বিজ্ঞান

স্কোপোলামাইন – শয়তানের নিঃশ্বাস

স্কোপোলামাইন - শয়তানের নিঃশ্বাস

কথায় আছে ‘ফুলের ঘায়ে মুচ্ছো যাওয়া’। ফুল বরাবরই সুন্দর। তার সুবাস, সুমিষ্ট রঙের ছটায় বরাবরই আমাদের মন চুরি করে নেয় সে। কিন্তু এই ফুলই ভুলিয়ে দিতে পারে স্মৃতি, কেড়ে নিতে পারে আত্মনিয়ন্ত্রণ। অবাক হচ্ছেন? ক্লোরোফর্ম মাখানো রুমাল নাকে চেপে চুরি-ছিনতাই করার ঘটনা তো শুনেছেন নিশ্চয়ই, এইরকমই একটা বিশেষ প্রকারের ড্রাগের সাহায্যে পরের পর চুরি-জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে কলম্বিয়ায় আর সেই ড্রাগের উৎস খোদ একটা ফুল। বিজ্ঞানীরা বলছেন এই ড্রাগ এখনও পর্যন্ত পৃথিবীর সবথেকে ভয়ঙ্কর ড্রাগ যা মানুষকে পরিণত করে একটা ‘জম্বি’তে (Zombie)। কী রয়েছে সেই ফুলের গন্ধে যার এমন ঘাতক ক্ষমতা? বিজ্ঞানের ভাষায় এরই নাম স্কোপোলামাইন (Scopolamine), লোকে বলে ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ (Devil’s Breath)।

যে ফুল থেকে এই ড্রাগটি পাওয়া যায়, তাকে চলতি ভাষায় বলা হয় ‘ঈশ্বরের দূতের সানাই’ বা ‘অ্যাঞ্জেলস ট্রাম্পেট’ (Angel’s Trumpet)। অনেকে আবার এর ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে একে ‘অ্যাঞ্জেলস ডেথ’ (Angels Death) নামেও ডাকেন।পরি সংখ্যান বলছে প্রতি বছর ৫০ হাজার মানুষ কলম্বিয়াতে এই ড্রাগের ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হন চিকিৎসার জন্য। জনৈক টিক্‌টক (TikTok) ভিডিও-নির্মাতা হঠাৎই সেই ফুল হাতে নিয়ে শুঁকে দেখেন আর তারপরই প্রচন্ড অস্থির হয়ে ওঠে তার শরীর, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন তিনি। ধীরে ধীরে অচেতন হয়ে পড়তে দেখা যায় তাঁকে। ফলে সেই ফুল আর তার গন্ধে থাকা সেই ড্রাগের উপাদান নিয়ে চাঞ্চল্য এখন চরমে। ১৯৭০ সাল থেকে নাকি কলম্বিয়ান দুষ্কৃতীরা এই স্কোপোলামাইন ব্যবহার করে মহিলাদের ধর্ষণ, চুরি, ছিনতাই এমনকি শিশু অপহরণও করে আসছে। একবার উত্তর অ্যান্টিওকোয়ার এক ৭ বছরের শিশুকে অপহরণ করে নিয়ে যায় কয়েকজন দুষ্কৃতী এবং সেই সময় তার বাবা-মাকে স্কোপোলামাইন দিয়ে অচেতন করে ফেলে তারা। দু মাস পরে সেই শিশুটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। শিশুটির বাবা-মা পুলিশের কাছে কোনও বর্ণনাই দিতে পারেননি ঘটনার, এমনকি সেই দিনের অপহরণের ব্যাপারে তাদের কিছুই মনে ছিল না আর। এমনই ক্ষমতা এই স্কোপোলামাইনের। এই স্কোপোলামাইন আসলে ব্যবহার করা হয় অপারেশন-পরবর্তী পর্যায়ে বমি কমানোর জন্য, এমনকি অ্যালঝাইমার্স গবেষণা এবং পার্কিনসন্স-এ আক্রান্ত ব্যক্তির মস্তিষ্ক বিকৃতি রোধ করতেও মাঝে মধ্যে এই ড্রাগ ব্যবহার করা হয়। স্কোপোলামাইন আবার হায়াসিন (Hyacine) নামেও পরিচিত। এটি আসলে কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত ট্রোপেন অ্যালকালয়েড (Tropane Alkaloid) এবং অ্যান্টিকোলিনার্জিক ড্রাগ (Anticolinergic Drug)। আবার এটি স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে অ্যাসিটাইলকোলিনের কার্যকারিতাও বন্ধ করে দিতে পারে। ইতিহাস বলছে ১৯০০ সাল থেকে এই স্কোপোলামাইন এক প্রকার চেতনানাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রসবকালীন সময়ে যন্ত্রণা কমানোর জন্য মরফিন ও স্কোপোলামাইনের মিশ্রণ ব্যবহার করা হত। রসায়নবিদরা পরীক্ষা করে বলেছেন যে এই স্কোপোলামাইনের প্রচলিত নাম ‘বুরুডাঙ্গা’ (Burudanga)। কলম্বিয়ার বোগোটা শহরের অনেক জায়গাতেই ধুতুরা ফুলের মত দেখতে নাইটশেড (Nightshade) গোত্রভুক্ত এই ফুল দেখতে পাওয়া যায়। এমনকি বোগোটার বটানিক্যাল গার্ডেনেও এই ফুল রয়েছে। যে সকল নিউরোট্রান্সমিটার (Neurotransmitter) মস্তিষ্কের স্বল্পকালীন স্মৃতি রক্ষা করে সেখানে তথ্য বহন করে নিয়ে যায়, সেগুলিকে রুদ্ধ করে দেয় এই স্কোপোলামাইন। ফলে এই ড্রাগ প্রয়োগের পর তাদের সঙ্গে ঠিক কী হয়, তা তাদের মস্তিষ্ক কোনওভাবেই মনে রাখতে পারে না। জার্মান নাৎসি বাহিনী অন্যতম অধিকর্তা জোসেফ মেঙ্গেলও নাকি বন্দিদের মুখ থেকে সত্য উদ্‌ঘাটনের জন্য এই স্কোপোলামাইন ব্যবহার করতেন।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

কোকেনের সঙ্গে স্কোপোলামাইনের বাহ্যিক রঙের অনেক সাদৃশ্য থাকলেও কোকেনের থেকেও নাকি এই ড্রাগ মারাত্মক প্রাণঘাতী। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, ত্বকের মাধ্যমে শরীরে এই স্কোপোলামাইন প্রবেশ করলে মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে এর প্রতিক্রিয়া শুরু হয় এবং তা ৮ ঘন্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এই মাদক গ্রহণের ফলে ব্যক্তি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন যাকে Twilight Sleep বলা হয়। তখন আর তার কোনও চিন্তাশক্তি থাকে না, তাকে দিয়ে তখন যা খুশি করানো সম্ভব। সেই কারণেই দুষ্কৃতীরা এই স্কোপোলামাইন ব্যবহার করে ব্যক্তিকে চেতনাহীন করে তার থেকে সহজেই আদায় করে নেয় টাকা-পয়সা, এমনকি সমস্ত গোপন নথি, ব্যাঙ্কের পিন নম্বর সহ আরও অনেক কিছুই। অথচ এই ঘটনার কোনও স্মৃতিই তার মনে থাকবে না। ১৯১০ সালে ড. রবার্ট হোস প্রথম লক্ষ্য করেন যে ট্রুথ সিরাম (Truth Serum) হিসেবে এই স্কোপোলামাইন ব্যবহার করলে মানুষ সাজিয়ে-গুছিয়ে চিন্তা করে মিথ্যা বলতে পারে না, ফলে আচ্ছন্ন অবস্থায় সে কেবলই সত্য কথা বলতে থাকে। বহু অপরাধীর জবানবন্দী আদায়ের সময় এই সিরাম ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

ভারতের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশেও এই স্কোপোলামাইন ব্যবহারকারী দুষ্কৃতীদের বাড়-বাড়ন্ত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পথচলতি মানুষকে একজন এসে একটা চিরকুট ধরিয়ে তাতে লেখা ঠিকানাটা কোথায় জিজ্ঞেস করেন এবং অদ্ভুতভাবে সেই চিরকুটে খুবই ছোট ছোট অক্ষরে সেই ঠিকানাটি লেখা থাকে। ফলে যে কোনও ব্যক্তিকেই তা ভালভাবে বোঝার জন্য চোখের সামনে আনতে হবে। আর তখনই কাগজে মাখানো স্কোপোলামাইন নিঃশ্বাসের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে সেই ব্যক্তির শরীরে। নিয়মমাফিক ২০ মিনিটের মধ্যে এর প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। ধীরে ধীরে সেই ব্যক্তি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ফলে দুষ্কৃতী তাকে তখন ঠিক ঠিক যা যা করতে বলবে, সেটাই করবেন তিনি। এভাবেই বহু মানুষ সর্বস্বান্ত হয়েছেন, বহু মহিলা ধর্ষিতাও হয়েছেন। এই মাদক এতটাই শক্তিশালী যে কারও শরীরে যদি ৫ থেকে ৭ মিলিগ্রাম স্কোপোলামাইন প্রবেশ করানো হয়, তবে সম্পূর্ণরূপে সে তার চিন্তাশক্তির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে এবং ১০ মিলিগ্রাম যদি তার পরিমাণ হয় সেক্ষেত্রে ব্যক্তি কোমাতেও চলে যেতে পারেন যেখান থেকে ধীরে ধীরে তার মৃত্যুও ঘটতে পারে। বিমানে বা জাহাজে মোশন সিকনেস (Motion Sickness) কাটানোর জন্য যে রাসায়নিক উপাদানটি আগে ব্যবহৃত হত, আজ সেই স্কোপোলামাইন হয়ে উঠেছে শয়তানের নিঃশ্বাস এবং পৃথিবীর ভয়ঙ্করতম মাদক।          

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন