সপ্তম শতাব্দীর একজন মহাজ্ঞানী, বৌদ্ধশাস্ত্রে পন্ডিত ও দার্শনিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন শীলভদ্র (Shilbhadra)। তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ছিলেন। বিখ্যাত চৈনিক পর্যটক হিউয়েন সাঙ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর অধীনে বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলেন।
৫২৯ সালে প্রাচীন সমতট রাজ্যের (বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্গত কুমিল্লা জেলা) এক রাজপরিবারে শীলভদ্রের জন্ম হয়।
ছোট থেকেই পড়াশোনায় অত্যন্ত মনোযোগী ছিলেন শীলভদ্র। কুড়ি বছর বয়স পর্যন্ত সমতট রাজ্যের রাজধানী লালমাই-ময়নামতিতে থেকেই পড়াশোনা করেন তিনি। তাঁর জ্ঞান আহরণের বাসনা ক্রমে এতটাই বৃদ্ধি পায় যে তিনি রাজপরিবারের রাজকীয় সম্পদ ও প্রাচুর্যের মোহ ত্যাগ করে জ্ঞান আহরণের জন্য প্রকৃত ধর্ম গুরুর খোঁজে রাজ্য ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। তৎকালীন ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্য জ্ঞান আহরণের জন্য তিনি ভ্রমণ করেন।
তিরিশ বছর বয়সে শীলভদ্র মগধে অবস্থিত বিখ্যাত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেসময় আচার্য ছিলেন ধর্মপাল। তিনি যোগাচার ও দর্শনের একজন বিদগ্ধ পণ্ডিত ছিলেন। ধর্মপালের থেকে শীলভদ্র বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন। এই ধর্মপালের হাত ধরেই শীলভদ্রের বৌদ্ধধর্মের সাথে পরিচয় হয়। বৌদ্ধধর্মের শাস্ত্রীয় বিষয়ে ধর্মপালের থেকে প্রভূত জ্ঞান অর্জন করেন তিনি। বৌদ্ধশাস্ত্রের আঠারোটি বিভাগের বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্র ছাড়াও হেতুবিদ্যা, শব্দবিদ্যা, শিল্পবিদ্যা, রসায়ন শাস্ত্র, ধাতুবিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র, সাংখ্য, বেদ, অথর্ববেদ, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে শীলভদ্র পারদর্শী হয়ে ওঠেন।
দক্ষিণ ভারতের এক পণ্ডিত শীলভদ্রের শিক্ষক ধর্মপালকে ধর্ম বিষয়ে তর্কযুদ্ধে আহ্বান জানান। স্থানীয় রাজার অনুরোধে ধর্মপাল এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশগ্রহণ করতে রাজি হন। শীলভদ্র বিষয়টি জানতে পেরে তিনি নিজেই এই তর্কযুদ্ধে অংশগ্রহণ করবেন বলে ইচ্ছা প্রকাশ করেন ধর্মপালের কাছে। শীলভদ্রের প্রতি ধর্মপালের অগাধ আস্থার কারণে শীলভদ্রের এই ইচ্ছা পূরণে রাজি হয়ে যান তিনি। মাত্র তিরিশ বছর বয়সে শীলভদ্র তাঁর জ্ঞান এবং প্রতিভার বলে এই তর্কযুদ্ধে জয়ী হন। তর্কযুদ্ধে শীলভদ্রের জ্ঞানের গভীরতা রাজাকে এতটাই অভিভূত করে যে তিনি খুশি হয়ে পুরস্কারস্বরূপ একটি শহর থেকে সংগৃহীত রাজস্বের পুরোটাই তাঁকে দান করে দিতে চান। কিন্তু রাজবংশের সন্তান হয়েও অঢেল ঐশ্বর্য ছেড়ে কেবল জ্ঞান আহরণের জন্য রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন শীলভদ্র। তাই অত্যন্ত বিনয়ের সাথে মগধ রাজার পুরস্কারের প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দিলেন। শেষ পর্যন্ত রাজার বিশেষ অনুরোধে শীলভদ্র সেই রাজস্ব গ্রহণ করলেন ঠিকই কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে নয়। তিনি সেই অর্থ দিয়ে একটি বৌদ্ধবিহার (সংঘারাম) নির্মাণ করে দিলেন। সেই বৌদ্ধবিহারের নাম রাখা হয় ‘শীলভদ্র সংঘারাম বিহার’। সেখানে জ্ঞানচর্চা করে মানুষ আলোকিত হবে এটাই ছিল শীলভদ্রের প্রত্যাশা।
ধর্মপাল বার্ধক্যজনিত কারণে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের পদ থেকে স্বেচ্ছাবসর গ্রহণ করলে শীলভদ্র এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য পদ লাভ করেন। এখান থেকেই শুরু হয় শীলভদ্রের কর্মজীবন। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য পদে তিনি কুড়ি বছরের বেশি সময় অতিবাহিত করেন।
শীলভদ্র নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য থাকাকালীন বিখ্যাত চৈনিক পর্যটক হিউয়েন সাঙ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বৌদ্ধধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরাগ ও বৌদ্ধশাস্ত্র সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান অর্জনের ইচ্ছা দেখে হিউয়েন সাঙকে শীলভদ্র নিজের শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন ও নিজ দায়িত্বে তাঁকে শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। হিউয়েন সাঙ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে পড়াশোনা করেছিলেন। হিউয়েন সাংয়ের ভারত ভ্রমণ বৃত্তান্ত থেকে জানা যায় তাঁর সঙ্গে যখন শীলভদ্রের প্রথম সাক্ষাৎ হয় তখন শীলভদ্রের বয়স হয়েছে একশো ছয় বছর। তাঁর পান্ডিত্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে শীলভদ্রের নাম কেউ উচ্চারণ করতেন না। তাঁর নাম উচ্চারণের বদলে তাঁকে যে অভিধায় অভিহিত করা হত তার বঙ্গানুবাদ হল ‘স্ব-ধর্মনিধি’ (Treasure of the True Law)।
শীলভদ্র সম্পর্কে এবং তাঁর জ্ঞানচর্চা ও কর্মকান্ড সম্পর্কে জানা যায় হিউয়েন সাঙ লিখিত ভ্রমণ বৃত্তান্ত মূলক একটি গ্রন্থ থেকে। হিউয়েন সাংয়ের বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর সময়ে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংখ্যা ছিল প্রায় দশ হাজার, বিভাগের সংখ্যা ছিলো প্রায় একশোটি, শিক্ষকের সংখ্যা ছিল দেড় হাজার। সেখানকার অধ্যাপকদের মধ্যে একমাত্র শীলভদ্র একাই প্রতিটি বিভাগের বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখতেন।
শীলভদ্র নিজে মহাযান মতাবলম্বী ছিলেন। তা সত্ত্বেও বৌদ্ধ ধর্মের সকল বিভাগে তাঁর বিশেষ পান্ডিত্য ছিল। কেবল বৌদ্ধ ধর্মই নয়, হিন্দু ধর্ম শাস্ত্রেও ছিল তাঁর অগাধ পান্ডিত্য।। শিষ্য হিউয়েন সাঙকে সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে তাঁর পাঠক্রমে বেদ অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন শীলভদ্র।
ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে তুর্কী মুসলিম সেনাপতি বখতিয়ার খিলজীর নেতৃত্বে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংস করা হয়। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসের পর ধীরে ধীরে শীলভদ্রকে ভুলে যেতে থাকে ইতিহাস। পরবর্তীকালে শীলভদ্রকে নিয়ে ত্রিপুরার মহারাজা ঐতিহাসিক শ্রী কৈলাসচন্দ্র সিংহ মাসিক পত্রিকা ‘সাহিত্য’তে ‘বঙ্গের আদিগৌরব শীলভদ্র’ শিরোনামে এক দীর্ঘ নিবন্ধ লেখেন। পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ’ প্রবন্ধে শীলভদ্রের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন।
শীলভদ্র বুদ্ধের বাণীকে তিনটি ধর্মচক্রে ভাগ করেছিলেন। মহাযান মতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘সমাধিমোচন সূত্র’ অনুসারে তিনি এই ধর্মচক্রের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্রথম চক্রে বুদ্ধ সারনাথে তাঁর পাঁচ শিষ্যকে জীবনের চারটি মহান সত্য সম্পর্কে অবহিত করেন। এই চক্রে বৌদ্ধধর্মের গোড়ার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় চক্রে বুদ্ধ মহাযান মতাবলম্বী বোধিসত্ত্বদের বোঝান এই পৃথিবীর সকল বস্তুর সার হল শূন্য। যেমন কোন কিছুরই শুরু নেই তেমনি শেষ নেই, উদয় নেই অস্ত নেই। তৃতীয় চক্রে বুদ্ধ সকল শ্রবক, প্রত্যেক বুদ্ধ এবং বোধিসত্ত্বদের দ্বিতীয় চক্র সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন যাতে তাঁদের মনে এই বিষয় কোন সংশয় না থাকে। শীলভদ্র রচিত বৌদ্ধধর্ম ও দর্শনের ওপর তিব্বতীয় ভাষায় লিখিত একমাত্র গ্রন্থ হল ‘আর্য বুদ্ধ ভূমি ব্যাখান’।
৬৫৪ সালে শীলভদ্রের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান