সববাংলায়

রমেশচন্দ্র মজুমদার

ভারতের জাতীয়তাবাদী ইতিহাস ঘরানার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব আচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদার (Ramesh Chandra Majumdar)। ঔপনিবেশিক ইতিহাস চর্চার আগ্রাসনে যখন প্রাচ্যের তথা ভারতের মতো দেশের ইতিহাস একেবারে বিধ্বস্ত এবং অন্যদিকে যখন মার্কসীয় ও উত্তরাধুনিক ইতিহাস চর্চার দ্বারা জাতির অর্ধেক ইতিহাস প্রায় অন্ধকারে বিলীন, ঠিক সেই সময় জাতীয়তাবাদী ইতিহাস চর্চায় এক নবদিগন্ত উন্মোচন করেন ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার। সত্যনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ এবং তথ্য-প্রমাণ সাপেক্ষে ইতিহাস রচনায় তিনি ছিলেন এক যুগান্তকারী প্রতিভা।

১৮৮৮ সালের ৪ ডিসেম্বর অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার খান্দাপাড়া গ্রামে এক কুলীন বৈদ্য পরিবারে আচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদারের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম হলধর মজুমদার এবং মায়ের নাম বিন্দুমুখী দেবী। তাঁরা ছিলেন তিন ভাই। অত্যন্ত দারিদ্র্য আর কষ্টের মধ্যে দিয়ে তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে। শৈশবকাল থেকে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন রমেশচন্দ্র। বিদ্যালয়ে পড়াকালীন তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত হন। এছাড়াও তিনি ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের একনিষ্ঠ ভক্ত। জানা যায় যে, তাঁর মৃত্যুর সময়কালেও তাঁর বসার ঘরে স্বামীজীর এক বিশাল তৈলচিত্র ছিল। 

গ্রামের মাইনর স্কুলে রমেশচন্দ্রের প্রাথমিক শিক্ষা হলেও তা সম্পূর্ণ হয়নি। পরে ১৯০৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কটকের র‍্যাভেনশ’ কলেজে তিনি ভর্তি হন। সেখানে শিক্ষা শেষ করে, ১৯০৭ সালে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে স্নাতকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন ও বৃত্তি (scholarship) লাভ করেন। এরপর তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ১৯১১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রমেশচন্দ্র মজুমদার স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন এবং ১৯১৩ সালে তাঁর ইতিহাসমূলক গবেষণার জন্য ‘প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ’ বৃত্তি লাভ করেন। পিএইচডিতে তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘কর্পোরেট লাইফ ইন অ্যান্‌সিয়েন্ট ইণ্ডিয়া’ (Corporate Life in Ancient India) যা নিয়ে ১৯১৭ সালে তিনি থিসিস জমা দেন ও ১৯১৮ সালে থিসিসটি বই হিসেবে প্রকাশিত হয়।

১৯১৪ সালে ঢাকার অন্তর্গত গভর্মেন্ট ট্রেনিং কলেজে অধ্যাপক হিসেবে রমেশচন্দ্র মজুমদারের কর্মজীবন শুরু হয় আর এখান থেকেই তিনি শিক্ষকতার পেশায় প্রথম পা রাখেন। এর পাশাপাশি তাঁর ইতিহাসমূলক গবেষণা চলতে থাকে। এরপর প্রায় সাত বছর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ১৯২১ সালে নবপ্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন তিনি। পরবর্তীকালে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও উপাচার্য পদে পাঁচ বছর আসীন ছিলেন। ১৯৫০ সালে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ ‘কলেজ অফ ইন্দোলজি’ (College Of Indology)-তে অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত হন রমেশচন্দ্র। এরপর ‘ভারতীয় ইতিহাস কংগ্রেস’-এর সাধারণ সভাপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

ড. মজুমদার বেশ কিছুদিন নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ও আমেরিকার শিকাগো এবং পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি অধ্যাপক হিসেবে কিছুদিন কর্মরত ছিলেন তিনি। এছাড়াও গ্রেট ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড এবং বম্বের ‘রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি’র অবৈতনিক কর্মী ছিলেন তিনি। আনুমানিকভাবে ইংরেজি ও বাংলা মিলিয়ে মোট পঁয়ত্রিশটি বই এবং কয়েকশো নিবন্ধ তিনি রচনা করেন। মূলত তাঁর এই অগাধ পাণ্ডিত্যের কারণেই তাঁকে ‘আচার্য’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

বাংলার ইতিহাস নিয়ে তাঁর অন্যতম গবেষণাধর্মী গ্রন্থ হল ‘দ্য হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল’ (The History of Bengal) যা ১৯৪৩ সালে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে বাংলা তথা বাঙালি জাতির প্রাচীন সময়কালের ইতিহাসের যে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেন রমেশচন্দ্র তা বাংলার ইতিহাসে এক অন্যমাত্রা এনে দেয়। কেবল বাংলা নয়, ভারতের ইতিহাসকে বিভিন্ন যুগে ভাগ করে তার যে নিখুঁত ইতিহাস তিনি তাঁর গ্রন্থ ‘Corporate Life In Ancient India’-তে দেখান তা ঐতিহাসিকদের কাছে এক অন্যতম সেরা ঐতিহাসিক সম্পদ বলে গণ্য হয়েছে যুগ যুগ ধরে। ১৯৭৬ – ১৯৭৭ সালের মধ্যে প্রকাশিত হয় তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘হিস্ট্রি অ্যাণ্ড কালচার অফ ইণ্ডিয়ান পিপ্‌ল’ (History And Culture Of Indian People)। এই গ্রন্থে প্রাচীন তথা বৈদিক যুগ থেকে আধুনিক যুগ অবধি ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির যে বিবর্তন তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন রমেশচন্দ্র মজুমদার। কেউ কেউ এই গ্রন্থটিকে ‘ভারতের প্রাচীনযুগ ও আধুনিক যুগের সেতুবন্ধনী’ বলেও মন্তব্য করেন। 

প্রামাণ্য তথ্যানুযায়ী, ঠিক যে সময় ড. মজুমদার গবেষণার কাজে হাত দেন, সেই সময় প্রাচীন ভারতের ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে যথেষ্ট তথ্যের অপ্রতুলতা ছিল। এই তথ্যের অপ্রতুলতা বহু ঐতিহাসিকই স্বীকার করেছেন যেমন ড. আর. ভাণ্ডারকর, কে. পি জয়সওয়াল প্রমুখ ঐতিহাসিক একথা স্বীকার করে নেন। এতদ্‌সত্ত্বেও প্রাচীন ভারতের ইতিহাস চর্চা ও রচনার জন্য রমেশচন্দ্র প্রাথমিক সূত্রের দ্বারা যেভাবে সঠিক তথ্য সহযোগে ইতিহাস রচনা করেছেন সেখানেই তাঁর ঐতিহাসিক হিসেবে সার্থকতা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আঞ্চলিক ইতিহাস তথা  বিষয়েও তাঁর একাধিক মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ রয়েছে।

এখানেই থেমে থাকেনি তাঁর ইতিহাসচর্চা। ভারতের বাইরে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস নিয়েও বহু গবেষণামূলক গ্রন্থ রয়েছে তাঁর। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ‘চম্পা, এনসিয়েন্ট ইন্ডিয়ান কলোনিজ ইন দি ফার ইস্ট’ (Champa, Ancient Indian colonies In the Far East) গ্রন্থে তিনি সুদূর অতীতে প্রাচ্যের প্রাচীন ভারতীয় উপনিবেশ ‘চম্পা’ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। এছাড়াও ‘সুবর্ণদ্বীপ’ (Suvarnadipa), ‘কম্বোজ দেশ’ (Kambuja Desa) প্রভৃতি সম্পর্কে নানা অজানা ইতিহাস তাঁর গ্রন্থ ‘ভারত ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার ইতিহাস’-এ প্রকাশ করেছেন তিনি। লাক্ষাদ্বীপের ইতিহাস নিয়ে লেখা তাঁর অন্যতম গ্রন্থ ‘দি হিস্ট্রি অফ এনসিয়েন্ট লাক্ষাদ্বীপ (The History of Ancient Lakshadweep!)

বলা বাহুল্য,  রমেশচন্দ্র এই ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে দিনের পর দিন এই সকল স্থানে থেকে এই সকল অঞ্চলের মানুষের তথ্য সংগ্রহ করে এই গ্রন্থগুলি রচনা করেছেন। রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর আত্মজীবনী  ‘জীবনের স্মৃতিদীপে’- বইতে বলেছেন যে একজন ঐতিহাসিক সর্বদা আবেগ-কুসংস্কার এবং পূর্বপরিকল্পিত ধারণা থেকে মুক্ত থাকবেন। আবার তিন খন্ডের ‘ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস’ (The History of Freedom Movement In India) গ্রন্থেও তিনি বলেন যে ইতিহাসের উপর কখনোই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাব খাটানো যাবে না। একজন ঐতিহাসিকের কাজ সত্যদৃষ্টি নিয়ে তথ্য সহযোগে ইতিহাস রচনা। তাঁর এগারো খন্ডের ‘ভারতবাসীর ইতিহাস কৃষ্টি সংস্কৃতি’ গ্রন্থেও ঐতিহাসিকদের ইতিহাস নির্মাণ সম্পর্কে কিরূপ দৃষ্টিকোণ থাকা দরকার সেই নিয়ে বহু বিষয় আলোচনা করেছেন তিনি। এই গ্রন্থের সম্পাদনা করেছিলেন রমেশচন্দ্র  এবং কে. এন. মুন্সী সম্মিলিতভাবে। রমেশচন্দ্র মজুমদার এক্ষেত্রে কে. এন. মুন্সীর যথেষ্ট সুখ্যাতি করেছিলেন। অন্যদিকে এই গ্রন্থ রচনা বা তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে রমেশচন্দ্র মজুমদার সম্পর্কে কে.এন মুন্সীও বিশ্বাসী ছিলেন। 

ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের বহু অজানা তথ্য ও সত্যনিষ্ঠ বিষয়কে তিনি তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে স্থান দেন যে কারণে একাধিক বার সরকারের রোষের মুখে তাঁকে পড়তে হয়। সিপাহি বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরতে ভারত সরকার তাঁকে একরকম বাধ্য করার চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি তথ্য-প্রমাণ ও যুক্তির সাহায্যে দেখান যে সিপাহি বিদ্রোহ কোনো স্বাধীনতা আন্দোলন ছিল না, এমনকি তা সংগঠিত আন্দোলন হিসেবেও সফল নয় কারণ দেশের অধিকাংশ মানুষই এতে যোগ দেয়নি। এরপরই ঐতিহাসিক মজুমদারের সাথে বিবাদ বাধে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদের। এই বিরোধের প্রধান কারণই ছিল এই সিপাহি বিদ্রোহ সংক্রান্ত মতানৈক্য। প্রথমত, সরকার বারবার একটি ভুল বিষয় প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করছিল যে এই যুদ্ধে হিন্দু-মুসলিম একত্রিত হয়ে যোগ দেয়। কিন্তু এই তথ্য ড. মজুমদার খারিজ করে দেন এবং বলেন হিন্দু-মুসলিম বরাবরই দুই জাতি পৃথক সত্তা নিয়ে এদেশে ছিল।  রমেশচন্দ্র তাঁর গবেষণা মারফত দেখাতে চেয়েছিলেন যে ভারতের পরাধীনতার ইতিহাস শুরু হয় ব্রিটিশদের আসার বহু পূর্ব থেকে তথা ইসলামিক শাসকদের আক্রমণের সময় থেকে। তিনি দেখান, সুদূর অতীতে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে পৃথ্বীরাজ চৌহানের পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গেই ভারতের স্বাধীনতার সূর্যাস্ত হয়। এই তথ্য মানতে চাননি মৌলানা আবুল কালাম আজাদ। আরব-তুর্কি এরা প্রত্যেকেই বর্হিশক্তি, তাই দেশীয় শক্তি যখন বৈদেশিক শক্তির কাছে পরাজিত হয় এবং একটি দেশের আপামর জাতি যখন বর্হিশক্তির অধীনে আসে তখনই তো পরাধীনতা নেমে আসে। ফলে রমেশচন্দ্র মজুমদারের ব্যাখ্যায় কোনো যুক্তিগত ভ্রান্তি ছিল না।   এরপরেও ড. মজুমদারের কথায় কেউ কর্ণপাত করেননি। শেষ পর্যন্ত এই কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন তিনি এবং সেই জায়গায় কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান ঐতিহাসিক তারাচাঁদ।

১৯৮০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ৯১ বছর বয়সে আচার্য ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. “জীবনের স্মৃতিদীপে”, লেখক- ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার, জেনারেল পাবলিকেশন, প্বৃষ্ঠা- মুখবন্ধ
  2. On Dr R.C Majumdar:The Historian of India, by S.B Chaudhuri, জয়শ্রী পত্রিকা:বৈশাখ:১৩৮৫ (পৃষ্ঠা:-১০৭-১১২) 
  3. Dr. R.C Majumdar:My Reminiscence, by P.N chopra, জয়শ্রী পত্রিকা…(পৃষ্ঠা:-১১৩-১১৭)
  4. Reviewed Work: History of the Freedom Movement in India. Vol. I by R. C. Majumdar
    Review by: B. N. Pandey
    The Journal of the Royal Asiatic Society of Great Britain and Ireland
    No. 1/2 (Apr., 1966), pp. 86-87 (2 pages)
    Published By: Cambridge University Press
  5. https://swarajyamag.com/
  6. https://unbumf.com/
  7. https://bharatabharati.in/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading