প্যারাঅলিম্পিক গেমসে ভারতকে প্রথম যিনি সোনা এনে দিয়েছিলেন তিনি হলেন মুরলীকান্ত পেটকার (Murlikant Petkar)। শুধু প্যারাঅলিম্পিক গেমস নয়, আরও বহু প্রতিযোগিতায় তিনি ভারতকে আন্তর্জাতিক স্তরে সম্মানিত করেছিলেন। একটি বিশ্বরেকর্ডও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। তাঁর জীবনকাহিনি নিয়ে বলিউডে একটি চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে যার নাম ‘চন্দু চ্যাম্পিয়ন’।
সাম্প্রতিক পোস্ট
১৯৪৪ সালের ১ নভেম্বর মহারাষ্ট্রের সাংলি অঞ্চলের ইসলামপুরে মুরলীকান্ত পেটকারের জন্ম হয়। তাঁর বাবা, মা বা স্ত্রীয়ের সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। তবে এটুকু জানা যায় যে তাঁর বাবা একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। মুরলীকান্তের ছেলের নাম অর্জুন মুরলীকান্ত পেটকর যিনি বর্তমানে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত। তিনি মাঝে মাঝে তাঁর বাবা ও পরিবার সম্পর্কে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন কথা ও ছবি ভাগ করে নেন। মুরলীকান্তের পুত্রবধূর নাম রাখি পেটকার।
মুরলীকান্ত পেটকারের শিক্ষা খুব বেশিদূর অগ্রসর হয়নি। নিজের গ্রামেই তিনি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন বলে জানা যায়। তারপর তিনি পুনে শহরে, তাঁর মাসির বাড়িতে চলে আসেন। তখন থেকে দিনের প্রায় অধিকাংশ সময় তিনি খেলার অনুশীলনের জন্য খরচ করতেন। ছোট থেকেই অ্যাথলেটিক্স, কুস্তি ও হকি ছিল তাঁর পছন্দের খেলা। একটি সাক্ষাৎকারে নিজের ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে মুরলীকান্ত বলেছিলেন নিজের গ্রামে কুস্তির প্রতিযোগিতায় তিনি অংশ নিতেন এবং একবার গ্রামের প্রধানের ছেলেকে হারিয়েছিলেন। তবে এই জয় তাঁর ক্ষেত্রে লাভদায়ী একেবারেই হয়নি, উলটে তিনি নিজের গ্রামে সমালোচিত ও চর্চিত হয়েছিলেন। এর ফলে কার্যত বাধ্য হয়েই সাংলি থেকে পুনেতে মাসির কাছে তাঁকে চলে আসতে হয়। এখানে এসে তাঁর কুস্তিপ্রীতি পরিবর্তিত হয় বক্সিংয়ে।
ছোট থেকেই মুরলীকান্ত পেটকারের মধ্যে খেলোয়াড়িসুলভ মনোভাব ভরপুর ছিল। তাই বক্সিংয়ের মতো এমন একটি খেলা যেখানে শারীরিক শক্তির পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তার প্রয়োজন রয়েছে, সেখানে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে তাঁর দ্বিধা হয়নি। বক্সিং রিংয়ে তাঁর প্রতিভা ক্রমশ প্রকাশ পেতে থাকে। এরপর তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স (EME)-এর কর্পস-এর কারিগর পদমর্যাদা বিভাগে (craftsman rank in the Corps) যোগ দেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর বয়েজ ব্যাটালিয়নে নিজের কর্মজীবন শুরু করেন তিনি।
ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় ১৯৬৪ সালে টোকিওতে আন্তর্জাতিক পরিষেবা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে বক্সিংয়ে অংশগ্রহণ করেন মুরলীকান্ত পেটকার। ওই প্রতিযোগিতাতেই তিনি সাঁতারে চারটি পদক অর্জন করেন। জাপান থেকে ফেরার পর তাঁকে তেলেঙ্গানার সেকেন্দ্রাবাদে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে ভারতের হয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিযোগিতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকেন মুরলীকান্ত। এরপর তাঁর পোস্টিং হয় জম্মু ও কাশ্মীরে।
১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় তিনি শ্রীনগরে ভারতীয় সেনার ক্যাম্পে ছিলেন। মুরলীকান্তের বক্তব্য থেকে জানা যায়, দুর্ঘটনা ঘটেছিল সেপ্টেম্বর মাসের এক বিকেলে। সেদিন যখন সাইরেন বাজে তখন তিনি সেনা ক্যাম্পে ঘুমাচ্ছিলেন। সাইরেন শুনে বেরিয়ে এসে দেখেন পাকিস্তানি সেনারা আক্রমণ করেছে এবং ভারতও পালটা জবাব দিতে শুরু করেছে। মুরলীকান্ত তখন যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষিত ছিলেন না। সেই যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর জখম হন তিনি। যুদ্ধের সময় মোট ৯টি গুলি খেয়েছিলেন মুরলীকান্ত যার মধ্যে ৮টি অস্ত্রপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়। কিন্তু একটি গুলি তাঁর মেরুদণ্ডের গভীরে প্রবেশ করে যা অস্ত্রপচারের মাধ্যমেও বের করা যায়নি।
চিকিৎসায় তাঁর জীবন রক্ষা পেলেও মেরুদণ্ডে আঘাতের কারণে মুরলীকান্ত পেটকার শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন। কোমরের নিচ থেকে দেহের নিম্নাংশ অক্ষম হয়ে পড়ে তাঁর। মুরলীকান্তকে প্রথমে দিল্লির একটি হাসপাতালে ও পরে বম্বেতে অবস্থিত ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি হাসপাতাল আইএনএইচএস (INHS) অশ্বিনীতে ভর্তি করা হয়। শারীরিকভাবে অক্ষম হওয়ার আগে মুরলীকান্ত ছিলেন একজন জাঁদরেল বক্সার এবং তিনি মূলত সেকেন্দ্রাবাদের EME-র (Electronics and Mechanical Engineers) হয়ে খেলতেন। কিন্তু তার পর থেকে বক্সিং তাঁর জীবন থেকে বিদায় নেয়। একদিকে স্বপ্নের খেলা তাঁর জীবন থেকে চলে যাওয়া অন্যদিকে শারীরিক অক্ষমতা, দুইয়ের মিশেলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন মুরলীকান্ত। ১৯৬৭ সালে আইএনএইচএস অশ্বিনী নৌ হাসপাতালে অ্যালকোহলের সঙ্গে ৩০টি ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। শুধু তাই নয়, ১৯৬৫ সালে শারীরিক আঘাতের পর থেকে তিনি তখন প্রথমবার প্রস্রাবের অনুভূতি পেয়েছিলেন। জীবন নতুন করে শুরু করার উৎসাহ পান মুরলীকান্ত।
মুম্বাইয়ের আইএনএইচএস অশ্বিনী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময়ই ফিজিওথেরাপিস্ট তাঁকে সাঁতার কাটার পরামর্শ দিয়েছিলেন কারণ তাঁর পা ছিল অসাড়। পরামর্শ অনুযায়ী তিনি কাছের একটি পুলে সাঁতার কাটা শুরু করেন যেখানে ভারতীয় নৌসেনার একটি দল জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সেখান থেকেই মুরলীকান্তের জীবনের মোড় ঘুরে যায়। দীর্ঘ অনুশীলন ও নিরলস অধ্যাবসায় তাঁকে সেই সব ক্রীড়াতেও অপ্রতিরোধ্য করে তোলে।
১৯৬৭ সালে মহারাষ্ট্র রাজ্য অ্যাথলেটিক মিটে, মুরলীকান্ত পেটকার শট-পুট, জ্যাভলিন থ্রো, ডিসকাস থ্রো, ভারোত্তোলন, টেবিল টেনিস এবং তীরন্দাজিতে রাজ্য চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন। ১৯৬৮ সালে তিনি গ্রীষ্মকালীন প্যারালিম্পিকে টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন এবং প্রথম রাউন্ডে উত্তীর্ণ হন। এরপর ১৯৬৯ সালে তিনি ইংল্যান্ডে স্টোক ম্যান্ডেভিল আন্তর্জাতিক প্যারাপ্লেজিক মিটে সাঁতারে অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁর জীবনের প্রথম স্বর্ণপদক পান। ১৯৭০ সালে তিনি স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গে অনুষ্ঠিত তৃতীয় কমনওয়েলথ প্যারাপ্লেজিক গেমসে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। এই প্রতিযোগিতায় তিনটি আন্তর্জাতিক পদক অর্জন করেন মুরলীকান্ত। একটি ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইল সাঁতারে একটি স্বর্ণপদক, জ্যাভলিন থ্রোতে একটি রৌপ্য পদক এবং শট-পুটে একটি ব্রোঞ্জ পদক। ১৯৭১ সালে তিনি সাঁতারে ফের একটি স্বর্ণপদক জেতেন। এরপর ১৯৭২ সালে জার্মানির হাইডেলবার্গে গ্রীষ্মকালীন প্যারালিম্পিকে তিনি ফের অংশ নেন এবং ব্যক্তিগত স্বর্ণপদক জেতেন। তিনি ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইল সাঁতার ইভেন্টে ৩৭.৩৩ সেকেন্ড সময় নিয়ে মুরলীকান্ত বিশ্ব রেকর্ড গড়েন। একই খেলায় তিনি জ্যাভলিন, প্রিসিশন জ্যাভলিন থ্রো এবং স্ল্যালমে অংশগ্রহণ করেন এবং তিনটি ইভেন্টেই তিনি ফাইনাল রাউন্ড পর্যন্ত পৌঁছন।
১৯৭২ সালেই মুরলীকান্ত পুনের TELCO-তে যোগ দেন এবং সেখনে কোম্পানির জনসংযোগ বিভাগে সিনিয়র সহকারী পদে প্রায় তিন দশক ধরে কাজ করেন। ১৯৮২ সালে হংকংয়ে আন্তর্জাতিক FESPIC গেমসে তিনি ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইল সাঁতারে বিশ্ব রেকর্ড গড়েন এবং নিজের মুকুটে আরও একটি পালক যোগ করেন। ওই বছর মুরলীকান্তকে অর্জুন পুরস্কার দেওয়ার দাবি ওঠে কিন্তু শোনা যায় ভারত সরকারের তরফে সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয় যার ফলে ভেঙে পড়েছিলেন মুরলীকান্ত।
১৯৭১ সালে পুনের কৃত্রিম অঙ্গ কেন্দ্রের তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মানেকশ কর্তৃক শ্রেষ্ঠ সাঁতারু হিসেবে শিল্ড পান তিনি। ১৯৭২ সালে ৫০ মিটার ফ্রিস্টাইল সাঁতারে ৩৭.৩৩ সেকেন্ড সময় নিয়ে বিশ্ব রেকর্ড স্থাপনের কৃতিত্ব তো তাঁর রয়েইছে। এরপর ১৯৭৩ সালে পুনের তৎকালীন মেয়র এন. বি. লিমায়ে তাঁকে গৌরব পদক দেন। টানা পাঁচ বছর (১৯৬৯-৭৩) জেনারেল চ্যাম্পিয়নশিপ কাপ জেতেন মুরলীকান্ত। ১৯৭৫ সালে পুনে জেসিস কর্তৃক অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য তিনি পান বিশেষ পুরস্কার এবং ওই বছরই মহারাষ্ট্র সরকার তাঁকে শিব ছত্রপতি পুরস্কার (এটি ছিল ভারতে কোনও প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদকে দেওয়া প্রথম পুরস্কার) দেয়। টানা ৭ বছর (১৯৬৮-৭৬) জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য অল ইন্ডিয়া মেয়র কাউন্সিলের সভাপতি মি. থোরাট ১৯৭৬ সালে তাঁকে পুনেতে সম্মানিত করেন। ১৯৭৯ সালের ৫ এপ্রিল তিনি শ্রী বিজয় মার্চেন্ট কর্তৃক ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান পুরস্কার লাভ করেন। পুনের তৎকালীন মেয়র অসাধারণ ক্রীড়াবিদ পুরস্কার তাঁকে ১৯৮১ সালে প্রদান করেন। ২০১৮ সালে কর্পস অফ ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স (EME) কর্তৃক সম্মানিত হন তিনি। ওই বছরই ২০ মার্চ ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে সম্মানিত করে। ২০২৪ সালে অর্জুন পুরস্কারের জন্য তাঁকে নির্বাচিত করা হয় এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি এই পুরস্কার পান।
বিভিন্ন লেখক তাঁদের বইয়ে মুরলীকান্ত পেটকরের জীবনের নানা বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল অপর্ণা জৈনের ‘বয়েজ উইল বি বয়েজ’ (Boys Will Be Boys), মেদিনী শর্মা ও সঞ্জয় শর্মার ‘কারেজ বিয়ন্ড কম্পেয়র’ (Courage Beyond Compare), শারদা গায়কোয়াড়ের ‘প্রবাস ভাদালি দিব্যঞ্চা’ (Pravas Vadali Divyancha), নন্দন কামাথ ও অপর্ণা রবিচন্দ্রনের ‘গো ইন্ডিয়া’স স্পোর্টিং ট্রান্সফরমেশন’ (Go India’s Sporting Transformation) এবং বিনয় জয়সওয়ালের লেখা ‘সংকল্প সে সিদ্ধি তক’ (Sankalp Se Siddhi Tak)। মুরলাকীন্তের জীবন নিয়ে বলিউডে একটি সিনেমাও তৈরি হয়েছে যার নাম ‘চন্দু চ্যাম্পিয়ন’ (Chandu Champion)। ২০২৪ সালে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছেন কার্তিক আরিয়ান। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন কবীর খান এবং প্রযোজনা করেছিলেন সাজিদ নাদিয়াদওয়ালা।
বর্তমানে নিজের কর্মজীবন ও খেলোয়াড় জীবন থেকে অবসর নিয়েছেন মুরলীকান্ত পেটকর। প্যারাঅলিম্পিক জয়ী এই খেলোয়াড় এখন তাঁর ছেলে ও পুত্রবধূর সঙ্গে মহারাষ্ট্রের পুনে শহরে থাকেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান