লেসলি ক্লডিয়াস (Leslie Claudius) ছিলেন একজন বিখ্যাত ভারতীয় হকি খেলোয়াড়। তাঁকে ভারতের সর্বকালের অন্যতম সেরা হকি খেলোয়াড় হিসেবে মনে করা হয়। তিনি ১৯৪০ ও ৫০-এর দশকে আন্তর্জাতিক হকিতে নিজের দক্ষতা ও ধারাবাহিকতা দেখিয়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তবে শুধু একজন খেলোয়াড় হিসেবে নয় বরং একজন দক্ষ কোচ ও ম্যানেজার হিসেবেও তিনি দীর্ঘদিন ভারতীয় হকি দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নিজের খেলোয়াড় এবং কোচিং কেরিয়ারে তিনি ভারতকে বহু আন্তর্জাতিক সাফল্য এনে দিয়েছিলেন। তিনি অলিম্পিকে চারটি পদক জেতার বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন। অলিম্পিক হকিতে তিনটি সোনাসহ মোট চারটি পদক জয়ের কৃতিত্ব ভারতীয়দের মধ্যে শুধু উধম সিং ও লেসলি ক্লডিয়াসের আছে। ১৯৪৮ সাল, ১৯৫২ সাল এবং ১৯৫৬ সালের অলিম্পিক হকিতে স্বর্ণপদক ও ১৯৬০ সালের অলিম্পিকে তিনি রূপোর পদক জয় করেছিলেন। লেসলি ক্লডিয়াসই ছিলেন প্রথম হকি খেলোয়াড় যিনি ১০০ টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রেকর্ড তৈরি করেছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি ষষ্ঠ ভারতীয় হকি খেলোয়াড় হিসেবে পদ্মশ্রী পুরস্কার পেয়েছিলেন।
১৯২৭ সালের ২৫ মার্চ ছত্তিশগড়ের বিলাসপুরের একটি মধ্যবিত্ত অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পরিবারে লেসলি ক্লডিয়াসের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম লেসলি ওয়াল্টার ক্লডিয়াস। তাঁর তিন ছেলে যাঁদের মধ্যে রবার্ট ক্লডিয়াস ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ভারতের হকি দলের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।
লেসলি ক্লডিয়াস প্রথম জীবনে হকি নয় বরং ফুটবল খেলতে পছন্দ করতেন। তিনি একজন শক্তিশালী মিডফিল্ডার হিসেবে ফুটবল খেলতে চেয়েছিলেন। এমনকি একজন দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে বিভিন্ন দলের হয়ে খেলার সুযোগও পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময় খেলোয়াড় কম পড়ায় রিচার্ড জন কার (Richard John Carr) তাঁকে ফুটবল মাঠ থেকে ডেকে নিয়ে যান হকি খেলার জন্য। এরপর তাঁর হকি স্টিক চালনার দক্ষতা দেখে সকলে অবাক হয়ে যায় ও সকলে তাঁকে হকি খেলায় মনোযোগ দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিছুদিন পর তিনি ফুটবল খেলা ছেড়ে হকি খেলায় মনোনিবেশ করেন। আর এভাবেই ফুটবলের বদলে হকির মাঠে তাঁর যাত্রা শুরু হয়।
এরপর রিচার্ড জন কারের সহায়তায় লেসলি ক্লডিয়াস বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে হকি দলে যোগ দেন। সেই সময় এই দলটি বেইটন কাপে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিল। এই দলের হয়ে অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য তিনি ভারতীয় জাতীয় দলে খেলার ডাক পান। ১৯৪৮ সালের লন্ডন অলিম্পিকে জাতীয় দলে লেসলি ক্লডিয়াসের অভিষেক হয়। এই অলিম্পিক ভারতের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ এতে প্রথমবার ভারত একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে অলিম্পিকে যোগদান করে। এই অলিম্পিকে ভারতীয় হকি দল স্বর্ণপদক জেতে। এটি ছিল স্বাধীন ভারতের প্রথম অলিম্পিক গোল্ড মেডেল। এরপর লেসলি ক্লডিয়াস কলকাতা শুল্ক বিভাগে প্রিভেন্টিভ অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। তিনি কলকাতা কাস্টমস ক্লাবের সদস্য ছিলেন। এছাড়া তিনি ১৯৪৮ সালে আগা খান টুর্নামেন্টে কলকাতা পোর্ট কাস্টমস কমিশনারেটের প্রতিনিধিত্ব করেন। দেশকে আন্তর্জাতিক সাফল্যের পাশাপাশি তিনি কলকাতা কাস্টমস ক্লাবকেও সাফল্য এনে দেন।
এরপর ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি অলিম্পিকে ভারতীয় পুরুষ হকি দলের সদস্য হিসেবে লেসলি ক্লডিয়াস ১৯৫২ সালে স্বর্ণপদক জেতেন। এই অলিম্পিকের ফাইনাল ম্যাচে ভারত নেদারল্যান্ডসকে ৬-১ গোলে পরাজিত করে। ফাইনাল ম্যাচে বলবীর সিং সিনিয়র একাই ৫টি গোল করে অলিম্পিক হকির ফাইনালে কোনও একক খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ গোলের বিশ্ব রেকর্ড তৈরি করেন। এরপর ১৯৫৬ সালে মেলবোর্ন অলিম্পিকেও স্বর্ণপদক জয় করে ভারতীয় হকি দল। এই অলিম্পিকের ফাইনালে ভারত পাকিস্তানকে ১-০ গোলে পরাজিত করে। সেই ম্যাচে ভারতের হয়ে জয়সূচক গোলটি করেন রণধীর সিং জেন্টল। এটি ছিল অলিম্পিক ইতিহাসে ভারত বনাম পাকিস্তানের প্রথম হকি ফাইনাল। এরপর ১৯৫৮ সালের টোকিও এশিয়ান গেমসে লেসলি ক্লডিয়াস ভারতীয় হকি দলের সদস্য হিসেবে রৌপ্যপদক জেতেন। সেই বছরই এশিয়ান গেমসে প্রথমবারের মতো হকিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই গেমসের ফাইনাল ম্যাচটিকে নিয়ে নানা বির্তক তৈরি হয়। কারণ পাকিস্তানের সাথে এই ম্যাচ ড্র হলেও, মোট গোল গড়ের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯৬০ সালে রোম অলিম্পিকে ভারতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে লেসলি ক্লডিয়াস রৌপ্যপদক জেতেন। তাছাড়া ইউরোপ, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড সফরে তিনি ভারতীয় দলের অংশ ছিলেন।
তবে অলিম্পিক সাফল্যের পাশাপাশি ক্লডিয়াস অসংখ্য আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টেও খেলেন। তিনি ভারতীয় হকি দলে একশোটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা প্রথম ব্যক্তি। তাঁর সময়কালে ভারতের ফিল্ড হকি দলটি একটি শক্তিশালী দলে পরিণত হয়েছিল। আর অনেকেই মনে করতেন যে, এই শক্তিশালী হকি দলের অন্যতম স্তম্ভ ছিলেন লেসলি ক্লডিয়াস।
লেসলি ক্লডিয়াস ১৯৬০ সালের অলিম্পিকের পর আন্তর্জাতিক হকি থেকে অবসর নেন এবং ১৯৬৫ সালের পর তিনি সমস্ত ধরণের প্রতিযোগিতামূলক খেলা থেকে পুরোপুরি অবসর নেন। হকি খেলা থেকে অবসর নেওয়ার পর লেসলি ক্লডিয়াস একজন কোচ এবং পরামর্শদাতা হিসেবে হকি খেলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খেলোয়াড়দের উৎসাহিত করতেন। তাঁর কোচিং-এ ভারতীয় জাতীয় দল বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ম্যাচে জয়লাভ করে। এছাড়া তিনি কিছু সময় ভারতীয় দলের ম্যানেজার ও কোচিং প্যানেলের অংশ হিসাবেও কাজ করেন। লেসলি ক্লডিয়াস ১৯৭৮ সালে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসের জন্য ভারতীয় হকি দলের ম্যানেজার হিসেবে নিযুক্ত হন।
লেসলি ক্লডিয়াসের হকি খেলার ধরণ ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মাঠের মধ্যে খুব সুন্দর ভাবে নিজের গতির তারতম্য ঘটাতে পারতেন। এমনকি বল নিয়ন্ত্রণেও তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ছিল। তিনি ড্রিবলিং ও বল নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষ ছিলেন এবং আক্রমণ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। তিনি স্টিক ব্যবহার করে দ্রুতগতিতে বলের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রেখে প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দিয়ে অনায়াসে এগিয়ে যেতেন। এইভাবে তিনি সহজে বল নিয়ন্ত্রণ, পজিশন ধরে রাখা এবং গোল করার সুযোগ তৈরি করতেন। এছাড়া তিনি সঠিক সময়ে প্রতিপক্ষের আক্রমণকে ব্যর্থ করতে পারতেন। তিনি শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতেও পাল্টা আক্রমণ গড়ে তুলে দলের জয় নিশ্চিত করতে পারতেন। আর এভাবে তিনি আন্তর্জাতিক হকিতে ভারতকে একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। তিনি ছিলেন শান্ত প্রকৃতির এক মানুষ। অসাধারণ ম্যাচ রিডিং ক্ষমতার জন্য তিনি একজন দক্ষ কোচ হয়ে উঠেছিলেন। তাছাড়া তিনি ছিলেন একজন সৎ মানুষ, যিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ক্রীড়াক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করা সম্ভব। তিনি তাঁর ছাত্রদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং সুস্থ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার কথা বলতেন।
ফিল্ড হকিতে অসাধারণ অবদানের জন্য লেসলি ক্লডিয়াস অসংখ্য পুরষ্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন। ভারত সরকার ১৯৭১ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী পুরষ্কার প্রদান করে। এছাড়া ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইস্টবেঙ্গল ক্লাব কর্তৃক প্রবর্তিত ‘ভারত গৌরব’ পুরস্কার দেন তাঁকে। এরপর ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকের বিশেষ ‘অলিম্পিক লেজেন্ডস ম্যাপ’-এ বুশে টিউব স্টেশনের (Bushey tube) নামকরণ করা হয়েছিল ক্লডিয়াসের নামে। এই অনুষ্ঠানের আয়োজকরা অলিম্পিক ইতিহাসের কিংবদন্তি খেলোয়াড়দের সম্মান জানিয়ে তাঁদের নামে লন্ডনের কিছু আন্ডারগ্রাউন্ড টিউব স্টেশনের নাম সাময়িকভাবে পরিবর্তন করেছিলেন। লেসলি ক্লডিয়াসসহ বিশ্বের অন্যতম সেরা কিছু হকি খেলোয়াড় এই সম্মান পেয়েছিলেন। ওই বছরই তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক বঙ্গবিভূষণ পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। এছাড়া তাঁকে সম্মান জানিয়ে ২০১৫ সালে কলকাতার প্লাসি গেট রোডের নামকরণ করা হয়েছিল লেসলি ক্লডিয়াস সরণি।
লিভার সিরোসিসের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর লেসলি ক্লডিয়াসের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান