আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ভাষা, এর শব্দ ও সাহিত্য ভান্ডার অপরিসীম। যেকোনো উৎকৃষ্ট ভাষার একটি প্রধান সম্পদ হল প্রবাদ, ইংরেজিতে যাকে বলে proverb। বাংলা ভাষায় প্রাচীনকাল থেকেই অনেক প্রবাদ লোকমুখে বা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এই রকমই একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল “ষণ্ডামার্ক” বা “ষণ্ডামার্কা” । এই প্রবাদটির প্রচলিত অর্থ হল: ষাঁড়ের মতো একগুঁয়ে ও বলিষ্ঠ, উগ্র, দুর্বৃত্ত ইত্যাদি। এই প্রবাদের উৎস খুঁজতে পুরাণের দিকে নজর দিতে হবে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
সাধারণত গুন্ডা ধরণের মানুষকে আমরা ষণ্ডামার্কা বা ষণ্ডামার্ক বলে থাকি এবং অনেকেই ধরে নিই ষণ্ড বা ষণ্ডা শব্দটি এখানে ষাঁড় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আসলে ষণ্ডামার্ক শব্দটি বা প্রবাদটি ষাঁড় থেকে থেকে আসেনি, এর উৎস ষণ্ড ও অমর্ক নামে দুই অসুর সেনাপতির নাম থেকে – তাদের একত্রে ষণ্ডামার্ক বলা হত যা পরবর্তীতে ষণ্ডামার্কা হয়ে গেছে।
মহর্ষি ভৃগুর পুত্র সর্বশাস্ত্রবিদ দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য ছিলেন অসুর-দৈত্যদের পুরোহিত তথা গুরু। দৈত্যগুরু নামে তিনি প্রসিদ্ধ। শুক্রাচার্যের দুই পুত্রের নাম যণ্ড ও অমর্ক। প্রহ্লাদের বাবা হিরণ্যকশিপুর গুরু শুক্রাচার্য, সেজন্য শুক্রাচার্যের সন্তান ষণ্ড ও অমর্ক তাঁর বাড়িতে থাকতেন । পিতা শুক্রাচার্যেই মতোই যণ্ড ও অমার্ক ছিলেন জ্ঞানী ও শাস্ত্রবিদ পণ্ডিত। রাজা হিরণ্যকশিপু তাঁর পুত্র প্রহ্লাদের শিক্ষার দায়িত্ব তুলে দেন ষণ্ডামার্কের হাতে। অর্থাৎ প্রহ্লাদের শিক্ষাগুরু হলেন যণ্ডামার্ক।
আবার ষণ্ডামার্ক দু’জনেই ছিলেন অসুরদের সেনানায়ক। গোঁয়ারগোবিন্দ ও বলশালী এই দুই ভাই যুদ্ধে দেবতাদের পরাজিত করেন। দেবতারা উপায়গতিক না দেখে অসুরদের পরাজিত করার জন্য এক ষড়যন্ত্র রচনা করেন। দেবতারা এক বিশাল যজ্ঞের আয়োজন ক’রে যণ্ড ও অমর্ককে সেখানে নিমন্ত্রণ জানান। বায়ুপুরাণ ও মৎস্যপুরাণ অনুযায়ী জানা যায় যে, দেবতারা দুই ভাইকে প্রচুর খাওয়া দাওয়া করায়। তাঁদেরকে প্রচুর পরিমাণে সুরা পান করিয়ে দেবতারা কৌশলে তাঁদেরকে অনুরোধ করেন অসুরপক্ষ ত্যাগ করতে। সুরাপানে মত্ত এই দুই অসুর-সেনাপতি ষণ্ডামার্ক অসুরদের পক্ষ ত্যাগ করেন। ফলে দেবতাদের কাছে অসুররা পরাজিত হয়।
ষণ্ডামার্ক ভয়ানক গোঁয়ার ও গুণ্ডা প্রকৃতির দৈত্য ছিলেন। সে কারণে ঐ স্বভাবের মানুষকে আমাদের সমাজে যণ্ডামার্ক বা যণ্ডামার্কা বলা হয়। প্রহ্লাদের গুরু হবার কারণে প্রবাদে যণ্ডামার্ক গুরুও বলা হয়। হিরণ্যকশিপুর কথায় ষণ্ডামার্ক বিষ্ণু-ভক্ত প্রহ্লাদের উপর অমানুষিক অত্যাচার করেছিলেন বলেও নামটি প্রবাদে পরিণত হয়েছে।
‘ষণ্ডামার্ক’ বা ‘ষণ্ডামার্কা’ প্রবাদটি দিয়ে বাক্যগঠন:
১। ‘ষণ্ডামার্কা’ চেহারার দুটো লোক সামনে দাঁড়াতেই লোকটি ভয়ে কেঁদে ফেলল।
২। আজকালকার ছোটখাট নেতারাও দু’পাশে দু’জন ‘ষণ্ডামার্কা’ দেহরক্ষী নিয়ে ঘোরে।!
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- প্রবাদের উৎস সন্ধান – সমর পাল, শোভা প্রকাশ / ঢাকা ; ১৫৯ পৃঃ
- পৌরাণিক অভিধান – সুধীরচন্দ্র সরকার, প্রথম সংস্করণ; ৫২৮ পৃঃ
- https://www.english-bangla.com/


আপনার মতামত জানান