সববাংলায়

ম্যাক্স মুলার

বিশ্ববিখ্যাত জার্মান ধর্মতত্ত্ববিদ, প্রাচ্যতত্ত্ববিশারদ এবং তুলনামূলক ভাষা-সাহিত্যের বিশিষ্ট গবেষক ম্যাক্স মুলার (Max Muller) সংস্কৃত ভাষার এক বিদগ্ধ পণ্ডিত হিসেবে খ্যাত। ঋগ্বেদ চর্চা করে তিনিই প্রথম জার্মান ভাষায় এর অনুবাদ প্রকাশ করেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি উপনিষদ চর্চা, ইংল্যাণ্ডে সংস্কৃত ভাষার প্রাচীন পুঁথির সন্ধান এবং ধর্ম বিষয়ে নানাবিধ বক্তব্য রেখেছেন ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে। বিভিন্ন ইউরোপীয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাকৃতিক ধর্ম, ইহজাগতিক ধর্ম, প্রত্নতাত্ত্বিক ধর্ম এবং মনস্তাত্ত্বিক ধর্ম বিষয়েও বক্তব্য রাখেন ম্যাক্স মুলার। ইমানুয়েল কান্টের দর্শনের দ্বারা তিনি যেমন প্রভাবিত হয়েছেন, তেমনি রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছেন মুলার। তাঁর স্মৃতিরক্ষার্থে ভারতের গ্যেটে ইন্সটিটিউটের নাম বদলে রাখা হয় ম্যাক্স মুলার ভবন। তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের পাশাপাশি ভারতীয় সংস্কৃতি ও ধর্ম দর্শন বিষয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন তিনি এবং তাঁর এই গবেষণার ফল হিসেবে এক সুবিশাল গ্রন্থ রচনা করেন মুলার ‘সিক্স সিস্টেমস্‌ অব ইণ্ডিয়ান ফিলোসফি’ নামে।

১৮২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত আন্‌হাল্ট রাজ্যের রাজধানী ডেসাউ শহরে ম্যাক্স মুলারের জন্ম হয়। তাঁর বাবা উইলহেম মুলার ছিলেন একজন বিশিষ্ট রোমান্টিক কবি ও গ্রন্থাগারিক এবং তাঁর মা এডেদলহেইড মুলার ছিলেন অ্যানহাল্ট-ডেসাউ শহরের মুখ্যমন্ত্রীর জ্যেষ্ঠা কন্যা। ম্যাক্স মুলারের বাবা উইলহেম মুলারের কবিতাগুলিকে নিয়ে এক অস্ট্রিয়ান সুরকার দু’টি গানের সুরারোপ করেছিলেন। তাঁর আসল নাম ছিল ফ্রেডরিক ম্যাক্স মুলার। এই ‘ফ্রেডরিক’ শব্দটি এসেছে তাঁর বড় মামার নাম থেকে। পরবর্তীকালে ১৮৫৯ সালে ম্যাক্স মুলার বিয়ে করেন জর্জিনা অ্যাডেলেইড গ্রেনফেলকে। তাঁদের চার সন্তান ছিল – অ্যাডা, মেরি, বিয়াত্রিচে এবং উইলিয়াম গ্রেনফেল।

ডেসাউ শহরে স্থানীয় গ্রামার স্কুলে প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় ম্যাক্স মুলারের। এই স্কুলগুলিকে তখন জার্মানিতে জিমন্যাসিয়াম বলা হত। ১৮২৯ সালে মাত্র ছয় বছর বয়সে বাবা মারা যাওয়ার পরে তাঁকে লিপজিগের নিকোলাই স্কুলে ভর্তি করা হয়। এই স্কুলেই শৈশবে ম্যাক্স মুলার সঙ্গীতশাস্ত্রে বিশেষ মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন। জনৈক শুভানুধ্যায়ীর পরামর্শে জীবিকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সঙ্গীতসাধনা পরিত্যাগ করেন। ১৮৩৬ সালে নিকোলাই স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে ১৮৪১ সালে লিপজিগ শহরে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ম্যাক্স মুলার। এরপর তিনি লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন বিভিন্ন প্রাচীন ইউরোপীয় ভাষা শিক্ষার উদ্দেশ্যে। গ্রিক, ল্যাটিন, আরবি, ফার্সি ইত্যাদি ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতও অধ্যয়ন করেন তিনি। ১৮৪৩ সালে লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন ম্যাক্স মুলার। ১৮৪৪ সালে ম্যাক্স মুলার বার্লিনে চলে আসেন আরও ভালভাবে সংস্কৃত শেখার জন্য। এখানে তিনি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবিশারদ অধ্যাপক ফ্রাঞ্জ বোপ্‌ ও দার্শনিক ফ্রেডরিক শিলিংয়ের কাছে যথাক্রমে সংস্কৃত এবং দর্শন অধ্যয়ন করেন। তিনি শিলিংয়ের জন্য উপনিষদ অনুবাদ করতে শুরু করেন, একই সঙ্গে চলতে থাকে তাঁর সংস্কৃত শিক্ষা। ফ্রাঞ্জ বোপের অধীনে তিনি ভারতীয় উপকথার একটি সংকলন ‘হিতোপদেশ’-এর জার্মান অনুবাদও করেন। ১৮৪৫ সালে তিনি প্যারিসে চলে যান ইউজিন বার্নফের কাছে সংস্কৃত শেখার জন্য। ইউজিনই তাঁকে উৎসাহ দেন সম্পূর্ণ ঋগ্বেদের অনুবাদ করে তা বই আকারে প্রকাশ করতে। এই পরামর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মুলার ১৮৪৬ সালে ইংল্যাণ্ডে সংস্কৃত পাণ্ডুলিপির খোঁজে চলে আসেন। সেই সময় পশ্চিমে এই উপনিষদের দর্শন সম্পর্কে বিশেষ পরিচিতি বা জ্ঞান কারওরই ছিল না। ঠিক এই সময়ই তাঁর ‘জার্মান লাভ’ নামে একটি উপন্যাস প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ঋগ্বেদে কথিত দেব-দেবীদের কথা গভীরভাবে পড়াশোনা করে মুলার বুঝতে পারেন আসলে এই দেব-দেবীরা প্রকৃতির অপ্রতিরোধ্য শক্তির প্রতীকবিশেষ। প্রখ্যাত সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত হোরেস হেম্যান উইলসনের চেষ্টায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃপক্ষ সায়নাচার্যের ভাষ্য সহযোগে ‘ঋগ্বেদ সংহিতা’র ম্যাক্স মুলার সম্পাদিত একখানি সংস্করণ প্রকাশ করে। এরপর থেকে পাকাপাকিভাবে ম্যাক্স মুলার অক্সফোর্ডেই থাকতে শুরু করেন। ১৮৪৯ সাল থেকে ১৮৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি ঋগ্বেদের উপর চর্চা করে এর সমালোচনা এবং দার্শনিক ব্যাখ্যা প্রস্তুত করেন।

১৮৫০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ইউরোপীয় ভাষাসমূহের ডেপুটি টেলরিয়ান অধ্যাপকের পদে নিযুক্ত হন। ১৮৫৪ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পূর্ণ সময়ের অধ্যাপনার কাজের পাশাপাশি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। ১৮৫৮ সালে অল সোলস কলেজে তাঁকে আজীবনের একটি বৃত্তি ও সদস্যপদ দেওয়া হয়। ১৮৫৯ সালে তাঁর ‘প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। ১৮৬৮ সালে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের প্রথম অধ্যাপক হিসেবে ম্যাক্স মুলার অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে শুরু করেন। এই বিভাগটি গড়ে উঠেছিল তাঁরই অনুপ্রেরণা ও উদ্যোগে। পরবর্তীকালে আইনসম্মতভাবে ১৮৭৫ সালে এই পদ থেকে অবসর গ্রহণ করলেও আমৃত্যু তিনি এই বিভাগের নানা কাজে ও গবেষণায় যুক্ত থেকেছেন। ১৮৮৮ সালে গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁকে জিফর্ড লেকচারার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে চার বছর ধরে বিভিন্ন ইউরোপীয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাকৃতিক ধর্ম, ইহজাগতিক ধর্ম, প্রত্নতাত্ত্বিক ধর্ম এবং মনস্তাত্ত্বিক ধর্ম বিষয়ে বক্তব্য রাখেন।

বহু ভাষার চর্চা করার সুবাদে ম্যাক্স মুলার যুক্তি সহকারে দেখান যে, ‘গড’ শব্দটি আসলে কোনো এক বিমূর্ত ধারণাকে বোঝায় আর তাঁর প্রতিফলন ঘটে মূর্ত কল্পনায়। ঠিক এই কারণেই তিনি প্রমাণ করে দেন যে বেদে বর্ণিত ‘দ্যেয়ুস’ আসলে জিউস, জুপিটার এদেরই প্রতিভূ এবং ব্যুৎপত্তিগতভাবে এরা সকলেই এক। পরবর্তীকালে দার্শনিক নীৎসে মুলারের মতো একইরকম ধারণা পোষণ করেছেন। ১৮৮১ সালে দার্শনিক কান্টের ‘ক্রিটিক অফ পিওর রিজন’ বইটির অনূদিত সংস্করণ প্রকাশ করেন মুলার। এই প্রসঙ্গে ইমানুয়েল কান্টের দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ডারউইন কথিত মানব বিবর্তনের তত্ত্বকে অস্বীকার করেন ম্যাক্স মুলার। ভাষা যে পশু এবং মানুষের মধ্যে ব্যবধান রচনা করে এই বক্তব্যের সমালোচনা করেন তিনি। মুলার উনবিংশ শতকের প্রখ্যাত ধর্মগুরু রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের চিন্তাধারার প্রতি ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট হন। ‘থেইস্টিক কোয়ার্টারলি রিভিউ’ পত্রিকায় ১৮৭৯ সালে প্রকাশিত ‘দ্য হিন্দু সেইন্ট’ শীর্ষক একটি রচনা থেকেই ম্যাক্স মুলার প্রথম দক্ষিণেশ্বরের রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সম্পর্কে জানতে পারেন। পরবর্তীকালে ১৮৯৮ সালে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের উপর একটি জীবনী গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। রামকৃষ্ণদেবের সুযোগ্য শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গেও তাঁর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল। স্বামীজির দ্বিতীয়বার ইংল্যাণ্ড ভ্রমণের সময় ম্যাক্স মুলারের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল।

তিনি তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও তুলনামূলক পুরাণ আলোচনার ক্ষেত্রে পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য হন। প্রাচ্যভাষা ও ভারতীয় দর্শনে তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল সুগভীর। ব্রিটেনের জাতীয় সঙ্গীতকে তিনিই সংস্কৃত ভাষায় পদ্যানুবাদ করেন প্রথম। তবে তাঁকে নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্কও কম নয়। তাঁর ধর্মবিষয়ক চারটি বক্তৃতাকে ঘিরে কেউ কেউ তাঁকে খ্রিস্টান-বিরোধী বলেও সমালোচনা করেছিলেন। ১৮৬১ থেকে ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত লন্ডনের র‌য়্যাল ইন্সটিটিউশনে ভাষাবিজ্ঞান ও তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব চর্চার ভিত্তি স্থাপনের অমর কীর্তির দাবিদার ম্যাক্স মুলার।

১৮৬৯ সালে ফরাসি ‘অ্যাকাডেমি ডেস ইন্সক্রিপশন্স এট বেলস-লেটারস’ সংস্থায় ফরেন করেসপণ্ডেন্টের স্বীকৃতি পান মুলার। ১৮৭৪ সালে তাঁকে ‘পুওর লি মেরিট’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ঠিক এর পরের বছর ১৮৭৫ সালে ‘বাভারিয়ান ম্যাক্সিমিলিয়ান অর্ডার ফর সায়েন্স অ্যাণ্ড আর্ট’-এর সম্মান দেওয়া হয় মুলারকে। ১৮৯৬ সালে প্রিভি কাউন্সিলের সদস্যপদ অর্জন করেন তিনি।

১৮৪৯ সালে প্রথম ম্যাক্স মুলার সম্পাদিত ঋগ্বেদের প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল এবং এর ষষ্ঠ তথা অন্তিম খণ্ড প্রকাশ পায় ১৮৭৩ সালে। ১৮৭৫ সালে একটি প্রাচ্যদেশীয় ধর্মপুস্তক ‘সেক্রেড বুক অব দি ইস্ট’-এর ইংরেজিতে অনুবাদ করেন মুলার। মোট ৫১টি খণ্ডে সমাপ্ত এই গ্রন্থমালার ৪৮টি খণ্ড ম্যাক্স মুলার জীবৎকালে প্রকাশ করে যেতে পেরেছিলেন। ১৮৯৪ সালে তাঁর ‘বেদান্ত দর্শন’ সম্পর্কে বক্তৃতাসমূহ বইয়ের আকারে প্রকাশিত হয়। সবশেষে উল্লেখ করতেই হয়, ‘সিক্স সিস্টেমস্‌ অব ইণ্ডিয়ান ফিলোসোফি’ নামে ম্যাক্স মুলার একটি সুবিশাল গ্রন্থ ১৮৯৮ সালে প্রকাশ করেন যা তাঁর খ্যাতির আরো একটি কারণ।

তাঁর মৃত্যুর পরে স্মৃতিরক্ষার্থে গ্যেটে ইন্সটিটিউটের নাম বদলে রাখা হয় ‘ম্যাক্স মুলার ভবন’। নতুন দিল্লিতেও একটি রাস্তার নামকরণ হয়েছে তাঁরই নামে।

১৯০০ সালের ২৮ অক্টোবর অক্সফোর্ডে নিজের বাড়িতেই ম্যাক্স মুলারের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading