ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্লে-ব্যাক সঙ্গীত এসেছিল যাঁর হাত ধরে তিনি রাইচাঁদ বড়াল (Raichand Boral)। বিংশ শতাব্দীর তিনের দশক থেকে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রকে তাঁর সঙ্গীতের মাধ্যমে নতুন এক দিশা দেখিয়েছিলেন। তাঁর অবদান এতটাই গভীর ও সুদূরপ্রসারী ছিল যে কালজয়ী সঙ্গীত রচয়িতা অনিল বিশ্বাস তাঁকে ‘ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের ভীষ্ম পিতামহ’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
১৯০৩ সালের ১৯ অক্টোবর উত্তর কলকাতার প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিটের একটি বাড়িতে রাইচাঁদ বড়ালের জন্ম হয়। তাঁর বাবা লালচাঁদ বড়াল ছিলেন একজন ধ্রুপদী ঘরানার বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ। তাঁর তিন পুত্রের মধ্যে রাইচাঁদ ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তাঁদের পূর্বপুরুষ প্রেমচাঁদ বড়াল ছিলেন বর্ধমান মহারাজার দেওয়ান। তিনি পরে কলকাতায় চলে আসেন এবং তাঁর নামেই তাঁদের বাড়ি সংলগ্ন রাস্তার নামকরণ হয়।
প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিটের ওই বাড়িতে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের চর্চা ছিল। বিশ্বনাথ রাও, রাধিকা গোস্বামী, মিয়া রমজান খাঁ-এর মতো নামী শিল্পীদের যাতায়াত ছিল বাড়িতে। সেই বাড়িরই ছেলে রাইচাঁদ। স্বাভাবিকভাবেই ছোট থেকেই সঙ্গীতের সঙ্গে তাঁর বড় হয়ে ওঠা। সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহ থেকেই অনেক ছোট বয়সে তাঁর তালিম নেওয়া শুরু হয়। প্রথমে বাবা লালচাঁদ বড়ালের কাছেই সঙ্গীত শিক্ষা শুরু করেন রাইচাঁদ। তারপর রামপুর এবং গোয়ালিয়র থেকে বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞরা তাঁকে শিক্ষা দিতে আসতেন। রামপুর ঘরানার উস্তাদ মুস্তাদ হুসেন খান সাহেবের কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিখতে শুরু করেন তিনি। পণ্ডিত বিশ্বনাথ রায়ের কাছে তালিম নিতেন ধ্রুপদ ঘরানার। এছাড়া মাসিত খানের কাছে শিখতেন তবলা। রাইচাঁদ তবলায় ‘সাথ সঙ্গত’ শিখেছিলেন। সরোদ শিখতেন ওস্তাদ হাফিজ আলি খান সাহেবের কাছে। ভজন, ঠুমরি, গজলেও অসাধারণ দক্ষতা ছিল রাইচাঁদের। তিনি লখনউ, এলাহাবাদ এবং বেনারসে একাধিক সঙ্গীত সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
এক নজরে রাইচাঁদ বড়ালের জীবনী:
- জন্ম: ১৯ অক্টোবর, ১৯০৩
- মৃত্যু: ২৫ নভেম্বর, ১৯৮১
- কেন বিখ্যাত: রাইচাঁদ বড়াল মূলত ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্লে-ব্যাক সঙ্গীতের পথিকৃৎ হিসেবে বিখ্যাত। তিনি ১৯৩০-এর দশকে নিউ থিয়েটার্সে কাজ করে বাংলা ও হিন্দি ছবির সঙ্গীতে নতুন ধারা আনেন। কে এল সায়গল, পঙ্কজ মল্লিকদের মতো শিল্পীদের নিয়ে তিনি এক স্বর্ণযুগের সূচনা করেন। তাঁর সঙ্গীতে শাস্ত্রীয়, নাট্যসঙ্গীত ও আধুনিকতার মেলবন্ধন দেখা যায়।
- পুরস্কার ও স্বীকৃতি: রাইচাঁদ বড়াল দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার, সৃজনশীল ও পরীক্ষামূলক সঙ্গীত বিভাগে সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। তাঁকে ভারতীয় প্লে-ব্যাক সঙ্গীতের জনক হিসেবেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়ে থাকে।
রাইচাঁদ বড়ালের কর্মজীবন শুরু হয় বেতারের হাত ধরে। ১৯২৭ সালে শুরু হয় ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি। তখন দেশের মাত্র দুটি শহরে – বম্বে ও কলকাতায় মাত্র দু’টি ব্যক্তিগত ট্রান্সমিটারের সাহায্য প্রথম বেতারকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। নৃপেন মজুমদারের আহ্বানে শুরু থেকেই কলকাতার বেতারকেন্দ্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন রাইচাঁদ বড়াল। তবে প্রথম জীবনে বেতারের সঙ্গে যোগ থাকলেও পরবর্তীকালে ভারতীয় চলচ্চিত্রে সুরকার হিসেবে যোগ দেন তিনি। ১৯৩১ সালে তিনি যোগ দেন কলকাতার বিখ্যাত প্রযোজনা সংস্থা নিউ থিয়েটার্সে। তখনও চলচ্চিত্রে নির্বাক যুগ চলছে। ‘চাষার মেয়ে’ নামে একটি ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করে খ্যাতিলাভ করেন রাইচাঁদ।
বাংলা গানকে রাইচাঁদ বড়াল এক নতুন আঙ্গিক দেন যেখানে উত্তর ভারতের গজল ধারাকে উনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সুরে তারের যন্ত্রের মাধ্যমে মিশ্রিত করে পরিবেশন করা হয়। এই সময়েই বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ হরিশচন্দ্র বালির মাধ্যমে কুন্দন লাল সায়গল বা কে এল সায়গলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সায়গল সাহেব তাঁর প্রথম গান রেকর্ড করেছিলেন রাইচাঁদের তত্ত্বাবধানেই। নির্বাক ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করলেও রাইচাঁদ বড়ালের আসল দক্ষতা মানুষের সামনে আনে সবাক ছবি। ১৯৩২ সালে ‘মহব্বত কে আঁসু’ চলচ্চিত্রে তিনি সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। ওই বছরই তিনি আরও দু’টি হিন্দি ছবি ও পাঁচটি বাংলা ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ‘জিন্দা লাশ’ (হিন্দি), ‘সুবাহ কি সিতারা’ (হিন্দি), পুনর্জন্ম (বাংলা), চিরকুমার সভা (বাংলা) ইত্যাদি। এরপরের দু’বছর তিনি আরও কয়েকটি ছবিতে সঙ্গীত পরিচালকের কাজ করেন। সেগুলি হল- ‘পূরণ ভগত’ (হিন্দি), ‘রাজরানি মীরা’ (হিন্দি), ‘মীরাবাই’ (বাংলা), ‘দুলারি বিবি’ (হিন্দি), ‘ডাকু মনসুর’ (হিন্দি), ‘মহাব্বত কি কসৌটি’ (হিন্দি), মাসতুতো ভাই (বাংলা), কপালকুণ্ডলা (বাংলা), রূপলেখা (বাংলা)। এই বছর রাইচাঁদ বড়াল একটি স্বল্প দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেন যার নাম ছিল ‘পিয়ার ব্রাদার্স’। সাদা-কালো এবং বাংলা ভাষায় তৈরি এই শর্ট ফিল্মে অভিনয় করেছিলেন শ্যাম লাহা এবং অমল মল্লিক। তবে স্বল্প দৈর্ঘ্যের এই চলচ্চিত্র তেমন খ্যাতি অর্জন করতে পারেনি।
এর পরের বছরটি অর্থাৎ ১৯৩৫ সাল ছিল রাইচাঁদ বড়ালের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেই বছরই তিনি চলচ্চিত্রের সঙ্গীতের বিষয়ে এমন এক পরিবর্তন আনেন যার জন্য তিনি চিরকাল ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সঙ্গীত জগতে পূজনীয় হয়ে থাকবেন।
আজ যে প্লে-ব্যাক সঙ্গীতের এত রমরমা, চলচ্চিত্র শিল্পকে সেই প্লে-ব্যাক গানের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছিলেন স্বয়ং রাইচাঁদ বড়াল। তার আগে চলচ্চিত্রের ধরন ছিল অন্য। সিনেমায় যিনি অভিনয় করতেন, তিনিই গাইতেন গান। এতে অভিনেতা বা অভিনেত্রীদের উপর গান ও অভিনয় – দু’টি কাজের চাপ একসঙ্গে থাকত। প্রচলিত এই ধারণার পরিবর্তন হল রাইচাঁদের হাত ধরে। ১৯৩৫ সালের গোড়ার দিকে তিনি দু’টি ছবিতে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন- ‘আফটার দ্য আর্থকোয়েক’ ও ‘কারওয়াঁ-এ-হায়াত’। তারপরই তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্লে-ব্যাক আনেন। পরপর দু’টি ছবিতে প্লে-ব্যাক করান তিনি যার মধ্যে একটি বাংলা ছবি ‘ভাগ্যচক্র’, অন্যটি হিন্দি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ধুপ ছাওঁ’। এমন এক সিদ্ধান্ত নেওয়া ও তাকে বাস্তবায়িত করার পিছনে আর একজন বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞের হাত ছিল যাঁর নাম পঙ্কজ কুমার মল্লিক। ‘ধুপ ছাওঁ’ সিনেমাটি ছিল বাংলার ‘ভাগ্যচক্র’ ছবির রিমেক। দু’টি ছবিরই পরিচালক ছিলেন নীতিন বোস এবং দু’টি ছবিই তৈরি হয়েছিল কলকাতার নিউ থিয়েটার্সে। ‘ধুপ ছাওঁ’ ছবিটিতে পারুল ঘোষের নেতৃত্বে একটি গান ছিল “ম্যায় খুশ হোনা চাহুঁ”। সম্পূর্ণ মহিলা কোরাসের এই গানটিতে মুখ্য গায়িকা ছিলেন সুপ্রভা সরকার এবং নৃত্যে চিত্রায়িত হয়েছিলেন হরিমতি। এরপর দেবদাস (বাংলা), মঞ্জিল (হিন্দি), গৃহদাহ (বাংলা), মায়া (বাংলা), ‘সাথী’ (বাংলা), দিদি (বাংলা), প্রেসিডেন্ট (হিন্দি, দিদি ছবির হিন্দি রিমেক) সহ অনেক ছবিতেই কাজ করে রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজ মল্লিক জুটি। প্রতিটি ছবিই তৈরি হয়েছিল নিউ থিয়েটার্সের তত্ত্বাবধানে।
১৯৫৩ সালে বম্বে চলে যান রাইচাঁদ বড়াল এবং সেই বছরই তিনি ‘দরদ-ই-দিল’ চলচ্চিত্রের জন্য সঙ্গীত পরিচালনা করেন। তখন কিছু মৌলিক রেকর্ডের সঙ্গীতও তিনি বানিয়েছিলেন। তাঁর কয়েকটি বিখ্যাত গান হল – “বলম আয়ে বসো মোরে মন মে” (দেবদাস), “প্রেম নগর মে বানাউঙ্গি ঘর ম্যায়” (চণ্ডীদাস), “এক বাংলা বনে ন্যারা” (প্রেসিডেন্ট) ইত্যাদি। রাইচাঁদ বড়াল আরও যেসব ছবির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সেগুলি হল – ‘স্ট্রিট সিঙ্গার’, ‘সাপেরা’, ‘বিদ্যাপতি’, ‘লাগান’, ‘নারী’, ‘উদয়ের পথে’, ‘শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু’, ‘নীলাচলে মহাপ্রভু’, ‘হামরাহি’, ‘পরাজয়’, ‘বড় বউ’, ‘মা’ ইত্যাদি। তিনি ভারতীয় সিনেমায় প্লে-ব্যাক সিঙ্গিংয়ের পাশাপাশি ‘ডুয়েট’ গানের পদ্ধতিগত ব্যবহারও চালু করেন। ‘অঞ্জনগড়’ (১৯৪৮) ছিল নিউ থিয়েটার্সের সঙ্গে করা তাঁর শেষ বিখ্যাত চলচ্চিত্র। তারপরে আরও বারো বছর ভারতীয় চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব সামলান তিনি। ১৯৬০ সালে ‘নতুন ফসল’ ছিল সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে তাঁর শেষ চলচ্চিত্র।
রাইচাঁদ বড়াল হিন্দি ও বাংলা মিলিয়ে সত্তরটিরও বেশি চলচ্চিত্রে (লাইভ স্কোর, নির্বাক চলচ্চিত্র বাদে) সঙ্গীত পরিচালকের দায়িত্ব সামলান। চলচ্চিত্রের সঙ্গীতে ঠুমরি এবং কীর্তনের মতো বিভিন্ন ধরনের সঙ্গীতের প্রচলন ও ব্যবহারে তিনি পারদর্শী ছিলেন। তিনি তাঁর সঙ্গীতের সঙ্গে সেতার এবং বেহালার মতো যন্ত্রগুলি ব্যবহার করতেন। তিনি সঙ্গীতের গজল শৈলীর সঙ্গে ধ্রুপদী ঘরানার যে মিশেল ঘটিয়েছিলেন তা কে এল সাইগলের গানে খুব ভালভাবে ফুটে উঠেছিল।
১৯৭৮ সালে, ৭৫ বছর বয়সে ভারতীয় চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনায় তাঁর অবদানের জন্য রাইচাঁদ বড়ালকে দাদাসাহেব ফালকে সম্মানে সম্মানিত করা হয়। ওই একই বছর তিনি সৃজনশীল ও পরীক্ষামূলক সঙ্গীত বিভাগে সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। একজন পারফর্মিং শিল্পীর জন্য এটি সর্বোচ্চ পুরস্কার যা দেয় ভারতের জাতীয় সঙ্গীত, নৃত্য ও নাটক অ্যাকাডেমি।
১৯৮১ সালের ২৫ নভেম্বর রাইচাঁদ বড়ালের মৃত্যু হয়। ভারতীয় চলচ্চিত্রের সঙ্গীতে তাঁর অবদান একটি মাইলস্টোন। প্লে-ব্যাক ও ডুয়েট সঙ্গীত নিয়ে তাঁর দেখানো পথেই আজও চলেছে ভারতীয় চলচ্চিত্র।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান