ইতিহাস

লালন ফকির

লালন ফকির (Lalon Fakir) একজন বিখ্যাত বাউল সাধক যিনি একাধারে সমাজ সংস্কারক, গীতিকার, সুরকার ও গায়ক ছিলেন। তিনি লালন সাঁই ,লালন শাহ, মহাত্মা লালন নামেও পরিচিত। মানবতাকেই তিনি শ্রেষ্ঠ ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। লালনকে বাউল গানের শ্রেষ্ঠতম শিল্পী হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

লালন ফকিরের সঠিক জন্ম ইতিহাস নিয়ে যথেষ্ট বির্তক রয়েছে। তাঁর জন্ম নিয়ে লালন কোন সঠিক তথ্য দিয়ে যাননি। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর শিষ্যরাও গুরু আজ্ঞা পালন করে লালনের জন্ম নিয়ে কোন সঠিক তথ্য রেখে যাননি। লালন গবেষকদের তাঁর জন্ম সাল ও পরিচয় নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। মোটামুটিভাবে সর্বাধিক গ্রাহ্য মতানুযায়ী ১৭৭৪ সালের ১৭ অক্টোবর অবিভক্ত বাংলার নদীয়া জেলার কুষ্ঠিয়ার কামারখালি থানার চাপড়া ইউনিয়নের গড়াই নদীর তীরে ভাঁড়ারা গ্রামে এক হিন্দু কায়স্থ পরিবারে লালন ফকিরের জন্ম। তাঁর বাবা মাধব কর ও মা পদ্মাবতী করের একমাত্র সন্তান ছিলেন তিনি। আবার কারোর মতে লালনের জন্ম যশোরে ফুলবাড়ী গ্রামে এক মুসলমান পরিবারে। বাবার নাম কাজী গোলাম কাদির ও মায়ের নাম আমিনা খাতুন। কাজী ছিল তাঁদের বংশগত উপাধি। গবেষকরা বলেন লালনের আরও দুই ভাই ছিল। নাম আলম শাহ ও কলম শাহ। আবার অন্য গবেষকরা বলেন লালনরা চার ভাই ছিলেন। আলম শাহ, কলম শাহ, মলম শাহ ও লালন শাহ। ছিয়াত্তরের মন্বত্তরে লালনের দুই ভাই আলম ও কলম শাহ মারা যান বলে একদল গবেষক জানান। লালন জীবনী রচয়িতা বসন্ত কুমার পাল বলেছেন “সাঁইজি হিন্দু কি মুসলিম এ কথা আমিও স্থির বলতে অক্ষম।”

শৈশবেই পিতৃবিয়োগ হওয়ার কারণে লালনের উপরেই সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে। ফলে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের সুযোগ হয়নি। নিজ সাধনাবলে তিনি হিন্দু ও ইসলাম উভয় ধর্মেই জ্ঞান লাভ করেন। লালন গবেষকদের তথ্যানুসারে লালন প্রতিবেশী বাউলদাস ও অন্যান্য সঙ্গীদের সাথে তীর্থভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। বাড়ী ফেরার পথে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন তিনি। পথে রোগ এতটাই গুরুতর হয় হয় যে তিনি অচৈতন্য হয়ে পড়েন। সঙ্গীরা তাঁকে মৃত মনে করে তাঁর মুখাগ্নি করে তাঁকে নদীতে ভাসিয়ে দেন। এক মুসলমান রমনী তাঁর সংজ্ঞাহীন দেহ উদ্ধার করে তাঁকে বাড়ীতে এনে সেবা শুশ্রুষা করে সারিয়ে তোলেন। সুস্থ হয়ে লালন বাড়ী ফিরে এলে তাঁর আত্মীয় পরিজনেরা তাঁকে গ্রহণ করলেন না। সমাজ তাঁকে এই যুক্তিতে পরিত্যাগ করে যে ব্যাক্তির একবার মুখাগ্নি হয়ে গেছে সে সমাজের চোখে “মৃত”ব্যক্তি। তাঁর প্রতি এই অবিচার লালনকে হিন্দু ধর্মের প্রতি বিদ্বেষী করে তোলে। তিনি ঘর ছাড়েন। তাঁর অতীত বিস্মৃত হয়ে এক নতুন মানুষের জন্ম হয় যে কেবলই “মানুষ”। তাঁর জাত, ধর্ম সমস্ত পরিচয়কে মুছে লালন মানবতাকেই ধর্ম হিসেবে বেছে নেন।

এরপর লালন চলে আসেন বাউল গুরু সিরাজ সাঁইয়ের কাছে। গুরু সিরাজের বাউল মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে এক নতুন জীবন শুরু হয় তাঁর। দীর্ঘ দিন গুরুর সাথে সাধনা করার পরে কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়া গ্রামে নিজের আখড়া স্হাপন করে তাঁর সাধক জীবনের সূচনা করেন লালন। তাঁর প্রায় দশ হাজার শিষ্য ছিল বলে জানা যায়। আখড়া গড়ার পরে তিনি বিয়ে করেন। তাঁর স্ত্রীর নাম বিশাখা বলে জানা যায়। তবে এই নিয়েও যথেষ্ট বির্তক রয়েছে লালন গবেষকদের মধ্যে।

লালন চেয়েছিলেন একটি অখন্ড মানবমন্ডলী গড়ে তুলতে। নিজেকে সমাজ বিরোধী, মানুষের জন্য মরমীয়া হয়ে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর আধ্যাত্মিক চেতনা তাঁর গানের মধ্যে দিয়ে সুষ্পষ্ট হয়ে ওঠে। “দেহতত্ত্ব” ছিল তাঁর ধর্মের মূল আধার। যেখানে দেহের অন্তরে থাকা আত্মাকে তিনি “মনের মানুষ” বলে অভিহিত করেছেন। আর দেহকে তার ঘর। তিনি সাধনার মাধ্যমে পার্থিব দেহের মাধ্যমে দেহত্তর জগতে পৌঁছানোর কথা উল্লেখ করেছেন, যা মানবজীবনের মহামুক্তির পথ। মানুষের রক্তমাংসের শরীরের মধ্যেই পরস্পর বিছিন্নরূপে আত্মার বাস যা রহস্যময় অজানা অস্পৃশ্য এক সত্তা। মনরূপী এই শরীরের মধ্যে আত্মা এক “অচিন পাখি” যাকে ধরা যায় না ছোঁয়াও যায় না তাকে।

লালন ফকিরের দার্শনিকতা বহুমানুষকে প্রভাবিত করেছিল। “যা আছে ভান্ডে তাই আছে ব্রক্ষ্মান্ডে” এই ছিল লালনের দর্শন। সমস্ত ধর্মের উর্দ্ধে উঠে এক অন্য ধর্মের সূত্রপাত করেছিলেন তিনি। মানবতাই ছিল তাঁর একমাত্র ধর্ম। ধর্মীয় গোঁড়ামির উর্দ্ধে উঠে তৎকালীন সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। সমাজের উচ্চবর্গের মানুষের তথাকথিত নীচু জাতের মানুষের উপর নিপীড়ন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধেও তিনি প্রতিবাদী হয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রবল প্রতাপশালী জমিদার প্রতিবাদী কৃষক জনতাকে শায়েস্তা করার জন্য লাঠিয়াল পাঠালে তখন লালনই লাঠি হাতে জমিদারদের লাঠিয়ালদের পরাজিত করে কৃষকবন্ধু কাঙাল হরিনাথকে রক্ষা করেন। সেই কারণেই গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে ভূস্বামী, ঐতিহাসিক, বুদ্ধিজীবী, বিশিষ্ট লেখক সকলেই লালনের জীবনদর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ লালনের জীবনদর্শন দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়ে প্রায় ১৫০টি গান রচনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘গোরা’ উপন্যাসের সূত্রপাত করেন লালনের গানের দ্বারা। লালনের মানবতাবাদী দর্শনে প্রভাবিত হয়েছিলেন সাম্যবাদী কবি নজরুল ইসলামও। আমেরিকান কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ লালনদর্শনে প্রভাবিত হয়ে ‘আফটার লালন’ নামে একটি কবিতা রচনা করেছেন। গিন্সবার্গের বহু রচনাবলীতে লালনের দর্শনের প্রভাব পাওয়া যায়।

লালন তাঁর জীবনদর্শন ও মতামতকে প্রকাশ করেছেন গানের মাধ্যমে। বাউল সমাজে তাঁর গান মুখে মুখে প্রচারিত হয়ে খ্যাতি লাভ করে। তাঁর লেখা গানের কোন পান্ডুলিপি পাওয়া যায় না। কিন্তু গানগুলি এতটাই জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল যে আজও তার ব্যাপ্তি রয়েছে জনমানসে। লালন গবেষকদের মতে তিনি প্রায় আট শতাধিক গান রচনা করেছিলেন। তাঁর গানগুলি মূলত আত্মতত্ত্ব দেহতত্ত্বের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বৈষ্ণব, বৌদ্ধ সহজিয়া ও সুফীবাদ। লালনের গানগুলি “লালনগীতি” নামে পরিচিত। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ‘হারমোনি’ বিভাগে লালনের গানগুলি প্রকাশ করেন। এছাড়াও লালনের গানগুলি মূলত “লালন গীতিকা” এবং “লালন ফকিরের গান” গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। তাঁর গানগুলির মধ্যে কয়েকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য –“মিলন হবে কতদিনে আমার মনের মানুষেরই সনে”, “আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে্‌ “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়”, “বাড়ির কাছে আরশিনগর” ইত্যাদি। এই গানগুলির মধ্যে তাঁর আত্মার সাথে মিলনের আকুতি সুপষ্টরূপে প্রতিভাত হয়েছে যে মনের মানুষের কোন লিঙ্গ, জাত, কূল ধর্ম বা জাত নেই।

লালনের গানের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য, তাঁর বেশিরভাগ গানের শেষে লালন নিজের নামে পদ রচনা করেছেন। ফলে তাঁর গান অন্য কেউ নিজের বলে চালিয়ে দিতে পারেনি। জাতবিষয়ক তাঁর একটি গানে যেমন লালন শেষ দিকে বলছেন, ‘গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়/তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়/লালন বলে জাত কারে কয়/এ ভ্রম তো গেল না’।

লালন এমন এক ব্যক্তিত্ব যাঁকে নিয়ে বহু আলোচনা সমালোচনা হয়েছে। তাঁকে নিয়ে রহস্য কম নেই। কিন্তু সমাজে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বাউল সংস্কৃতিকে এক উচ্চমার্গ প্রদান করেছে তাঁর ভাবাদর্শ। সেই কারণেই তাঁকে “বাউল সম্রাট” বলে আখ্যায়িত করা হয়। তাঁর জীবনীকে কেন্দ্র করে রচিত উপন্যাসগুলির মধ্যে পরেশ ভট্টাচার্যের লেখা “বাউল রাজার প্রেম” অন্যতম। বিশিষ্ট সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লালনের জীবকে কেন্দ্র করে লিখেছেন ‘মনের মানুষ’ উপন্যাস যা পরে ছায়াছবিও হয়।

১৯৬২ সালে তাঁর জন্মস্থান কুষ্টিয়াতে ‘লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্র’ তৈরী হয়। ১৯৭২ সালে তৈরী হয় ‘লালন আকাদেমি’। ঠাকুর বাড়ীর সঙ্গেও লালনের সম্পর্ক ছিল। লালনের জন্মভূমি কুষ্টিয়া ছিল ঠাকুর বাড়ীর জমিদারির অংশ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের গান শুনে তাঁর সাথে নিজে উৎসাহিত হয়ে দেখা করেছিলেন। লালনের একমাত্র স্কেচটি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা যাতে ১৮৮৯ সাল ৫ মে তারিখ দেওয়া আছে। স্কেচটি বর্তমানে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের সাথে লালনের কোনদিন দেখা হয়েছিল কিনা তা নিয়েও যথেষ্ট বির্তক রয়েছে। তবে রবীন্দ্রনাথ লালনের মৃত্যুর পরের বছর কুষ্টিয়ার শিলাইদহে যান জমিদারি কাজের দেখাশোনার জন্য এবং সেই সময়ে তিনি লালনের গান নিয়ে যথেষ্ট উৎসাহিত হয়ে পড়েন।

আনুমানিক ১৭ অক্টোবর ১৮৯০ সালে লালন ফকিরের মৃত্যু হয় তাঁর ছেউড়িয়ার আখড়ায়।

তথ্যসূত্র


  1. https://www.bbc.com/
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. https://www.thedailystar.net/
  4. https://www.thedailystar.net/
  5. https://www.anandabazar.com/
  6. https://www.banglanews24.com/fiction/news/bd/476262.details

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

সাহিত্য অনুরাগী?
বাংলায় লিখতে বা পড়তে এই ছবিতে ক্লিক করুন।