূজায় কোনো প্রকার আর্থিক অসুবিধে হলে সবই গিরিশচন্দ্রের নির্দেশে রাজ-কোষাগার থেকে পুষিয়ে দেওয়া হতো। আর সেই কর্মচারীদের বাড়ির পুজো তিনি নিজে দেখতে আসতেন। আর এই কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির দেবী প্রতিমা গড়া হলে শান্তিপুরের মৃৎশিল্পীদের কাছে রাজা গিরিশচন্দ্র মাকে পাটে বসানোর অনুমতি চাইতেন, কারিগরেরা অনুমতি দিলে তবেই রাজা দেবীকে পাটে নিয়ে বসাতেন। এতসব আয়োজন, এতসব লুপ্ত ঐতিহ্যের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ির পুজোর সঙ্গে আর তাই বাংলার বনেদি সাবেকিয়ানার পুজোর তালিকায় কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ির পুজো অন্যতম উল্লেখ্য।

বিভিন্ন বনেদী বাড়ির পূজা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য ভিডিও আকারে দেখুন এখানে

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

অর্জুনের পুত্রকে কেন বিয়ে করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন সেই ভিডিও

মহাশ্বেতা দেবীকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য দেখুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন অজানা এই তথ্য