সববাংলায়

মহাকাশ অভিযান ।। স্পেস মিশন

পৃথিবী থেকে রাতের ঘন কালো আকাশ, উজ্জ্বল তারামণ্ডল কিংবা চাঁদের কলঙ্ক দেখার অভিজ্ঞতা মানুষ যখন থেকে পেয়েছে, এই মহাবিশ্বকে জানার আগ্রহ তার তত বেড়েছে ক্রমে ক্রমে। পৃথিবীর বাইরে আরও যে খান সাতেক গ্রহ রয়েছে, গ্রহাণু রয়েছে, রয়েছে আরও অসংখ্য মহাজাগতিক উপাদান তার সম্পর্কে জানার আগ্রহেই শুরু হয়েছিল এক সময় মহাকাশ অভিযান বা স্পেস মিশন (Space Mission)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে শুরু করে চিন, জাপান এমনকি ভারতও ধীরে ধীরে এই মহাকাশ অভিযানে সামিল হয়েছে এবং মহাকাশের দুর্গম রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চন্দ্র অভিযান, মঙ্গল অভিযান ছাড়াও এই মহাকাশ অভিযানের ফলে মানুষ জেনেছে শুধু চাঁদ নয়, সূর্যের বুকেও রয়েছে কলঙ্কের দাগ। আবার শনির চাঁদগুলির সম্পর্কেও নানাবিধ তথ্য আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে এই মহাকাশ অভিযানের ফলে। জ্যোতির্বিদ্যা এবং মহাকাশ প্রযুক্তির সাহায্যে মহাকাশ সম্পর্কে আবিষ্কারের প্রচেষ্টার নামই মহাকাশ অভিযান। আসুন জেনে নেওয়া যাক মহাকাশ অভিযানের এক সুদীর্ঘ ইতিহাস।

শুনলে অবাক হতে হয় মহাকাশে মানুষের প্রথম পাঠানো বস্তু ছিল বন্দুকের গুলি যা ১৯৪০-এর দশকে জার্মান সিয়েজ ইঞ্জিন থেকে পৃথিবীর উপরে প্রায় ৪০ কিমি. উচ্চতা পর্যন্ত ছোঁড়া সম্ভব হয়েছিল। পরবর্তীকালে জার্মান বিজ্ঞানীরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘ভি-২’ (V 2) নামক রকেটের করে প্রথমবার মহাকাশে কোনও বস্তু পাঠাতে সক্ষম হয়। ১৯৪৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘ভি-২’ রকেটের সাহায্যেই প্রথম মহাকাশ থেকে পৃথিবীর ছবি তোলে। তবে ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবরই সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘স্পুটনিক ১’ (Sputnik 1) মহাকাশযান উৎক্ষেপণকে প্রথম আনুষ্ঠানিক মহাকাশ অভিযান বলা হয়। একটি ‘আর ৭’ (R-7) রকেটের সাহায্যে পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫০ কিমি. উচ্চতায় পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেছিল এই স্পুটনিক ১। এই মহাকাশযান থেকে নির্গত শব্দতরঙ্গের বিশ্লেষণের মাধ্যমে পৃথিবীতে বসে বিজ্ঞানীরা আয়নোস্ফিয়ারের ইলেক্ট্রন ঘনত্ব সম্পর্কে কিংবা মহাকাশের তাপমাত্রা ও চাপ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। ‘স্পুটনিক ১’ ছিল মহাকাশে মানুষের পাঠানো প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ। ঐ বছরই ৩ নভেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন ‘স্পুটনিক ২’ মহাকাশযানে করে প্রথম পৃথিবী থেকে একটি কুকুরকে পাঠান মহাকাশে, মানুষের আগে প্রথম মহাকাশ্চারী ছিল এই কুকুর ‘লাইকা’। এই ঘটনার চার বছর পরেই ১৯৬১ সালে মহাকাশে পাড়ি দেয় পৃথিবীর প্রথম মানুষ – রাশিয়ান মহাকাশচারী ইউরি গ্যাগারিন। ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল ‘ভস্তক ১’ (Vostok 1) নামের মহাকাশযানে চড়ে মহাকাশে মাত্র ১ ঘন্টা ৪৮ মিনিট সময় ব্যাপী পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন ইউরি গ্যাগারিন। এর মাধ্যমেই সোভিয়েত মহাকাশ গবেষণা সমগ্র বিশ্বের কাছে মহাকাশে মানুষের পদচারণার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তবে তার আগে ১৯৫৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণার ফলাফল হিসেবে প্রথমে একটি ‘ভ্যানগার্ড স্যাটেলাইট’  এবং তার পরে জুনো রকেটের সাহায্যে ‘এক্সপ্লোরার ১’ (Explorer 1) নামের একটি মহাকাশযান পাঠানো হয়। ভ্যানগার্ড স্যাটেলাইটটি ব্যর্থ হলেও এক্সপ্লোরার ১-এর সাহায্যে মহাকাশের নানাবিধ তথ্য জানতে পারা যায় নতুনভাবে। ১৯৫৯ সালে পৃথিবী থেকে প্রথম কোনও কৃত্রিম উপগ্রহ চাঁদে পাঠানো সম্ভব হয় যার নাম ছিল ‘লুনা ২’ যা পাঠিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। এরপরে আবার ১৯৬৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি লুনা ৯ নামের একটি কৃত্রিম উপগ্রহ চাঁদে অবতরণ করে, ঐ বছরই আবার ৩ এপ্রিল তারিখে লুনা ১০ চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করে। এর আগে ১৯৬১ সালের ৫ মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রথম মহাকাশচারী হিসেবে অ্যালান শেফার্ড জুনিয়র মহাশূন্যে পৌঁছে মহাকাশযানে করে পৃথিবীর কক্ষপথে ১৫ মিনিট ২২ সেকেন্ড যাবৎ পরিভ্রমণ করেন। ঐ বছরই ২৫ মে তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কেনেডি ঘোষণা করেন যে ৬০-এর দশকের শেষের মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাঁদে সফলভাবে কোনও মানুষকে পাঠাতে সক্ষম হবে। ১৯৬২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জন গ্লেন নামের এক মার্কিন মহাকাশচারী সফলভাবে পৃথিবীকে তিনবার প্রদক্ষিণ করতে সক্ষম হন। তবে এই মহাকাশ অভিযান সংক্রান্ত প্রচেষ্টা সবসময় সুখকর ছিল না। ১৯৬৭ সালে কেনেডি স্পেস সেন্টারে স্থিত ‘অ্যাপোলো ১’ মহাকাশযানের কমান্ড মডিউলে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আগুন ধরে যায় এবং তার ফলে গাস গ্রিসম, এডওয়ার্ড হোয়াইট এবং রজার চ্যাফে এই তিন মহাকাশচারীর মৃত্যু হয়। ঐ বছরই ২৪ এপ্রিল নভোশ্চর ভ্লাদিমির কোমারভের মৃত্যু হয় ‘সয়্যুজ ১’ (Soyuj 1) মহাকাশযানে করে পৃথিবীতে ফেরার সময়। এর ঠিক বছর দুয়েক পরে ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই ‘অ্যাপোলো ১১’ (Apollo 11) নামের মহাকাশযানে চড়ে পৃথিবীর মানুষ প্রথম চাঁদে পা রাখে। এই চন্দ্র অভিযানেই নীল আর্মস্ট্রং এবং এডুইন অলড্রিন নামের দুই মহাকাশচারী চাঁদে অবতরণ করে ইতিহাস গড়েছিলেন। ১৯৬৯ সাল থেকে শুরু করে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত এরকম মোট ৬টি মহাকাশযানে ১২ জন মহাকাশচারী চাঁদে অবতরণ করেন। তবে মহাকাশ অভিযান প্রকল্পে চাঁদের মাটিকে ছুঁতে পারাটাই শেষ বা সর্বোচ্চ সাফল্য ছিল না। চাঁদের সীমা অতিক্রম করে মানুষ চাইছিল আরও অন্যান্য গ্রহগুলিকে আবিষ্কার করতে, তাদের সম্পর্কে আরও জানতে। এরপরেও কয়েকজন মহাকাশচারীর মৃত্যু ঘটেছিল মহাকাশ অভিযান করতে গিয়ে। ১৯৭১ সালে ‘সয়্যুজ ১১’ (Soyuj 11) মহাকাশযানটি পৃথিবীতে ফিরে আসার মাত্র আধ ঘন্টা আগেই ধ্বংস হয়ে যায় এবং তিন জন রাশিয়ান নভোশ্চর প্রাণ হারান। ঐ বছর ১৯ এপ্রিল সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপন করে প্রথম মহাকাশ স্টেশন ‘স্যালুট ১’ (Salyut 1)। তার অনেক বছর পরে ২০০০ সালে স্থাপিত হয় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (International Space Station)। ২০১২ সালে প্রথম মানুষের নির্মিত মহাকাশযান ‘ভয়েজার ১’ (Voyager 1) সৌরজগতের সীমা ছাড়িয়ে আন্তঃনাক্ষত্রিক শূন্যে (Interstellar Space) বিচরণ করতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৯ সালে পৃথিবী থেকে এই ‘ভয়েজার ১’-এর দূরত্ব ছিল ২ হাজার ১৭১ কোটি কিলোমিটার যা এখনও পর্যন্ত মানুষের বানানো পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরতম বস্তু।

তবে শুধু চাঁদ নয়, শুক্র, মঙ্গল এমনকি সূর্যের বহু অজানা তথ্য জানতে মহাকাশ অভিযান এগিয়ে গিয়েছে সময়ের হাত ধরে। প্রথম অ্যাপোলো টেলিস্কোপ মাউন্টের সাহায্যে সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করেন বিজ্ঞানীরা। বুধের উপর পর্যবেক্ষণ চালানোর জন্যেও পৃথিবী থেকে উৎক্ষিপ্ত হয়েছে ‘মেসেঞ্জার’ ও ‘মেরিনার ১০’ মহাকাশযানগুলি। পরবর্তীকালে ‘ভেনেরা ১’, ‘ভেনেরা ৪’, ‘মেরিনার ২’ ইত্যাদি নানাবিধ মহাকাশযান শুক্র গ্রহের কক্ষপথে আবর্তনের মধ্য দিয়ে শুক্র গ্রহ সম্পর্কে নানাবিধ তথ্য আবিষ্কারে সহায়তা করেছে। সেই ১৯৬০-এর দশক থেকেই নানা সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন এমনকি ইউরোপ, জাপান ও ভারতও মঙ্গলগ্রহে অর্বিটার, রোভার কিংবা ল্যান্ডার মহাকাশযান প্রেরণে সচেষ্ট হয়েছে। পৃথিবীর পরে একমাত্র মঙ্গল গ্রহকেই মানুষের বিকল্প বাসস্থান করে তোলার জন্য নিত্যদিন নতুন নতুন আবিষ্কারে মগ্ন রয়েছে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা। সৌরজগতের সবথেকে বড়ো গ্রহ বৃহস্পতি – তার চারপাশে প্রদক্ষিণ করেছে বহু মহাকাশযান। ‘পায়োনিয়ার’ (Pioneer) ও ‘ভয়েজার’ (Voyager) গোষ্ঠীর এই মহাকাশযানগুলির মধ্যে কেবলমাত্র ‘গ্যালিলিও’ (Galileo) ও ‘জুনো’ (Juno) নামের মহাকাশযানই বৃহস্পতির কক্ষপথে প্রবেশ করতে পেরেছিল। শনির বিভিন্ন উপগ্রহগুলি সম্পর্কেও এইরকম নানাবিধ মহাকাশযান পাঠিয়ে ধারণা পাওয়া গেছে। এখানেই থেমে নেই মহাকাশ অভিযান। হাল আমলে এলন মাস্কের সৌজন্যে বাণিজ্যিকভাবে ‘স্পেস এক্স’-এর মাধ্যমে মহাকাশ ভ্রমণকেও সম্ভব করে তোলা হয়েছে।       


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading