ইতিহাস

রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জী

রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জী (Rajendranath Mukherjee) একজন প্রখ্যাত বাঙালি শিল্পপতি তথা স্থপতি ছিলেন। মার্টিন অ্যান্ড কোং এর ডিরেক্টর হিসেবে রাজেন্দ্রনাথ ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, এসপ্ল্যানেড ম্যানসন, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, রামকৃষ্ণ মিশন, ত্রিপুরা প্যালেস, মাইসোর মেমোরিয়াল সহ আধুনিক হাওড়া ব্রিজের নক্সা তৈরি ও রূপায়ণের দায়িত্বে ছিলেন। শিল্প-বাণিজ্যের নানা কমিটিতে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি রাজেন্দ্রনাথ বেঙ্গল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন, বেঙ্গল ফ্লাইং ক্লাব এবং মোহনবাগান ক্লাবের মতো সংগঠনের সভাপতিও ছিলেন৷

১৮৫৪ সালের ২৩ জুন উত্তর ২৪ পরগণা জেলার বসিরহাট মহকুমার ভ্যাবলা গ্রামে রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জীর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ভগবানচন্দ্র মুখার্জী এবং মায়ের নাম ব্রহ্মময়ী দেবী। ভগবানচন্দ্রের তৃতীয়া পত্নী ব্রহ্মময়ী দেবীর গর্ভে রাজেন্দ্রনাথের জন্ম হয়। রাজেন্দ্রনাথের শিশু অবস্থাতেই তাঁর বাবার মৃত্যু হলে তিনি মায়ের কাছেই প্রতিপালিত হন।

রাজেন্দ্রনাথের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় গ্রামের পাঠশালায়। এরপর কালীগঞ্জের ইংরেজি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু কিছুদিন পর বসন্ত রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে বাঁচতে বারাসাতের এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে স্থানীয় ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা চালিয়ে যান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই আত্মীয়ের মৃত্যু হলে কিছুদিন আগ্রাতে মামাবাড়িতে গিয়ে পড়াশোনা করেন। শেষে মাত্র ১৭ বছর বয়সে কলকাতায় পারিবারিক সূত্রে যদুমতি দেবীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। রাজেন্দ্রনাথ এরপর স্কুলের পাঠ সম্পূর্ণ করে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য। তিন বছর পড়াশোনা করার পর ভগ্ন স্বাস্থ্যের কারণে মূল পরীক্ষায় বসতে পারেননি তিনি৷

মাসিক পনেরো টাকা বেতনে এক বাণিজ্য বিদ্যালয়ে গণিতের শিক্ষক হিসেবে রাজেন্দ্রনাথের কর্মজীবনে প্রবেশ ঘটে। রাজেন্দ্রনাথের জীবনের মোড় ঘুরে যায় আলিপুর চিড়িয়াখানায় কলকাতা পৌরসভার তৎকালীন মুখ্য ইঞ্জিনিয়ার ব্রাডফোর্ড লেসলি (Chief Engineer of Calcutta Corporation)-র সাথে একটি ঘটনার মাধ্যমে সাক্ষাতে। বারবার মিস্ত্রিদের কাজ বোঝাতে গিয়ে ভাষার জন্য সমস্যায় পড়েছিলেন লেসলি৷ ঘটনাস্থলে উপস্থিত রাজেন্দ্রনাথ লেসলির চাহিদা বুঝে নিয়ে বাঙালি মিস্ত্রিদের বুঝিয়ে দিয়ে কাজ সহজ করে দেন। রাজেন্দ্রনাথের দক্ষতায় সন্তুষ্ট লেসলি পলতায় জল প্রকল্প নির্মাণ কাজের দায়িত্ব রাজেন্দ্রনাথকে দিতে চাইলে তিনি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে বাণিজ্যের দুনিয়ায় রাজেন্দ্রনাথের সাম্রাজ্য বিস্তার চলতে থাকে ৷ তিনি লখনউ, এলাহাবাদ, আগ্রা, কানপুরে জলপ্রকল্প তৈরি করেন।

রাজেন্দ্রনাথ তৎকালীন বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার স্যার টমাস অ্যাকুইনাস মার্টিনের সঙ্গে অংশীদারিত্বে ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু ‘নেটিভ’ হওয়ার কারণে কোম্পানির নামকরণের সময় তাঁর নাম বাদ দিয়েই ১৮৯২ সালে গড়ে ওঠে ‘মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি’। ১৯০৬ সালে মার্টিনের মৃত্যুর পর রাজেন্দ্রনাথই হন ওই সংস্থার সিনিয়র পার্টনার৷ এরপর ‘মার্টিন অ্যান্ড কোং’ কলকাতা শহরের পরিচয় বহনকারী ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, হাওড়া ব্রিজ, বেলুড়মঠ ও মন্দির, টিপু সুলতান মসজিদ, বিধানসভা ভবন নির্মাণের মধ্য দিয়ে কার্যত কলকাতার রূপকার হয়ে ওঠে। ব্যবসা করতে গিয়ে রাজেন্দ্রনাথ অনুভব করেছিলেন শহরের সঙ্গে আশেপাশের গাঁ-গঞ্জকেও রেলপথে যুক্ত করতে হবে৷ সেই সময়, ব্রিটিশ সরকার নির্মিত রেলপথ মূলত বড় বড় শহরগুলিকেই যুক্ত করেছিল৷ তাই তিনি বেসরকারি উদ্যোগ হিসেবে ‘মার্টিন লাইট রেলওয়ে'(MLR) নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলেন যা মূলত ন্যারোগেজ রেল বা ছোট রেল রূপে গোটা দেশে পরিষেবা দিতে থাকে৷ এইভাবেই হাওড়া-আমতা, বারাসাত-বসিরহাট, বক্তিয়ারপুর-বিহার, আরা-সাসারাম, দিল্লি-সাহারানপুর ইত্যাদি রেলপথের রুট তৈরি হয় ৷ অপরদিকে পূর্ত বিভাগ থেকে বরাত পাওয়া নানা কাজ করতে গিয়ে রাজেন্দ্রনাথও অনুভব করেন নির্মাণ ব্যবসার জন্য লৌহ ইস্পাত কারখানার প্রয়োজনীয়তা। তাই ১৯০৭ সালে জামশেদপুরে জামশেদজী টাটার ছেলে দোরাবজি টাটা প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম ইস্পাত কারখানা(TISCO)-র পর রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জীর ‘মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি’র প্রয়াসে ১৯১৮ সালে জন্ম নেয় ‘ইস্কো’ (Indian Iron and Steel Company-IISCO) – দেশের দ্বিতীয় ইস্পাত কারখানা৷ বহুদিন ধরে এই দু’টি কারখানাই ছিল ভারতের ইস্পাত উৎপাদনের প্রধান উৎস৷ ১৯৩৬ সালে রাজেন্দ্রনাথের মৃত্যু হলেও তাঁর সুযোগ্য পুত্র স্যার বীরেন্দ্রনাথ মুখার্জীর হাত ধরে ‘ইস্কো’র সম্প্রসারণ ঘটার ফলে ৬০ দশকের শেষদিকেও বাঙালি নিয়ন্ত্রিত এই শিল্পগোষ্ঠীর হাতে থাকা সম্পত্তির পরিমাণ দেশের মধ্যে তৃতীয় স্থানে ছিল।

এগুলি ছাড়াও শিল্প বাণিজ্যের প্রসারের জন্য রাজেন্দ্রনাথ বহু সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯১০ সালে এলাহাবাদে ‘শ্রমশিল্প অর্থনৈতিক সমিতি’র সভাপতি পদে আসীন হন রাজেন্দ্রনাথ। ১৯২২ সালে ‘ভাগীরথী নদীর সেতু নির্মাণ কমিটি’র ও ১৯২৩ সালে ‘বাংলার ব্যয়সঙ্কোচ কমিটি’র সভাপতিরূপে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু অবদান রেখেছেন। তাছাড়া ১৯২৪ সালে ভারত সরকারের ব্যয়সঙ্কোচ কমিটি এবং ভারতীয় মুদ্রানীতি ও আয়-ব্যয় সংক্রান্ত কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। সমাজের উন্নতিকল্পে, নারী শিক্ষার জন্য তিনি নির্দ্বিধায় অর্থব্যয় করতেন। সুস্থ, সক্রিয় জীবনযাত্রার জন্য বাঙালিদের নিয়মিত খেলাধূলা ও শরীরচর্চা করার জন্য উৎসাহ দান করতেন রাজেন্দ্রনাথ।

শিবপুর বিই কলেজ (অধুনা আইআইইএসটি IIEST) তে অবস্থিত জিলেট অ্যান্ড জনসন কোম্পানি নির্মিত টারেট ক্লক টাওয়ারটি রাজেন্দ্রনাথ কলেজকে দান করেন ১৯১৯ সালে। এই কলেজে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৮৮৩ ব্যাচ-এর ছাত্র ছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডের ক্রয়ডন থেকে এই ঘড়িটি আনিয়েছিলেন তিনি।

১৯১০ সালে তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর এডওয়ার্ড বেকার রাজেন্দ্রনাথকে বেঙ্গল এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলে কৃষি ও শিল্প দফতর দিতে চাইলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। এরপর ১৯৩০ সালে বাংলার গভর্নর স্টানলি জ্যাকসন রাজেন্দ্রনাথকে অবিভক্ত বঙ্গ প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করতে অনুরোধ করলে সেই অনুরোধও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন৷

ব্রিটিশ সরকার ১৯০৮ সালে রাজেন্দ্রনাথকে ‘কম্প্যানিয়ন অব দ্য অর্ডার অব দ্য ইন্ডিয়ান এম্পায়ার’ (Companion of the Order of the Indian Empire, CIE) নিযুক্ত করে এবং ১৯১১তে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯২১ সালে কলকাতায় আয়োজিত ‘জাতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস’-এর (8th of Indian Science Congress) অষ্টম অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জী। ১৯২২-এ ইংরেজ সরকার তাঁকে ‘নাইট কমান্ডার অব দ্য রয়্যাল ভিক্টোরিয়ান অর্ডার’ (Knight Commander of the Royal Victorian Order KCVO) সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৩১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জীকে সাম্মানিক ডি.এস.সি (কারিগরি বিদ্যা) ডিগ্রি প্রদান করে। কলকাতার ডালহৌসি চত্বরে মিশন রো নামক রাস্তাটি পরবর্তী সময়ে তাঁর নামানুসারে আর.এন মুখার্জী রোড করা হয়। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে তাঁর স্মারক মূর্তিও স্থাপন করা হয়। তবে তাঁর মৃত্যুর পর বসিরহাট মহকুমা সম্মিলনীর উদ্যোগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত স্মৃতিসভাতে তদানীন্তন উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর ভাষণে যথার্থই বলেছিলেন যে তাঁর নামানুসারে একটি শিল্পশিক্ষার বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেই তাঁর স্মৃতির প্রতি যোগ্য সম্মান প্রদর্শন করা হতে পারে।

১৯৩৬ সালের ১৫ মে ৮২ বছর বয়সে কলকাতায় রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জীর মৃত্যু হয়।

তথ্যসূত্র


  1. বঙ্গ গৌরব- জলধর সেন (দ্বিতীয় খণ্ড) পৃষ্ঠা-১৪৩ - ১৪৫ এবং ২৬৫-২৬৭
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. https://aajkaal.in/
  4. https://www.aajkaal.in/
  5. https://www.kolkata24x7.com/
  6. http://archives.anandabazar.com/
  7. https://www.kmcgov.in/
  8. https://www.eimuhurte.com/
  9. http://www.srisaradamath.org/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন