এশিয়া তথা ভারতের প্রথম বিশ্বশ্রী অর্থাৎ মিস্টার ইউনিভার্সের খেতাব জিতেছিলেন বাঙালি ব্যায়ামবীর মনতোষ রায় (Manotosh Roy)। ব্যায়ামাচার্য বিষ্ণুচরণ ঘোষকে গুরু হিসেবে বরণ করে তাঁর ছবির সামনে বাড়িতেই নিরন্তর ব্যায়াম চর্চা করতেন তিনি। জীবনের প্রথম বডি-বিল্ডিং প্রতিযোগিতায় ব্যর্থ হলেও ১৯৫১ সালে মিস্টার ইউনিভার্স প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করেন তিনি। ১৯৫৮ সালে এশিয়ান বডিবিল্ডিং ফাউণ্ডেশন গড়ে তোলেন মনতোষ রায়। যোগব্যায়াম ও শরীরচর্চার উপরে বহু পত্র-পত্রিকায় লিখতে শুরু করেন তিনি এবং এর উপরে তার বেশ কিছু বইও আছে। ইন্টারন্যাশনাল বডিবিল্ডিং ফেডারেশন তাঁকে সারাজীবনের কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০১ সালে স্বর্ণপদকে ভূষিত করে।
এক নজরে মনতোষ রায়:
- জন্ম: ২১ অক্টোবর, ১৯১৬
- মৃত্যু: ২৯ জুন, ২০০৫
- কেন বিখ্যাত: ব্যায়ামবীর মনতোষ রায় ছিলেন এশিয়া তথা ভারতের প্রথম বিশ্বশ্রী বা মিস্টার ইউনিভার্স। ইন্ডিয়ান বডি বিল্ডিং ফেডারেশন ও এশিয়ান বডি বিল্ডিং ফেডারেশন তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠে। ব্যায়াম বিষয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালিখির পাশাপাশি বেশ কিছু বই লিখেছেন তিনি।
- পুরস্কার: ১৯৫১ সালে মিস্টার ইউনিভার্স প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হন। ইন্টারন্যাশনাল বডিবিল্ডিং ফেডারেশন তাঁকে সারাজীবনের কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০১ সালে স্বর্ণপদকে ভূষিত করে।
১৯১৬ সালের ২১ অক্টোবর অবিভক্ত ঢাকা জেলার অন্তর্গত মেঘনা নদীর তীরের একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম গজরিয়াতে মনতোষ রায়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম রসিক লাল রায়। শৈশবে পারিবারিক দারিদ্র্য আর অসচ্ছলতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছিল মনতোষ রায়কে। তাঁর যখন মাত্র ১২ বছর বয়স, তখন থেকেই তিনি ভার উত্তোলন করতে পছন্দ করতেন। ছোটবেলা থেকেই লোহার বল হাতে করে তুলে ব্যায়াম করতেন তিনি। সেই অভ্যাস পরেও ছাড়েননি মনতোষ রায়। একটি ইংরেজি মাধ্যম মিড্ল স্কুলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা করেছেন মনতোষ রায়। মাত্র বারো বছর বয়স থেকে তিনি শরীরচর্চা করতে শুরু করেছিলেন। সেকালের আরেক বিখ্যাত ব্যায়ামবীর বিষ্ণুচরণ ঘোষকে তিনি নিজের গুরু বলে স্বীকার করেছিলেন। ঠিক যেভাবে মহাভারতে দ্রোণাচার্যের মূর্তি সামনে রেখে একলব্য ধনুর্বিদ্যা চর্চা করতেন, সেভাবেই মনতোষ রায়ও বিষ্ণুচরণ ঘোষের একটি ছবি সামনে রেখে নিজের বাড়িতেই নিরন্তর নিরলসভাবে শরীরচর্চা করতেন। এই সময়েই বিষ্ণুচরণ ঘোষের সঙ্গে অভাবিতভাবে সাক্ষাৎ ঘটে যায় তাঁর। তখন থেকে প্রত্যক্ষভাবে বিষ্ণুচরণ ঘোষের কাছে শরীরচর্চার পাঠ নিতে শুরু করেন মনতোষ রায়।
জীবনের প্রথম বডি বিল্ডিং প্রতিযোগিতায় তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ১৯৩৯ সালে। কিন্তু সেখানে তিনি সাফল্যলাভ করতে পারেননি। মাত্র ২৩ বছর বয়সে এই প্রতিযোগিতায় যোগ দিলেও ব্যর্থ হন মনতোষ রায়। এরপর থেকে কঠোর অনুশীলনের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত করেন তিনি। নতুন উদ্যমে শরীরচর্চায় মনোনিবেশ করার ফলে ঐ বছরই ‘ইস্ট ইন্ডিয়ান বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপ’-এ বিজেতার শিরোপা পান মনতোষ রায়। পরে ১৯৪৭ সালে ‘অল ইন্ডিয়া বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপ’–এও জয়লাভ করেন তিনি। সমগ্র ভারতের মধ্যে বাঙালি হিসেবে যেমন সকলের গর্ব হয়ে উঠলেন, তেমনই শরীরচর্চার জগতে ভারতীয় হিসেবে কৃতিত্বের পরিচয় দিলেন। এরপরই চলে আসে ইতিহাস বিখ্যাত সেই দিনটি। ১৯৫১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত হয় মিস্টার ইউনিভার্স প্রতিযোগিতা আর সেই প্রতিযোগিতায় মনতোষ রায় অংশগ্রহণ করেন। গ্রুপ ৩ অ্যামেচার বিভাগে মিস্টার ইউনিভার্স প্রতিযোগিতায় সাফল্য লাভ করেন তিনি। গ্রুপ ৩-এ সে সময় কম উচ্চতাবিশিষ্ট প্রতিযোগীদের নেওয়া হতো। মনতোষ রায়ের উচ্চতা ছিল সাড়ে পাঁচ ফুট। এত কম উচ্চতা হয়েও প্রতিযোগিতার দর্শকেরা তাঁর সুগঠিত পেশিবহুল শারীরিক গঠন দেখে স্তম্ভিত হয়েছিলেন আর তেমনই বিচারকেরাও মুগ্ধ হয়েছিলেন। শোনা যায় মনতোষ রায়ের একটি স্বাক্ষর সংগ্রহের জন্য বহু দর্শকের ভিড় প্রতিযোগিতা মঞ্চের বাইরে প্রায় আড়াই ঘন্টা ধরে অপেক্ষারত ছিল। তাঁর ওজন ছিল ৭০ কেজি, গলা ও ঘাড়ের মাপ ১৬.৫ ইঞ্চি, ছাতির মাপ ৪৫ ইঞ্চি, বাইসেপের মাপ ছিল ১৬.৫ ইঞ্চি, উরুর মাপ ছিল ২৩ ইঞ্চি এবং কাফ্ পেশি ছিল ১৫.৫ ইঞ্চি আয়তন বিশিষ্ট। কোনরকম স্টেরয়েড বা আধুনিক জীবনে প্রচলিত প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট ছাড়াই এত সুগঠিত শারীরিক গঠন তৈরি করার পিছনে কেবল কঠোর পরিশ্রম আর নিরন্তর চেষ্টা ছিল মনতোষ রায়ের। মিস্টার ইউনিভার্স প্রতিযোগিতায় বিজেতার শিরোপা পাওয়ার পরে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ইণ্ডিয়া হাউজে তাঁকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করেন। লণ্ডন থেকে বিজয়ীবীরের মতো কলকাতায় ফিরে আসেন তিনি। মনতোষ রায় তখন এশিয়ার প্রথম মিস্টার ইউনিভার্স। এই একই বছর আরেক বাঙালি মিস্টার ইউনিভার্স প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন, তিনি সর্বজনবিদিত শ্রী মনোহর আইচ।
ভারতে ফিরে আসার পর তিনি বিভিন্ন শরীরচর্চার ক্লাবে প্রশিক্ষক হিসাবে কাজ করতে শুরু করেন। ভারতবাসীর কাছে তিনি তখন জীবন্ত কিংবদন্তী। বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের যোগব্যায়াম এবং শরীরচর্চা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন তিনি। ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদও তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ নিতে আসতেন বলে শোনা যায়। ১৯৫৮ সালে মনতোষ রায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইন্ডিয়ান বডি বিল্ডিং ফেডারেশন’। এছাড়াও তাঁরই উদ্যোগে গড়ে ওঠে ‘এশিয়ান বডি বিল্ডিং ফেডারেশন’। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ল’ কলেজে শরীরচর্চার শিক্ষক হিসেবে যুক্ত ছিলেন মনতোষ রায়। ১৯৯৮ সালে কলকাতায় মনতোষ রায় তাঁর নিজের বাড়ির কাছেই একটি মাল্টিজিম স্থাপন করেন। এর পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন জায়গায় কিছু ছোটখাট যোগব্যায়াম সংস্থা গড়ে তুলেছেন। বিভিন্ন সাময়িক পত্র পত্রিকায় তিনি স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রবন্ধ লিখতেন, যোগব্যায়ামের উপর কিছু বইও লিখেছিলেন। দূরদর্শন কেন্দ্রে তাঁর যোগব্যায়ামের উপরে একটি অনুষ্ঠানও সম্প্রচারিত হয়েছিল।
ইন্টারন্যাশনাল বডিবিল্ডিং ফেডারেশন তাঁকে সারাজীবনের কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০১ সালে স্বর্ণপদকে ভূষিত করে।
২০০৫ সালের ২৯ জুন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কলকাতার একটি নার্সিংহোমে মনতোষ রায়ের মৃত্যু হয়।
মনতোষ রায়ের পুত্র মলয় রায়ও আটবার মিস্টার ইন্ডিয়া খেতাব জয় করেছেন এবং পেয়েছেন অর্জুন পুরস্কারের সম্মান। মনতোষ রায়ের মৃত্যুর পর মলয় রায়ই মাল্টিজিমটি পরিচালনা করেন। ২০২১ সালের ৩০ জুন উত্তর কলকাতার জগৎ মুখার্জী পার্কে মনতোষ রায়ের একটি মর্মর মূর্তি উন্মোচন করেন তৎকালীন রাজ্য পরিবহন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম এবং নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী ড. শশী পাঁজা।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান