সববাংলায়

মহিষাসুরমর্দিনী

‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠছে আলোক-মঞ্জীর, ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা; প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা।’ পুজো এলেই প্রতিটি বাঙালির নস্টালজিয়ায় ভেসে ওঠে মহালয়ার পুণ্য তিথিতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠের মাধুর্যে মহিষাসুরমর্দিনী র পাঠ। একসময় বেতারের সবথেকে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ছিল এই মহিষাসুরমর্দিনী (Mahishasurmardini)। মোটামুটিভাবে বাংলার বাইরেই হোক, বা ভিতরে, এমনকি ভারতের বাইরেও যত বাঙালিই থাক প্রায় প্রত্যেকের হৃদয়ের অন্তঃস্থলের বীণার তন্ত্রীতে আজও নাড়া দিয়ে যায় সেই সুরঝঙ্কার, সেই উদাত্ত কণ্ঠের চণ্ডীপাঠ। একসময় বাঙালির ঘুম ভাঙাতো এই মহিষাসুরমর্দিনী। আকাশবাণী কলকাতার সরাসরি সম্প্রচার শোনার জন্য তথাকথিত অলস-কুঁড়ে বাঙালিও উঠে পড়তো ভোর চারটেয়। মহিষাসুরমর্দিনী ছিল পবিত্র গঙ্গাজলের মতো যার ছোঁয়াতে পবিত্র হয়ে উঠতো মন-প্রাণ, বাঙালির পুজো পুজো গন্ধে ধুনো-আতরের সুবাসে ভরিয়ে তুলতো এই অনুষ্ঠান। আর এর মাধ্যমেই বাঙালি সংস্কৃতির মজ্জায় মজ্জায় কিংবদন্তীতে পরিণত হলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, সঙ্গীত পরিচালক পঙ্কজ মল্লিক প্রমুখেরা। সামান্য এক বামুনের চণ্ডীপাঠ নিয়ে সেকালেও কম জলঘোলা হয়নি। এই মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানের গল্পই আজ জেনে নেওয়া যাক চলুন।

সময়টা ১৯৩২ সাল। সদ্য দুই বছর আগে ১৯৩০ সালে ভারতীয় বেতার সংস্থা সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে এবং তার নাম বদলে গিয়ে হয়েছে ‘ইণ্ডিয়ান স্টেট ব্রডকাস্টিং সার্ভিস’। তারই শাখা আকাশবাণী কলকাতা। বেতারের প্রাণকেন্দ্র বলা চলে। গার্স্টিন প্লেসের ঠিকানাতে এর প্রধান কার্যালয় ছিল, ওখান থেকেই সব অনুষ্ঠান প্রথমদিকে সম্প্রচারিত হতো। তো ১৯৩২-এর চৈত্র মাস সমাগত, বসন্তের সমাগমে আকাশবাণীর একটি বিশেষ অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করলেন বাণীকুমার অর্থাৎ বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। মার্কণ্ডেয় চণ্ডী থেকে কাহিনি ধার করে, স্তোত্র আর সঙ্গীতের সমাহারে গড়ে তোলেন তিনি ‘বসন্তকুমারী’ নামের একটি গীতি-আলেখ্য। সেই সময় আকাশবাণীর এই অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিচালনার ভার ছিল রাইচাঁদ বড়ালের উপর, গানে সুর সংযোজন করেছিলেন পঙ্কজ মল্লিক আর হরিশচন্দ্র বালী। ১৯৩২ সালের দুর্গাপুজোর অষ্টমীর দিন সরাসরি সম্প্রচারিত এই অনুষ্ঠানে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রও কিছু অংশ পাঠ করেছিলেন। সেই শুরু বাণীকুমার, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র আর পঙ্কজকুমার মল্লিকের ত্রয়ী আকাশবাণীর বেতার অনুষ্ঠানে বিরাট ভূমিকা রাখতে শুরু করেন আর ভবিষ্যতে এই তিন স্তম্ভই হয়ে উঠবেন বেতারের সর্বকালের সেরা ও জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের ধারক-বাহক নির্মাতা সবই। ‘বসন্তেশ্বরী’র পরের বছরই আরেকটি অনুরূপ অনুষ্ঠান করা হয় যা ‘মহিষাসুর বধ’ নামে ১৯৩৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ভোরে প্রভাতী অনুষ্ঠানে সম্প্রচারিত হয়। এই মহিষাসুর বধের অনুষ্ঠান ক্রমেই জনপ্রিয় হতে শুরু করে। আকাশবাণীর বিশেষ দল যে মহিষাসুর বধ পরিকল্পনা করেছিলেন তার উপদেষ্টা ছিলেন অধ্যাপক অশোকনাথ শাস্ত্রী বেদান্ততীর্থ। একবার এই অনুষ্ঠানের মহড়াতেই সংস্কৃত চণ্ডীর স্তোত্র পাঠের পর ঠিক একইরকম সুরে ও ছন্দে বাংলা ভাষ্যগুলিও পড়তে শুরু করেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। নিছক মজা করার জন্য এ কাজ করলেও অন্য সকলের এই পাঠভঙ্গি ভালো লেগে যায় এবং এভাবেই বলার জন্য অনুরোধ করেন সকলে। এর ফলে গতানুগতিক ভাষ্যপাঠের থেকে আরো অন্যরকমের এক বাতাবরণ তৈরি হয়ে যায়। সেই থেকেই বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কণ্ঠে আমরা চণ্ডীপাঠের ভঙ্গিতে বাংলা ভাষ্যপাঠ শুনে আসছি। পঙ্কজ কুমার মল্লিক, মানিকমালা, কৃষ্ণ ঘোষ, বীণাপানি প্রমুখ সেকালের বিখ্যাত সব গায়ক-গায়িকারা এত গান গেয়েছিলেন, সুর দিয়েছিলেন পঙ্কজ মল্লিক, হরিশচন্দ্র বালী এবং সাগির খাঁ। মহালয়ার দিন পুণ্যলগ্নে এই অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হওয়ায় গোঁড়া রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ সমাজে নিন্দার ঝড় ওঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কায়স্থ হয়েও চণ্ডীপাঠ করা নিয়ে। কিন্তু অনুষ্ঠান দলের সদস্যরা কেউ এতে চিন্তিত ছিলেন না। তাদের বক্তব্য ছিল হিন্দু মন্দিরে গিয়ে তারা কোনো পুজো করছেন না, একটি অনুষ্ঠান করছেন মাত্র। এতে ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ ভেদাভেদ বাতুলতা এবং সেক্ষেত্রে অধিকাংশ সেরা বাদ্য-বাদকদের সরিয়ে ব্রাহ্মণ বাজিয়ে আনা উচিত বলে মনে করেন তারা যা এক কথায় অসম্ভব। ১৯৩৬ সালে আবার সরাসরি সম্প্রচারিত হয় এই ‘মহিষাসুর বধ’। এটিই ছিল প্রথম যুগের ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত সরাসরি সম্প্রচার করা হতো এই অনুষ্ঠান, কিন্তু পরে একই সময়ে পূর্বের রেকর্ডটিই চালান হতে থাকে যে রীতি আজও বহমান। ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত ঐ অনুষ্ঠান মহিষাসুর বধ বা শারদ বন্দনা নামেই সম্প্রচারিত হতো, প্রথম ১৯৩৭ সালে এর নাম বদলে রাখা হয় ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। নতুন করে দুর্গাস্তব, স্তত্র, চণ্ডীর কিছু নতুন সূক্ত, আরো কিছু গানের সমাহারে এই অনুষ্ঠানকে আরো সমৃদ্ধ করে তোলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। এর আলেখ্য রচনা করেছিলেন স্বয়ং বাণীকুমার, সম্পাদনা করেছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র আর গানে সুরারোপ করেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক। দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, সুপ্রীতি ঘোষ প্রমুখ সেরা সঙ্গীত-শিল্পীরা গান গেয়েছিলেন এই অনুষ্ঠানে। আজও তাঁদেরই গান রেকর্ডে বাজে। শঙ্খধ্বনির মধ্যে দিয়ে মহালয়ার পুণ্যপ্রভাতে শুরু হতো সমবেত সঙ্গীত – ‘যা চণ্ডী মধুকৈটভাদি…’। আর তারপরই মূল অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা ঘটতো। মোট উনিশটি গান ছিল এই অনুষ্ঠানে যার মধ্যে প্রায় সব গানই বাঙালির দুর্গাপুজোকে আরো মোহময় করে তুলেছিল। তব অচিন্ত্য, জাগো দুর্গা, অখিল বিমানে, হে চিন্ময়ী, বাজলো তোমার আলোর বেণু ইত্যাদি বিখ্যাত সব গান শুধুমাত্র মহালয়ার এই অনুষ্ঠানের জন্যেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বাঙালির মনে। সারা ভারতের ৩৫টি বেতারকেন্দ্র থেকে প্রচারিত হতো এই অনুষ্ঠান।

এই মহিষাসুরমর্দিনীর মাঝেও একবার আকাশবাণী দপ্তর অন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে মূল অনুষ্ঠানের পরিবর্তে সম্প্রচার করে ‘দেবীং দূর্গতিহারিণীম্‌’। ধ্যানেশনারায়ণ চক্রবর্তীর লেখা এই অনুষ্ঠানে পাঠ করেছিলেন মহানায়ক উত্তমকুমার, সঙ্গীত পরিচালনা করেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এবং মান্না দে, লতা মঙ্গেশকর কিংবা আশা ভোঁসলের মতো বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীদের দিয়ে গান গাওয়ানো হলেও এই অনুষ্ঠান পরিবর্তন মেনে নেয় শ্রোতারা। অনুষ্ঠান চলাকালীনই বিক্ষোভসূচক ফোন আসতে থাকে আকাশবাণীর দপ্তরে, এমনকি সেইদিন দুপুরে আকাশবাণীর সামনে বিক্ষোভ জমায়েতও হয়। বাধ্য হয়ে ষষ্ঠীর দিন পুনরায় ফিরিয়ে আনা হয় সেই সোনাঝরা সুদিনের ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। বাঙালির আবেগ কত তীব্র শুধু একটি অনুষ্ঠানকে ঘিরে তা সেদিন প্রমাণিৎ হয়েছিল। পরবর্তীকালে উত্তমকুমার স্বয়ং এই আবেদনে সাড়া দেওয়ার জন্য আক্ষেপ করেছেন। জনপ্রিয়তার উত্তুঙ্গ শীর্ষে থাকা এই বেতার অনুষ্ঠানের ধারা বজায় রেখে আজও একই সময়ে ভোর চারটেয় বেতারে সম্প্রচারিত হয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার। পরবর্তীকালে শুধু বেতারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি এই মহিষাসুরমর্দিনী। দূরদর্শন কেন্দ্র কলকাতার টেলিভিশন অনুষ্ঠানেও প্রচারিত হতে থাকে মহিষাসুরমর্দিনী। ১৯৯৪ সালে প্রথম রঙিন অনুষ্ঠানে সম্প্রচারিত হয় এই অনুষ্ঠান, ঠিক মহালয়ার ভোরে চারটেয়। দেবী দুর্গার ভূমিকায় অভিনয় করেন সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায় আর সেই অভিনয়ই আইকনিক হয়ে ওঠে বাঙালির কাছে। তারপর দূরদর্শনের মহিষাসুরমর্দিনীর জনপ্রিয়তাও বাড়তে থাকে। ভোর পাঁচটার এই দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যমে দেবী দুর্গার ভূমিকায় কত বিখ্যাত অভিনেত্রী অভিনয় করেছেন – কখনো দেবশ্রী রায়, কখনো অপরাজিতা আঢ্য কিংবা শ্রীনন্দা শঙ্কর, এমনকি ডিডি ন্যাশনাল ভারতের অনুষ্ঠানে হেমা মালিনীও অভিনয় করেছিলেন দেবী দুর্গার ভূমিকায়। আর এখন তো হাল আমলের অভিনেত্রীরা প্রায় সকলেই কোনো না কোনোবার দেবী দুর্গার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। তবে দূরদর্শন কলকাতার প্রসার কমেছে, এসেছে অন্যান্য বেসরকারি চ্যানেল। কিন্তু ঐতিহ্যের আয়নায় মরচে পড়ে না কোনোদিন।

সময় পাল্টেছে, রেডিও গিয়ে এসে গেছে স্মার্টফোন, এসেছে ইউটিউব। তবু মহিষাসুরমর্দিনী শোনার অভ্যাস আর একবুক নস্টালজিয়া রয়ে গেছে আপামর বাঙালির মনে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading