ধর্ম

অশ্বথামার মণি

অশ্বথামার মণি

মহাগুরু দ্রোণ ও তাঁর স্ত্রী কৃপীর একমাত্র ছেলে হল অশ্বত্থামার মাথায় জন্ম থেকেই একটি মণি ছিল যা অশ্বত্থামার মণি নামে পরিচিত। অশ্বত্থামার মণি টির কারণে অশ্বথামা দৈবিক শক্তিতে বলীয়ান ছিলেন। এটি তাঁকে ক্ষিদে, তেষ্টা, যন্ত্রণা, ক্লান্তি প্রভৃতি দুর্বলতা থেকে রক্ষা করত। পান্ডব ও কৌরবদের সমস্ত সম্পত্তির মিলিত মূল্যের থেকেও অশ্বথামার এই সহজাত মণিটি বেশি মূল্যবান ছিল।

মহাভারতের সৌপ্তিকপর্বে দেখা যায় যে, মৃতপ্রায় কুরুসম্রাট দুর্যোধন অশ্বথামাকে কৌরবপক্ষের সেনাপতি পদে নিযুক্ত করেন। অশ্বথামাও প্রতিজ্ঞা করেন, যে ভাবেই হোক তিনি দুর্যোধনের সব শত্রুদের হত্যা করবেন। এরপর সেইদিন রাত্রে লুকিয়ে পান্ডবদের শিবিরে ঢুকে অশ্বথামা ঘুমন্ত অবস্থায় দ্রৌপদীর পাঁচ ছেলে, শিখন্ডী, ধৃষ্টদ্যুম্ন এবং পান্ডব পক্ষের আরো অন্যান্য বীরদের নৃশংস ভাবে হত্যা করেন।

পরদিন সকাল হলে ধৃষ্টদ্যুম্নের সারথি যুধিষ্ঠিরের কাছে গিয়ে সব ঘটনা জানালে শোকে যুধিষ্ঠির অজ্ঞান হয়ে যান। কিছুক্ষণ পরে তাঁর জ্ঞান ফিরলে তিনি সবার সঙ্গে শিবিরে এসে দেখেন, তাঁদের সমস্ত আত্মীয়, বন্ধু ও প্রিয়জনেরা ছিন্নদেহে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। এই ভীষণ দৃশ্য দেখে যুধিষ্ঠির আবার কাঁদতে শুরু করেন এবং নকুলকে আদেশ করেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দ্রৌপদীকে সেখানে নিয়ে আসতে।

দ্রৌপদী তখনও পান্ডবপক্ষের অন্যান্য মহিলাদের সঙ্গে উপপ্লব্য নগরেই ছিলেন। পান্ডব শিবিরে এসে সমস্ত কিছু জানার পর এবং নিজের ভাই ও ছেলেদের মৃত অবস্থায় দেখে তিনি ঝড়ে উপড়ে যাওয়া কলাগাছের মত কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে পড়ে গেলেন। তাঁকে এই অবস্থায় দেখে ভীম এগিয়ে এসে তাঁর চোখের জল মুছিয়ে শান্ত্বনা দিতে লাগলেন। দ্রৌপদী কাঁদতে কাঁদতে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, “মহারাজ! আপনি ক্ষত্রিয়দের ধর্ম অনুযায়ী নিজের ছেলে ও আত্মীয়দের যমকে দান করেছেন। এখন সুখে রাজ্য ভোগ করুন। ভাগ্যের জোরে আপনি সমস্ত পৃথিবীর রাজা হয়েছেন, এখন আর উন্মত্ত হাতির মত বলবান অভিমন্যুকে আপনার মনে পড়বে কেন? মহারাজ! আমি সত্য বলছি, আজ যদি আপনি ঐ পাপী অশ্বথামাকে বধ না করেন, তবে আমি এখানেই অনশনে প্রাণত্যাগ করব। হে পান্ডবগণ! আপনারা সকলেই আমার এই প্রতিজ্ঞা শুনে রাখুন।” এই বলে দ্রৌপদী সেখানেই প্রায়োপবেশনে বসলেন।

এই কথা শুনে যুধিষ্ঠির বললেন, “কল্যাণী! তোমার প্রিয়জনেরা ক্ষত্রিয়ধর্ম পালন করেই নিহত হয়েছেন। এখন তাঁদের জন্য শোক করা অনুচিত। আর তুমি তো জানো অশ্বথামা অমর। আর তা ছাড়া তিনি দুর্গম বনে ছেল গেছেন। এই অবস্থায় আমরা কেমন করে তাঁকে বধ করব?”

দ্রৌপদী বললেন, “আমি শুনেছি জন্ম থেকেই অশ্বথামার মাথায় একটি দিব্য মণি আছে যা অশ্বত্থামার মণি নামে পরিচিত। যদি একান্তই তাঁকে বধ করা সম্ভব না হয়, তবে তাঁকে যুদ্ধে হারিয়ে ঐ মণিটি আমাকে এনে দিন। আপনার মাথায় ঐ মণিটি পরিয়ে দিলে আমি কিছুটা হলেও শান্তি পাব।” এই বলে দ্রৌপদী ভীমকে অনুরোধ করে বললেন, “মহাবল! আপনি ক্ষত্রিয়ধর্ম স্মরণ করে আমাকে বাঁচান। আপনি জতুগৃহ থেকে ভাইদের বাঁচিয়েছিলেন, হিড়িম্ব রাক্ষসকে হত্যা করেছিলেন, কীচকের হাত থেকে আমার সম্মান রক্ষা করেছিলেন। এখন অশ্বত্থামাকে হারিয়ে এই অপমানের প্রতিশোধ নিন।”

এই কথা শুনে ভীম দ্রৌপদীকে আশ্বস্ত করে তখনই নকুলকে সারথি করে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অশ্বথামাকে খুঁজতে বেরোলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর কৃষ্ণ সেখানে এসে সব কিছু শুনে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, “মহারাজ! আপনি অশ্বত্থামার কাছে একা ভীমকে কেন পাঠালেন? আপনি কি জানেন না অশ্বত্থামার কাছে ‘ব্রহ্মশির’ নামে ওকে ভয়ঙ্কর অস্ত্র আছে? সে অস্ত্র এমনই ভীষণ যে অশ্বথামা তার বদলে আমার কাছে আমার সুদর্শন চক্র চাইতেও লজ্জা পাননি। এখন তিনি যদি ভীমের উপর সেই অস্ত্র প্রয়োগ করে বসেন তবে কী হবে আপনি ভেবে দেখেছেন?”

কৃষ্ণের এই কথা শুনে যুধিষ্ঠির খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। তখন কৃষ্ণ তাঁর গরুড়ধ্বজ রথে যুধিষ্ঠির ও অর্জুনকে তুলে নিয়ে ভীমের রথের চাকার দাগ দেখতে দেখতে চলতে লাগলেন। কিছুদূর গিয়ে ভীমকে দেখতে পেয়ে তাঁরা তাঁকেও রথে তুলে নিলেন।
কিছুক্ষণ পরেই তাঁরা অশ্বত্থামাকে দেখতে পেলেন। তাঁকে দেখেই ভীম ও অর্জুন ভীষণ রাগে সিংহনাদ করতে শুরু করলেন ও নিজের নিজের ধনুকে টঙ্কার দিলেন। সেই ভয়ানক আওয়াজ শুনতে পেয়ে অশ্বত্থামা ফিরে তাকালেন এবং কৃষ্ণের সঙ্গে যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুনকে দেখতে পেলেন। এই চারজনকে একসঙ্গে দেখে অশ্বত্থামা খুব ভয় পেয়ে গেলেন এবং তাড়াতাড়ি “পান্ডব বংশ নষ্ট হোক” বলে ব্রহ্মশির অস্ত্র তাঁদের দিকে ছুঁড়ে মারলেন। তখন সর্বনাশ হয় দেখে কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, “অর্জুন! তোমার কাছে গুরু দ্রোণের দেওয়া যে ব্রহ্মশির অস্ত্র আছে, তা প্রয়োগ কর।”

তখন অর্জুন আর অন্য কোনো উপায় না দেখে “এই অস্ত্রে অশ্বত্থামার অস্ত্র বারণ হোক” বলে তাঁর ব্রহ্মশির অস্ত্র প্রয়োগ করলেন। তখন দুই ভয়ঙ্কর অস্ত্রের তেজে এমন ভীষণ গর্জন, উল্কাবৃষ্টি ও বজ্রপাত শুরু অশ্বত্থামা হল যে, সবাই ভাবতে লাগল এবার বুঝি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে!

এই ভীষণ কান্ড দেখে নারদ এবং ব্যাসদেব দুই অস্ত্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অর্জুন ও অশ্বথামাকে অনুরোধ করলেন তাঁদের অস্ত্র ফিরিয়ে নিতে। তখন অর্জুন বললেন, “মুনিবর! আমি অস্ত্র ফিরিয়ে নিলেই অশ্বথামার অস্ত্র আমাদের ভস্ম করে ফেলবে। যাতে আমরা সবাই রক্ষা পাই, আপনারা এমন উপায় করুন। আমি এখনই আমার অস্ত্র থামিয়ে দিচ্ছি।”

এই বলে অর্জুন নিজের অস্ত্র ফিরিয়ে নিলেন। কিন্তু অশ্বত্থামা অর্জুনের মত সাধুপুরুষ ছিলেন না, তাঁর ব্রহ্মশির অস্ত্রকে থামাবার ক্ষমতা ছিল না। তাই পান্ডবদের রক্ষা করার জন্য নারদ ও ব্যাসদেব বললেন যে, অশ্বত্থামার অস্ত্রে বর্তমানে পান্ডবদের কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু এর প্রভাবে অভিমন্যু ও উত্তরার ছেলেটি জন্মের পরই মারা যাবে। আর ক্ষতিপূরণ স্বরূপ অশ্বত্থামা তাঁর মাথার দিব্য মণিটি পান্ডবদের হাতে তুলে দেবেন।

এ কথা মেনে নেওয়া ছাড়া অশ্বত্থামার কাছে আর কোনো উপায় রইল না। কাজেই তিনি নিজের মাথার মণিটি খুলে অর্জুনের হাতে দিয়ে সেখান থেকে চলে গেলেন। তারপর আর তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এরপর পান্ডবরা অশ্বত্থামার মণি টি এনে দ্রৌপদীর হাতে দিলেন। পর্বত তার মাথায় চাঁদকে ধারণ করে যেমন শোভা পায়, দ্রৌপদী মণিটি যুধিষ্ঠিরের মাথায় পরিয়ে দিলে যুধিষ্ঠিরও তেমন শোভাযুক্ত হলেন। যুধিষ্ঠিরের এই রূপ দেখে দ্রৌপদীর রাগ ও শোক কমে গেল, তিনি খাদ্য ও জল গ্রহণ করলেন।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

তথ্যসূত্র


  1. মহাভারত’, কালীপ্রসন্ন সিংহ, ‘সৌপ্তিকপর্ব, অধ্যায় ১০-১৬, পৃষ্ঠা ২১-২৯
  2. ‘মহাভারত সারানুবাদ', রাজশেখর বসু, কলিকাতা প্রেস, তৃতীয় প্রকাশ, সৌপ্তিকপর্ব, ঐষীকপর্বাধ্যায়, অধ্যায় ৫-৬, পৃষ্ঠা ৪৮৮-৪৯১
  3. ‘ছেলেদের মহাভারত', উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, বসাক বুক স্টোর প্রাইভেট লিমিটেড, দ্বিতীয় মুদ্রণ, সৌপ্তিকপর্ব, পৃষ্ঠা ১৮৯-১৯১

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়

শ্রাবণ মাসে ষোল সোমবারের ব্রত নিয়ে জানতে


shib

ছবিতে ক্লিক করুন