সববাংলায়

সাঁওতাল বিদ্রোহ

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ অপশাসনের বিরুদ্ধে নানা সময়ে সংঘটিত হয়েছে একাধিক বিদ্রোহ। নেতৃত্বের আসনে কখনও থেকেছেন অভিজাত, চিন্তাশীল, শিক্ষিত মানুষ কখনও বা সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রোষানল আছড়ে পড়েছে স্বৈরাচারী ইংরেজ শাসনের ওপর। তেমনই দরিদ্র, অশিক্ষিত সাঁওতালদের একজোট হয়ে ব্রিটিশ শক্তির সম্মুখে রুখে দাঁড়ানোর ঘটনা ইতিহাসে সাঁওতাল বিদ্রোহ (Santhal Rebellion) নামে পরিচিত। মানভূম, ছোটনাগপুর, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ইত্যাদি অঞ্চলে বসবাস করা আদিবাসী সাঁওতালরা দেশীয় মহাজন ও ইংরেজ কর্মচারীদের অত্যাচারের প্রতিবাদে সিধু ও কানু নামের দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে জোট বেঁধে সমবেত আন্দোলনে নেমেছিল। ব্রিটিশদের গোলা-বারুদ-বন্দুকের মতো আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের বিপক্ষে কেবলমাত্র তীর, ধনুক, বর্শা ইত্যাদি নিয়ে জীবনের পরোয়া না করে রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়া দুঃসাহসী সাঁওতালরা বিদ্রোহে সফল না হলেও ইংরেজ শাসনকে সাময়িকভাবে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। ব্রিটিশ অপশাসনের বিরুদ্ধে সাঁওতালীদের এই গণজাগরণ ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে রয়েছে।

মহাবিদ্রোহ সংঘটিত হওয়ার আগেই ব্রিটিশ সরকারের স্বৈরাচারী শাসন, অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল সাঁওতালরা। ঐতিহাসিক হিসেব অনুযায়ী ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন থেকে ১৮৫৬ সালের ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ছয় মাস সাঁওতাল বিদ্রোহ স্থায়ী হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, কেবল ইংরেজ সরকারই এই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল না, সেই সঙ্গে দেশীয় জমিদারদের অকথ্য শোষণও সাঁওতালদের বিদ্রোহী হয়ে উঠতে বাধ্য করেছিল।

সাঁওতালরা মূলত কৃষিজীবী আদিবাসী এক সম্প্রদায়। কঠোর পরিশ্রমী, সহজ, সরল এই মানুষগুলি ছোটনাগপুর, পালামৌ, বাঁকুড়া প্রভৃতি অঞ্চলের গভীর বনভূমিতে বাস করে কৃষিকাজের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করত। অবশেষে ব্রিটিশ প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সূচনা হলে এই বিস্তীর্ণ আরণ্যক অঞ্চলও কোম্পানির রাজস্বের অধীনে চলে আসে। ফলত সেখানকার জমিদার ও কোম্পানির কর্মচারীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সেই অঞ্চল ত্যাগ করে সাঁওতালরা ঝাড়খন্ডের অন্তর্গত রাজমহলের পার্বত্য অঞ্চলে ও মুর্শিদাবাদের একাংশের বনভূমি পরিষ্কার করে সেইসব জায়গায় বসতি গড়তে থাকে। রাজমহলের এই পার্বত্য অঞ্চলের নাম তারা দিয়েছিল দামিন-ই-কোহি। জমি ও অর্থনৈতিক সুবিধার কারণে ধলভূম, মানভূম, হাজারীবাগ, মেদিনীপুর এবং অন্যান্য আশেপাশের এলাকা থেকে বিপুল সংখ্যক সাঁওতাল বসতি স্থাপন করতে আসে এখানে। শীঘ্রই ১৮৩০ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে তাদের জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে ৩০০০ থেকে ৮৩,০০০-এ উন্নীত হয়।

তবে এখানে এসেও রেহাই পায়নি তারা। দেশীয় জমিদার, মহাজন, ঋণপ্রদানকারী, কর আদায়কারী, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দ্বারা নিয়োজিত মধ্যস্থতাকারীরা ক্রমে এইসব অঞ্চলেও নিজেদের প্রশাসনিক ক্ষমতা বিস্তার করে সরলপ্রাণ দরিদ্র সাঁওতালদের শোষণ করতে শুরু করে। মহাজনরা সাঁওতালদের ঋণ দিত এবং অন্যায়ভাবে চড়া সুদ আদায় করত। সুদের হার ছিল প্রায় ৫০ থেকে ৫০০ শতাংশ। ঋণের জাল থেকে অনেকেই আর মুক্তি পেত না, ফলে ঋণের দায়ে অসহায় সাঁওতালের চাষের বলদ, জমির ফসল হারাতে হত। এমনকি দোকানদাররা তাদের ভুয়ো বাটখারার সাহায্যে ঠকাত দিনরাত। ইংরেজ কর্মচারীরা জোরজবরদস্তি সাঁওতালদের হাঁস, মুরগি তুলে নিয়ে যেত, এমনকি সাঁওতাল রমনীদের সম্মানে হাত দিতেও দ্বিধা করত না। একসময় তাদের সহ্যের সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেলে তারা বিদ্রোহের পথ বেছে নিয়েছিল।

অবশেষে দুই সাঁওতাল বিদ্রোহী নেতা সিধু ও কানু মুর্মু অসংখ্য সাঁওতালকে একত্র করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন ভাগনাডিহির মাঠে প্রায় দশ হাজার সাঁওতালের সামনে দাঁড়িয়ে সিধু মুর্মু একটি স্বাদীন সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়েছিলেন। তাদের সমর্থনে একে একে এগিয়ে এসেছিলেন কামার, কুমোর, ছুতোর তাঁতি প্রভৃতি নানা জীবিকার সাধারণ মানুষেরা। ৭ জুলাই সাঁওতালরা প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সিধু ও কানু ছাড়াও সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রথম সারির নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন চাঁদ ও ভৈরব নামের দুই ভাই, বীরসিং, কালো প্রামাণিক, ডোমন মাঝি প্রমুখ। উল্লেখ্য যে, এই বীর সিং মূলত একটি ডাকাত দলের নেতৃত্ব দিতেন এবং অত্যাচারী বাঙালি জমিদাররা ছিল তাদের লক্ষ্য। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেকর্ডে এমন আরও অনেক ডাকাতের কথা পাওয়া যায়। বিদ্রোহীদের সংখ্যা ক্রমে বাড়তে থাকে এবং বাড়তে বাড়তে তা পঞ্চাশ হাজারে পৌঁছে যায়। প্রথমদিকে ভাগলপুর থেকে মুঙ্গের অঞ্চলে তাদের কার্যকলাপ শুরু হয়েছিল। বিভিন্ন স্থানে প্রায় দশ হাজার করে সাঁওতাল জমা হয়ে ডাক ও রেল যোগাযোগ বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। তাদের আক্রমণের মূল লক্ষ্যই হয়ে দাঁড়িয়েছিল রেলস্টেশন, ডাকঘর, থানা, ইউরোপীয়দের বাংলো, দেশীয় জমিদারদের বাড়ি ইত্যাদি স্থান।

১০ জুলাই কলকাতায় পাঠানো একটি বার্তায় দাবি করা হয়েছিল যে, ১০ থেকে ১২ হাজার সাঁওতাল জঙ্গিপুরের কাছে জমা হচ্ছে এবং ঔরঙ্গাবাদের ম্যাজিস্ট্রেট একটি বার্তা পাঠান যে তারা রেলের বাড়িগুলি দখল করে নিয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেটের আরেকটি বার্তায় জানানো হয় যে ১৩,০০০ সাঁওতাল বীরভূম থেকে জড়ো হচ্ছে এবং বিশাল জমিতে থাকা রেলের বাংলো পুড়িয়ে দিচ্ছে। এমনকি এমন গুজবও ছিল যে অনেক দূরের জেলা থেকেও সাঁওতালরা বিদ্রোহে যোগ দিচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অ-সাঁওতাল উপজাতির সদস্যরা, অর্থাৎ মাল পাহাড়ীরা বিদ্রোহে যোগ দেয়। ব্রিটিশদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের সম্মুখে তীর-ধনুক, বল্লম, বর্শা নিয়ে অকুতোভয়ে লড়াই করেন সাঁওতালরা। ভাগলপুর থেকে মুঙ্গের পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসনের প্রায় অবসান ঘটিয়ে দিয়েছিল তারা। অনেক গ্রামে জমিদার, মহাজন এবং তাদের কর্মচারীদের মৃত্যুদন্ড দেয় সাঁওতালরা।

১৫ জুলাই ভাগলপুরের জেলা কমিশনার সাঁওতালদের অস্ত্র ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করে এবং তাদের অভিযোগগুলি পরীক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটি ঘোষণা পাঠান, কিন্তু এই ঘোষণা উপেক্ষা করা হয় এবং সাঁওতালরা লড়াই চালিয়ে যায়। নারায়ণপুরে সাঁওতালদের কাছে ইস্ট ইন্ডিয়ার শোচনীয় পরাজয় ঘটে। বেশ কয়েকজন ভারতীয় অফিসার এবং ২৫জন সিপাহীকে হত্যা করে তারা। এই জয়ের খবর তাদের আরও উদ্বুদ্ধ করে তোলে। ১৮৫৫ সালের ২১ জুলাই ভাগলপুর কমিশনার লিখেছিলেন যে সাঁওতালরা রাজমহল থেকে পলাশৌর পর্যন্ত রাস্তা জুড়ে ছিল এবং কোলগং-এর পশ্চিমে সমতলভূমি বরাবর গ্রামগুলি লুটপাট করছে ও পুড়িয়ে দিচ্ছে। রামপুরহাট, মহেশপুর, সিউড়ি ইত্যাদি নানাদিকে হাজারে হাজারে ছড়িয়ে যাচ্ছিল সাঁওতালরা এবং গ্রাম লুটপাট করে জ্বালিয়ে দিচ্ছিল।

সাঁওতালদের এই প্রকাশ্য বিদ্রোহ ব্রিটিশদের অবাকই করেছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সাঁওতাল বিদ্রোহ দমনের জন্য বিশেষ একটি কমিশন তৈরি করেছিল। এ.সি বিডওয়েলকে এই প্রতিষ্ঠানের কমিশনার নিযুক্ত করা হয়। গভর্নর কাউন্সিল বিদ্রোহীদের দমন করবার জন্য সম্পূর্ণ সামরিক পদক্ষেপের অনুমোদন দেয়। তারা ব্যারাকপুর থেকে রাণীগঞ্জে সৈন্য পাঠাতে এবং রেলওয়ে স্টেশন এবং গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড রক্ষার জন্য শহরে ইতিমধ্যেই সৈন্যদের পুনরায় মোতায়েন করতে চেয়েছিল। কোম্পানির প্রধান আক্রমণ যা বিদ্রোহকে স্তিমিত করে দিতে শুরু করেছিল, সেটি হয়েছিল ২৪ জুলাই। মুর্শিদাবাদের নবাব কর্তৃক প্রেরিত ৩০টি হাতি ও ২০০ সৈন্য-সহ কমিশনার টুগুডের নেতৃত্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ৫০জন সৈন্য পুলশা থেকে দামিন-ই-কোহির পূর্বে মহেশপুরের দিকে যাত্রা করে। যেখানে তারা ৫০০০ সাঁওতালের সঙ্গে যুদ্ধ করে। সেখানে মাত্র দশ মিনিটের মধ্যে তারা প্রায় ১০০জন সাঁওতালকে হত্যা করে। কোম্পানির সৈন্যদের সঙ্গে বারহাইতের কাছে যুদ্ধের সময় এও গুজব রটে যে কানু মুর্মুর মৃত্যু হয়েছে। লাগাতার বিক্ষিপ্তভাবে সাঁওতাল ও কোম্পানির সৈন্যদের লড়াই চলতে থাকে। কখনও কোম্পানির লেফটেন্যান্ট সাঁওতালদের হাতে মারা গেছেন, কখনও আবার সৈন্যদের গুলিতে অসংখ্য সাঁওতালের মৃত্যু হয়েছে।

জুলাইয়ের শেষ দিকে মেজর জেনারেল জিডব্লিউএ লয়েডকে নিয়ে আসা হয়, যিনি বিডওয়েলের থেকে সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণ নেন এবং বিদ্রোহ সম্পূর্ণ দমনের জন্য আরও বেশি বাহিনী সংগ্রহ করেন। যখন তার কমান্ড প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তার কাছে স্থানীয় পদাতিক বাহিনীর ৫টি রেজিমেন্ট, হিল রেঞ্জার্স, কিছু ইউরোপীয় সৈন্য এবং অশ্বারোহী সৈন্য ছাড়াও অনেক জমিদারের পাঠানো বিভিন্ন সৈন্য ছিল যারা কোম্পানিকে সাহায্য করত।

মুখোমুখি বেশ কয়েকটি সংঘর্ষের পর ৮ নভেম্বর গভর্নর জেনারেল সামরিক আইন ঘোষণা করেন। এটি গঙ্গার ডান তীরে ভাগলপুর জেলা থেকে মুর্শিদাবাদ জেলার গঙ্গার বাম তীরের এলাকাগুলিতে প্রযোজ্য হয়। এই আইন সশস্ত্র যেকোনো সাঁওতালকে মৃত্যুদন্ড দেওয়ার অনুমতি দেয়। প্রাথমিকভাবে ভাগলপুর কমিশনার সিধু ও কানুকে গ্রেফতারের জন্য ১০,০০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। ১৮৫৫ সালের ডিসেম্বরের দিকে কানু বন্দী হন। শেষপর্যন্ত ১৮৫৬ সালের জানুয়ারি মাস নাগাদ বিদ্রোহ দমিত হয়। ২৩ হাজার বিদ্রোহীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়৷ সিধু, কানু ও অন্যান্য বেশ কয়েকজন নেতাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল এবং ছত্রিশটি সাঁওতাল গ্রাম ধ্বংস করা হয়।

এই সাঁওতাল বিদ্রোহ প্রাথমিকভাবে ব্যর্থ হলেও তা ব্রিটিশ শাসনকে যথেষ্ট দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে, যদি ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহকে স্বাধীনতা সংগ্রামের মর্যাদা দেওয়া হয় তবে সাঁওতাল বিদ্রোহেরও সেই মর্যাদা পাওয়া উচিত।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. ‘স্বদেশ, সভ্যতা ও বিশ্ব’, জীবন মুখোপাধ্যায়, শ্রীধর পাবলিশার্স, কলকাতা, পুনর্মুদ্রণ, জানুয়ারি, ২০২১।
  2. https://en.m.wikipedia.org/
  3. https://vajiramandravi.com//
  4. https://amritmahotsav.nic.in/
  5. https://specials.manoramaonline.com/
  6. https://www.studyiq.com/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading