বিংশ শতাব্দীর পাঁচ থেকে সাতের দশকের হিন্দি চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার ছিলেন মদন মোহন (Madan Mohan)। তাঁকে হিন্দি চলচ্চিত্র জগতের সবচেয়ে সুরেলা এবং দক্ষ সঙ্গীত পরিচালক হিসাবে মনে করা হয়। মূলত গজল-ভিত্তিক সুরের জন্যই তিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন, এবং তাঁর রচিত বহু গজল আজও ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে পরবর্তীকালে তিনি গজলের পাশাপাশি হিন্দি চলচ্চিত্রের জন্য ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতে আধুনিক উপাদানগুলিকে দক্ষভাবে ব্যবহার করে একটি নতুন ধারা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সুর ও রাগের সঠিকতার জন্যই তিনি সঙ্গীত জগতে অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। তাঁর গজলের করুণ সুর, রাগ-ভিত্তিক গভীরতা ও মেলোডির জন্য লতা মঙ্গেশকর তাঁকে ‘গজল কা শেহজাদা’ নামে অভিহিত করেন।
সাম্প্রতিক পোস্ট
সুরকার মদন মোহনের প্রকৃত নাম হল মদন মোহন কোহলি। ১৯২৪ সালের ২৫ জুন ইরাকের বাগদাদে মদন মোহনের জন্ম হয়। তাঁর বাবা রায় বাহাদুর চুনিলাল কোহলি (Rai Bahadur Chuni Lal Kohli) প্রথমে ইরাকি পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। আর পরবর্তীকালে তিনি মুম্বাইয়ের বোম্বে টকিজ এবং ফিল্মিস্তান স্টুডিওর অংশীদার হিসাবে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। মদন মোহনের মায়ের নাম ভগবন্তী দেবী (Bhagwanti Devi)। মদন মোহনের সঙ্গে শিলা ধিংগারের (Sheila Dhingra) বিয়ে হয়েছিল। তাঁর তিন সন্তান সমীর কোহলি, সঙ্গীতা কোহলি ও সঞ্জীব কোহলির মধ্যে বাবার পথ অনুসরণ করে একমাত্র সঞ্জীব কোহলি পরবর্তীকালে সঙ্গীতের জগতে কাজ করেছিলেন। এছাড়া তাঁর ভাগ্নি অঞ্জু মহেন্দ্রু (Anju Mahendru) ছিলেন একজন অভিনেত্রী।
মদন মোহনের শৈশব কেটে ছিল মধ্যপ্রাচ্যে। ১৯৩২ সালের পর তাঁর পরিবার তৎকালীন ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের ঝিলম জেলায় তাঁদের নিজেদের শহর চকওয়ালে ফিরে আসেন। তিনি প্রথম কয়েক বছর লাহোরের স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন। এই সময় তিনি কিছু দিন কর্তার সিং (Kartar Singh)-এর কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রশিক্ষণ নিয়ে সঙ্গীতের মূল বিষয়গুলি আয়ত্ত করেছিলেন। এছাড়া তিনি আর কখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে সঙ্গীতের প্রশিক্ষণ নেননি। এরপর তিনি পরিবারের সঙ্গে মুম্বাইয়ে চলে যান। সেখানে তিনি বাইকুল্লার সেন্ট মেরি স্কুল থেকে সিনিয়র কেমব্রিজ ডিগ্রি লাভ করেন। মুম্বইয়ে থাকাকালীন মাত্র ১১ বছর বয়স থেকেই তিনি অল ইণ্ডিয়া রেডিও-র অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া শুরু করেন। এরপর ১৭ বছর বয়সে তিনি দেরাদুনের কর্নেল ব্রাউন কেমব্রিজ হাই স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখানে তাঁর স্কুলের পড়াশোনা শেষ করেন।
এক নজরে মদন মোহনের জীবনী:
- জন্ম: ২৫ জুন, ১৯২৪
- মৃত্যু: ১৪ জুলাই, ১৯৭৫
- কেন বিখ্যাত: মদন মোহন মূলত তাঁর অসাধারণ গজল–সুরের জন্যই বিখ্যাত। রাগভিত্তিক সুরকে আধুনিক মেলোডির সঙ্গে মিলিয়ে তিনি হিন্দি চলচ্চিত্রে গজলের এক নতুন ধারা তৈরি করেছিলেন। লতা মঙ্গেশকর, রফি, তালাত, আশা—সবাই তাঁর সুরে অমর গান উপহার দিয়েছেন।আবেগ, করুণতা ও সুরের সৌন্দর্য—এই তিনের নিখুঁত মিশ্রণে তিনি হয়ে ওঠেন বলিউডের ‘গজল স্পেশালিস্ট’। মৃত্যুর পরও তাঁর সুর নতুন ছবিতে পুনরায় ব্যবহৃত হওয়া—এটাই তাঁর চিরস্থায়ী জনপ্রিয়তার প্রমাণ।
- পুরস্কার ও স্বীকৃতি: মদন মোহন ‘দস্তক’ ছবির জন্য সেরা সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁর অব্যবহৃত সুর ব্যবহার করে বানানো ‘বীর-জারা’ -র জন্য আইফা পুরস্কারে তাঁকে মরণোত্তর সম্মান দেওয়া হয়। লতা মঙ্গেশকর তাঁকে ‘গজল কা শেহজাদা’ বলতেন।
১৯৪৩ সালে মদন মোহনের কর্মজীবন শুরু হয় সেনাবাহিনীতে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তিনি সঙ্গীতের টানে সেনাবাহিনী ছেড়ে মুম্বাই চলে আসেন। ১৯৪৬ সালে তিনি লক্ষ্ণৌতে ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’য় কাজ করা শুরু করেছিলেন। এখানে তিনি বড়ে গুলাম আলী খান , বেগম আখতার, তালাত মাহমুদের মতো বিখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। এই সময় তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিওতে সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানের জন্য বিভিন্ন সঙ্গীত রচনা করতেন।
১৯৪৭ সালে তাঁকে অল ইন্ডিয়া রেডিওর দিল্লি শাখায় বদলি করা হয়। তিনি নিজে গান গাইতে পছন্দ করতেন, সেই সময় বেহজাদ লখনওই-র লেখা দুটি গজল তিনি রেকর্ড করেন। তবে সিনেমার জন্য প্রথন গান গেয়েছিলেন ১৯৪৮ সালে দিল্লিতে মহান সুরকার গোলাম হায়দার (Ghulam Haider)-এর ‘শহীদ’ সিনেমার জন্য। মদন মোহন ও লতা মঙ্গেশকর ‘পিঞ্জরে মে বুলবুল বোলে’ ও ‘মেরা ছোটাসা দিল দোলে’ গানদুটি একত্রে গেয়েছিলেন, তবে এই গানগুলি ওই সিনেমায় ব্যবহার করা হয়নি।
১৯৪৭ সালে মদন মোহন ‘দো ভাই’ সিনেমার জন্য সঙ্গীত পরিচালক শচীন দেব বর্মণের সহায়ক হিসাবে কাজ করেছিলেন। স্বাধীন সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে মদন মোহন ১৯৫০ সালে ‘আঁখে’ সিনেমায় প্রথম কাজ করেন। আর প্রথম সিনেমাতেই তিনি সাফল্য লাভ করেন। এই সিনেমা থেকেই তাঁর মহম্মদ রফির সঙ্গে কাজের শুরু। তাঁর পরবর্তী সিনেমা ‘আদা ‘য় তিনি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে কাজ করেন। পরবর্তীকালে অনেক সিনেমাতেই লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। মদন মোহনের সুরে ‘শরাবি’ সিনেমায় মোহাম্মদ রফির (Mohammed Rafi) গান ‘সাওয়ান কে মাহিনে মে’ এবং ‘কভি না কভি কোই না কোই তো আয়েগা’ দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল। এছাড়া ‘মুনিমজি’ সিনেমায় তিনি একটি ছোট চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন। ১৯৫৫ সালে ‘রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম’ সিনেমায় তিনি বেশ কিছু চমৎকার গান তৈরি করলেও এইগুলি বেশি হিট হয়নি। তবে সেই সময় সমস্ত শীর্ষ তারকারা আগে থেকেই নির্দিষ্ট সুরকার বেছে নেওয়ায় তাঁর কাজ পেতে যথেষ্ট অসুবিধা হয়েছিল। এরপর তিনি ‘দেখা কবিরা রোয়া’ সিনেমার সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করছিলেন। এই সিনেমায় তালাত মাহমুদের সঙ্গে তিনি ‘হামসে আয়া না গায়া ‘ গানটি তৈরি করেন।
১৯৫৮ সালে তিনি ‘আদালত’ সিনেমার গজলের সুরের মধ্যে দিয়ে সকলের নজরে আসেন। পরবর্তীকালে ‘আনপথ’ ছবিতে তাঁর পরিচালিত গানগুলি ধীরে ধীরে সমগ্র ভারত জুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই সিনেমার গজলগুলির মধ্যে দিয়ে তিনি ‘গজল রাজা’ হিসেবে পরিচিতি পান। এরপর ১৯৬৪ সালে ‘জাহান আরা’ সিনেমায় ‘ও চুপ রহেঁ তো’, ‘কিসি কি ইয়াদ মে’ গানে সুর দেন তিনি। মদন মোহনের উদ্যোগে রাজ খোসলার ‘ওমেন ইন হোয়াইট’ এর সংস্করণ ‘ওহ কৌন থি ?’ ছবিতে লতা মঙ্গেশকর তিনটি জনপ্রিয় গান ‘নয়না বারসে রিম ঝিম রিম ঝিম’ , ‘লাগ জা গলে’ এবং ‘জো হামনে দাস্তা আপনি সুনায়ি’ গেয়েছিলেন। এছাড়া ‘দুলহান এক রাত কি’ সিনেমার ‘ম্যায়নে রঙ লি আজ চুনারিয়া’ ছিল তাঁর বিখ্যাত গান। ‘হীর রাঞ্জা’ সিনেমায় ‘ইয়ে দুনিয়া ইয়ে মেহফিল মেরে কাম কি নেহি’ গানটি মদন মোহনের সর্বকালীন সেরা গানগুলির মধ্যে অন্যতম।
তা ছাড়া তিনি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে তৈরি করেছিলেন ‘তু পেয়ার করে ইয়া ঠুকরায়ে’ , ‘মেরি বীণা তুম বিন রয়ে’ ইত্যাদি গান। এরপর তিনি ১৯৬৪ সালে সুর দিয়েছিলেন চেতন আনন্দ পরিচালিত ভারত-চীন যুদ্ধের উপর ভিত্তি করে তৈরি ‘হাকিকত’ সিনেমায়। এই সিনেমায় তিনি সুর দিয়েছিলেন ‘কই চলি হাম ফিদা’, ‘ম্যায় ইয়ে সোচ কর’, ‘জারা সি আহাত হোতি হ্যায় ‘, ‘খেলো না মেরে দিলসে’র মতো গানগুলিতে। তাছাড়া তিনি ওই ছবিতে রফি, তালাত, মান্না দে এবং ভূপেন্দ্রকে নিয়ে একসাথে ‘হোকে মজবুর মুঝে উসনে ভুলা হোগা’ গানটিও তৈরি করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে এই গানটিই ছিল একমাত্র গান যেখানে এতগুলো শীর্ষস্থানীয় পুরুষ প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে কাজ করেছিলেন। এছাড়া এই গানের মধ্যে দিয়ে ভূপেন্দ্র প্রথমবারের মতো সিনেমায় প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে কাজ করা শুরু করছিলেন।
ছয়ের দশকের পর সাতের দশকের গোড়ার দিক ছিল মদন মোহনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। ১৯৭০ সালে তিনি ‘দস্তক’ সিনেমার জন্য রাগ-ভিত্তিক সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন। এছাড়া ‘দিল কি রাহেঁ’ সিনেমার জন্য তিনি বিখ্যাত গজল ‘রসম-এ-উলফাত কো নিভায়েঁ’তে সুর দিয়েছিলেন। এটি গেয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর। এই সকল গান ছাড়াও তিনি সুর দিয়েছিলেন বিখ্যাত সংগীত ‘ অ্যায় দিল মুঝে বাতা দে’, ‘ঝুমকা গিরা রে’, ‘জারুরত হ্যায়’, ‘ভুলি হুই ইয়াদোঁ’ এবং ‘সবাহ সে ইয়ে কাহ দো’ ইত্যাদি। এছাড়া তাঁর শেষের দিকের গানগুলি ‘মাই রি’, ‘তুম জো মিল গে হো’, ‘হর তরফ আব ইয়েহি আফসানে হ্যায়’ দারুণ বাণিজ্যিক সাফল্য পেয়েছিল। সবশেষে বলা যায় যে, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে তিনি আকর্ষণীয়ভাবে ব্যবহার করেছিলেন।
মদন মোহন কোহলি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ক সঙ্গীত রচয়িতা। তাঁর গানে সবচেয়ে বেশি কন্ঠ দিয়েছেন লতা মঙ্গেশকর। এছাড়াও তিনি নিয়মিত কাজ করেছেন মোহাম্মদ রফি, আশা ভোঁসলে , কিশোর কুমার, তালাত মাহমুদ এবং গীতা দত্তের মতো সর্বকালীন সেরা গায়ক-গায়িকাদের সঙ্গে।
মদন মোহনকে ‘ও কৌন থি ‘, ‘আনপথ’ ছবির সেরা সঙ্গীত পরিচালক হিসাবে ‘ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন করা হয়েছিল, তবে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি হেরে যান। অবশেষে, দস্তক’ ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার জন্য ১৯৭১ সালে তিনি সেরা সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন, এটি ছিল তার জীবদ্দশায় পাওয়া একমাত্র বড় পুরস্কার। এছাড়া মদন মোহনের ছেলে সঞ্জীব কোহলি ২০০৪ সালের যশ চোপড়ার (Yash Chopra) সিনেমা ‘বীর-জারা’-র জন্য তাঁর প্রয়াত বাবার অব্যবহৃত সুর পুনর্নির্মাণ করেছিলেন। আর এই সিনেমার সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে মদনমোহনকে ২০০৫ সালে আইফা (IIFA) পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়েছিল।
১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে মুম্বাইয়ে মদন মোহনের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান