সববাংলায়

এমআরআই ।। ম্যাগনেটিক রেসোনেন্স ইমেজিং ।। MRI Imaging

ম্যাগনেটিক রেসোনেন্স ইমেজিং বা সংক্ষেপে এমআরআই (MRI) এমন একটি অত্যাধুনিক মেডিকেল প্রযুক্তি যার সাহায্যে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গের হাই রেজল্যুশন ছবি তোলা হয়। মূলত চৌম্বক ক্ষেত্র এবং বেতার তরঙ্গ ব্যবহার ক’রে কম্পিউটারের  সাহায্যে চিকিৎসা সংক্রান্ত অনুসন্ধানের জন্য কোন অস্ত্রোপচার ছাড়াই সম্পূর্ণ বেদনাহীন এই প্রক্রিয়ায় শরীরের অভ্যন্তরের উচ্চ রেজল্যুশন ছবি তোলা হয়ে থাকে ।    

চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্তর্গত রেডিওলোজি (মূলত চৌম্বক ক্ষেত্র এবং বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে উচ্চ রেজল্যুশন ছবির মাধ্যমে শরীরের অভ্যন্তরীণ কোন সমস্যার অনুসন্ধান বা চিকিৎসা করা) বিভাগের একটি নবতম সংযোজন এই এমআরআই।  এমআরআই ছাড়াও রেডিওলজি বিভাগের অন্তর্ভুক্ত চিকিৎসা প্রক্রিয়াগুলি হল এক্স – রে, সিটি স্ক্যান, আল্ট্রাসাউন্ড ইত্যাদি।  প্রধানত শরীরের অভ্যন্তরীণ নরম অংশ যেমন – কোন অঙ্গ, পেশী এবং স্নায়ুর ছবি তুলতে এই এমআরআই প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়।  এছাড়াও অস্থি এবং অস্থিসন্ধির ছবি তুলতেও এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়।  

এমআরআই কাজ করে কীভাবে: এমআরআই প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করে আমাদের শরীরের কলা এবং পেশীতে থাকা হাইড্রোজেন পরমাণুগুলিকে সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয় প্রথমে।  এরপর বেতার তরঙ্গ ব্যবহারের মাধ্যমে হাইড্রোজেন পরমাণুর সেই সারিটিকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়। এর ফল স্বরূপ হাইড্রোজেন পরমাণু থেকে যে সিগন্যাল বেরোতে থাকে সেটিকে চিহ্নিত করাই এমআরআইয়ের কাজ।  এই সিগন্যালগুলিকে চিহ্নিত করার পর কম্পিউটারের সাহায্যে বিশ্লেষণ করে শরীরের অভ্যন্তরে থাকা কোন অঙ্গের অত্যন্ত বিশদ এবং পরিষ্কার ছবি তৈরি করা হয়।  এমআরআই যন্ত্রে একটি বিশাল আকারের চোঙের মত চুম্বক লাগানো থাকে যেটির কাজ হল চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করা।  এর সাথে থাকে একটি রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি কয়েল যার কাজ বেতার তরঙ্গ সৃষ্টি করা।  সঙ্গে একটি কম্পিউটার থাকে যেটির কাজ হল এই বেতার তরঙ্গ থেকে প্রাপ্ত সিগন্যালকে বিশ্লেষণ করা।  রোগীর শোয়ার জন্য একটি নিৰ্দিষ্ট শয্যার ব্যবস্থা থাকে এই যন্ত্রে যেটির মাধ্যমে রোগীকে এমআরআই যন্ত্রের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন কোণ থেকে ছবি তোলার জন্য।  

এমআরআই প্রযুক্তির ইতিহাস: এই এমআরআই প্রযুক্তির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় এই প্রক্রিয়ার সূচনা হয় ১৯৪৬ সালে যখন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই পদার্থবিদ ফেলিক্স ব্লচ এবং এডওয়ার্ড মিলস পুরসেল চৌম্বকীয় অনুরণন প্রক্রিয়াটি আবিষ্কার করেন। চৌম্বকীয় অনুরণন হল সেই প্রক্রিয়া যেখানে অতি প্রবল চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে পরমাণুগুলি সারিবদ্ধভাবে থাকতে পারে এবং যার ফল স্বরূপ তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণের শোষণ এবং নির্গমন দুইই চলতে থাকে। 

আশির দশকে স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক, স্টনি ব্রুক-এর গবেষকরা প্রথম ক্লিনিক্যাল এমআরআই স্ক্যানার তৈরি করেছিলেন, যা শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র এবং রেডিও তরঙ্গ ব্যবহারের মাধ্যমে মানবদেহের ছবি তৈরি তুলতে সক্ষম হয়েছিল। মানবদেহের প্রথম এমআরআই ছবি ১৯৭৭ সালে তৈরি হয় এবং ১৯৮০ সালে প্রথমবার পূর্ণাঙ্গ  মানব শরীরের জন্য এমআরআই স্ক্যানার তৈরি হয়। 

এরপর থেকে ক্রমে চুম্বক শক্তি, ছবির মান এবং ছবি বিশ্লেষণের প্রক্রিয়াগুলির উন্নতির সাথে এমআরআই প্রযুক্তির ক্রমশ উন্নতি হতে থাকে। বর্তমানে স্নায়ুবিদ্যা, কার্ডিওলজি, অঙ্কোলজি সহ চিকিৎসাক্ষেত্রের অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে এই এমআরআই ব্যবহার করা হয়ে থাকে।  

এমআরআইয়ের ব্যবহার: আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় শরীরের অভ্যন্তরীণ কোন অঙ্গের সমস্যা নির্ধারণে এমআরআই অত্যন্ত কার্যকরী একটি চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে দেখা দিয়েছে।  নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে সাধারণত এমআরআই ব্যবহার করা হয় – 

মস্তিষ্কের ছবি তোলার ক্ষেত্রে –  মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর ছবি কিংবা মস্তিষ্ক কীভাবে তার কাজ করে তা বোঝার জন্য এমআরআই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।  এছাড়া মস্তিষ্কের টিউমার, স্ট্রোক সহ বিভিন্ন স্নায়ুঘটিত সমস্যা নির্ধারণে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। 

মাস্কুলোস্কেলিটাল ছবি তোলার ক্ষেত্রে –  হাড়, অস্থিসন্ধি, বিভিন্ন কোষ ও কলা, টেন্ডন এবং লিগামেন্টের আঘাতের ক্ষেত্রে আঘাতের প্রভাব বুঝতে এই এমআরআই ব্যবহার হয়ে থাকে। 

কার্ডিওভাস্কুলার ছবি তোলার ক্ষেত্রে –  হৃদপিন্ডে কোন সমস্যা কিংবা হৃদপেশীর ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে এই প্রক্রিয়া ব্যবহার হয়।  

অ্যাবডোমিনাল এবং পেলভিক ছবি তোলার ক্ষেত্রে –  তলপেট মধ্যস্থ অঙ্গ কিডনি, লিভার এবং অগ্ন্যাশয়ের সমস্যা নির্ধারণ এবং তলপেটের টিউমারের অবস্থা বুঝতে এই প্রক্রিয়া ব্যবহার হয়ে থাকে।  .

শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সমস্যা নির্ধারণে অন্যান্য ইমেজিং প্রক্রিয়াগুলির তুলনায় এমআরআই ব্যবহার করার বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, এমআরআই আয়নাইজিং রেডিয়েশন ব্যবহার করে না।  এটি রোগীদের, বিশেষ করে শিশু এবং গর্ভবতী মহিলাদের জন্য নিরাপদ। দ্বিতীয়ত, এমআরআই শরীর মধ্যস্থ নরম টিস্যুগুলির অত্যন্ত বিশদ ছবি তুলতে পারে। এছাড়া এমআরআই ব্যবহার করে যেকোন কোণ থেকে শরীরের ত্রিমাত্রিক ছবি তোলা যায় যা অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করে।  

এমআরআইয়ের সীমাবদ্ধতা: এমআরআই ব্যবহারের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি সাধারণত সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। অনেক রোগী এই প্রক্রিয়া চলাকালীন ক্লাস্ট্রোফোবিয়া বা উদ্বেগ অনুভব করে যেহেতু অনেকক্ষণ ধরে প্রক্রিয়াটি চলে। যেসব রোগীর বুকে পেসমেকার বসানো আছে তাঁদের জন্য এম আর আই উপযুক্ত নয়।  

এমআরআই বর্তমানে রেডিওলজি বিভাগের একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য শক্তিশালী মাধ্যম।  এটি একটি নিরাপদ এবং অস্ত্রোপচারহীন পদ্ধতি যা শরীরের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর অত্যন্ত বিশদ ছবি  তুলতে পারে। এমআরআই-এর কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও, এটি চিকিৎসকদের জন্য একটি অত্যন্ত মূল্যবান হাতিয়ার হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। 


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading