ইতিহাস

নবাব সুলতান জাহান বেগম

ভোপালের চতুর্থ মহিলা শাসক নবাব সুলতান জাহান বেগম (Nawab Sultan Jahan Begum) তাঁর শাসনকালে পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে নারীর উন্নতি ও নারী-প্রগতির প্রয়াসের জন্য ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। ব্রিটিশ শাসিত ভারতের একটি দেশীয় রাজ্যের শাসক নবাব সুলতান জাহান সেকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারীবাদী হিসেবে পরিচিত এবং আজও তিনি সুপরিচিত। ভোপালে দীর্ঘ ১০৭ বছর বেগমদের শাসন চলেছে যার মধ্যে ভোপালের মুসলিম মহিলাদের উন্নতির জন্য নবাব সুলতান জাহান বেগমের সমাজ ও শিক্ষা সংস্কারের নানাবিধ প্রচেষ্টা পরবর্তীকালের সমাজ সংস্কারকদেরও প্রভাবিত করেছিল। ১৯০১ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত তাঁর পঁচিশ বছরের রাজত্বকালে পাশ্চাত্য ও ইউনানির আদলে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যেই স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি স্থাপন করে এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। নারীর সার্বিক মুক্তির জন্য তাঁর প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক স্তরেও তাঁকে বিখ্যাত করে তুলেছিল। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র মহিলা উপাচার্য ছিলেন নবাব সুলতান জাহান বেগম।

১৮৫৮ সালের ২৯ জুলাই নবাব সুলতান জাহান বেগমের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম নবাব জাহাঙ্গীর মহম্মদ খান বাহাদুর এবং মায়ের নাম শাহ জাহান বেগম। তাঁর ঠাকুরমা নবাব সিকান্দার বেগমও ভোপালের একজন অন্যতম মুসলিম শাসক ছিলেন। ভোপালের চারজন মুসলিম নারী শাসকের উত্তরাধিকারী হিসেবেই ১৯০১ সালে ভোপালের রাজ সিংহাসনে বসেন সুলতান জাহান বেগম। তাঁর বাল্যকালের ঘটনা জানা যায় তাঁরই লেখা ‘তাজ-উল-ইকবাল’ গ্রন্থ থেকে। পরবর্তীকালে আহমেদ আলি খান বাহাদুরের সঙ্গে বিবাহ হয় নবাব সুলতান জাহান বেগমের। তাঁদের অন্যতম কনিষ্ঠ পুত্র সন্তান হামিদুল্লাহ খান পরবর্তীকালে ভোপালের শাসক হন। হামিদুল্লাহ খানের প্রপৌত্র বিখ্যাত ক্রিকেটার মনসুর আলি খান পতৌদি এবং তাঁর নাত-বৌ বিখ্যাত অভিনেত্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহধন্যা উত্তরসূরি শর্মিলা ঠাকুর।

মাত্র চার বছর বয়সে বিসমিল্লা অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরান পাঠের মধ্য দিয়েই তাঁর প্রাথমিক পাঠ শুরু হয়েছিল। কোরান পাঠের পাশাপাশি কোরান অনুবাদ, পাটিগণিত, ফারসি, পশতু ও ইংরাজি ভাষা শিক্ষাও লাভ করেছিলেন সুলতান জাহান বেগম। তাঁর ঠাকুরমার সৌজন্যে সিকান্দার জাহানের সেক্রেটারি মুন্সি হুসেন খানের কাছে ইংরাজি, মৌলভি জামাল উদ্দিন খানের কাছে কোরান পাঠ ও অনুবাদ শিক্ষা এবং পণ্ডিত গণপৎ রাইয়ের কাছে পাটিগণিত শিখেছিলেন সুলতান জাহান। সেকালের পর্দা প্রথা ত্যাগ করে পরিবার-বহির্ভূত পুরুষের কাছে শিক্ষালাভের প্রচেষ্টা তাঁকে অন্যতম প্রগতিশীলতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত করে।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


১৯০১ সালের ৪ জুলাই ৪৩ বছর বয়সে ভোপালের সিংহাসনে বসেন সুলতান জাহান বেগম। সর্দার মঞ্জিল প্রাসাদে তাঁর রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। অভিষেক অনুষ্ঠানে দশ হাজার টাকা মূল্যের খিলাত, একটি তরোয়াল, একটি গলার হার উপহারস্বরূপ লাভ করেন তিনি। ভোপালের সেনাবাহিনী শূন্যে একুশটি গুলি ছুঁড়ে গান-স্যালুটের মাধ্যমে সম্মান জ্ঞাপন করে নবাব সুলতান জাহান বেগমকে। তাঁর ঠাকুরমা সিকান্দার বেগমের মৃত্যুর পরে দরবার-উল-ইকবাল-ই-ভোপালের শাসক রূপে আত্মপ্রকাশ করেন নবাব সুলতান জাহান বেগম। তাঁর পঁচিশ বছরের শাসনকালে মুসলিম মহিলাদের শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে বিশেষ কৃতিত্বের ছাপ রেখেছেন তিনি। গ্রামে গ্রামে ঘুরে নারীদের নানাবিধ সমস্যার কথা শোনেন তিনি। নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য ভোপালে তিনি দুটি হাসপাতাল নির্মাণ করান – পুরুষদের জন্য তৈরি হয় প্রিন্স অফ ওয়েলস হাসপাতাল এবং মহিলাদের জন্য তৈরি হয় লেডি ল্যান্সডাউন হাসপাতাল। এই লেডি ল্যান্সডাউন হাসপাতালটিই পরে সুলতানিয়া জেনানা হাসপাতাল নামে পরিচিত হয়। এই হাসপাতালে বহু অনাথ মেয়েকে সেবিকার কাজ শেখানো হতো এবং এই হাসপাতালেরই অধীনে শিশুদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল লেডি হার্ডিঞ্জ ইনফ্যান্ট হোম। অনাথ শিশুদের এই হোমে দেখভাল করা হতো, তাদের খাওয়া-পরার ভারও নেওয়া হতো হাসপাতালের কর্তৃপক্ষের থেকেই। ১৯১২ সালে লেডি হার্ডিঞ্জ ভোপালে এলে নবাব সুলতান জাহানের প্রতিষ্ঠিত লেডি মিন্টো নার্সিং স্কুলটি উদ্বোধন করেন। ভোপালে সুলতান জাহানই প্রথম স্বাস্থ্য প্রকল্প হিসেবে চালু করেন ‘মাদার্সা-ই-আসিফিয়া’ যে প্রকল্পের অধীনে গ্রামীণ স্বাস্থ্যকর্মী এবং চিকিৎসক, হাকিমদের ইউনানি চিকিৎসা পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত করা হতো। সমগ্র রাজ্যে তিরিশটির মতো ইউনানি স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি করেছিলেন নবাব সুলতান জাহান বেগম। একেবারে আধুনিক চিন্তাভাবনায় অভ্যস্ত সুলতান জাহান বেগম পর্দা প্রথায় বিশ্বাস করতেন না এবং মুসলিম মহিলাদের বাধ্যতামূলক বোরখা পড়ার প্রথার বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। ১৯১৮ সালে ভোপালে মেয়েদের জন্য বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শিক্ষার প্রচলন করেন তিনি। তাঁর শাসনকালে বহু কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নবাব সুলতান জাহান বেগম এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সেই সব প্রতিষ্ঠানে নিযুক্ত করেছিলেন। ফলে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রশিক্ষণের দিকেও মনোযোগ ছিল তাঁর। ১৯২৬ সালে ভোপালের সিংহাসনের দায়িত্ব থেকে অবসর নেন সুলতান জাহান বেগম এবং তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র হামিদুল্লাহ খান তাঁর পরে ভোপালের শাসক হন।

শুধু শিক্ষাব্যবস্থাই নয়, সেকালের ভোপালে কর ব্যবস্থা, পুলিশ প্রশাসন, সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ প্রতিটি ক্ষেত্রে সংস্কার সাধন করেছিলেন তিনি। কৃষিকাজের উন্নতি ঘটাতে রাজ্যে ব্যাপক সেচ চালু করেন সুলতান জাহান বেগম। ১৯২২ সালে তিনি একটি এক্সিকিউটিভ ও লেজিসলেটিভ স্টেট কাউন্সিল তৈরি করেন এবং পৌরসভার জন্য নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করেন। যক্ষ্মা রোগের প্রতিকারের লক্ষ্যে টিকাদান কর্মসূচিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি।

১৯১৪ সালে অল ইণ্ডিয়া মুসলিম লেডিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হন নবাব সুলতান জাহান বেগম। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা উপাচার্য ছিলেন তিনি। ১৯২০ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদেই বহাল ছিলেন।

‘অ্যান অ্যাকাউন্ট অফ মাই লাইফ’ শিরোনামে নবাব সুলতান জাহান বেগম তিন খণ্ডে আত্মজীবনী লিখেছেন যা যথাক্রমে ১৯১২, ১৯২২ এবং ১৯২৭ সালে প্রকাশ পেয়েছিল। এছাড়াও হজরত মহম্মদের জীবনীও লিখেছিলেন তিনি ‘সিরাত-ই-মুস্তাফা’ নামে। রান্না, ঘরকন্না-গৃহস্থালি, স্বাস্থ্য সচেতনতা, নারী শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ের উপর পঞ্চাশটিরও বেশি বই লিখেছেন তিনি। বিভিন্ন মহিলা সমিতিতে নারী শিক্ষার উপর বেশ কিছু বক্তৃতা দিয়েছিলেন তিনি যেগুলির কয়েকটি পরবর্তীকালে ‘সিল্ক-ই-শাহওয়ার’ নামে একটি সংকলনে প্রকাশ পায় ১৯১৯ সালে। আবার অন্য কিছু বক্তৃতা ছাপা হয় মহিলাদের উর্দু জার্নাল ‘খাতুন’, ‘জিল-উস-সুলতান’ ইত্যাদিতে।

সুলতান জাহানের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য বই হল – ‘হিদায়াৎ-উস-জৌযান’, ‘সাবিল-উল-জিনান’, ‘তন্দুরস্তি’, ‘বাচ্চোঁ কি পরওয়ারিশ’, ‘হিদায়াত-তিমারদারি’, ‘মাইশাৎ-ও-মোয়াশিরাৎ’ ইত্যাদি।

২০১৭ সালে ভারত সরকারের চলচ্চিত্র মন্ত্রকের অর্থসাহায্যে রচিতা গোরোয়ালার পরিচালনায় একটি তথ্যচিত্র মুক্তি পায় ‘বেগমোঁ কা ভোপাল’ নামে যেখানে ভোপালের অন্যান্য বেগমদের পাশাপাশি সুলতান জাহান বেগমের জীবনও বিস্তারিতভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

১৮৭৭ সালে ‘এম্প্রেস অফ ইণ্ডিয়া’র রৌপ্য পদক এবং ১৯০৩ সালে দিল্লি দরবার স্বর্ণপদক লাভ করেছিলেন সুলতান জাহান। এছাড়াও ১৯০৪ সালে ‘অর্ডার অফ দ্য ইণ্ডিয়ান এম্পায়ার’, ১৯১০ সালে ‘অর্ডার অফ দ্য স্টার অফ ইণ্ডিয়া’ এবং ১৯১১ সালে ‘অর্ডার অফ দ্য ক্রাউন অফ ইণ্ডিয়া’র শ্রেষ্ঠতম সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি। ১৯১১ সালে অটোমান সাম্রাজ্যের ‘নিশান-ই-মজিদি’ উপাধি লাভ করেন তিনি। সর্বশেষ ১৯১৭ সালে ‘ডেম গ্র্যাণ্ড ক্রস অফ দ্য অর্ডার অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ উপাধি অর্জন করেছিলেন তিনি।   

১৯৩০ সালের ১২ মে নবাব সুলতান জাহান বেগমের মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য