ধর্ম

মারাং বুরু

মারাং বুরু

পূর্ব ভারতে বসবাসকারী একটি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী হল ‘সাঁওতাল’। মূলত ঝাড়খণ্ড রাজ্যেই এদের সর্বাধিক বসবাস হলেও আসাম, ত্রিপুরা, বিহার, উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গের বিশেষত পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম ইত্যাদি কিছু কিছু অঞ্চলে এদের বসবাস রয়েছে। মারাং বুরু এই সাঁওতাল গোষ্ঠীরই এক অন্যতম প্রধান দেবতা।         

সাঁওতালদের জীবনযাত্রার ধরন, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির মতোই তাদের ধর্মবিশ্বাসও তাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনার অন্তর্গত। তারা প্রধানত ‘সারনা’ বা ‘সারি’ ধর্মীয় দর্শন মেনে চলে। এরা মূলত প্রকৃতি পূজারী। কোনও মূর্তি বা প্রতীকের পূজায় এরা বিশ্বাসী নয়। প্রকৃতিকে তাদের নিজের জীবনের রূপ হিসেবে ধরে নিয়ে তারা প্রকৃতিকে শ্রদ্ধা করে, নাচ-গান করে পূজা করে। সাঁওতালদের মধ্যে মারাং বুরুকে শক্তির সর্বোচ্চ উৎস হিসেবে পূজা করা হয়। এর কোনও আকৃতি, মুখ বা প্রতিমা নেই। মারাং বুরু প্রকৃতির আকৃতিতেই পূজিত হন। তাঁকে ‘দেবতা’ বা ‘দেবী’ বলে মনে করা অর্থাৎ তিনি পুরুষ না স্ত্রী তা বিচার করা সম্পূর্ণ ভুল হবে। প্রকৃতপক্ষে, এই প্রকৃতিকেই ‘মারাং বুরু’ বলে মনে করা হয় যিনি তাদের সব কিছু দেন। বৃষ্টি, জল, বাতাস, জমি, বন, নদী সব কিছু যা যা এই প্রকৃতিতে রয়েছে এবং যা তারা তাদের জীবনে ব্যবহার করে, এই সব কিছুকেই তারা মারাং বুরু বলে ডাকে এবং পূজা করে।     


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

সাঁওতালি ভাষায় ‘মারাং’ শব্দের অর্থ ‘বৃহৎ’ বা ‘মহান এবং ‘বুরু’ শব্দের অর্থ ‘পর্বত। অর্থাৎ ‘মারাং বুরু’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল ‘মহান পর্বত’। সাঁওতালদের মত অনুসারে, মারাং বুরুর প্রকৃত নাম হল ‘লিতা’। সাঁওতালরা এই দেবতাকে তাদের একজন প্রকৃত বন্ধু বা সাহায্যকারী হিসেবে মনে করে যিনি জীবনের সব সমস্যায় তাদের পাশে থাকেন এবং তাদের আশীর্বাদ করেন। এই দেবতাকে নিয়ে সাঁওতালদের মধ্যে অনেক লোককথা প্রচলিত আছে। একটি কাহিনী অনুসারে, সৃষ্টির প্রথমে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে শুধুই জল ছিল। তখন জীবিত প্রাণী কিছুই ছিল না, চারিদিকে ছিল অকূল সমুদ্র। সেই সময় মারাং বুরু এবং আরো কয়েকজন দেবতা ঠিক করলেন যে, তাঁরা এই পৃথিবীতে মানুষ এবং আরো নানা রকম প্রাণী ও উদ্ভিদ সৃষ্টি করবেন। সেই মত মারাং বুরু একটি পুরুষ পাখি এবং মালান বুধি নামের আরেক দেবতা একটি স্ত্রী পাখির বেশ ধরলেন এবং সমুদ্রের মধ্যে উড়ে উড়ে বাসা বানানোর জন্য শুকনো জায়গার খোঁজ করতে লাগলেন। কিন্তু কোথাও মাটি না পাওয়ায় একটি কচ্ছপ তখন তার খোলসের উপরে তাঁদের বাসা বানানোর জায়গা দেয়। সেই কচ্ছপের পিঠের উপরে বাসা বানিয়ে স্ত্রী পাখিটি দুটি ডিম পাড়ে। কিছুদিন পর সেই ডিম থেকে একটি ছেলে ও একটি মেয়ের জন্ম হয়। ছেলেটির নাম হয় ‘পিলচু হাড়াম’ ও মেয়েটির নাম হয় ‘পিলচু বুধি’। ছেলে-মেয়ে দুটি আস্তে আস্তে বড় হয়। এই দুটি ছেলে মেয়ে থেকেই সাতটি ছেলে ও সাতটি মেয়ের জন্ম হয়। সাঁওতালরা মনে করে, এই চৌদ্দজন নারী ও পুরুষই ছিল সমগ্র সাঁওতাল জাতির পূর্বপুরুষ। উপকথা অনুযায়ী, একদিন পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুধির মধ্যে ভীষণ ঝগড়া হয়। এর ফলে তারা আর একসাথে থাকবে না বলে ঠিক করে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পিলচু হাড়াম সাত ছেলেকে নিয়ে এবং পিলচু বুধি সাত মেয়েকে নিয়ে আলাদা হয়ে যায়। এভাবেই দিন কাটতে থাকে। আস্তে আস্তে বড় হয়ে উঠতে থাকে তারা। পিলচু হাড়াম এবং তার সাত ছেলে অনেক বড় যোদ্ধা (মতান্তরে শিকারী) হয়ে ওঠে। একদিন বনের মধ্যে শিকার খুঁজতে খুঁজতে সাতজন ছেলে সাতটি মেয়েকে দেখতে পায়। মেয়েগুলির রূপে মুগ্ধ হয়ে তারা এক-একজন এক-একটি মেয়েকে বিয়ে করে নেয় এবং তাদের বাবার কাছে ফিরে না গিয়ে সেই বনের মধ্যেই সংসার পাতে। এদিকে পিলচু হাড়াম তার ছেলেদের দেখতে না পেয়ে চিন্তায় পড়ে যায়। ছেলেদের খুঁজতে খুঁজতে সেও এসে পড়ে সেই বনে। সেখানে এসে সে এক বৃদ্ধা মহিলাকে দেখতে পেয়ে তার কাছে আগুন চায়। বৃদ্ধাটি আগুন এনে দিলে পিলচু হাড়াম তাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তার সাথে কথা বলতে শুরু করে। কথা বলতে বলতেই মহিলাটি তার পরিচয় দেয়। এর পরেই পিলচু হাড়াম তার স্ত্রীকে চিনতে পারে এবং তার কাছে ক্ষমা চায়। তখন তার সাত ছেলেও তাদের স্ত্রীদের নিয়ে সেখানে আসে। এই ঘটনার পর থেকে সবাই একসাথে সেই বনেই থাকতে শুরু করে। সাঁওতালি লোককথা অনুযায়ী, এই সাত দম্পতি ও তাদের ছেলেমেয়েদের থেকেই সাঁওতাল জাতির সৃষ্টি হয়েছিল।     

এই লোককাহিনীটির একটি অন্য রূপও পাওয়া যায় যা মূল কাহিনী থেকে কিছুটা আলাদা। সেখানে বলা হয়েছে পিলচু বুধির স্বামী পিলচু হাড়াম মারাং বুরুর মানুষরূপ নন, অন্য কেউ। পিলচু হাড়ামের ছেলেদের সঙ্গে তার মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর মেয়েরা যখন স্বামীদেরকে কিছু না জানিয়ে চলে যায়, তখন পিলচু বুধি কান্নায় ভেঙে পড়ে। সে মারাং বুরুর কাছে প্রার্থনা জানায় তার স্বামীকে ও মেয়েদের ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। তার প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে মারাং বুরু পিলচু বুধির সামনে আসেন এবং তাকে সঙ্গে করে পিলচু হাড়াম ও তার ছেলে-বৌদের কাছে নিয়ে যান। পিলচু হাড়ামও তার স্ত্রীর কাছে ক্ষমা চায়। এদিকে তাদের সাত ছেলে যখন জানতে পারে যে তাদের স্ত্রীরা আর কেউ নয়, তাদেরই আপন বোন, তখন তারা ভীষণ রেগে যায় এবং নিজের বাবা ও মাকে হত্যা করতে যায়। পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুধিকে বাঁচানোর জন্য মারাং বুরু তাদের একটি পর্বতের গুহায় লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছেলেদের রাগ পড়ে যায় এবং তারা তাদের কৃতকর্মের জন্য বাবা-মায়ের কাছে ক্ষমাও চায়। সেই পর্বতের গুহাতেই তারা থাকতে শুরু করে। এরপর তাদের সন্তানরা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাদের থেকেই সাঁওতাল জাতির উৎপত্তি হয়।   

সাঁওতালদের গ্রামের মধ্যে শাল গাছের নিচে অবস্থিত ‘জাহের থান’ বা ‘পবিত্র স্থান’-এ মারাং বুরুর পুজো হয়। গ্রামের সকল পরিবারের পক্ষ থেকে গ্রামের প্রধান পুরোহিত মারাং বুরুর পুজো করেন। ‘ভিতরি’ পুজোর সময় প্রতিটি পরিবার মারাং বুরুকে নৈবেদ্য নিবেদন করে। নৈবেদ্য হিসেবে তাঁকে ‘চোলাই মদ’ দেওয়া হয়। সাঁওতালি লোককথা বলে, মারাং বুরু সাঁওতালদের চাল থেকে মদ তৈরি করা শিখিয়েছিলেন। মদ ছাড়াও মারাং বুরুর উদ্দেশ্যে সাদা মুরগি বা সাদা ছাগল বলি দেওয়া হয় ও সেই মাংস গ্রামবাসীরা সবাই মিলে ভাগ করে খায়। সাধারণত গ্রামের সব পরিবার একত্রিত হয়েই দেবতাদের উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য নিবেদন করে। কিন্তু মারাং বুরুই একমাত্র দেবতা, যিনি গ্রামের প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে আলাদা আলাদা ভাবে অর্ঘ্য গ্রহণ করেন। ফলে সাঁওতাল জনজীবনে, লোককথায়, উপকথায় মারাং বুরু যেন এক পরম শক্তির আধার হিসেবে মান্যতা পেয়ে আসছেন বহু বহু কাল ধরে। সেই ঐতিহ্য আজও অটুট।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

মনোরথ দ্বিতীয়া ব্রতকথা নিয়ে জানতে


মনোরথ দ্বিতীয়া

ছবিতে ক্লিক করুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন