ইতিহাস

শশাঙ্ক মোহন রায়

শশাঙ্ক মোহন রায় (Shasanka Mohan Roy) একজন ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ফিজিক্যাল সায়েন্সের পারমাণবিক শক্তি বিভাগের ‘রাজা রামান্না ফেলো’। তিনি টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান গ্রুপ কমিটির প্রাক্তন চেয়ারম্যান। তিনি পায়ন-পায়ন ডায়নমিক্সের (pion-pion dynamics) এক্স্যাক্ট ইন্টিগ্রাল ইকোয়েশন (Exact Integral Equation) তৈরি করার জন্য এবং বেল ইনইকোয়ালিটিজ-এর (Bell inequalities) ওপর কাজের জন্য জনপ্রিয়। এই ইকোয়েশনগুলোকে ‘রয়েজ ইকুয়েশন’ও (Roy’s equation) বলা হয়। 

১৯৪১ সালের ২ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানী দিল্লিতে শশাঙ্ক মোহন রায়ের জন্ম হয়। ১৯৬০ সালে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বিজ্ঞান শাখায় স্নাতক হন এবং ১৯৬২ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ (M.Sc) করেন। তিনি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৬ সালে পিএইচডি করেন। এরপর তিনি ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত সান দিয়েগোর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট ডক্টরেট করেন। ভারতে ফিরে আসার পরে, তিনি ১৯৬৭ সালে টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ-এ যোগ দেন। তিনি ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান গ্রুপ কমিটির সভাপতিত্ব করেছিলেন। তিনি ২০০৬ সাল পর্যন্ত একজন সিনিয়র অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন। অধ্যাপনা থেকে অবসর গ্রহণের পরে তিনি জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ফিজিক্যাল সায়েন্স-এর পারমাণবিক শক্তি বিভাগে ‘রাজা রামন্না ফেলো’ হিসেবে যোগদান করেন।

তিনি বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিভাগীয় পরিদর্শক ছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ইউরোপীয়ান অর্গানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ (European Organization for Nuclear Research, CERN) এবং স্যাকলে নিউক্লিয়ার রিসার্চ সেন্টার (Saclay Nuclear Research Centre), লুসান বিশ্ববিদ্যালয় (University of Lausanne), সাইরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয় (Syracuse University), আলবার্তা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Alberta), কায়সারস্লাউটার্ন বিশ্ববিদ্যালয় (University of Kaiserslautern) এবং ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় (University of York)।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নন্দিতার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই সন্তান অরুনাভ  এবং অদিতি। মহারাষ্ট্রের নভি মুম্বাই অঞ্চলে তিনি তাঁর পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন।

তাঁর গবেষণা মূলত পায়ন ডায়নামিকস (pion dynamics) এবং হেড্রন ইন্টার‍্যাকশন (hadron interactions) এর উপর ভিত্তি করে। তাঁর ‘অ্যাকসিয়ম্যাটিক কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি’-র (axiomatic quantum Field theory) ওপর কাজের ভিত্তিতে তিনি এক্স্যাক্ট ইন্টিগ্রাল ইকুয়েশন (exact integral equation) প্রস্তুত করেন যা পরে ‘রয়েস ইকুয়েশন’ (Roy’s equation) নামে পরিচিত হয়। তিনি আন্দ্রে মাটিনের (Andre Martin) ‘হাই এনার্জি বাউন্ডস’ (high-energy bounds) এবং জন স্টুয়ার্ট বেলের (John Stewart Bell) ‘আইনস্টাইন-পোডোলস্কি-রোসেন প্যারাডক্স’ (Einstein-Podolsky-Rosen Paradox)-এর উপর কাজকে এগিয়ে নিয়ে যান। হাই এনার্জি বাউন্সের ওপর কাজ করতে গিয়ে তিনি ‘রায়-সিং মাল্টিপারটিকেল বেল ইনিকোয়ালিটিস’ (Roy-Singh multiparticle Bell inequalities) এবং ‘অউবারসন-ম্যাহোক্স-রায়-সিং-বেল ইনিকোয়ালিটিস’ (Auberson-Mahoux-Roy-Singh Bell inequalities) আবিষ্কার করেন। তিনি ‘চন্দ্রশেখর লিমিট’ (Chandrasekhar limit) এবং ‘বোসন সিস্টেমে’র (Boson system) ‘ক্রিটিক্যাল মাস’ (critical mass) নিয়েও গবেষণা করেন। আন্দ্রে মার্টিনের সাহায্য তিনি ক্রিটিক্যাল মাসের রিলেটিভিস্টিক কোল্যাপ্সের (relativistic collapse) তত্ত্ব প্রমাণ করেন। ধর-গ্রোভার-রায় সুপার জিরো এলগোরিদম (Dhar-Grover-Roy super-Zeno algorithm), রায়-ব্রাউনস্টেইন্স কোয়ান্টাম মেট্রোলজি (Roy-Braunstein’s quantum metrology), পমেরানচাক থিয়োরেম (Pomeranchuk’s Theorem) ইত্যাদির ওপর গবেষণা তাঁর শ্রেষ্ঠ অবদানের মধ্যে পড়ে।

বিভিন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক পত্রিকা ও বইয়ে শশাঙ্ক মোহন রায়ের ১০৫-টি গবেষণা সম্পর্কিত প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তিনি পরবর্তীকালে বীরেন্দ্র সিং-এর সাথে একটি বহু প্রশংসিত বই লেখেন, যার নাম ‘অ্যাডভান্সেস ইন হাই এনার্জি ফিজিকস’ (Advances in High Energy Physics)। তিনি টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি বিভাগে থিওরিটিক্যাল ফিজিকস সেমিনার সার্কিট-এর (Theoretical Physics Seminar Circuit) প্রচলন শুরু করেন। তিনি সিএসআইআর-স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ সেন্টারে (CSIR- structural engineering research center) বক্তৃতা দিয়েছিলেন এবং ১৯৯৭ সালে বোম্বের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে (Indian Institute of Technology, Bombay) একজন বিশেষজ্ঞ সদস্য ছিলেন। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত ইন্দো ফ্রেঞ্চ সেন্টার ফর দ্য প্রোমোশন অফ আ্যডভান্স রিসার্চ-এ (Indo-French Centre for the promotion of Advanced Research (IFCPAR/CEFIPRA)) ‘শ্রোডিঞ্জার ইকোয়েশনস’ (Schroedinger’s equations) সম্পর্কিত এক গবেষণার প্রধান গবেষক ছিলেন।

১৯৮১ সালে ভারত সরকারের সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক গবেষণাভিত্তিক সংস্থা ‘কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ’ (Council of Scientific and Industrial Research) তাঁকে ‘শান্তি স্বরূপ ভাটনগর’ পুরস্কার (Shanti Swarup Bhatnagar Prize) দিয়ে সম্মানিত করে। তিনি ১৯৮২ সালে ‘ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস’ (Indian Academy of Sciences), ১৯৮৯ সালে ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি’ (Indian National Science Academy), ১৯৯৩ সালে ‘ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস, ইন্ডিয়া’ (National Academy of Sciences, India), এবং ২০০২ সালে ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস’-এর (The World Academy of Sciences) নির্বাচিত ‘ফেলো’ ছিলেন। ২০০৩ সালে ‘ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেস অ্যাসোসিয়েশন’ (Indian Science Congress Association) তাঁকে ‘এস এন বোস বার্থ সেন্টেনারি গোল্ড মেডেল’-এর  (S. N. Bose Birth Centenary Gold Medal) জন্য নির্বাচন করে।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।