বিবিধ

নারকোটিক ড্রাগস অ্যাণ্ড সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস আ্যক্ট, ১৯৮৫

অতি মাত্রায় মাদকদ্রব্য ব্যবহার এবং মাদক পাচার বা বিক্রি ভারতে দণ্ডনীয় অপরাধ। গাঁজা, ভাঙ, চরস এগুলিকেই মাদক দ্রব্য হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। ১৯৮৫ সালে প্রথম ভারতে মাদক দ্রব্য সংক্রান্ত ‘নারকোটিক ড্রাগস অ্যাণ্ড সাইকোট্রোপিক সাবস্ট্যান্সেস অ্যাক্ট’(Narcotic Drugs and Psychotropic Substances Act, 1985)চালু হয়। এই আইন বলে সকল ভারতীয় নাগরিককে মাদক দ্রব্যের উৎপাদন, প্রস্তুতকরণ, চাষাবাদ, মাদক ক্রয়-বিক্রয়, পাচার কিংবা মাদক সেবনে নিষেধ করা হয়। সেই সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন রাজীব গান্ধী। ১৯৮৫ সালের ২৩ আগস্ট লোকসভায় এই বিল প্রথম পাশ হয় এবং ঐ বছর ১৪ নভেম্বর থেকে আইনটি সমগ্র ভারতে বলবৎ হয়।

১৯৮৫ সালের নারকোটিক ড্রাগস অ্যাণ্ড সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস আইনে যা বলা আছে তা হল –

এই আইনের দ্বারা মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত আইন সংহত এবং সংশোধন করার জন্য মাদকদ্রব্য এবং সাইকোট্রপিক পদার্থের ব্যবহারের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ আরোপ করা, মাদকদ্রব্যের অবৈধ পাচার বা বিক্রি এবং সেই ক্ষেত্রে প্রাপ্ত মাদক বাজেয়াপ্ত করা, মাদকদ্রব্য ও সাইকোট্রপিক পদার্থের জন্য আন্তর্জাতিক আইন বাস্তুবায়িত করা এবং প্রয়োজনে সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করা।

এই আইনে মোট ছয়টি অধ্যায় আছে। প্রথম অধ্যায়ে মূলত রয়েছে আইনে বর্ণিত নানাবিধ শব্দবন্ধের পরিচয় এবং সংজ্ঞা। গাঁজা, মারিজুয়ানা এগুলি কী প্রকৃতির মাদক, অবৈধ পাচার বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, আফিম কী, প্রস্তুতকৃত মাদক বলতে কী বোঝায় ইত্যাদি আইন সংক্রান্ত নানাবিধ শব্দের বিস্তৃত ব্যাখ্যা এই অধ্যায়ে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়টি মাদকদ্রব্যের অবৈধ পাচার, বিক্রি ইত্যাদি রোধ করার জন্য স্থিরীকৃত প্রশাসনিক দপ্তরগুলির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের কোন কোন অফিসার এই মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়ভারপ্রাপ্ত তাও এই অধ্যায়ে বলা আছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে এর পাশাপাশি মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্ধারিত কমিটি, জাতীয় ফাণ্ডের বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে। মাদকদ্রব্যের অত্যধিক ব্যবহার, অবৈধ পাচার ও বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করতে এবং অভিযুক্তদের উপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার কোন কোন বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে তার একটা তালিকা দেওয়া রয়েছে এই আইনের তৃতীয় অধ্যায়ে। গাঁজা, চরসের ব্যাপারে বিশেষ কোন কোন বিধি রয়েছে তাও এই অধ্যায় থেকে জানা যায়। চতুর্থ অধ্যায়টির মূল বিষয় মাদক সংক্রান্ত অভিযুক্তদের কী কী শাস্তি হতে পারে তার বর্ণনা। সর্বশেষ অধ্যায়ে মাদকের অবৈধ পাচার সংক্রান্ত ব্যাপারে মাদক বাজেয়াপ্ত করার বিষয়ে উপযুক্ত শাস্তির প্রতিবিধানও দেওয়া আছে। তার পাশাপাশি যে কোনো প্রকার মাদকের স্বীকৃত সীমা বা মাত্রা উল্লেখ করা হয়েছে এই আইনে।

এই আইন বলে খুব সামান্য পরিমাণ মাদক কোনো ব্যক্তির কাছে পাওয়া গেলে তার শাস্তিস্বরূপ এক বছর পর্যন্ত কারাবাস এবং দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। এই পরিমাণ যদি ব্যবসায়িক মাত্রার থেকে কম অথচ ক্ষুদ্র পরিমাণের থেকে বেশি হয়, তখন কারাবাসের সময়কাল হবে দশ বছর এবং এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। সবশেষে ব্যবসায়িক মাত্রার মাদক কোনো ভারতীয় নাগরিকের থেকে উদ্ধার করা হলে তার কুড়ি বছর পর্যন্ত কারাবাস এবং দুই লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। আইনের চতুর্থ অধ্যায়ে স্পষ্টত বলা আছে কোন মাত্রাকে ক্ষুদ্র পরিমাণ বলা হবে আর কোন মাত্রাকে বলা হবে ব্যবসায়িক মাত্রা। উদাহরণস্বরূপ, গাঁজার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র পরিমাণ হবে ১ কিলোগ্রাম আবার হেরোইনের ক্ষেত্রে এই মাত্রা স্বীকৃত হয়েছে ৫ গ্রাম।

এই আইন বলে কেউ যদি নিজের ব্যবহারের জন্য নিজের কাছে অল্প পরিমাণ মাদক রাখে সেক্ষেত্রে শাস্তির পরিমাণ একরকম হবে, আবার কেউ মাদকের অবৈধ ব্যবসা করলে তার জন্য শাস্তি অন্যরকম হবে। মোটামুটিভাবে নারকোটিক ড্রাগস অ্যাণ্ড সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস আইন, ১৯৮৫-এর ৮ সি ধারা অনুসারে মাদক কেনা ও কাছে রাখা আইনত অপরাধ, ২২ নং ধারা অনুসারে আইন অমান্য করে মাদক কেনাবেচা বা পাচার শাস্তিযোগ্য। আবার এই আইনের ২৭এ ধারা অনুসারে মাদক সেবন অপরাধযোগ্য। এমনকি আইন ভেঙে মাদক কেনাবেচা ও মাদক সেবনে মদত দেওয়া ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

১৯৮৫ সালের আগে ভারতে গাঁজা সেবন নিষিদ্ধ ছিল না। এমনকি ইতিহাসে জানা যায় অথর্ববেদেও গাঁজা সেবনের প্রসঙ্গ আছে। ব্রিটিশ ভারতে ১৮৯৩ সালে ‘ইণ্ডিয়ান হেম্প ড্রাগস কমিশন’ স্থাপিত হয় মাদক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য যেখানে সীমিত মাদক ব্যবহারকে কোনোভাবেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে মান্য করা হয়নি। এই আইন পাশ হওয়ার পরে ‘দ্য টাইমস অফ ইণ্ডিয়া’ পত্রিকা এর সমালোচনা করে বলে যে এই আইনে সব প্রকারের মাদকের জন্য একইরকম শাস্তি ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১৫ সালে লোকসভার সদস্য তথাগত সতপথী গাঁজার উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য অনেক আইনি চেষ্টাও করেছেন।

১৯৮৮, ২০০১, ২০১৪ এবং ২০১৬ সালে মোট চারবার এই আইনটি সংশোধিত হয়েছে। তবে এর মধ্যে ২০১৪ সালের সংশোধনীতে মর্ফিন, মেথাডন ইত্যাদি প্রয়োজনীয় মাদক ওষুধকে এই আইনের আওতায় রাখা হয়নি। এমনকি এই সংশোধনীতে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার উপরেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাছাড়া অধিক পরিমাণে মাদক পাচার বা কেনাবেচার জন্য অভিযুক্তকে যে অন্তিমে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়ার নীতি ছিল পূর্বোক্ত আইনে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় এবং তার পরিবর্তে তিরিশ বছর পর্যন্ত কারাবাসের শাস্তি প্রতিবিধান দেওয়া হয়।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন