বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে যেসব রাজনীতিবিদদের কথা উপেক্ষা করা যাবে না, তাঁদের মধ্যে একজন হলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ মনসুর আলী (Muhammad Mansur Ali)। প্রথমে মুসলীম লীগ তারপর আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে পদার্পণ করেন তিনি। ভাষা আন্দোলনের সময় প্রতিবাদ সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দারুণ ঘনিষ্ঠতা ছিল তাঁর। মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্থায়ী সরকার গঠনের একজন অন্যতম কারিগর ছিলেন এই মনসুর আলী। এমনকি সেনা প্রশিক্ষণ লাভ করে পাকিস্তান ন্যাশানাল গার্ডে ক্যাপ্টেন পদে অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি সকলের কাছে ‘ক্যাপ্টেন মনসুর’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। মুজিবুর রহমানের সময়তেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অল্প সময়ের জন্য। এছাড়াও প্রশাসনিক বিভিন্ন উচ্চপদ অলঙ্কৃত করেছিলেন মনসুর।
সাম্প্রতিক পোস্ট
১৯১৯ সালের ১৬ জানুয়ারি বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের অন্তর্গত রতনকান্দি ইউনিয়নের কুড়িপাড়া গ্রামে এক বাঙালি মুসলমান পরিবারে মুহাম্মদ মনসুর আলীর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম হরফ আলী সরকার (Haraf Ali Sarkar)।
প্রাথমিকভাবে মনসুর আলীর শিক্ষা শুরু হয়েছিল কাজীপুরের গান্ধাইল রতনকান্দি ইউনিয়ন আলী আহমেদ হাই স্কুল থেকে। সেখান থেকে চলে গিয়েছিলেন বিএল হাইস্কুলে। সেখান থেকে মাধ্যমিক স্তরের পড়াশুনা সমাপ্ত করে পাবনার গভর্নমেন্ট এডওয়ার্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছিলেন। বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষা সমাপ্ত হওয়ার পর উচ্চশিক্ষার জন্য মনসুর কলকাতায় যান এবং ভর্তি হন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে, যেটি বর্তমানে মৌলানা আজাদ কলেজ নামে পরিচিত। উল্লেখ্য যে, এই কলেজে পড়াকালীনই তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। এই কলেজ থেকে ১৯৪১ সালে বিএ পাশ করেন মনসুর৷ অবশ্য এখানেই তাঁর শিক্ষার দৌড় থেমে যায়নি৷ এরপর তিনি বিখ্যাত আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৪৫ সালে অর্থনীতি এবং আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এলএলবিতে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন তিনি।
আলিগড় থেকে দেশে ফিরে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে থাকেন মনসুর৷ এই সময় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবিতে গড়ে তোলা মুসলীম লীগের একজন সক্রিয় সদস্য হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত পাবনা জেলা মুসলিম লীগের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন মনসুর। এরই মধ্যে আবার ১৯৪৮ সালে যশোর সেনানিবাসে সেনাপ্রশিক্ষণ নেন এবং পিএলজি অর্থাৎ পাকিস্তান ল্যান্সারস গ্রুপের ক্যাপ্টেন পদে আসীন হন৷ সেই থেকে সকলের কাছে ‘ক্যাপ্টেন মনসুর’ নামেও পরিচিত হয়েছিলেন তিনি।
১৯৫১ সালে তিনি আইন অনুশীলন করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং প্রবেশ করেছিলেন পাবনা জেলা আদালতে৷ আইনজীবী সমিতির সভাপতিও নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি৷
এখানে বলে নেওয়া যাক, যে, রংপুর জেলার এক জজের মেয়ে বেগম আমিনাকে (Begum Amina) বিবাহ করেছিলেন মনসুর। আমিনা পাঁচ ছেলে এবং একটি মেয়ের জন্ম দিয়েছিলেন।
১৯৫১ সালেই যখন মনসুর আলী আইন চর্চায় রত, সেবছরই বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পদার্পণ করেন তিনি৷ খুব শীঘ্রই তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও পাবনা জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপরেই ১৯৫২ সালে দেশজুড়ে উর্দু ভাষার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলা ভাষার অধিকারের লড়াই শুরু হয়ে যায়। দেশের ছাত্র-যুব-তরুণের দল যেমন একজোট হয়ে ওঠে, তেমনি তাদের সঙ্গ দিতে এগিয়ে আসেন মধ্যবয়সী মননশীল মেধাসম্পন্ন মানুষের দলও৷ পাকিস্তান সরকারের উগ্র সেনাদের বিপক্ষে বাহান্ন সালের সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছে। এই সময়তেই উর্দুকে একমাত্র সরকারী ভাষা হিসাবে ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত করতে সহায়তা করার জন্য মনসুরকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল।
কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট জোটের প্রার্থী হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার সদস্য নির্বাচত হয়েছিলেন তিনি৷ এরপর ১৯৫৬ সালে আতাউর রহমানের নেতৃত্বে সংযুক্ত সরকারের মন্ত্রীসভায় আইন ও সংসদ বিষয়ক, খাদ্য ও কৃষি এবং বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি৷ আইয়ুব খানের অভ্যুত্থানের পর ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারি হলে তাঁকে নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত বন্দী রাখা হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এরপর ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন মনসুর আলী। এইসময় তিনি আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি করেছিলেন এবং সামরিক শাসনের বিরোধিতা করেছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মনসুর আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরমধ্যেই আবার দেশজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন বুকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তরুণ থেকে বর্ষীয়ান সকলেই। ১৯৭১ সালে এই স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে প্রবাসে সরকার গঠনের উদ্দেশ্য নিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান মনসুর৷ মুক্তিযুদ্ধের সময় সেই অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চের নির্বাচনে মনসুর পাবনা-১ আসন থেকে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর মনসুর প্রথমে যোগাযোগ মন্ত্রী এবং পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে একদলীয় রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর, মুজিব বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন এবং তাঁরই আমলে মনসুর আলী ১৯৭৫ সালের ১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন। মনসুর আলী বঙ্গবন্ধুকে বাকশাল অর্থাৎ বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ সংগঠনের কাজেও সাহায্য করেছিলেন এবং সেই দলের মহাসচিব পদটিও পেয়েছিলেন৷ বাকশাল সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও ১৫ আগস্ট মুজিবুর রহমানের হত্যার পর দলটি ভেঙে গিয়েছিল।
সামরিক বাহিনী ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের অনেককে হত্যা করেছিল। এই হত্যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এরপরে খন্দকার মোশতাক আহমেদের অভ্যুত্থান ঘটে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। মোশতাক আহমেদের পরিকল্পনা অনুযায়ীই মুজিবুরকে হত্যা করা হয়েছিল। এই হত্যাকান্ডের পরপরই মনসুর আলী আত্মগোপন করেছিলেন। মোশতাক আহমেদ মনসুর আলী-সহ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এএইচএম কামারুজ্জামান এবং তাজউদ্দীন আহমদের মতো আওয়ামী লীগের নেতাদের তাঁর সরকারে যোগদানের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে তাঁরা প্রত্যেকেই মোশতাক আহমেদের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে ১৯৭৫ সালের ২৩ আগস্ট সেনাবাহিনী লাগিয়ে তাঁদেরকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে আটকে রাখা হয়েছিল। মনসুর আলীরা আহমেদের সরকারকে সমর্থন করতে কোনোভাবেই রাজি হননি।
খন্দকার মোশতাক আহমেদের সরকারকে সমর্থন করতে অস্বীকার করায় মনসুর আলী এবং আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাদেরকে ১৯৭৫ সালেরই ৩ নভেম্বর মধ্যরাতে সেই ঢাকা সেন্ট্রাল জেলেই হত্যা করা হয়েছিল। মনসুর আলীর বয়স তখন ছিল ৫৬ বছর।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান