সববাংলায়

শবে মেরাজ | লাইলাতুল মেরাজ

ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষজনের কাছে বছরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাতের মধ্যে একটি হল লাইলাতুল মেরাজ। আরবী ভাষায় লাইলাতুল শব্দের অর্থ রাত এবং মেরাজ শব্দের অর্থ ঊর্ধ্বগমন। মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী এই রাতেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মহান আল্লাহর ইচ্ছায় ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করেছিলেন। মুসলমানদের কাছে এই রাতটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ লাইলাতুল মেরাজের রাতেই মুসলমানদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। এই রাত শবে মেরাজ নামেও পরিচিত। বছরের অন্যান্য কয়েকটি পবিত্র রাত হল লাইলাতুল কদর, লাইলাতুল জায়েজা, লাইলাতুল বরাত ইত্যাদি।

২০২৭ সালের লাইলাতুল মেরাজ কবে?

  • বাংলা তারিখ: ২১ পৌষ, ১৪৩৩
  • ইংরাজি তারিখ: ৬ জানুয়ারি, ২০২৭

ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী নবুওয়াতের প্রায় দশম বা একাদশ বছরের এক রাতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কার পবিত্র কাবা শরীফ থেকে জেরুজালেমের বায়তুল মুকাদ্দাস বা মসজিদুল আকসায় যাত্রা করেন। কুরআনের ভাষায় এই যাত্রাকে ইসরা বলা হয়। সেখানে তিনি অন্যান্য নবীদের নিয়ে জামাতে নামাজ পড়ান। এরপর তিনি বোরাক নামক বিশেষ বাহনে চেপে ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করেন, যা মেরাজ নামে পরিচিত। এই সফরে তাঁর সঙ্গে ছিলেন ফেরেশতা হজরত জিব্রাইল (আ.)। মেরাজের সফরে তিনি একে একে সাত আসমান অতিক্রম করেন এবং প্রতিটি আসমানে বিভিন্ন নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

লাইলাতুল মেরাজের রাতে প্রথম আসমানে তিনি হজরত আদমের (আ.) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দ্বিতীয় আসমানে তিনি হজরত ইয়াহইয়া (আ.) ও হজরত ঈসার (আ.) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তৃতীয় আসমানে তিনি হজরত ইউসুফের (আ.) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। চতুর্থ আসমানে তিনি হজরত ইদ্রিসের (আ.) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পঞ্চম আসমানে তিনি হজরত হারুনের (আ.) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ষষ্ঠ আসমানে তিনি হজরত মুসার (আ.) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সপ্তম আসমানে পৌঁছে তিনি হজরত ইব্রাহিমের (আ.) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

এরপর মহানবী (সা.) সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছান। সেখানে তিনি বায়তুল মা’মুর দেখতে পান, যেখানে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা ইবাদত করেন। তিনি সেখানে চারটি নদীও দেখতে পান—দুটি গোপন এবং দুটি প্রকাশ্য। প্রকাশ্য নদী দুটি নীল ও ফোরাত নদীর উৎস বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সময় মহান আল্লাহ মুসলমানদের জন্য প্রতিদিন পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন। ফেরার পথে হজরত মুসা (আ.) নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে পরামর্শ দেন যেন তিনি আল্লাহর কাছে নামাজের সংখ্যা কমানোর জন্য আবেদন করেন। কয়েকবার এভাবে প্রার্থনার পর আল্লাহ তায়ালা তা কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নির্ধারণ করেন। তবে সওয়াবের দিক থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান বলে ঘোষণা করা হয়।

লাইলাতুল মেরাজের রাতে নবী মুহাম্মদ (সা.) জান্নাত ও জাহান্নামের বিভিন্ন দৃশ্যও প্রত্যক্ষ করেছিলেন। এই সফরে নবী (সা.) এমন একদল লোককে দেখতে পান যাদের নখ ছিল তামার মতো। তারা সেই নখ দিয়ে নিজেদের মুখমণ্ডল ও বুক আঁচড়াচ্ছিল। জিজ্ঞাসা করলে ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.) জানান, এরা সেইসব মানুষ যারা দুনিয়ায় মানুষের সম্মানহানি করত। আরেক স্থানে তিনি এমন লোকদের দেখেন যাদের পেট অস্বাভাবিক বড় এবং তারা ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারছিল না। জিব্রাইল (আ.) জানান, তারা হল সুদখোর, যারা দুনিয়ায় সুদের মাধ্যমে অন্যায়ভাবে ধনসম্পদ অর্জন করেছিল। নবী (সা.) আরও দেখেন এমন একদল মানুষকে, যাদের মাথায় বড় পাথর দিয়ে আঘাত করা হচ্ছিল। আঘাতে তাদের মাথা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল, আবার তা আগের অবস্থায় ফিরে আসছিল এবং পুনরায় একই শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল। তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে জিব্রাইল (আ.) বলেন, তারা সেইসব মানুষ যারা দুনিয়ায় নামাজ আদায়ে অবহেলা করত। তিনি আরও দেখেন এমন কিছু মানুষকে, যাদের সামনে ভালো ও তাজা মাংস রাখা থাকা সত্ত্বেও তারা ভালো মাংস ছেড়ে পচা মাংস খাচ্ছিল। তাদের সম্পর্কে জিব্রাইল (আ.) বলেন, তারা সেইসব পুরুষ ও নারী যারা বৈধ সম্পর্ক ছেড়ে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। মেরাজের সময় নবী (সা.) এমন কিছু লোককেও দেখেন যারা মানুষের আমানত রক্ষা না করে প্রতারণা করত। তাদেরকে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে দেখেছিলেন তিনি। আবার এতিমের সম্পদ আত্মসাৎকারীদেরকেও তিনি কঠোর শাস্তি পেতে দেখেছেন। এছাড়াও তিনি এমন লোকদের শাস্তি পেতে দেখেছেন যারা সারাক্ষণ অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করত এবং সমাজে ফেতনা সৃষ্টি করত। তাদের জিভ আর ঠোঁট আগুনের তৈরি কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলা হচ্ছিল এবং আবার তা আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছিল। এই সব দৃশ্য দেখিয়ে আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্য সতর্কবার্তা প্রদান করেন, যাতে মানুষ পাপ থেকে বিরত থাকে এবং সৎ পথে চলার চেষ্টা করে।

বর্তমানে অনেক মুসলমান লাইলাতুল মেরাজ উপলক্ষে ইবাদত-বন্দেগি করেন, যেমন কোরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ, জিকির ও দোয়া করা। অনেক জায়গায় মসজিদে ওয়াজ-মাহফিল ও ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তবে কুরআন ও হাদিসে শবে মেরাজ উপলক্ষে আলাদা কোনো নির্দিষ্ট নামাজ, রোজা বা বিশেষ ইবাদতের নির্দেশ নেই বলে অনেক আলেম মনে করেন। নবী মুহাম্মদ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরামও আলাদা করে লাইলাতুল মেরাজ পালনের কোনো প্রথা চালু করেননি। ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী লাইলাতুল মেরাজের রাতে মুসলমানদের জন্য দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের বিধান নির্ধারিত হয়। তাই অনেক আলেমের মতে এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথভাবে আদায় করা।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading