সববাংলায়

ক্রুপাবাই সাথিয়ানাধান

ক্রুপাবাই সাথিয়ানাধান (Krupabai Sathianadhan) একজন ভারতীয় মারাঠি মহিলা যিনি ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন ইংরেজি ভাষায় প্রথম ভারতীয় আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসের রচয়িতা হিসেবে। তিনি এমন একজন মহিলা ছিলেন যাঁকে ধর্ম, সামাজিক বাধা, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কোনোকিছুই থামিয়ে রাখতে পারেনি তাঁর সাহিত্যসৃষ্টি, তাঁর পড়াশুনো, তাঁর শিক্ষার প্রসারের কাজের থেকে। শুধুমাত্র লেখিকা হিসেবেই নয়, তিনি অবদান রেখে গেছেন ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে নারীশিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রেও। উনিশ শতকের শেষ ভাগের পরাধীন ভারতবর্ষে ধর্মের গোঁড়ামি, নারীদের উপর অত্যাচার, দেশীয় খৃষ্টানদের প্রতি শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবিদ্বেষ নিয়ে লেখা তাঁর দুটি উপন্যাস সেই সময়ের সমাজ ও পরিবেশের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবে।

১৮৬২ সালে তৎকালীন বম্বে প্রেসিডেন্সীর আহমেদনগরে ক্রুপাবাই সাথিয়ানাধান-এর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম হরিপন্থ খিস্তী এবং মায়ের নাম রাধাবাই খিস্তী। খুবই কম বয়সে পিতৃবিয়োগ হয় ক্রুপাবাইয়ের। তাঁরা মোট চোদ্দ জন ভাইবোন ছিলেন। অনেক প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে তাঁদের বড় করতে থাকেন তাঁর মা রাধাবাই এবং দাদা ভাস্কর। তাঁর দাদা ভাস্করই তাঁর সবথেকে কাছের মানুষ হয়ে ওঠেন। তিনিই প্রথম ক্রুপাবাইকে পরিচয় ঘটান সাহিত্যের সাথে, শিক্ষার সাথে। ক্রুপাবাইয়ের যখন ১৩ বছর বয়স তখন দাদা ভাস্করের মৃত্যু তাঁকে অনেকটাই অসহায় করে ফেলে। গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে পরিস্থিতির ফেরে যখন ক্রুপাবাইয়ের বাবা মা ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য হন, তখন এক অভূতপূর্ব সংঘাতের মুখে পড়তে হয় তাঁর মা রাধাবাইকে যিনি এক অসম লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বড় করতে থাকেন ক্রুপাবাই এবং তাঁর ভাইবোনদের। উপরন্তু ছেলে ভাস্করের মৃত্যু তাঁকে মানসিকভাবে আরও বড় লড়াইয়ের সামনে ঠেলে দেয়।

দুই ইউরোপীয়ান মিশনারী মহিলার সংস্পর্শে এসে ক্রুপাবাই সাথিয়ানাধান একটি বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুলেই প্রথম তিনি নজর কাড়েন তাঁর অসাধারন মেধার জোরে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশুনোর প্রতি প্রবল আসক্তি তাঁকে আরও উচ্চতর শিক্ষার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আশৈশব দারিদ্রের সাথে যুদ্ধ করার ফলে অপুষ্টিজনিত রোগ বাসা বাধে তাঁর শরীরে। তাঁর মন যদিও তা স্বীকার করেনি কোনোদিন, কিন্তু অশক্ত শরীর বারবার বাধা হিসেবে এসে দাঁড়ায় তাঁর স্বপ্ন সফল করার পথে। বোর্ডিং স্কুলে তাঁর এক পরিচিত মহিলাকে দেখে অনুপ্রানিত হয়ে অত্যন্ত মেধাবী ক্রুপাবাই মনেপ্রাণে চেষ্টা চালিয়ে যান চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে পড়াশুনো করে, তৎকালীন সমাজের পর্দানসীন মহিলাদের সুস্বাস্থ্যের উদ্দেশ্যে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে। তিনি স্কলারশিপও পান বিলেতে গিয়ে পড়াশুনো করার জন্য। কিন্তু আবার বাধ সাধে তাঁর শরীরে বাসা বাধা রোগ। বিদেশে গিয়ে চিকিৎসক হয়ে ওঠার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়।

১৮৭৮ সালে প্রথম মহিলাদের ডাক্তারি পড়ার জন্য দরজা খুলে দেয় মাদ্রাজ মেডিক্যাল কলেজ। ক্রুপাবাই সৌভাগ্য হল এই কলেজে ভর্তি হয়ে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন সফল করার। এরই সাথে সুযোগ হল বিখ্যাত সমাজকর্মী রেভারেন্ড ডব্লিউ টি সাথিয়ানাধানের বাড়িতে থেকে তাঁর সান্নিধ্যে আসার। পরের একটা বছর প্রাণপাত পরিশ্রম করেন ক্রুপাবাই চিকিৎসাশাস্ত্রে নিজেকে উপযুক্ত করে তোলার, তাঁর বহুদিনের স্বপ্ন সফল করার। কিন্তু আবার বাধ সাধে তাঁর শরীর। পড়াশুনোর অত্যধিক পরিশ্রমের ধকল সইতে না পেরে ভেঙ্গে পড়ে তাঁর শরীর যার ফলে পড়াশুনো থেকে সাময়িকভাবে বিরতি নিতে হয় তাঁকে। নিজেকে সারিয়ে তোলার জন্য ১৮৭৯ সালে মানসিকভাবে পর্যুদস্ত ক্রুপাবাইকে মাদ্রাজ ছেড়ে চলে যেতে হয় পুনেতে তাঁর দিদির কাছে।

১৮৮১ সালে মাদ্রাজে ফিরে আসার পর ক্রুপাবাইয়ের সাথে পরিচয় হয় রেভারেন্ড সাতিয়ানাধানের পুত্র সদ্য বিলেতফেরত স্যামুয়েল সাতিয়ানাধানের। এর কিছুদিনের মধ্যেই বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন তাঁরা। তাঁদের বিবাহের কিছুদিনের মধ্যেই উটাকামন্ডের ব্রীক্স মেমোরিয়াল স্কুলে প্রধান শিক্ষকের চাকরি পান স্যামুয়েল সাতিয়ানাধান।উটাকামন্ডের স্বাস্থ্যকর জলবায়ু বেশ তরতাজা করে তলে ক্রুপাবাইকে। চার্চ মিশনারি সোসাইটির সাহায্যে মুসলিম মেয়েদের জন্য একটি বিদ্যালয় শুরু করেন তিনি। এই সুন্দর পরিবেশেই প্রথম তিনি সাহিত্যচর্চার কাজ শুরু করেন। ‘অ্যান ইন্ডিয়ান লেডি’ ছদ্মনামে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা ছাপা হতে থাকে।এভাবেই তিন তিনটি বছর কাটানোর পরে তাঁর স্বামীর কর্মসূত্রে তাঁদের চলে যেতে হয় রাজামুন্দ্রিতে। আবারও উপকূলবর্তী আর্দ্র জলবায়ুতে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। ফলে বাধ্য হয়ে তাঁর স্বামীকে চাকরিতে বদলি নিয়ে চলে আসতে হয় কুম্বাকোনামে।

এই কয়েক বছরের ঘনঘন স্থান পরিবর্তনের মাঝেও নিজের প্রাণশক্তি হারাননি ক্রুপাবাই। ক্রমান্বয়ে লিখে গেছেন প্রবন্ধ, গল্প এবং অবশেষে পাকাপাকিভাবে মাদ্রাজে ফেরার পরেই তিনি তাঁর প্রথম আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস লেখা শেষ করেন। ১৮৮৭ থেকে ১৮৮৮ সাল অবধি ‘সগুনা – আ স্টোরি অফ আ নেটিভ ক্রিশ্চিয়ান লাইফ’ ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয় মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজ ম্যাগাজিনে। ১৮৯৫ সালে এই উপন্যাস গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় মাদ্রাজের ভারদাচারি এন্ড কোং থেকে। মহারানী ভিক্টোরিয়ার সম্পূর্ণ উপন্যাসটি পড়ে ক্রুপাবাইয়ের অন্যান্য লেখাও জোগাড় করে পড়তে শুরু করেন। ‘সগুনা’ পরাধীন ভারতের উনিশ শতকের শেষভাগের সময়টিকে চমৎকারভাবে ধরে রেখেছে। একটি গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারের দিনের পর দিন শোষিত হওয়ার ইতিহাস, তাঁদের ধর্মান্তরিত হওয়ার প্রেক্ষাপট, একা এক বিধবা রমণীর লড়াই, সনাতন সমাজের চোখে ‘ম্লেচ্ছ’ হয়ে তাঁর সন্তানদের বড় হয়ে ওঠা, দেশীয় খৃষ্টানদের প্রতি বিদেশী শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবিদ্বেষী মনোভাব, এই সব নিয়েই এক কালজয়ী উপন্যাস সগুনা – আ স্টোরি অফ আ নেটিভ ক্রিশ্চিয়ান লাইফ , যা এত বছর পরেও নতুন শতাব্দীর সাহিত্যিকদের চিন্তার খোরাক যোগায়।

এরই মাঝে তোলপাড় হতে থাকে ক্রুপাবাইয়ের জীবনে। এক বছর পার করার আগেই মৃত্যু হয় তাঁর একমাত্র সন্তানের। আবার মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন তিনি এবং এই সময়েই বম্বেতে তাঁর শরীরে ধরা পরে দূরারোগ্য যক্ষ্মারোগের লক্ষণ। হাতে আর বেশী সময় নেই বুঝতে পেরে ক্রমান্বয়ে লিখতে শুরু করেন ক্রুপাবাই। নতুন উপন্যাস ‘কমলা-আ স্টোরি অফ হিন্দু লাইফ’ লিখতে শুরু করেন এই সময়ে। কমলা-আ স্টোরি অফ হিন্দু লাইফ প্রকাশিত হয় ১৮৯৪ সালে। সগুনা এবং কমলা -নিজের জীবনকে এই দুই চরিত্রের মধ্যে দিয়ে অমর করে রেখে গেছেন ক্রুপাবাই।

১৮৯৪ সালে দীর্ঘ রোগভোগের পর ক্রুপাবাই সাথিয়ানাধানের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পরে মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজ মহিলাদের জন্য একটি বিশেষ বৃত্তি শুরু করে এবং ম্যাট্রিকুলেশনে শ্রেষ্ঠ ছাত্রীর জন্য ক্রুপাবাই সাথিয়ানাধানের নামাঙ্কিত পদক চালু করে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading