ইতিহাস

রশিদ করিম

বাংলাদেশের বিখ্যাত ঔপন্যাসিক রশিদ করিম (Rashid Karim) ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একজন উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক। রশিদ করিমের লেখার মূল উপজীব্য ছিল সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজ, এবং বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক অবস্থা। মানুষের জীবন যাপন, দৈনন্দিন সংকট, নানান ওঠা-পড়া তাঁর উপন্যাস বা ছোটগল্পের প্রধান বিষয় বস্তু ছিল। তাঁর সাহিত্য জীবনকে কয়েকটি স্পষ্ট বিভাগে ভাগ করে নেওয়া যায়। প্রথমটি ব্রিটিশ পর্ব, দ্বিতীয়টি পাকিস্তান পর্ব এবং তৃতীয় তথা শেষ পর্বটি হলো বাংলাদেশ পর্ব। দেশভাগের স্মৃতি, রাজনৈতিক অবস্থান সবকিছুই তাঁর সাহিত্যে ঘুরেফিরে এসেছে। এর মধ্যেও রশিদ করিম মানুষের কথা, তাঁদের বহুমাত্রিক সমস্যার কথা তুলে ধরতে ভোলেননি।

১৯২৫ সালের ১৪ আগস্ট কলকাতায় রশিদ করিমের জন্ম হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত তৎকালীন ক্যালকাটা ইসলামিয়া কলেজ বর্তমানে যা মৌলানা আজাদ কলেজ নামে পরিচিত, সেখান থেকে স্নাতক স্তরের পড়াশোনা শেষ করেন। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পরে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে গেলে রশিদ করিম তাঁর পরিবারসহ বাংলাদেশের ঢাকায় চলে যান।

তাঁর সাহিত্যিক জীবনকে তিনটি বিভাগে ভাগ করলে দেখা যায় যে তিনি ব্রিটিশ পর্বে লেখালেখি শুরু করেন, পাকিস্তান পর্বে অর্থাৎ বাংলাদেশ পরাধীন থাকাকালীন তাঁর সাহিত্য জীবন আপন গতিতে এগোতে থাকে এবং তৃতীয় অর্থাৎ শেষ পর্বে স্বাধীন বাংলাদেশে বসে তিনি তাঁর সবথেকে জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকীর্তিগুলি সৃষ্টি করেন। যদিও মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি তাঁর প্রথম গল্পটি লেখেন তবে তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্প কিন্তু এটি ছিল না। ১৯৪২ সালে মহম্মদ নাসিরুদ্দিনের (Mohammad Nasiruddin) ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রথম রশিদ করিমের একটি গল্প প্রকাশিত হয়।

এরপরে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত তিনি আর কিছু লেখেননি। ১৯৬১ সালের পর থেকে তাঁর সাহিত্য জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয় বলা যায়। সেই বছরেই তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘উত্তম পুরুষ’’ প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। এই উপন্যাসের জন্যই তিনি ১৯৬৯ সালে আদমজি সাহিত্য পুরস্কার (Adamjee Literary Award) পান।তার দু বছর পরে অর্থাৎ ১৯৬৩ সালে ‘প্রসন্ন পাষাণ’ উপন্যাসটি তাঁকে প্রভূত খ্যাতি এনে দেয়। এই উপন্যাসটির জন্যই তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক হিসেবে পরিচিতি পান।

এই প্রভূত খ্যাতি, জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও তিনি সাহিত্য সৃষ্টি থেকে আবার প্রায় এক দশকের বিরতি নেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পরে ১৯৭৩ সালে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘আমার যত গ্লানি’ প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসটি তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেয়। এত দিন পর্যন্ত মানুষ তাঁকে এমন একজন লেখক হিসেবে চিনতেন যিনি অল্প সংখ্যক লেখা লিখলেও তাঁর প্রতিটি লেখাই ছিল অসামান্য। কিন্তু ‘আমার যত গ্লানি’ প্রকাশিত হওয়ার পরে তিনি নিয়মিত লেখালেখি করা শুরু করেন। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আরেকটি উপন্যাস ‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’।

রশিদ করিমের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তাঁর বিষয় নির্বাচনের স্বতন্ত্রতা, এবং বাস্তব জীবন অভিজ্ঞতা। তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস ‘উত্তম পুরুষ’-এ তিনি তৎকালীন কলকাতার মুসলিম সমাজের একটি সার্বিক ছবি তুলে ধরেছেন। ‘প্রসন্ন পাষাণ’ উপন্যাসেও ব্যক্তিমানুষের জীবনের দ্বন্দ্বের সঙ্গে সমাজ-বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। দেশভাগের পটভূমিতে লেখা ‘আমার যত গ্লানি’ উপন্যাসে সফলভাবে মানুষের মনঃস্তত্ত্ব এবং বহির্সমাজকে তুলে ধরেছেন। ‘প্রেম একটি লাল গোলাপ’ তাঁর একটি মনঃস্তাত্ত্বিক উপন্যাস যেটি তাঁর বিশেষ জনপ্রিয় একটি উপন্যাস।

তাঁর লেখায় সমালোচকেরা আত্মজীবনীর ছোঁয়া পান। সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের সামাজিক রাজনৈতিক জীবনের কথা বলাই তাঁর সাহিত্যের উদ্দেশ্য। দেশভাগের পরে কলকাতা ছেড়ে সপরিবারে ঢাকা চলে যাওয়ার বিষয়টিও তাঁর লেখায় বিশেষ প্রভাব ফেলেছে বলেই সমালোচকদের অভিমত। আধুনিক মানুষের অন্তরকে সাধারণ পাঠকের কাছে উন্মুক্ত করতে তিনি প্রথিতযশা ছিলেন। বাংলা সাহিত্যের জগতে তাঁর সমসাময়িক কোনো সাহিত্যিককেই এভাবে মানুষের মনের অন্দরমহলের খোঁজ পাঠককে দিতে দেখা যায়নি। সব মিলিয়ে আধুনিক মানুষকে সাহিত্যের জগতে প্রকাশ করানোর ক্ষেত্রে তিনি পথিকৃৎ।

তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি লেখা হল, ‘একালের রূপকথা’ (১৯৮০), ‘সাধারণ লোকের কাহিনী’ (১৯৮২), ‘সোনার পাথরবাটি’, ‘মায়ের কাছে যাচ্ছি’, ‘চিনি না’, ‘বড়ই নিঃসঙ্গ’, ‘পদতলায় রক্ত’, ‘লাঞ্চ-বক্স’। এছাড়াও, ‘প্রথম প্রেম’ নামে তাঁর একটি ছোটগল্প সংগ্রহ আছে। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মজীবনী ‘জীবন-মরণ’।

আদমজি সাহিত্য পুরস্কারের পাশাপাশি তাঁর অনবদ্য সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি ১৯৭২ সালে বাংলা আকাদেমি সাহিত্য সম্মান, ১৯৮৪ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯১ সালে লেখিকা সংঘ সম্মান পান।

মৃত্যুর আগে শেষ ১৯ বছর রশিদ করিম পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি একবর্ণ লিখতে পারেননি। ২০১১ সালের ২৬ নভেম্বর ঢাকার ইব্রাহিম কার্ডিয়াক সেন্টারে ৮৬ বছর বয়সে রশিদ করিমের মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

সাহিত্য অনুরাগী?
বাংলায় লিখতে বা পড়তে এই ছবিতে ক্লিক করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন