ইতিহাস

রোহিনী গডবোল

রোহিনী গডবোল (Rohini Godbole) একজন ভারতীয় তাত্ত্বিক মহিলা পদার্থবিদ যিনি ভারতবর্ষের খ্যাতনাম্নী মহিলা পদার্থবিদদের মধ্যে অন্যতম। বেঙ্গালুরুতে অবস্থিত ‘ইণ্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স’-এর (IIS) অধীনে ‘সেন্টার ফর হাই এনার্জি ফিজিক্স’-এর অধ্যাপক রোহিনী হিগ’স কণা নিয়ে প্রায় তিন দশক একনিষ্ঠ গবেষণা করেছেন। ‘ইণ্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স’ পরিচালিত বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে উদ্যোগী মহিলাদের জন্য নির্মিত একটি প্যানেলের প্রধান রোহিনী গডবোল। এই সংস্থার পক্ষ থেকে বিজ্ঞানের গবেষণায় যাতে মহিলারা এগিয়ে আসেন তার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করে চলেছেন তিনি। সাম্প্রতিককালে ফ্রান্স সরকারের পক্ষ থেকে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ‘অর্ডার অফ মেরিট’ (Order Of Merit) পুরস্কারে ভূষিত হন। ভারতের কয়েকজন বিশিষ্ট মহিলা বিজ্ঞানীর জীবনী সংকলিত করে রাম রামস্বামীর সহযোগিতায় রোহিনী গডবোল একটি বই প্রকাশ করেছেন ‘লীলাবতী’স ডটারস’ নামে। আজীবন বহু জটিল গবেষণা আর নিরন্তর বিদ্যায়তনিক প্রবন্ধ রচনায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন তিনি যা ভারতের পদার্থবিদ্যার গবেষণার ইতিহাসে স্মরণীয় অবদান রেখে চলেছে।

মহারাষ্ট্রের পুনের এক ছোট্ট শহরে ১৯৫২ সালের ১২ নভেম্বর রোহিনী গডবোলের জন্ম হয়। রোহিনীর পরিবারে শিক্ষার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। তাঁর বাবা মধুসূদন গণেশ গডবোল এবং মা মালতি মধুসূদন গডবোলের আরো তিন কন্যা সন্তান ছিল। রোহিনীর সেই তিন বোনই বিজ্ঞানের সঙ্গে জড়িত যাদের মধ্যে এক বোন চিকিৎসক এবং বাকি দুই বোন শিক্ষিকার পেশায় রয়েছেন। ছোটোবেলা থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি রোহিনীর ছিল অসীম আগ্রহ। কিন্তু রোহিনী ছোটবেলায় যে বালিকা বিদ্যালয়ে পড়তেন সেখানে বিজ্ঞান পড়ানো হতো না। বিজ্ঞানের বিষয়গুলি নিয়ে পড়বার জন্য সেই সময় একটি বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। এই বৃত্তি পাওয়ার জন্য নিজের প্রচেষ্টায় রোহিনী বিজ্ঞানের বিষয়গুলি পড়তে শুরু করেন।

স্থানীয় সেই বালিকা বিদ্যালয়েই রোহিনী গডবোলের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। পরে ১৯৭২ সালে পুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন স্যার পরশুরামভাউ কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যা, গণিত ও রাশিবিজ্ঞান নিয়ে প্রথম বিভাগে স্নাতক উত্তীর্ণ হন তিনি। খুব অল্প বয়স থেকেই অঙ্ক ও পদার্থবিদ্যা পড়তে খুব ভালোবাসতেন রোহিনী। সেই সময় স্বাভাবিকভাবেই তিনি জানতেন না যে গবেষণাকেও পেশা হিসাবে গ্রহণ করা যায়।

রোহিনী প্রথমে গণিতবিদ হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভবিষ্যতে যদি চাকরি না পান এই আশঙ্কায় তিনি পদার্থবিদ্যায় মনোনিবেশ করেন। ১৯৭৪ সালে মুম্বাইয়ের ‘ইণ্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’ থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতকোত্তর স্তরে প্রথম হন রোহিনী গডবোল। এরপর ডক্টরেট ডিগ্রি লাভের উদ্দেশ্যে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেবার কথা মনস্থির করেন। ১৯৭৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টোনি ব্রুকে ‘স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক’ থেকে তিনি কণা পদার্থবিদ্যায় (Particle Physics) পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করে দেশে ফিরে আসেন।

১৯৭৯ সালে মুম্বাইয়ের ‘টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ’-এ ভিজিটিং ফেলো (Visiting Fellow) হিসাবেই রোহিনী গডবোলের কর্মজীবন শুরু হয়। দীর্ঘ তিন বছর এই সংস্থায় যুক্ত থাকার পরে ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বম্বে ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ্যা বিভাগে লেকচারার পদে এবং ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এখানেই রিডার পদে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। ১৯৯৫ সালে বেঙ্গালুরুর ‘ইণ্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স’-এর অধীনে ‘সেন্টার ফর হাই এনার্জি ফিজিক্স’ সংস্থায় সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন রোহিনী গডবোল এবং এই সংস্থাতেই ১৯৯৮ সালে সম্মানিত অধ্যাপকের পদে উত্তীর্ণ হন। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ রোহিনী গডবোল হিগ্‌স পার্টিক্‌ল (Higgs Particle) বা হিগ্‌স-বোসন পার্টিক্‌লের (Higgs-Boson Particle) অনুসন্ধানের জন্য প্রায় ৩৫ বছর ধরে গবেষণা করছেন। হিগ্‌স পার্টিক্‌ল হল কণা-পদার্থবিদ্যার স্ট্যাণ্ডার্ড মডেলের একটি প্রাথমিক কণা (Elementary Particle)। এই কণাটি ঘূর্ণণে অক্ষম বা স্পিন জিরো (Spin ০) এবং এটি তড়িৎ আধান ও রঙহীন। কণাটি এতটাই অস্থিতিশীল যে অন্য কণার ওপর সহজেই তা প্রভাব বিস্তার করে। ফলে ‘কণা প্রপঞ্চবিজ্ঞান’ অর্থাৎ ‘পার্টিক্‌ল ফেনোমেনোলজি’-র (Particle Phenomenology) বিভিন্ন দিক নিয়ে দীর্ঘ তিন দশক ধরে তিনি কাজ করছেন। বিশেষত কণা পদার্থবিদ্যার প্রচলিত ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’ (Standard Model) এবং এই মডেলের অতিরিক্ত কিছু বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত পদার্থবিদ্যা অর্থাৎ ‘ফিজিক্স বিয়ন্ড ইট’ (Physics Beyond It) নিয়েও নিরন্তর গবেষণা করেছেন রোহিনী গডবোল। কণা পদার্থবিদ্যার ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’-এর যে দিকটি নিয়ে তিনি বর্তমানে কাজ করছেন, তা মহাবিশ্বের প্রাথমিক কণাগুলির (Primary Particle) ধর্ম ও ব্যবহার বুঝতে সাহায্য করে। উচ্চশক্তি সম্পন্ন ফোটন কণার ‘হ্যাড্রোনিক গঠন’-এর (Hadronic Structure) উপর তাঁর কাজ পরবর্তী প্রজন্মের(Next Generation) উন্নত ‘ইলেক্ট্রন পজিট্রন কোলাইডার’-এর (Electron Positron Collidar) নকশা বানাতে সাহায্য করবে। এই যন্ত্রের মাধ্যমে মহাবিশ্বের গঠনও বোঝা যাবে বলে ধারণা করেছেন রোহিনী। ভারতের তিনটি বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির নির্বাচিত সদস্যা রোহিনী গডবোল যথা- ‘দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স’, ‘ইণ্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স’ এবং ‘ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স’। শুধু তাই নয় ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স’ (TWAS)-এর অধীন ‘সায়েন্স অ্যাকাডেমি অফ ডেভলপিং ওয়ার্ল্ড’-এর নির্বাচিত সদস্যা প্রফেসর গডবোল। তিনি ‘ইউরোপীয়ান রিসার্চ ল্যাব’-এর অন্তর্গত ‘ইন্টারন্যাশনাল লিনিয়ার কোলাইডার’-এর ‘ইন্টারন্যাশনাল ডিটেক্টর অ্যাডভাইসরি গ্রুপ’ (IDAG) সদস্যাও বটে। ২০০২ সালে মহিলা পদার্থবিদদের নিয়ে প্যারিসে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি আমন্ত্রিত হন। এই সম্মেলনে মহিলা বিজ্ঞানীদের স্বল্প উপস্থিতি ও নানারকম আলোচনা থেকে তিনি বুঝতে পারেন, সমাজে এখনো মহিলা বিজ্ঞানীদের গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো সুষ্ঠ পরিবেশ তৈরি হয়নি। প্রথম দিকে তিনি নিজেও জানতেন না যে বিজ্ঞানের গবেষণা করেও জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব। মহিলা বিজ্ঞানী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তিনি অন্যান্য উদীয়মান মহিলা বিজ্ঞানীদের কাছে স্বয়ং একটি আদর্শ হয়ে উঠেছিলেন।

‘থিওরি অ্যাণ্ড ফেনোমেনোলজি অফ এস পার্টিকেল : অ্যান ইন্ট্রোডাকশন অফ ফোর ডাইমেনশনাল এন=১ সুপারসিমেট্রি ইন হাই এনার্জি ফিজিক্স’ (Theory And Phenomenology Of Sparticles: An Account Of Four-dimensional N=1 Supersymmetry In High Energy Physics) শীর্ষক একটি গ্রন্থ রচনা করেন রোহিনী গডবোল যেখানে উচ্চশক্তি পদার্থবিদ্যা ও মহাবিশ্ববিজ্ঞান অর্থাৎ কসমোলজি বিষয়ক নানা তথ্য সহজভাবে বিবৃত হয়েছে। এর পরে ২০০৮ সালে রামকৃষ্ণ রামস্বামীর সঙ্গে যুগ্মভাবে ‘লীলাবতী’স ডটারস – দ্য ওমেন সায়েন্টিস্টস অফ ইণ্ডিয়া’(Lilavati’s Daughters – the Women Scientists of India) নামে একটি গ্রন্থ সম্পাদনা করেন রোহিনী যা আসলে ভারতের কয়েকজন বিখ্যাত মহিলা বিজ্ঞানীদের জীবনীর সংকলন। ২০১০ সালে ‘এ গার্ল’স গাইড টু লাইফ ইন লাইফ সায়েন্স’ নামে আরেকটি গ্রন্থ সম্পাদনা করেন তিনি। দেড়শোটিরও বেশি বিজ্ঞান-বিষয়ক গবেষণাপত্র রচনা করেছেন রোহিনী গডবোল। তাঁর এক সহকর্মী পাঞ্চেরীর সঙ্গে যৌথভাবে পদার্থবিদ্যায় অতি প্রয়োজনীয় ‘গডবোল-পাঞ্চেরী’ মডেলের প্রস্তাবনা দেন তিনি।

বিজ্ঞান নিয়ে অনেক দূর অগ্রসর হওয়ার পর, এমনকি পিএইচডি করার পরও অনেক মহিলাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় বিবাহিত জীবনে স্বামী, সন্তান ও অন্যান্য সাংসারিক কাজকে মূল্য দিতে গিয়ে নিজেদের বিজ্ঞান সাধনার স্বপ্নকে তারা বিসর্জন দিয়ে ফেলেন। তাই রোহিনী গডবোল এবং রামস্বামী দুজনে মিলে নানাবিধ কর্মশালার আয়োজন করতেন, মহিলাদের বিজ্ঞান নিয়ে পড়বার পরামর্শ দিতেন, জীবনে অনেকরকম বাধা-বিপত্তি এলেও কীভাবে নিজের গবেষণায় মনোনিবেশ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা যায় তার উপায় বলতেন। মহিলা গবেষকদের কাছে রোহিনী এক ‘রোল মডেল’-এ পরিণত হন। বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ছাড়াও গডবোলের আরেকটি পরিচয় ছিল। একজন ‘সায়েন্স কমুনিকেটর’ (Science Communicator) হিসেবে বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় নানা আকর্ষণীয় তথ্য প্রচার করে মানুষের মনে বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞানের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করতেন রোহিনী এবং বিজ্ঞানের চেতনা বাড়াতে, গবেষক হতে তাদেরকে তিনি উদ্বুদ্ধ করতেন।

বিজ্ঞানজগতে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি প্রচুর পুরস্কার পেয়েছেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ২০০৭ সালে ন্যাশনাল অ্যাকাডেমির পক্ষ থেকে ফেলোশিপ, ২০০৯ সালে ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি’-র পক্ষ থেকে ‘সত্যেন্দ্রনাথ বসু পদক’ এবং ‘অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স অফ ডেভেলপিং ওয়ার্ল্ড’-এর ফেলোশিপ পান রোহিনী গডবোল। ২০১৫ সালে ‘নিউ ইণ্ডিয়ান এক্সপ্রেস গ্রুপ’ তাঁকে ‘দেবী’ পুরস্কারে সম্মানিত করে। সর্বোপরি ভারতের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মান ‘পদ্মশ্রী পুরস্কার’ লাভ করেন তিনি ২০১৯ সালে। ২০২১ সালে ‘ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল অর্ডার অফ মেরিট’ পুরস্কারে ভূষিত হন রোহিনী গডবোল। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসবাসকারী ব্যক্তি অসামরিকক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে এই পুরস্কারটি পেয়ে থাকেন।

রোহিনী গডবোল বর্তমানে ইণ্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্সে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।