ইতিহাস

শংকর দয়াল শর্মা

শংকর দয়াল শর্মা (Shankar Dayal Sharma) ছিলেন ভারতের নবম রাষ্ট্রপতি যিনি ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ভারতের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। শংকর দয়াল শর্মা ভারতের অষ্টম উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবেও নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি ভোপালের মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন ছিলেন।

১৯১৮ সালের ১৯ আগস্ট মধ্যপ্রদেশের ভোপালে শংকর দয়াল শর্মার জন্ম হয়। তিনি লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। শংকর দয়াল ছাত্র হিসেবে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি খেলাধূলোর প্রতিও যথেষ্ট আগ্রহী ছিলেন। সাঁতার এবং দৌড়ে তিনি বেশ দক্ষ ছিলেন। শংকর দয়াল তাঁর সমাজসেবামূলক কাজের জন্য লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘চক্রবর্তী স্বর্ণপদক’ লাভ করেন। তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে ‘ডক্টরেট’ ডিগ্রী অর্জন করেন। পরবর্তীকালে তিনি কেমব্রিজ এবং লখনৌ এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বেশ কিছুদিন কাজও করেছিলেন। তিনি হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে ‘ফেলোশিপ’, কেমব্রিজের ফিটজউইলিয়াম কলেজে কর্মরত থাকাকালীন ‘অনারারি বেঞ্চার’, ‘মাস্টার অফ লিংকনস ইন‌’এবং ‘অনারারি ফেলো’ নির্বাচিত হয়েছিলেন। ভারতের উপরাষ্ট্রপতি পদে থাকার সময়ও তিনি ভারতের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ছিলেন।

ভোপালের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার আগে ৯ বছর তিনি লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ের অধ্যাপক ছিলেন। পরবর্তীকালে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি হরিজন, আদিবাসী ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণীর জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলেন। এমনকি মেয়েদের জন্যও তিনি অবৈতনিক শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের করাচীতে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বিষয়ক সম্মেলনে তিনি ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৩ বছর ধরে তিনি কেন্দ্রীয় শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য ছিলেন। ভোপালের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ ছিল জায়গিরদারী প্রথার বিলোপ সাধন।

১৯৪০ সালে তিনি লখনৌতে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে পরবর্তী সময়ে তিনি ভারতের ‘জাতীয় কংগ্রেস’-এ যোগদান করেন। তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনেও জড়িত ছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ভোপালের নবাব চেয়েছিলেন তাঁর রাজ্যকে ভারতের থেকে পৃথক রাখতে। এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে শংকর দয়াল ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর মাসে গণআন্দোলন করেন যার ফলে তাঁকে ৮ মাসের জন্য কারাবন্দী রাখা হয়। পরবর্তীকালে, জনগণের চাপে পড়ে ভোপালের নবাব বাধ্য হয়ে তাঁকে মুক্ত করেন এবং ১৯৪৯ সালের ৩০ এপ্রিল ভারতের সাথে সংযুক্ত হওয়ার চুক্তিতে সই করেন। ১৯৫২ সালে শংকর দয়াল শর্মা ভোপালের সর্বাপেক্ষা কনিষ্ঠ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি ভোপালের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।

১৯৭২ সালে তিনি ‘অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি’র সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার যোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি অন্ধ্রপ্রদেশের রাজ্যপাল ১৯৮৫ সালে পাঞ্জাবের রাজ্যপাল এবং ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি মহারাষ্ট্রের রাজ্যপাল ছিলেন। ১৯৮৭ সালের পর তিনি ভারতের উপরাষ্ট্রপতি এবং রাজ্যসভার চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৯২ সালে রাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণের আগে পর্যন্ত তিনি উপরাষ্ট্রপতি পদে বহাল ছিলেন। রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন তিনি তিনজন প্রধানমন্ত্রীকে (অটল বিহারী বাজপেয়ী, এইচ. ডি দেবেগৌড়া এবং ইন্দ্রকুমার গুজরাল) শপথ বাক্য পাঠ করিয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি শিক্ষা, আইন, শিল্প-বাণিজ্য, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং রাজস্ব সংক্রান্ত দফতরের দায়িত্ব পালন করেছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিমালাদেবীকে বিবাহ করেন। তাঁদের দুজন পুত্র সন্তান ও এক কন্যা সন্তান হয়। তাঁদের কন্যা গীতাঞ্জলি ও তাঁর স্বামী কংগ্রেস সাংসদ ললিত মাকেন ১৯৮৫ সালের ৩১ জুলাই পাঞ্জাবে খালিস্তানি সন্ত্রাসীদের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।

ভারতের সমস্ত বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে স্নাতক স্তরে ‘শংকর দয়াল শর্মা স্বর্ণপদক’ প্রদান করা হয়। ১৯৯৪ সালে এই পদকের জন্য তিনি অর্থ প্রদান করেছিলেন।

১৯৭০ সালে তিনি কোরানের ওপর একটি কবিতা রচনা করেছিলেন, যা ভারত ও পাকিস্তানের হিন্দি ও উর্দু ভাষী মুসলমানদের মধ্যে অত্যন্ত সমাদৃত হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক আইনজীবী সমিতি (The International Bar Association) আইনের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা এবং অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে ‘লিভিং লেজেন্ড অফ ল আ্যওয়ার্ড অফ রেকগনিশন’ পুরস্কারে সম্মানিত করেছে।

জীবনের শেষ পাঁচ বছর তিনি অসুস্থ ছিলেন। ১৯৯৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর অসুস্থ অবস্থায় দিল্লির হাসপাতালে হার্ট অ্যাটাকে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

স্বরচিত রচনাপাঠ প্রতিযোগিতা - নববর্ষ ১৪২৮



সমস্ত রচনাপাঠ শুনতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন