বাংলাদেশ ৬৪টি জেলায় বিভক্ত। বেশিরভাগ জেলাই স্বাধীনতার আগে থেকে ছিল, কিছু জেলা স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে গঠিত, আবার কিছু জেলা একটি মূল জেলাকে দু’ভাগ করে তৈরি হয়েছে মূলত প্রশাসনিক সুবিধার কারণে। প্রতিটি জেলাই একে অন্যের থেকে যেমন ভূমিরূপে আলাদা, তেমনি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও স্বতন্ত্র। প্রতিটি জেলার এই নিজস্বতাই আজ বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে। সেরকমই একটি জেলা হল নওগাঁ জেলা (Naogaon)।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী বিভাগের একটি অংশ হল নওগাঁ জেলা। এই জেলার সঙ্গে নীলবিদ্রোহেরও ইতিহাস জড়িত রয়েছে। এই নওগাঁ জেলায় উনিশ শতকে কৃষক বিদ্রোহও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। এই জেলার আশেপাশে পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের মতো বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এমনকি এই জেলার সঙ্গে রবীন্দ্রস্মৃতিও জড়িয়ে রয়েছে। নওগাঁ জেলার প্যাঁড়া সন্দেশ খুবই বিখ্যাত।
নওগাঁ জেলার উত্তরে রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য, দক্ষিণে নাটোর ও রাজশাহী জেলা, পূর্বে রয়েছে জয়পুরহাট, বগুড়া ও নাটোর জেলা এবং পশ্চিমে রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা।
নওগাঁ জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলি হল: আত্রাই নদী, ছোট যমুনা নদী, তুলসী গঙ্গা নদী, শিব নদী, ফকিরনী নদী, পুনর্ভবা নদী এবং নাগর নদী।
নওগাঁ জেলার আয়তন ৩৪৩৫.৬৫ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী নওগাঁ জেলার জনসংখ্যা ছিল ২,৭৮৪,৫৯৮। পরিবার ছিল ৭৫৬,৪৫৯টি। মোট জনসংখ্যার মধ্যে পুরুষ ১,৩৭৪,৩১২ জন এবং মহিলা ১,৪০৮,৮৪০ জন। এই জনসংখ্যার মধ্যে ১৪.৯ শতাংশ শহরে বাকি মানুষ গ্রামের বাসিন্দা। শহরের বাসিন্দা ৪১৬,২৪৩ এবং গ্রামের বাসিন্দা ২,৩৬৭,০৮২।
নানা ধর্মের মানুষ নওগাঁ জেলায় বাস করলেও এখানে মুসলিম সম্প্রসারণ মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। ধর্মের নিরিখে জনসংখ্যার বিচার করলে দেখা যাবে, ২০২২ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী এখানে ইসলাম ধর্মাবলম্বী ৮৬.৮২ শতাংশ, হিন্দু ধর্মাবলম্বী ১১.৪৫ শতাংশ, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ০.৭৭ শতাংশ এবং অন্যান্য ধর্মের মানুষদের সংখ্যা ০.৯৫ শতাংশ। জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু অর্থাৎ সাঁওতাল, ওরাওঁ, মুন্ডা প্রভৃতি উপজাতির সংখ্যা ৩.৮৫ শতাংশ। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে এখানেই রয়েছে বাংলাদেশের বৃহত্তম সংখ্যালঘু জনসংখ্যা।
নওগাঁ জেলার ইতিহাসের দিকে এবার নজর দেওয়া যাক। নওগাঁ শব্দটি যে দুটি শব্দের মিশ্রণে তৈরি হয়েছে, সে দুটি শব্দ হল ‘নও’ এবং ‘গাঁ’। নাও হল একটি ফরাসি শব্দ, যার অর্থ হল নতুন এবং গাঁ শব্দের অর্থ গ্রাম। অতএব নওগাঁর মানে হল নতুন গ্রাম।
এই নওগাঁ কিন্তু প্রাচীন পৌন্ড্রবর্ধনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মনে করা হয় এখানকার বাসিন্দারা প্রাচীন পুন্ড্র জাতির বংশধর ছিল। নৃতাত্ত্বিকেরা মনে করেন, পুন্ড্ররা বিশ্বামিত্রের বংশধর এবং বৈদিক যুগের মানুষ। মহাভারতে আবার অন্যরকম তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে পুন্ড্রদের অন্ধ ঋষি দীর্ঘতমার ঔরসজাত পুত্র বলি রাজার বংশধর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব এই নওগাঁ যে প্রাচীন এক জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল ছিল, তা বোঝাই যায়। ১৯৩২ সালে প্রকাশিত একটি পুস্তিকা অনুযায়ী, নওগাঁ শহরের প্রাচীন অধিবাসী তরফদাররা চারশ বছর আগে আজমির থেকে এসে এখানে বসতি স্থাপন করেছিলেন এবং পরে মুর্শিদাবাদের নবাব সরকারের কাছ থেকে ‘তরফদার’ খেতাব পান৷
ব্রিটিশ শাসনামলে ঐতিহাসিক নীলবিদ্রোহের আগুনও ছড়িয়ে পড়েছিল এই নওগাঁ জেলায় এবং নীলচাষীদের হাতে নাজেহাল হয়ে ইংরেজ নীলকর সাহেবরা নীল চাষ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল।
নওগাঁতে মহকুমা সদর প্রতিষ্ঠার সময় এখানে কোন পাকা সরকারী ভবন ছিল না। উনিশ শতকের শেষ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রায় মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত নওগাঁ মহকুমা বিস্তৃতি লাভ করায় একে জেলা ঘোষণা করার দাবি উঠেছিল। তবে ব্রিটিশ শাসনামলে নওগাঁ জেলা গঠনের দাবি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পরে বাংলাদেশের সমস্ত মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করার দাবি জানানো হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতি আজও এই নওগাঁ জেলার ধুলোমাটিতে মিশে রয়েছে। ১৯৭৫ সালে সরকারিভাবে মহকুমাগুলিকে জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর তা ভন্ডুল হয়ে যায়। পরবর্তীকালে ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে দ্রুততার সঙ্গে সরকারী উদ্যোগে সব মহকুমাগুলিকে জেলায় রূপান্তরিত করবার কাজ শুরু হয়।
নওগাঁ জেলার সরকারী ভাষা হল বাংলা। তবে এই জেলায় ইংরেজি, হিন্দি, আরবি বলা মানুষেরও অভাব নেই।
রাজশাহী জেলার অধীনস্থ নওগাঁ মহকুমা ১৮৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল৷ ১৯৮৪ সালে নওগাঁ মহকুমা জেলায় রূপান্তরিত হয়। ১৯৬৩ সালে পৌরসভা গঠিত হয়। যে-এগারোটি উপজেলা নিয়ে নওগাঁ জেলা গঠিত, সেগুলি হল: আত্রাই উপজেলা, বদলগাছী উপজেলা, ধামইরহাট উপজেলা, মান্দা উপজেলা, মহাদেবপুর উপজেলা, নওগাঁ সদর উপজেলা, নিয়ামতপুর উপজেলা, পত্নীতলা উপজেলা, পোরশা উপজেলা, রাণীনগর উপজেলা এবং সাপাহার উপজেলা। এর মধ্যে নিয়ামতপুর হল বৃহত্তম উপজেলা এবং বদলগাছী হল সবচেয়ে ছোট উপজেলা। ১১টি উপজেলা ছাড়াও নওগাঁ জেলায় রয়েছে ৯৯টি ইউনিয়ন পরিষদ, ২৭৯৫টি গ্রাম, ১৮টি ওয়ার্ড, ৭৪টি মহল্লা।
নওগাঁ জেলার মূল অর্থনৈতিক ভিত্তিই হল কৃষি। এই জেলার অধিকাংশ মানুষই কৃষক। এখানে উৎপাদিত ফসলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: ধান, পাট, গম, ভুট্টা, আলু, ডাল, তৈলবীজ, বেগুন, পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি। এছাড়াও আম এবং আখের উৎপাদনও এখানে প্রচুর পরিমাণে হয়। ধান উৎপাদনের দিক থেকে বর্তমানে নওগাঁ শীর্ষ তালিকাভুক্ত জেলা। আম আহরণের ক্ষেত্রেও এখন এই জেলা দেশের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
নওগাঁ জেলার উল্লেখযোগ্য ভ্রমণস্থানের তালিকা অপূর্ণই থেকে যাবে যদি তালিকার শুরুতেই পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহারের উল্লেখ না থাকে। সপ্তম শতাব্দীর এই বৌদ্ধ বিহারটির ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব অনেক। এরপর উল্লেখ করতে হয় নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলায় অবস্থিত জগদ্দল মহাবিহারের কথা৷ এটি ১১ শতকের শেষ থেকে ১২ শতকের মাঝামাঝি সময়কার একটি বৌদ্ধবিহার। পাল রাজবংশের সম্ভবত রামপালের দ্বারা এই বিহারটি নির্মিত হয়েছিল। এটি অস্থায়ীভাবে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসাবে তালিকাভুক্ত।
সোমপুর মহাবিহার থেকে কিছু দূরে অবস্থিত হলুদ বিহারও একটি উল্লেখযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এটিও মূলত একটি মধ্যযুগীয় বিহার।
এরপরে উল্লেখ করতে হয় নওগাঁ জেলার পতিসর গ্রামের কথা। এই গ্রামটির সঙ্গে রবীন্দ্রস্মৃতি জড়িত রয়েছে বলে এর একটি গুরুত্ব আছে। পতিসরে কালীগ্রাম পরগণায় ঠাকুর পরিবারের জমিদারির সদর দপ্তর ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৮৩০ সালে এই জমিদারিটি কিনেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম ১৮৯১ সালের জানুয়ারি মাসে পতিসরে আসেন। এখানে থাকার সময় বহু সাহিত্য রচনা করেছিলেন তিনি। কবি যখন নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন তখন পতিসরের প্রজারা তাঁকে সম্মান জানিয়েছিল। ১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথ শেষবারের জন্য পতিসরে গিয়েছিলেন।
এরপর বলতে হয় কুসুম্বা মসজিদের কথা। এটি বাংলায় আফগান শাসনামলে ১৫৫৮-৫৯ সালে সুলাইমান নামে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দ্বারা নির্মিত হয়েছিল।
দুবলহাটির জমিদারবাড়ি বা রাজবাড়ি এই জেলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক নিদর্শন। পাল রাজবংশের সময় রাজা হরেন্দ্র রায়চৌধুরী প্রথম রাজবাড়িটি নির্মাণ করেন। ১৯৪৬ সালে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার সময় এই রাজবাড়িটি ধ্বংস হয়ে যায়।
দীবর দীঘি নওগাঁ জেলার আরেকটি অন্যতম প্রাচীন স্থান। এগুলি ছাড়াও এই জেলার আরও কয়েকটি দর্শনীয় স্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: বলিহার রাজবাড়ি, আলতাদীঘি, দিব্যক জয়স্তম্ভ, মাহিসন্তোষ ইত্যাদি।
নওগাঁ জেলা বিখ্যাত ও জনপ্রিয় বেশ কিছু ব্যক্তির জন্মস্থান। তেমনই কয়েকজন বিখ্যাত ও কৃতী মানুষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: মতিন রহমান (চলচ্চিত্র পরিচালক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপক), জেমস (বিখ্যাত গায়ক, গীতিকার ও সুরকার), মোহাম্মদ বায়তুল্লাহ (রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশ সংসদের প্রথম ডেপুটি স্পিকার), তালিম হোসেন (কবি, একুশে পদক এবং বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্ত, ঢাকায় নজরুল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা), আব্দুল জলিল (রাজনীতিবিদ, আওয়ামী কর্মী, সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী, মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেড-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান), শিশির নাগ (সাংবাদিক এবং বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক নেতা), চিকন আলী (কমেডি অভিনেতা), শবনম মুস্তারী (গায়িকা, একুশে পদক প্রাপক, তালিম হোসেনের মেয়ে), শিবলী সাদিক (প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপক), কালা পাহাড় (বাংলা সালতানাতের কুখ্যাত মুসলিম সেনাপতি) প্রমুখ।
নওগাঁ জেলার লোকসংস্কৃতির ধারাটি আজও সমানভাবে বহমান। মুর্শিদি, ভাটিয়ালির মতো লোকগান, যাত্রা, পল্লীবাংলার বিয়ের গান, গ্রাম্য ছড়া ও কবিতা বহু শতাব্দী ধরে এখানে বিদ্যমান। চড়কপূজা, নবান্নের মতো অনুষ্ঠান ছাড়াও এখানে বাইচ খেলা, দাড়িয়াবান্ধা খেলা, লাঠি খেলা ইত্যাদি বিভিন্ন লোকক্রীড়া আজও দেখা যায়।
নওগাঁ জেলার বিখ্যাত ও জনপ্রিয় খাবার বললেই প্রথমে মনে পড়ে প্যাঁড়া সন্দেশের কথা। নওগাঁতেই প্রথম এই মিষ্টির উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে, মহেন্দ্র দাস নামে একজন ব্যক্তিই প্রথম নওগাঁয় এই মিষ্টির প্রচলন করেছিলেন। এমনকি এও মনে করা হয় যে, এই মহেন্দ্র ভারতেরই এক নবাবের দরবারে মিষ্টি তৈরির কাজ করতেন। নবাব যুদ্ধে পরাজিত হলে নওগাঁর কালীতলায় এসে তিনি বসতি স্থাপন করেন ও সেখানে প্যাঁড়া সন্দেশ বিক্রি করা শুরু করেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান