ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের সূচনা লগ্নে, পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলায় যে আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে মানুষ সর্বপ্রথম ব্রিটিশ অপশাসনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল, তা হল সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (Sannyasi Rebellion)। অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার হিন্দু সন্ন্যাসীদের দ্বারা এই আন্দোলন সংগঠিত হয়। ব্রিটিশদের প্রথম গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস-ই প্রথম ‘সন্ন্যাসী বিদ্রোহ’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। এই বিদ্রোহের সমসাময়িক কালে একই দাবীতে মুসলিম সুফি সাধকরাও ফকির বিদ্রোহের ডাক দেন। ধর্মীয় মতভেদ থাকা সত্ত্বেও সমকালীন এই দুই বিদ্রোহের নেতারা একে অন্যকে সহায়তা করতেন। এই কারণে ঐতিহাসিকরা এই বিদ্রোহকে সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ বলেও উল্লেখ করেছেন। এই বিদ্রোহে মানুষ প্রথম সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। তবে আন্দোলনটি এককভাবে নয় — এটি বিভিন্ন সময় ও স্থানে ছোট-বড় ঘটনার সমষ্টি ছিল এবং ইতিহাসবিদরা এর চরিত্র (জাতীয়-স্বাধীনতা যুদ্ধ, কৃষক-স্বার্থের প্রতিরোধ, নাকি দস্যুত্ব ও লুটপাট) নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করে থাকেন। এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচনা করেন বিখ্যাত উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’ ও ‘দেবী চৌধুরানী’।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার হিন্দু সন্ন্যাসীরা ১৭৬৩ সালে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সূচনা করে। ‘দবিস্তান’ বা ‘দাবেস্তান-ই মাজাহেব’ (Dabistan-i Mazaheb) গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, প্রাচীনকাল থেকে ভারতীয় সন্ন্যাসী ও ফকিররা দলবদ্ধভাবে ঘুরে ধর্মীয় কাজ করে বেড়াতেন। তাঁরা ধর্মীয় কাজের পাশাপাশি অস্ত্র চালনা ও যুদ্ধবিদ্যাতেও ছিলেন সমান পারদর্শী। এই কারণে পরবর্তীকালে তাঁরা অনেকে মুঘল সেনাবাহিনীতে সৈনিকের কাজও পেয়েছিলেন।
মুঘলদের স্বর্ণযুগের অবসানের পর থেকে তাঁদের জীবনধারাতেও নানা পরিবর্তন আসে। সন্ন্যাসীদের একটা বিরাট অংশ পূর্ববঙ্গ ও উত্তরবঙ্গে জমি লাভ করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং কৃষিজীবীতে পরিণত হন। আবার অনেকে মশলা, কাপড়, রেশমের ব্যবসা শুরু করে ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন। জীবনযাত্রার পরিবর্তন হলেও, বছরের নির্দিষ্ট সময় তাঁরা দলবদ্ধভাবে তীর্থযাত্রা করতে যেতেন। বিশেষত, বাংলা থেকে উত্তর ভারতের নানা স্থানে প্রতি বছর এক বিরাট সংখ্যক হিন্দু সন্ন্যাসীরা তীর্থ করতে যেতেন, আবার অন্যদিকে দশনামী নাগা সাধুরা তীর্থ করতে বাংলা প্রদেশে আসতেন। প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী, এই তীর্থ পরিভ্রমণের জন্য গ্রামের জমিদার বা ওই অঞ্চলের প্রধানরা সন্ন্যাসীদের কিছু অর্থ সাহায্য করতেন।
কিন্তু পলাশীর যুদ্ধের পর নবাবকে সামনে রেখে বাংলার প্রকৃত শাসক হয়ে ওঠে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। এই সময় নবাবদের অত্যধিক খাজনা দেওয়া এবং অন্যদিকে সন্ন্যাসীদের দান-ধ্যান করা গ্রামের জমিদারদের পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিল না, ফলে তাঁরা সন্ন্যাসীদের টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেন। এর ফলে সন্ন্যাসীদের মধ্যে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয় বক্সার যুদ্ধের শেষে কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পর। এতদিন পর্যন্ত সন্ন্যাসীরা দান হিসাবে পাওয়া জমিগুলোর কোনও খাজনা দিতেন না, কিন্তু ব্রিটিশ কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পর তাঁদের জমির উপর উচ্চহারে করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। আবার কিছু সন্ন্যাসীর ব্যবসায়িক দ্রব্য, যেমন — মশলা, রেশম প্রভৃতি কোম্পানির লোকজনরা স্বল্পমূল্যে কিনতে চাইত। এতে সন্ন্যাসীদের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হতো এবং যাঁরা বাধা দিতেন, তাঁদের পণ্য জোর করে ছিনিয়ে নেওয়া হতো।
এইভাবে অর্থনৈতিক শোষণের ফলে সন্ন্যাসীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। এছাড়া, সন্ন্যাসীরা যেহেতু ভারতের নানা এলাকায় তীর্থ করতে যেতেন, তাই তাঁরা নিজেদের সঙ্গে নানা রকম অস্ত্র রাখতেন। কিন্তু কোম্পানির লোকজনরা এই সকল অস্ত্রধারী সন্ন্যাসীদের সন্দেহের চোখে দেখত। তারা মনে করত যে, এই সকল মানুষ কোম্পানির শাসনতান্ত্রিক এলাকায় প্রবেশ করলে ওই অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সন্ন্যাসীদের উপর তীর্থকরও আরোপ করে। ভারতীয় রীতিনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ ইংরেজরা মনে করত, জমিদারদের দেওয়া টাকা সরকারের প্রাপ্য আর এই সন্ন্যাসীরা তা ভোগ করে চলেছে। এই সকল কারণেই একসময় সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ভয়ানক রূপ ধারণ করে।
বাংলা ও বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রধানত এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রধান নেতা ছিলেন ভবানীচরণ পাঠক (Bhavanicharan Pathak)। আর তাঁর শিষ্যা, পীরগাছার জমিদার জয়দুর্গা দেবী ওরফে দেবী চৌধুরানী (Devi Chaudhurani) ছিলেন এই আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী। তবে, দেবী চৌধুরানীর ঐতিহাসিক অস্তিত্ব নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পূর্বে ১৭৬০ সালে মাসিমপুরে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানীর সঙ্গে কোম্পানির ও নবাবের যৌথ বাহিনীর যুদ্ধ হয়, যা এই বিদ্রোহের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীকালে ১৭৬৩ সালে ঢাকায় ইংরেজদের কুঠি আক্রমণের মধ্যে দিয়ে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সূচনা হয়।
ভবানী পাঠকের নির্দেশে বাংলা, মুর্শিদাবাদ, জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর বনে সন্ন্যাসী বিদ্রোহ সংগঠিত হয়। এছাড়া এই আন্দোলনে ভবানী পাঠক সঙ্গ পান ফকির বিদ্রোহের অন্যতম নেতা মজনু শাহের। মারাঠা সম্প্রদায়ভুক্ত ‘গোঁসাই’, শৈব সন্ন্যাসীভুক্ত নাগা সন্ন্যাসী, ‘গিরি’ ও ‘দশনামী’ সম্প্রদায়ের হিন্দু সন্ন্যাসীরা এই আন্দোলনে যোগ দেন। হুসেয়পুরের জমিদার রাজা ফতেহ বাহাদুর শাহী এবং বেত্তিয়াহের রাজা যুগল কিশোরের মতো ভূমিহীন জমিদাররাও এই আন্দোলনকে সমর্থন করেন। ১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে বহু মানুষ অনাহারে মারা যায়, যা এই বিদ্রোহকে আরও জোরদার করে তোলে। খাজনার ভারে জর্জরিত বিপদগ্রস্ত পরিবারগুলি সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহের মধ্যে দিয়ে নিজেদের বাঁচার আশা খুঁজে পায়, তাই তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই আন্দোলনে যোগ দেয়।
বিদ্রোহের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ছিল কোম্পানির কুঠি, তাদের লোকজন, ইংরেজদের অনুগত জমিদারদের কাছারি এবং জমিদারি আমলাদের বাসস্থান। বিদ্রোহীরা তরবারি, বর্শা, বন্দুক, বল্লম, এবং অগ্নি নিক্ষেপক যন্ত্র ব্যবহার করত। তারা গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ করে অতর্কিতে আক্রমণ করত এবং দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে কোম্পানির বাহিনীকে ঘিরে ফেলত। অন্যদিকে গ্রামের সাধারণ মানুষেরা বিদ্রোহীদের গুপ্তচরের কাজ করত। এই আন্দোলন উত্তরবঙ্গ, বিশেষ করে রংপুর, কোচবিহার, রাজশাহী, জলপাইগুড়ি, দিনাজপুর, বগুড়া অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, মালদহ, বিহারের কিছু কিছু অঞ্চলেও এর প্রভাব পড়েছিল। বিদ্রোহ দমন করার জন্য ১৭৭১ সালে কোনও নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই নাটোরের ১৫০ জন বিদ্রোহী সন্ন্যাসীকে ইংরেজরা মৃত্যুদণ্ড দেয়।
কোম্পানির কাছে প্রশিক্ষিত বাহিনী থাকলেও তারা এই আন্দোলনকে সহজে দমন করতে পারেনি। তবে, ব্রিটিশদের কঠোর দমন-পীড়ন নীতি, উপযুক্ত অস্ত্রের অভাব, সুযোগ্য নেতৃত্বের অভাব, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং বিদ্রোহীদের মধ্যে যোগাযোগের অপ্রতুলতার জন্য এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে। এছাড়া, বিদ্রোহের শেষ দিকে ইংরেজরা সন্ন্যাসী ও ফকিরদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভেদে উস্কানি দেয়, ফলে এই আন্দোলনে জনগণের সমর্থন ক্রমশ কমতে থাকে এবং আন্দোলন বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। কয়েক দশক ধরে চলা এই আন্দোলন ১৮০০ সালে শেষ হলেও ১৮০২ সাল পর্যন্ত এর প্রভাব বাংলায় কম-বেশি ছিল।
সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও ভারতের ইতিহাসে এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। ধর্মীয় ভাবনা নিয়ে শুরু হলেও এই আন্দোলন ক্রমশ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। এই আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে বাংলার মানুষদের মধ্যে প্রথম জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। ব্রিটিশরা এই আন্দোলনের সকল সন্ন্যাসীদের দস্যু বললেও সাধারণ মানুষের উপর নির্যাতনের কোনও অভিযোগ করেনি। এই আন্দোলনে হিন্দু সন্ন্যাসী ও মুসলিম ফকিররা একসাথে যোগ দিয়ে ধর্ম নির্বিশেষে এক সুসংহত আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের ‘বন্দেমাতরম’ সঙ্গীতটি পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ করে এবং এই গানের প্রথম দুই স্তবককে ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গণপরিষদ স্বাধীন ভারতের জাতীয় স্তোত্রের মর্যাদা দিয়েছে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান