সনাতন হিন্দু ধর্মে মা দুর্গা মহিষাসুরমর্দিনী, সর্বপাপহারিণী ও আনন্দস্বরূপিনী। মহিষাসুরমর্দিনীরূপেই তাঁকে আমরা সবচেয়ে বেশি চিনি, কিন্তু দেবী দুর্গার রয়েছে বহু বৈচিত্র্যময় রূপ। যেমন দশমহাবিদ্যা, তেমনই দেবীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রূপমালা হল নবদুর্গা। নবদুর্গা বলতে দুর্গার নয়টি ভিন্ন রূপকে বোঝানো হয়। বসন্ত এবং শরৎকালে নবরাত্রিতে দেবীর এই নয় রূপের পূজা করা হয়। শ্রী শ্রী চণ্ডীর দেবীকবচ অধ্যায়ে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্লোকে ব্রহ্মা মার্কণ্ডেয় মুনিকে দেবীর এই নয়টি রূপের কথা বলেছেন, যা এখানে সরাসরি উল্লেখ করা হল –
প্রথমং শৈলপুত্রী চ দ্বিতীয়ং ব্রহ্মচারিণী ।
তৃতীয়ং চন্দ্রঘণ্টেতি কূষ্মাণ্ডেতি চতুর্থকম্ ।।
পঞ্চমং স্কন্দমাতেতি ষষ্ঠং কাত্যায়নী তথা ।
সপ্তমং কালরাত্রীতি মহাগৌরীতি চাষ্টমম্ ।।
নবমং সিদ্ধিদাত্রী চ নবদুর্গাঃ প্রকীর্তিতাঃ ।
উক্তান্যেতানি নামানি ব্রহ্মণৈব মহাত্মনা।।
উপরোক্ত শ্লোকে দেবীর নয়টি রূপের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং সেগুলো হল যথাক্রমে শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, চন্দ্রঘন্টা, কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী এবং সিদ্ধিদাত্রী। এবারে প্রতিটি রূপের বিস্তারিত কথা জানা যাক।
শৈলপুত্রী
নবদুর্গার প্রথম রূপ হলেন শৈলপুত্রী, যিনি গিরিরাজ হিমালয়ের কন্যা এবং পার্বতী নামেও খ্যাত। হিমালয়ের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী হিমালয়ের কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করেন। শৈল বা পর্বতের কন্যা হওয়ায় তাঁর নাম হয় শৈলপুত্রী বা পার্বতী। সতী রূপে দেহত্যাগের পর তিনি হিমালয়ের গৃহে জন্ম নিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গেই বিবাহ হয়েছিল শিবের। গৌরবর্ণা এই দেবীর বাহন একটি সাদা ষাঁড়। তাঁর ডান হাতে তিনি ত্রিশূল ধারণ করেন আর বাম হাতে থাকে পদ্ম। নবরাত্রির প্রথম দিনে শৈলপুত্রীর পূজা করা হয়। তিনি সংসারে স্থিতি, ধৈর্য এবং গৃহস্থ জীবনের সমৃদ্ধি প্রদান করেন।
ব্রহ্মচারিণী
নবদুর্গার দ্বিতীয় রূপ হলেন ব্রহ্মচারিণী, যিনি দেবী পার্বতীর এক যোগিনী রূপ। শিবকে স্বামী রূপে পাওয়ার জন্যে কঠোর সাধনায় রত হয়েছিলেন। নারদমুনির পরামর্শে দেবী এই ব্রহ্মচারিণীর বেশে অনন্ত তপস্যা করে শিবকে তুষ্ট করার চেষ্টা করেন। পুরাণ মতে, দীর্ঘ কয়েক হাজার বছর তিনি নামমাত্র ফলমূল খেয়ে জীবন ধারণ করেছিলেন, এমনকি পরে একেবারেই খাওয়াদাওয়া ত্যাগ করেন। গাছের পাতা পর্যন্ত না খাওয়ার কারণে তাঁকে অপর্ণা নামেও ডাকা হয়। অবশেষে ব্রহ্মার বরেই দেবী শিবকে পতিরূপে লাভ করেন। ব্রহ্মচারিণীর রূপ সরল ও তপস্বিনী। তাঁর দুই হাতের একটিতে কমণ্ডলু এবং অন্যটিতে জপমালা বা ফুল থাকে। তাঁর গলায় শুকনো রুদ্রাক্ষের মালা শোভিত থাকে। নবরাত্রির দ্বিতীয় দিনে ব্রহ্মচারিণীর পূজা করা হয়। তিনি ভক্তদের অধ্যবসায়, জ্ঞান এবং অটল ভক্তি দান করেন।
চন্দ্রঘন্টা
নবদুর্গার তৃতীয় রূপ হলেন দেবী চন্দ্রঘণ্টা, যিনি সিংহবাহিনী এবং দশভুজা রূপে পূজিতা। একটি কাহিনী অনুসারে, শিব-পার্বতীর বিবাহের সময় তারকাসুর তাঁর বাহিনী নিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান পণ্ড করার চেষ্টা করলে দেবী চন্দ্রঘণ্টা রূপে আবির্ভূতা হয়ে তারকাসুরের বাহিনীকে তাড়িয়ে দেন। অন্য একটি কাহিনী অনুসারে, শিব তাঁর বিয়ের দিনে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে ভূতপ্রেতসহ পার্বতীর বাড়িতে গেলে পার্বতীর মা মেনকা শিবের এই রূপ দেখে অজ্ঞান হয়ে যান। তখন দেবী পার্বতী, চন্দ্রঘণ্টার রূপ ধারণ করেন এবং দেবীর এই রূপ দেখে শিব তাঁর ভয়ঙ্কর রূপ ত্যাগ করেন। তাঁর দশ হাতের আটটি হাতে ধনুর্বাণ, গদা, ত্রিশূল, পদ্ম, জপমালা প্রভৃতি অস্ত্র সজ্জিত থাকে, আর বাকি দুটি হাতে তিনি বরমুদ্রা ও অভয়মুদ্রা প্রদর্শন করেন। এই রূপে দেবী চন্দ্রঘণ্টা ভক্তদের আশীর্বাদ প্রদান করেন এবং অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটান। নবরাত্রির তৃতীয় দিনে দেবী চন্দ্রঘণ্টার পূজা করা হয়। তিনি সাহস, বীরত্ব ও যুদ্ধশক্তির প্রতীক। ভক্তদের জীবনে শত্রুভয়, দুঃখকষ্ট ও অশুভ শক্তি দূর করে শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রদান করেন।
কুষ্মাণ্ডা
নবদুর্গার চতুর্থ রূপ হলেন দেবী কুষ্মাণ্ডা, যিনি ত্রিনেত্রা ও অষ্টভুজা রূপে পূজিতা। শিবের সঙ্গে বিবাহের পরে দেবী পার্বতী উপলব্ধি করেন যে তিনি নিজেই মহাশক্তিস্বরূপা। এই রূপে তিনি সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডকে নিজের মধ্যে ধারণ করেন। কথিত আছে যে মহাশূন্য যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল, তখন দেবী কুষ্মাণ্ডার থেকেই বিশ্বসৃষ্টির সূচনা হয়। দেবীর ডান দিকের চারটি হাতে রয়েছে পদ্ম, বাণ, ধনুক ও কমণ্ডলু এবং বাঁ দিকের চারটি হাতে রয়েছে চক্র, গদা, অমৃতপূর্ণ ঘট ও জপমালা। নবরাত্রির চতুর্থ দিনে দেবী কুষ্মাণ্ডার পূজা করা হয়। তিনি জগৎ-সৃষ্টির প্রতীক এবং ভক্তদের সুস্বাস্থ্য, দীপ্তি ও শক্তি প্রদান করেন। তাঁর আরাধনায় জীবনের অন্ধকার দূর হয়ে আলো ও উজ্জ্বলতা নেমে আসে।
স্কন্দমাতা
নবদুর্গার পঞ্চম রূপ হলেন স্কন্দমাতা, যিনি কার্তিকের মাতা রূপে পূজিতা। কার্তিকের অপর নাম স্কন্দ এবং তাঁর মাতা হিসাবেই দেবীর নাম হয়েছে স্কন্দমাতা। তাই দেবী স্কন্দমাতার মূর্তি বা ছবিতে শিশু কার্তিককে লক্ষ করা যায়। তবে দেবীর কোলে কার্তিকের যে রূপ দেখা যায়, তা বাংলায় পূজিত কার্তিকের রূপ থেকে আলাদা। এর কারণ দেবীর কোলে বসে থাকা কার্তিকের মূর্তিটি ষড়ানন। এই রূপের মধ্য দিয়ে দেবীর মাতৃভাবের প্রকাশ ঘটে। দেবী স্কন্দমাতা সিংহবাহিনী এবং চতুর্ভুজা। এক হাতে তিনি কার্তিককে ধরে রাখেন, এক হাতে আশীর্বাদ প্রদর্শন করে থাকেন এবং বাকি দুই হাতে পদ্মফুল থাকে। নবরাত্রির পঞ্চম দিনে দেবী স্কন্দমাতার পূজা করা হয়। তিনি ভক্তদের মাতৃত্ব, সন্তানের মঙ্গল এবং পারিবারিক সুখ প্রদান করেন।
কাত্যায়নী
নবদুর্গার ষষ্ঠ রূপ হলেন দেবী কাত্যায়নী, যিনি পার্বতীর মহাশক্তিরই অংশ। মহিষাসুর বধের উদ্দেশ্যে দেবতারা যখন মহামায়ার শরণাপন্ন হয়েছিলেন, তখন দেবী, ঋষি কাত্যায়নের আশ্রমে আবির্ভূতা হয়েছিলেন। কাত্যায়ন তাঁকে কন্যারূপে গ্রহণ করেছিলেন বলে দেবীর নাম কাত্যায়নী। অন্যমতে তিনি ঋষি কাত্যায়নের ঘরেই জন্মেছিলেন বলেই তাঁর এরূপ নাম। মহিষাসুর বধের জন্য তিনি অষ্টাদশভূজা রূপে আবির্ভূতা হয়েছিলেন, যেখানে তাঁর প্রতিটি হাতে বিভিন্ন দেবতার থেকে প্রাপ্ত অস্ত্র থাকে। কিন্তু নবদুর্গার ষষ্ঠ রূপের দেবী কাত্যায়নীকে চতুর্ভুজারূপে কল্পনা করা হয়। তিনি ডানদিকের দুই হাতে অভয় মুদ্রা প্রদর্শন করেন এবং তাঁর বাঁদিকের দুই হাতের এক হাতে পদ্ম এবং অন্য হাতে তরবারি রয়েছে। দেবী সিংহবাহিনী। নবরাত্রির ষষ্ঠ দিনে দেবী কাত্যায়নীর পূজা করা হয়। তিনি ভক্তদের জীবনে শত্রুভয় ও অশুভ শক্তি দূর করে সমৃদ্ধি প্রদান করেন।
কালরাত্রি
নবদুর্গার সপ্তম রূপ হলেন দেবী কালরাত্রি, যিনি ভয়ঙ্কর এবং উগ্র রূপে পূজিতা। তিনি কৃষ্ণবর্ণা, এলোকেশী, ত্রিনয়নী এবং চতুর্ভুজা। তাঁর নিঃশ্বাস থেকে অগ্নিশিখা নির্গত হয় এবং সারা শরীর ঝলমলে দীপ্তিতে ভরা। দেবী চতুর্ভুজা, যার ডান দিকের দুই হাতে তিনি বরাভয় ও অভয়মুদ্রা প্রদর্শন করে থাকেন এবং তাঁর বাঁদিকের দুই হাতে রয়েছে খড়গ ও লোহার কাঁটা। গাধার পিঠে চেপে গলায় বজ্রের মালা পড়ে ধ্বংসের দেবী হিসেবে আবির্ভূতা হন দেবী কালরাত্রি। তাঁর ভয়ঙ্কর রূপ দেখে শত্রুরা আতঙ্কিত হলেও ভক্তদের কাছে তিনি শুভফলের দেবী। তাই তাঁর আরেক নাম শুভঙ্করী। নবরাত্রির সপ্তম দিনে দেবী কালরাত্রির পূজা করা হয়। তিনি অশুভ শক্তির বিনাশিনী এবং ভক্তদের জীবনের ভয়, দুঃখ ও দুর্গতি দূর করে কল্যাণ, সাহস ও আত্মশক্তি দান করেন।
মহাগৌরী
নবদুর্গার অষ্টম রূপ হলেন দেবী মহাগৌরী। তাঁর রূপ শুভ্রবর্ণা এবং তাঁর মূর্তি অতি স্নিগ্ধ। মহিষাসুর বধের সময় দেবীর দেহ মলিন হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে তপস্যা করে স্নান করার পর তিনি অপূর্ব গৌরবর্ণা রূপ ধারণ করেন, যা থেকে তাঁর নামকরণ হয় মহাগৌরী। দেবী চতুর্ভুজা, যার দুটি হাতে রয়েছে ত্রিশূল ও ডমরু, আর বাকি দুটি হাতে তিনি বরমুদ্রা ও অভয়মুদ্রা প্রদর্শন করে থাকেন। তাঁর বাহন সাদা ষাঁড়। তিনি সর্বদা শুভ্র বস্ত্র ও অলঙ্কারে সজ্জিতা। নবরাত্রির অষ্টম দিনে দেবী মহাগৌরীর পূজা করা হয়। তিনি পবিত্রতা, শান্তি, সৌন্দর্য ও কল্যাণের প্রতীক। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, তাঁর আরাধনায় পাপক্ষয় হয় এবং ভক্তের জীবনে সুখ, সমৃদ্ধি ও মুক্তি আসে।
সিদ্ধিদাত্রী
নবদুর্গার নবম ও শেষ রূপ হলেন সিদ্ধিদাত্রী। সিদ্ধিদাত্রী শব্দের অর্থ যিনি সিদ্ধি প্রদান করেন। তিনি ভক্তদের অষ্টসিদ্ধি (অণিমা, মহিমা, গরিমা, লঘিমা, প্রাপ্তি, প্রাকাম্য, ঈশিত্ব ও বশিত্ব) দান করেন। দেবতারা, ঋষিরা, গন্ধর্ব-যক্ষ-অসুররাও তাঁর কাছে সিদ্ধিলাভের জন্য প্রার্থনা করেছেন। কথিত আছে শিব নিজেও সিদ্ধিদাত্রী দেবীর উপাসনা করেছিলেন এবং তাঁর কৃপায় সিদ্ধিলাভ করে অর্ধনারীশ্বর রূপ ধারণ করেন। দেবী পদ্মাসনে আসীনা এবং চতুর্ভুজা। তাঁর চারহাতে রয়েছে শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম। নবরাত্রির নবম দিনে দেবী সিদ্ধিদাত্রীর পূজা করা হয়। তিনি ভক্তদের মুক্তি, জ্ঞান, ভক্তি ও সিদ্ধি দান করেন।
শৈলপুত্রী থেকে সিদ্ধিদাত্রী, দেবীর প্রতিটি রূপ ভক্তদেরকে আলাদা আলাদা শিক্ষা দেয়। কোথাও মাতৃত্ব, কোথাও তপস্যা, কোথাও ভয়ংকর রূপে অশুভ শক্তির বিনাশ আবার কোথাও শান্ত, জ্ঞানময় রূপে মুক্তির পথ দেখানো—সব মিলিয়ে দেবী দুর্গা আমাদের জীবনের সৃষ্টিকর্ত্রী, পালনকর্ত্রী এবং সংহারশক্তি। নবরাত্রি কিংবা দুর্গোৎসবে এই নয়টি রূপের আরাধনা তাই কেবল আচার নয়, এটি আসলে আত্মিক শক্তি জাগ্রত করার এক সাধনা।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- শ্রী শ্রী চণ্ডী, অনুবাদক – শ্রীরামনারায়ণদত্ত শাস্ত্রী, বঙ্গানুবাদ – শ্রীদুর্গাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য, গীতাপ্রেস গোরখপুর, দেবীকবচ অধ্যায়, তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্লোক
- https://www.ebanglalibrary.com/
- https://en.wikipedia.org
- https://bn.wikipedia.org/kushmanda
- https://eisamay.com/
- https://bn.wikipedia.org/chandraghanta
- https://www.drikpanchang.com/
- https://rgyan.com/


আপনার মতামত জানান