ইতিহাস

সাদাত হাসান মান্টো

খ্যাতনামা সাহিত্যিক সাদাত হাসান মান্টো ( Saadat Hasan Manto) ছিলেন উপমহাদেশে ঘটে যাওয়া দাঙ্গা, দেশভাগ, বিচ্ছিন্ন অবস্থার শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী৷  হাহাকার, দাঙ্গার আতঙ্ক, সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত বিদ্বেষ তাঁর গল্পে বারে যে দক্ষতায় ফুটে উঠেছে তেমনটা আর কারও ওঠেনি।

১৯১২ সালের ১১ মে মাসে পাঞ্জাবের (স্বাধীনতা পূর্ববর্তী) লুধিয়ানার পাপরউদি গ্রামে সাদাত হাসান মান্টো জন্মগ্রহণ করেন৷ তাঁর বাবা ছিলেন আঞ্চলিক আদালতের বিচারক।  কাশ্মিরী বংশভূত পরিবারে জন্ম নেওয়ায় মান্টো’র যথেষ্ট গর্ববোধ ছিল৷ 

সাদাত হাসান মান্টোর প্রাথমিক পড়াশুনা শুরু হয় অমৃতসরের মুসলিম হাই স্কুলে। এরপর তিনি আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন৷ ১৯৩২ সালে তাঁর বাবার মৃত্যুর পর মান্টো  অসহায় হয়ে পড়েন। পরিবারের অর্থ কষ্ট মেটানোর জন্য উপার্জনের পথ খুঁজে নিতে হয় তাঁকে ।

মান্টোর কর্ম জীবন শুরু হয়েছিল অনুবাদক হিসেবে৷ মান্টো সর্বপ্রথম ভিক্টর হুগোর ‘দ্য লাস্ট ডে অফ আ কনডেমেন্ড ম্যান’ ( The Last Day of a Condemned Man)  এর ঊর্দূ অনুবাদ করেন যেটি ঊর্দূ বুক স্টল থেকে ‘ সরগুজা-এ-আসির’  (Sarguzasht-e-Aseer)  নামে প্রকাশিত হয়েছিল৷ এরপর তিনি লুধিয়ানা থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকীয় কর্মী হিসেবে কাজে যোগ দেন। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পরই তিনি ইন্ডিয়ান প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের (আইপিডব্লিউএ) সঙ্গে যুক্ত হন৷ ১৯৩৪ সালে তিনি বোম্বাইতে আসেন এবং হিন্দি সিনেমা জগতের জন্য বিভিন্ন পত্রিকা, সংবাদপত্র এবং স্ক্রিপ্ট লেখা শুরু করেন । এই সূত্রেই  নূরজাহান, নওশাদ, ইসমত চুঘতাই, শ্যাম এবং অশোক কুমারের সঙ্গে তাঁর ভাল বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তীসময়ে ১৯৪১ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিও-র উর্দু পরিষেবাতে লেখার কাজও তিনি শুরু করেছিলেন। 

সাদাত হাসান মান্টোর উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বের মধ্যে পড়ে তাঁর সাহিত্যজীবন। মূলত ঊর্দূ ভাষায় তিনি সাহিত্যচর্চা করেছেন৷ তাঁর রচনাগুলির মধ্যে বাইশটি  ছোটগল্প, একটি উপন্যাস, পাঁচটি ধারাবাহিক রেডিও নাটক, তিনটি প্রবন্ধ সংগ্রহ এবং দুটি ব্যক্তিগত রূপরেখা রয়েছে। তাঁর লেখা ছোটোগল্পগুলো যথেষ্ট চর্চিত হয়েছে৷ মান্টোর লেখায় আমরা সমাজের সেই কঠিন সত্য সম্পর্কে জানতে পারি যা আগে কখনও কোন লেখায় তেমন ভাবে পাইনি । এই প্রসঙ্গে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ভারত পাকিস্তান বিভাজনের গল্পগুলি বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া বহু বলিউড সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে প্রথম শ্রেনীর চিত্রাভিনেতা ও পরিচালকদের কাছে মান্টোর কদর যথেষ্টই ছিল। 

মান্টোর জীবনেও সব থেকে বড় বাঁকটি এসেছিল ১৯৩৩ সালে, যখন তাঁর বয়স একুশ।  সেই সময় তাঁর পরিচয় ঘটে বিতর্কিত  লেখক আবদুল বারী অলিগের সঙ্গে। তিনি মান্টোকে  রাশিয়ান এবং ফরাসী সাহিত্য চর্চায় উৎসাহ দেন।

মান্টোর রচিত দ্বিতীয় গল্প “ইনকলাব পাসান্দ” আলিগড় পত্রিকায় ১৯৩৫ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত হয়েছিল।  ১৯৪১ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিয়োতে কাজ নেওয়ার পরবর্তী আঠারো মাস তাঁর জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল বলা চলে। তিনি এই সময়ে রেডিও -র জন্য চার নাটকের সংকলন লেখেন৷ যেগুলি হল – ‘ আও ‘ ( Aao (Come), ‘মান্টো কে ড্রামে (Manto ke Drame), জানাজে্ ‘(Janaze)  এবং ‘ তিন অওরাতে'(  Teen Auraten)। এরপর তাঁর ছোটোগল্পের সংকলন ‘ধুয়ান’ (ধোঁয়া) প্রকাশ পায়।  তিনি হয়ে ওঠেন উর্দু সাহিত্যের একজন জনপ্রিয় ছোটগল্পকার। তাঁর বিখ্যাত গল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য  টোবা টেক সিং, তামাশা, ঠান্ডা গোশত, কালি সালোয়ার, খালি বোতল, ধুঁয়া ইত্যাদি। তার রচনায় দেশভাগ, সাম্প্রদায়িকতা, দাঙ্গা , মানব চরিত্রের বীভৎসতা বারংবার ঘুরে ফিরে আসে। 

তাঁর রচিত ছোটো গল্প ‘টোবা টেক সিং ‘বহু আলোচিত ও বিখ্যাত একটি ছোটগল্প। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত এই গল্পটি ভারত পাকিস্তান দেশভাগের প্রেক্ষাপটে লেখা। ভারত, পাকিস্তান স্বাধীনতা ও দেশভাগের দুই তিন বছর পরে দুই দেশের সরকার সিদ্ধান্ত নেন দেশের পাগলদেরও ভাগাভাগি হবে। অর্থাৎ হিন্দু পাগলদের ভারত এবং মুসলিম পাগলদের পাকিস্তানে পাঠানো হবে।  দেশভাগের ঘটনা ও রাষ্ট্রের মানবতাবিরোধী নীতিকে তীব্র ব্যঙ্গ ও শ্লেষাত্মক আক্রমনে বিঁধে গল্পটি লিখেছেন লেখক মান্টো৷ মান্টোর লেখা সর্বাধিক চচিত আরেকটি গল্প হল ‘ঠান্ডা গোস্ত ‘৷  এই গল্পটির পটভূমি ১৯৪৭ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার। ইশের সিং তাঁর প্রণয়িনী কালবন্ত কাউরকে বিছানায় সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হয়। কালবন্ত কাউর তাঁকে বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে অভিযুক্ত করে এবং মনে করে সে অন্য কারো সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে। গল্পটি শেষ হয় একটি ধর্ষনের কাহিনীর সূত্রপাত দিয়ে অথচ ধর্ষনরত মেয়েটি ছিল মৃত ঠান্ডা গোস্ত তথা মাংসের মতন৷ গল্পের চমক সেখানেই৷ 

প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক চিন্তার এই উর্দু ছোটগল্পকারকে তাঁর মুক্তচিন্তার কারনে অপমানিত, লাঞ্ছিত হতে হয় ভারত পাকিস্তান দুই দেশেই। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে সপরিবারে তিনি লাহোর চলে যান। পাকিস্তানের কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, নাসির কাজমি, আহমেফ রহি প্রমুখের সংস্পর্শে তিনি আসেন। তাঁর বিশেষ খ্যাতি ছিল প্রগতিশীল রাজনৈতিক সাহিত্যচর্চায়। মান্টো’র বিরুদ্ধে ছয়বার অশ্লীলতার অভিযোগে মামলা করা হয়েছিল। ভারতপাকিস্তান দুই দেশই তাঁর গল্পকে অশ্লীলতার অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল৷ সেই অভিযোগের দায়ে তিনি বলেছিলেন “I am not a pornographer but a story writer”। তিনি কেবল জীবনের গল্প লিখতে চেয়েছিলেন৷ জীবনের নগ্ন রূপ তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। তাঁর গল্পে ফুটে উঠেছে সেই বাস্তববোধ৷ আর এই বাস্তববোধই তাঁকে বারে বারে সমাজের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে৷ 

তাঁর অধিকাংশ সাহিত্যচর্চা  বহুভাষায় অনুবাদিত হয়েছে। সালমান রুশদি মান্টো সম্পর্কে বলেন “Undisputed master of modern Indian short story”। কেবল লেখক হিসেবে খ্যাত বলেই নয়, মান্টোর ব্যক্তিগত জীবনও ঘটনাবহুল ছিল৷ ভারত- পাকিস্তান ভাগের ঘটনা তাঁকে আহত করেছিল৷ মানুষের মনস্তত্ত্বের অন্ধকার দিককে তিনি গল্পের মধ্য দিয়ে চিত্রিত করেছিলেন । 

২০১৫ সালে পাকিস্তানি অভিনেতা ও পরিচালক সরমাদ খুসাত মান্টোর জীবন অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র “মান্টো” তৈরী করেছিলেন৷ যেটি ২০১৮ সালে প্রকাশ পেয়েছিল৷ ২০১৮ সালে বলিউডেও নন্দিতা দাস প্রণীত এবং নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী অভিনীত মান্টোকে নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরী হয়েছিল৷ 

অত্যাধিক মদ্যপানের কারনে তাঁর যকৃতে সিরোসিস ধরা পরে৷ এর ফলে ১৯৫৫ সালের ১৮ জানুয়ারি সাদাত হাসান মান্টোর মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।