ইতিহাস

মহম্মদ ইকবাল

মহম্মদ ইকবাল (Muhammad Iqbal) একজন পাকিস্তানী কবি তথা দার্শনিক যাঁর মননেই প্রথমবার জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের ভাবনা। “সাঁরে জাঁহাসে আচ্ছা হিন্দুস্তা হামারা” ভারতে জনপ্রিয় এই দেশাত্মবোধক গানটির সৃষ্টিকর্তা হিসাবে অমর থাকবেন মহম্মদ ইকবাল। তিনি আল্লামা ইকবাল নামেও সমধিক পরিচিত। তিনি একাধারে যেমন উর্দু কবি ছিলেন,তেমনই রাষ্ট্রতাত্ত্বিক হিসেবেও তিনি অবিভক্ত ভারতীয় রাজনৈতিক মহলে অত্যন্ত সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। পেশাগত ভাবে ব্যারিস্টার হলেও দার্শনিক হিসাবে তাঁর মতামত জনমানসে এক নতুন আলোড়ন তৈরী করেছিল।

১৮৭৭ সালের ৯ নভেম্বর অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের শিয়ালকোটে মহম্মদ ইকবালের জন্ম হয়। তাঁর পরিবার শুরুতে কাশ্মীরি ব্রাক্ষণ সম্প্রদায়ের হলেও পরবর্তীতে তাঁর পরিবার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। তাঁর দাদু ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবি ও স্বাধীনতা সংগ্রামী। তিনি ইকবালের জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তাঁর বাবা শেখ নূর মহম্মদ প্রথমে সরকারী চাকরিতে যুক্ত থাকলেও পরে তিনি নিজস্ব কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। ইকবালের বাবা মা দুজনেই ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলিম। সুফী মতবাদে বিশ্বাসী শেখ নূর মহম্মদ ও মা ইমাম বিবি ইসলাম নিবেদিত প্রাণ মুসলমান ছিলেন যার প্রভাব তাঁদের পাঁচ সন্তানের মধ্যেও পড়েছিল।১৮৯৫ সালে ১৮ বছর বয়সে ইকবালের প্রথম বিবাহ হয় করিম বিবির সাথে। তাঁদের তিনটি সন্তান হয়। ১৯১৬ সালে করিম বিবির সাথে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদের পর ইকবাল বিবাহ করেন মুখতার বেগমকে ১৯১৪ সালে। কিন্তু ১৯২৪ সালে মুখতার বেগমের এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু হয় এবং সেই পুত্রেরও মৃত্যু ঘটে। দ্বিতীয় স্ত্রীয়ের মৃত্যুর পর সরদার বেগমকে বিয়ে করেন ইকবাল এবং তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে হয়। কিন্তু তাঁর তৃতীয় স্ত্রীয়ের সাথে দাম্পত্য সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় রোগশয্যায় ইকবাল প্রথম স্ত্রীর শরণাপন্ন হন এবং মৃত্যু অবধি তাঁর কাছেই আশ্রয় নেন।

তৎকালীন সময়ে খ্রিস্টান মিশনারিরা শিয়ালকোটে শিক্ষা প্রচারের জন্য স্কটিশ মিশন স্কুল তৈরী শুরু করে। সেই স্কটিশ মিশন স্কুলেই ইকবালের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। ১৮৯৩ সালে তিনি এই স্কুল থেকেই ম্যাট্রিকুলেশন শেষ করেন এবং ১৮৯৫ সালে ঐ একই স্কুল থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি লাহোর সরকারী কলেজে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন এবং ওখান থেকে দর্শন, ইংরেজি ও আরবি সাহিত্যে স্বর্ণ পদক পেয়ে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। ১৮৯৯ সালে তিনি স্নাতকোত্তর পড়া শেষ করেন ঐ একই ইউনিভার্সিটি থেকে। লাহোর কলেজে পড়ার সময়ই তিনি টমাস আর্নল্ডের সংস্পর্শে আসেন। তিনিই ইকবালকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য। ১৯০৫ সালে ইকবাল লন্ডন যান আইন নিয়ে পড়াশোনা করার জন্য। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লিঙ্কনস্ ইনে তিনবছর পড়ার পরে ব্যারিস্টারি পাস করেন। এরপর ১৯০৮ সালে জার্মানীর মিউনিখের লুডভিগ ম্যাক্সমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে “The Development of Mataphysics in Persia” এই বিষয়ে গবেষণা করে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।

১৮৯৯ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করার পরে লাহোর গর্ভমেন্ট কলেজে দর্শন ও ইংরেজি সাহিত্যের জুনিয়র প্রফেসর হয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯০৮ সালে যখন ইকবাল দেশে ফিরে আসেন তখন তিনি আইনকেই তাঁর পেশা হিসেবে বেছে নেন এবং ওকালতি পেশায় তিনি বেশ সুনাম অর্জন করেন।

তিনি যখন লাহোর কলেজে পড়তেন তখন থেকেই তাঁর সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। ইকবালের কবি জীবন শুরু হয় উর্দু কবিতার মাধ্যমে। তাঁর কাব্য প্রতিভার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তাঁর শিক্ষক সৈয়দ মীর হাসান। তাঁর উৎসাহেই ইকবাল সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। ১৯০৪ সালে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় শিশুদের জন্য প্রথম তিনি একটি দেশাত্মবোধক কবিতা লেখেন “সারে জাঁহা সে আচ্ছা হিন্দুস্হা হামারা” নামে। পরে হিন্দিতে এই কবিতাটি ‘তারানা এ হিন্দি” তে প্রকাশিত হয়।

স্নাতকোত্তর শেষ করার আগেই তিনি সাহিত্য জগতের পরিচিত মুখ হয়ে যান। আইন নিয়ে তাঁর পেশাজীবন শুরু করলেও বেশীদিন সেই পেশায় তিনি নিযুক্ত থাকতে পারেননি।সাহিত্যের প্রতি অমোঘ আকর্ষণের কারণে তিনি ওকালতি ছেড়ে সাহিত্যে মনোনিবেশ করেন। তাঁর রচনাগুলি মূলত ফারসি এবং উর্দুতে লেখা। গদ্য ও পদ্য দুটি ক্ষেত্রেই ছিল ইকবালের সমান স্বাচ্ছন্দ্য। তিনি যেমন প্রেমের কবিতা লিখেছেন ঠিক তেমনই আবার অর্থনীতির মত জটিল ও নীরস বিষয়ের উপরেও রচনা করে গেছেন। অর্থনীতির উপরে তাঁর লেখা উর্দু ভাষার প্রথম বই ‘ইলমুল ইকতিসাদ’। ১৯১৫ সালে ইকবালের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আসরার – ই খুশী’ প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে সাড়া পড়ে যায় সর্বত্র। তাঁর এই কাব্যগ্রন্থ সমালোচিতও হয় ভীষণ। সুফী কবি হাফিজ শিরাজী তীব্র সমালোচনা করেন এই কাব্যগ্রন্থের। কিন্তু সমালোচনা ইকবালের কলমকে রুদ্ধ করতে অপারগ ছিল বরং তাঁকে সাহিত্যকীর্তিতে দুর্বার গতি প্রদানে সক্ষম হয়েছিল। এরপর একে একে তিনি রচনা করেন ‘পায়াম – ই মাশারিক’, ‘বাঙ্গ – ই দারা’, ‘যাবুর-ই-আজম’ যা তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ ফারসি কবিতা সংকলন। ইকবালকে অমর করেছে তাঁর দুটি রচনা ‘শিকওয়া ও জবাবে শিকওয়া’ এবং ‘আসরার ই খুদি’।

বৃটেনে ছাত্রাবস্হায় থাকাকালীনই তাঁর প্রথম রাজনীতির আঙিনায় পর্দাপন ঘটে। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি একজন রাজনীতিবিদও হয়ে ওঠেন। ১৯০৬ সালে অল ইন্ডিয়া মুসলীম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইকবাল সেই বছরই মুসলিম লীগে যোগদান করেন এবং ব্রিটিশ চ্যাপ্টারের এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্যপদ পান। ১৯২৬ সালে পাঞ্জাব বিধানসভার আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন। ১৯৩০ সালে তিনি মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

পৃথক পাকিস্তান রাষ্ট্রের কথা ইকবালই প্রথম বলেন ‘দ্য রিকনষ্ট্রাকশন ওব রিলিজিয়াস থট ইন ইসলাম’ গ্রন্থে। তিনি শ্রমিক, কৃষক সহ সমাজের খেটে খাওয়া মানুষদের নায্য পাওনার পক্ষে ছিলেন। তাঁর বিচারধারা কোরান থেকে অণুপ্রাণিত ছিল যা ইসলামিক পুনর্জাগরণ তৈরীতে সাহায্য করেছিল। তাঁর মতাদর্শের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন বহু মানুষ। তিনি মনে করতেন হিন্দু ও মুসলমানের সমান অধিকার থাকা উচিত সমাজের সব স্তরে। কিন্তু মুসলমানদের উন্নয়নের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের প্রয়োজনীতার কথা তিনি বিশেষভাবে প্রয়োজন বোধ করছেন। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন অবিভক্ত ভারতে মুসলমানদের অস্তিত্ব সঙ্কটে। নিজেদের অস্তিত্ব এবং মুসলমানদের সংস্কৃতি বজায় রাখার জন্য আলাদা মুসলিম রাষ্ট্রের কথা জোর দিয়ে বলছেন বার বার। তাঁর এই মতামতকে তিনি আফগানিস্তান, ইরানেও প্রচার করেন।

১৯৩০ সালে এলাহাবাদে মুসলীম লিগের সভায় ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি অবিভক্ত ভারতে যে সমস্ত জায়গায় মুসলীম সংখ্যাগরিষ্ঠতা বেশী সেইসব জায়গায় আলাদা মুসলীম রাষ্ট্রের প্রস্তাব রাখেন। হিন্দুত্বের চাপে ইসলাম ধর্ম অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন হতে পারে এই আশংকাও তিনি তাঁর বক্তব্যে প্রকাশ করেন। তাঁর এই মতবাদ ভারতীয় রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় যা মুসলমানদের পৃথক রাষ্ট্র গঠনে পরবর্তী কালে অণুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের আধ্যাত্মিক চেতনাকে জাগ্রত করার জন্য ইকবালকে ‘স্পিরিচুয়াল ফাদার অফ পাকিস্তান’ বলা হয়। ইকবাল খিলাফত আন্দোলনের সাথেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। মুসলমানদের অধিকার রক্ষার জন্য ‘জামিয়া মিলায়া ইসলামিয়া’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত তাঁর স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্ন পূরণ করেন তাঁর ভাবশিষ্য মহম্মদ আলী জিন্না।

১৯২২ সালে ব্রিটেনে রাজা পঞ্চম জর্জ তাঁকে ‘নাইট ব্যাচেলর’ উপাধিতে ভূষিত করেন তাঁর ফার্সি ভাষার দক্ষতার কারণে ও ফার্সি রচনার জন্য তিনি ইরানেও সমানভাবে সমাদৃত আজও। ইরানে তিনি “ইকবাল – ই – লাহোরী” নামে পরিচিত। তাঁর লেখা “সারে জাঁহা সে আচ্ছা” ভারতে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। পরবর্তীতে এই কবিতাটিতে পন্ডিত রবিশঙ্কর সুর প্রদান করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে এই গানটি কুচকাওয়াজ সঙ্গীত হিসেবে আজও ব্যবহৃত হয়।

মহম্মদ ইকবাল পাকিস্তানের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁর জন্মদিন পাকিস্তানে সরকারী ছুটির দিন হিসেবে ঘোষিত। পাকিস্তানের একটি বিমানবন্দর আল্লামা ইকবাল বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিত। ইকবালের বাড়ি এখনও শিয়ালকোটে অবস্থিত। যে বাড়ীতে ইকবাল বেশীরভাগ সময় কাটিয়েছেন এবং তাঁর মৃত্যু যে বাড়ী থেকে হয়েছে, তা এখন জাদুঘর এবং দর্শকদের কাছে উম্মুক্ত।

১৯৩৮ সালে ২১ এপ্রিল অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের লাহোরে এই মহান কবি, দার্শনিক, রাজনীতিবিদের মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।