সববাংলায়

শাহ আব্দুল করিম

বিভাগঃ , ,

বাংলার লোকসঙ্গীত ঘরানার যে একটি জনপ্রিয় শাখা বাউল গান, সেই বাউল গানেরই একজন জনপ্রিয় শিল্পী হলেন বাংলাদেশের শাহ আব্দুল করিম (Shah Abdul Karim)। তিনি সঙ্গীত রচনা, সুরারোপ যেমন করতেন, গানও গাইতেন। তাঁকে মানুষ ‘বাউল সম্রাট’ আখ্যা দিয়েছিল। পাঁচশোর বেশি গান রচনা করেছেন তিনি। বাউল সঙ্গীতকে নিজের প্রতিভাবলে এক অসাধারণ উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন করিম। বাউল গান ছাড়াও জারিগান, সারিগান এমনকি শরীয়তী, মারফতি, দেহতত্ত্বের গান, গণসঙ্গীত ইত্যাদি সঙ্গীত-শাখাগুলিরও চর্চা করতেন। তাঁর গান অনূদিত হয়েছে ইংরেজিতে। সঙ্গীত পরিবেশনের জন্য বিদেশেও গিয়েছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ছিলেন তাঁর গানের একান্ত অনুরাগী। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহের কথা, সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার কথা তাঁর গানের কথায় প্রতিফলিত হয়েছে বারবার। তাঁকে ‘একুশে পদক’ দ্বারা সম্মানিত করা হয়েছিল।

১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার অন্তর্গত উজানধল গ্রামে এক অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে শাহ আব্দুল করিমের জন্ম হয়। তাঁর পিতা ইব্রাহীম আলী ছিলেন দরিদ্র এক কৃষক এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল নাইওরজান বিবি। এই দম্পতির মোট ছয় সন্তানের মধ্যে একমাত্র ছেলে ছিলেন শাহ আব্দুল করিম। তাঁর শৈশব বাংলাদেশের গ্রামে, মাঠেঘাটে, সুনামগঞ্জের কালনী নদীর তীরে কেটেছিল অত্যন্ত দারিদ্র্যে৷ পরিবারে এই অর্থকষ্ট থাকবার কারণেই ঠিকমতো লেখাপড়াও শিখে ওঠা হয়নি তাঁর। গ্রামের ব্রিটিশ-চালিত এক নৈশ বিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য যেতেন তিনি। কিন্তু গ্রামে রটে গিয়েছিল যে, সেই নাইট স্কুলে পড়লে নাকি ব্রিটিশদের সৈন্যদলের সঙ্গে গিয়ে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। সেই কারণেই স্কুল থেকে সকলে পালাতে শুরু করে এবং নৈশ বিদ্যালয় উঠে যায়। মাত্র ৮ দিন তিনি সেই স্কুলে যেতে পেরেছিলেন।

এতটাই আর্থিক অনটনের মধ্যে তাঁরা ছিলেন যে, যখন করিমের ১১ কি ১২ বছর বয়স তখন গ্রামের মোড়লের বাড়িতে রাখাল বালকের কাজ নিতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। বেতন ছিল দুই টাকা। মোড়লের বাড়ির গরুগুলির দেখভাল করা, গরু চরাতে নিয়ে যাওয়া ছিল তাঁর কাজ। সেই গরু চরানোর অবসরে গান ছিল তাঁর সঙ্গী। শত দারিদ্র্যের মধ্যেও গান ছেড়ে যায়নি তাঁকে। বর্ষাকালে যখন গরু চরানোর কাজ তেমন থাকত না, সেসময় আর্থিক চাহিদা মেটানোর জন্য মুদির দোকানেও কাজ করেছিলেন করিম।

শাহ আব্দুল করিম কাজ করতেন এবং তারই মধ্যে অবসর মতো মনের আনন্দে গান গাইতেন। আব্দুল করিম নসিবুল্লাহ নামে এক দাদার মুখে গান শুনে গানের প্রতি গভীরভাবে আকর্ষিত হয়েছিলেন। তবে গান গাইতেন বলে গ্রামের মানুষের চক্ষুশূল হয়েছিলেন তিনি। এমনকি গান গাওয়ার জন্যই ঈদের জামাতে সামিল হতে নিষেধ করা হয় তাঁকে। তাঁর নিজের গ্রামের মানুষের থেকে এমন ব্যবহার পেয়ে খুবই আঘাত পেয়েছিলেন মনে। সকলের সামনে করিমকে বলা হয় তওবা করতে এবং আর গান না গাওয়ার কথা বলতে। কিন্তু শাহ আব্দুল করিম তেমন কথা বলতে অস্বীকার করেন। আসলে জানতেন যে, বললেই গান ছাড়তে পারবেন না তিনি, তাই ভবিষ্যতেও যেটা ছাড়তে পারবেন না, বর্তমানে দাঁড়িয়ে, সেটা ছেড়ে দেবেন—এমন মিথ্যে কথা বলতে রাজি হননি করিম। ফলত তাঁকে কাফের আখ্যা দিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। উজানধল গ্রাম থেকে চলে গিয়ে গন্ধাগ্রামে আশ্রয় নেন করিম। সেই গ্রামে অবশ্য সঙ্গীতের কদর করা মানুষের অভাব ছিল না। সেখানে লোকসমাজে আলতার মা নামে পরিচিত এক বিধবার বাড়িতে থাকতেন তিনি। যদিও রহস্যজনকভাবে সেই গ্রামের সঙ্গেও একদিন সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল তাঁর।

শাহ আব্দুল করিম বাংলার বাউল সম্প্রদায়ের কয়েকজন বিখ্যাত মানুষের কাছে সঙ্গীতের প্রশিক্ষণ লাভ করেছিলেন। আব্দুল করিম ছোটবেলায় প্রাথমিকভাবে বাউল শাহ ইব্রাহিম মাস্তান বক্সের কাছে গান শিখেছিলেন। এই শাহ ইব্রাহিম ছিলেন শ্রীপুর পীর মহলের বাসিন্দা। পরে তিনি সাধক রশীদউদ্দিনের কাছেও সঙ্গীত প্রশিক্ষণ লাভ করেন। তিনি বাউলগানের জগতের কিংবদন্তি লালন শাহ, পুঞ্জু শাহ, দুদ্দু শাহদের দর্শন থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সেই কারণেই তাঁর গানেও লালন শাহজীর মতো মানবতার জয়গান মুখ্য হয়ে ওঠে; কোনরকম ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে তিনি প্রশ্রয় দেননি। সেই সঙ্গে ভাটির অঞ্চলের মানুষ এবং অন্যান্য সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনা, ভালবাসা-বিচ্ছেদ-বিরহের কথা দক্ষ শিল্পীর মতো স্বরচিত গানে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান আব্দুল করিমের গানের খুব অনুরাগী হয়ে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু যখন সুনামগঞ্জে গিয়েছিলেন একবার, তখন আব্দুল করিম তাঁকে গান শুনিয়েছিলেন। মুজিবর আবার মাওলানা ভাসানীকে করিমের গানের কথা জানিয়েছিলেন।

আব্দুল করিম দু’বার বিবাহ করেছিলেন। প্রেম করেই বিবাহ করেন তিনি। কিন্তু সংসারে তাঁকে বাঁধা তো সহজ নয়। গান পাগল সেই মানুষ বিবাহের পরও রাতের পর রাত জেগে নানা আসরে গান গেয়ে বেড়াতেন, নববিবাহিত স্ত্রীকে সময় দিতেন খুবই কম। ফলত, শ্বশুরবাড়ি থেকে ডাকা হয় করিমকে এবং বলা হয় বউ অথবা গান দুজনের মধ্যে বেছে নিতে হবে একজনকে। আব্দুল করিম নির্দ্বিধায় বেছে নিয়েছিলেন তাঁর প্রাণের সঙ্গী গানকেই। প্রথম বিয়ে তাঁর টেকেনি, কিন্তু পরে আফতাবুন্নেসা নামের এক নারীকে বিবাহ করেছিলেন তিনি আবার। এই আফতাবুন্নেসার সরলতার জন্য তাঁকে করিম সরলা বলে সম্বোধন করত। প্রথম বউয়ের তুলনায় এই দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা। করিমের গান গাওয়াকেই তিনি সবচেয়ে উৎসাহ দিতেন, অনুপ্রেরণা দিতেন। মুখ বুজে একা হাতে সংসার ঠেলে গেছেন তিনি। সংসারের অভাব নিয়ে অভিযোগ করে করিমের সঙ্গীত সাধনায় ব্যাঘাত ঘটাননি। সংসার চালানোর জন্য সরলা অন্যের বাড়ি কাজ পর্যন্ত করেছিলেন। বায়না নিয়ে গ্রামে গ্রামে গান গেয়ে বেড়ালেও সরলা কোনদিন অভিমান করেননি। কিন্তু এই সরলাও করিমের সঙ্গে শেষ জীবন পর্যন্ত থাকলেন না, তার আগেই চলে গেলেন মর্ত্যলোক ছেড়ে। সরলার মৃত্যুর সময়তেও করিম তাঁর কাছে থাকতে পারেননি। সরলার জানাজার জন্যও লোক পাওয়া যাচ্ছিল না সেসময়। ইমাম বলেছিলেন সরলার জানাজার কোন প্রয়োজন নেই, কারণ তিনি ছিলেন একজন বাউল ফকিরের স্ত্রী। কেউ রাজি না হলে নিজের উঠোনেই সরলার জানাজা পড়েন করিম এবং সরলার স্মৃতিতে নিজের হাতে সরলামহল বানিয়েছিলেন।

শাহ আব্দুল করিমের গানে কোন নির্দিষ্ট ধর্মবিশ্বাসের কথা নেই, বরং মানবধর্মকেই সেখানে বড় করে তোলা হয়েছে৷ রাধাকৃষ্ণের লীলাবিষয়ক গানও রচনা করেছিলেন তিনি। এছাড়াও গণসঙ্গীত, শরীয়তী, মারফতি ইত্যাদি নানারকম ঘরানার চর্চার কথা বলা হয়েছে আগেই। তিনি একইসঙ্গে ছিলেন সঙ্গীত রচয়িতা, সুরকার এবং গায়ক। একসময় সাধক দুর্বীণ শাহ-এর সঙ্গে সিলেট জেলায় এক অনুষ্ঠানে ‘মালজোড়া গান’ গেয়ে তিনি অনেক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় বাউলশিল্পী কামালউদ্দিনের সঙ্গে বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভায় গণসঙ্গীত গেয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন করিম। এমনকি সরকারের সহায়তায় সঙ্গীত পরিবেশন করতে বেশ কয়েকবার লন্ডনেও গিয়েছিলেন তিনি।

১৯৫৪ সালে শাহ আব্দুল করিমের গণসঙ্গীত গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়াও ‘আফতাব সঙ্গীত’, ‘কালনীর ঢেউ’, ‘ভাটির চিঠি’ ইত্যাদি বইতে শাহ আব্দুল করিমের গান সংকলিত হয়েছে। বাংলা একাডেমি তাঁর দশটি গান ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন।  ১৬০০টিরও বেশি গান লিখেছিলেন তিনি। তাঁর কয়েকটি জনপ্রিয় গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ‘মুর্শিদ ধন হে, কেমনে চিনিব তোমারে’, ‘আমার হাত বান্ধিবি পাও বান্ধিবি’, ‘ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে’, ‘বন্দে মায়া লাগাইসে’, ‘কেনো পিরীতি বাড়াইলা রে বন্ধু’, ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ ইত্যাদি।

বাউল এবং লোকসঙ্গীতের আরও কয়েকটি ধারায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য শাহ আব্দুল করিম বিভিন্ন সময়ে নানা পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ২০০১ সালে আব্দুল করিমকে একুশে পদক দ্বারা সম্মানিত করা হয়। তারও আগে ২০০০ সালে আব্দুর রউফ চৌধুরীর থেকে দ্রোহী কথাসাহিত্যিক পুরস্কার লাভ করেন তিনি।

২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ৯৩ বছর বয়সে শ্বাসকষ্টজনিত কারণে সিলেটে বাউল সম্রাট নামে পরিচিত শাহ আব্দুল করিমের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।