মহাকাশ স্টেশন বা স্পেস স্টেশন বলতে অনেকেরই মনে কোনও স্বচ্ছ ধারণা নেই। পৃথিবী থেকে অনেক কাল আগে থেকেই মহাকাশ সংক্রান্ত গবেষণা, পৃথিবী ব্যতীত অন্য গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে অনুসন্ধান ইত্যাদির জন্য নানা সময় নানা মহাকাশযান পাঠানো হয়েছে। সেগুলি নির্দিষ্ট কাজ সমাধা করে আবার ফিরে এসেছে পৃথিবীর মাটিতে, কিন্তু পৃথিবী থেকে ২৫০ মাইল উপরে এমন এক বিশালাকায় মহাকাশযান রয়েছে যা সর্বদা আমাদের পৃথিবীর চারপাশে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরে চলেছে। এটিকে একটি কৃত্রিম উপগ্রহও বলা চলে, এর ভিতরে মহাকাশ বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট গবেষণাগারে নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করে থাকেন। এই বাসযোগ্য কৃত্রিম উপগ্রহ তথা মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্রই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন (International Space Station)।
মহাকাশ স্টেশন আসলে একটা বিশালাকায় মহাকাশযান (Spacecraft) যা সবসময় আমাদের এই পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। এর মধ্যেই রয়েছে গবেষণাগার, মহাকাশবিজ্ঞানীরা অনেকেই এই গবেষণাগারে থেকে নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। পৃথিবীর বহু দেশ একত্রিত হয়ে সম্মিলিতভাবে যেহেতু এই মহাকাশ স্টেশনটি গড়ে তুলেছে তাই এর নাম আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন। মহাকাশে স্বল্পকালের জন্য বসবাস এবং সেখানকার বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পর্কিত তথ্য জানার জন্য নাসা (NASA) এই মহাকাশ স্টেশনটি ব্যবহার করে থাকে। একে একপ্রকার বাসযোগ্য কৃত্রিম উপগ্রহ বলা চলে। এই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন আসলে একটি বহুজাতিক সহযোগিতামূলক প্রকল্প যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে নাসার পাশাপাশি রাশিয়ার ‘রসকসমস’ (Roscosmos), জাপানের ‘জাক্সা’ (JAXA), ইউরোপের ‘ইএসএ’ (ESA) এবং কানাডার ‘সিএসএ’ (CSA) ইত্যাদি মহাকাশ গবেষণা সংস্থাও অংশগ্রহণ করেছে। আদপে এই মহাকাশ স্টেশন একটি মাইক্রো-গ্র্যাভিটি ও মহাকাশীয় পরিমণ্ডলে অবস্থিত গবেষণাগার হিসেবে কাজ করে। পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫০ মাইল অর্থাৎ ৪০০ কিলোমিটার উপরে রয়েছে এই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের কক্ষপথ।
১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে সোভিয়েত রাশিয়ার ‘স্যালুট’ (Salyut) এবং ‘মীর’ (Mir) মহাকাশ স্টেশনের একটি বর্ধিতাংশ হিসেবে নাসা ‘ফ্রিডম’ (Freedom) নামে একটি মড্যুলার মহাকাশ স্টেশন চালু করার কথা ভাবে। ১৯৮৪ সালে ‘ফ্রিডম’ মহাকাশ স্টেশনে যুক্ত হওয়ার জন্য ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সিকে (European Space Agency) আহ্বান জানানো হয় এবং ইএসএ-র অনুমোদনে ১৯৮৭ সালে এই মহাকাশ স্টেশনে চালু হয় কলম্বাস গবেষণাগার। ১৯৮৫ সালে ফ্রিডম মহাকাশ স্টেশনের অংশ হিসেবে ‘জাপানিজ এক্সপেরিমেন্ট মডিউল’ (JEM) বা ‘কিবো’ (Kibo) যুক্ত হয়। ১৯৮৫ সালের গোড়ার দিকে ‘ইএসএ’ কলম্বাস প্রকল্পকে অনুমোদন দেয়। মূলত জার্মানি এবং ইতালিই এই প্রকল্পের প্রধান পরিকল্পক ছিল এবং তাঁদের পরিকল্পনামাফিক ফ্রিডমকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইউরোপীয় কক্ষীয় আউটপোস্ট (Orbital Outpost) হিসেবে বিকশিত করার কথা ভাবা হয়। ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমেরিকান উপরাষ্ট্রপতি আল গোর এবং রাশিয়ান প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর চেরনোমাইরদিন একটি নতুন মহাকাশ স্টেশনের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন আর এই মহাকাশ স্টেশনটিই শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন হিসেবে পূর্ণতা পায়। ১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের প্রথম অংশটি একটি রাশিয়ান রকেটের সাহায্যে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। এরপরে আরও কতগুলি টুকরো এর সঙ্গে যুক্ত হয় এবং ২০০০ সাল নাগাদ এখানে মানুষের বাস করা বা কাজ করার উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়। ২০১১ সালে নাসা এবং তার সহযোগীরা একত্রে এই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করে।
ঠিক কেমন এই মহাকাশ স্টেশনের চেহারাটা? সংক্ষেপে ও সহজে বোঝাতে গেলে বলতে হয় একটি পাঁচ কামরার বাড়ির মতোই বড়ো এই মহাকাশ স্টেশনটি। এখানে দুটি বাথরুম, একটি জিমন্যাসিয়াম ও একটি বড়ো বে জানালা (Bay Window) রয়েছে। ছয়জন মানুষ এই মহাকাশ স্টেশনে থাকতে পারেন। সমগ্র মহাকাশ স্টেশনের ওজন আনুমানিক দশ লক্ষ পাউন্ড অর্থাৎ ৪ লক্ষ ৫৩ হাজার ৫৯২ কিলোগ্রাম। প্রতি ঘন্টায় ২৮ হাজার কিলোমিটার গতিবেগে এই মহাকাশ স্টেশনটি পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। ঔজ্জ্বল্যের দিক থেকে পৃথিবীর নিকটতম গ্রহ শুক্রকেও হার মানায় এই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন। রাতের আকাশে তৃতীয় সর্বোচ্চ উজ্জ্বল বস্তু এই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন যা কিনা খালি চোখেই দেখা যায়। ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন ওরফে আইএসএস (ISS) আকারে একটি প্রামাণ্য ফুটবল মাঠকে ঢেকে দিতে পারে। সাধারণভাবে এর মধ্যে সাতজন নভোশ্চারীর একটি দল থাকে। যদিও পরিস্থিতি অনুযায়ী এই সংখ্যা পালটে যায়। ২০০৯ সালে আইএসএস-এ মোট ১৩ জন ক্রু সদস্য ছিল। মহাকাশচারীরা একটি রাশিয়ান সয়্যুজ (Soywuj) ক্যাপসুলের মাধ্যমে মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছায়। ১৯৬৭ সাল থেকে দীর্ঘকাল পর্যন্ত এই ক্যাপসুলের মাধ্যমেই মহাকাশচারীরা মহাকাশ স্টেশনে এসেছে। তবে ২০২০ সালে এলন মাস্ক কর্তৃক নির্মিত ও পরিকল্পিত স্পেস-এক্সের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে মানুষদের পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এই ক্যাপসুলটিই এখনও পর্যন্ত একমাত্র ব্যক্তি মালিকানাধীন ক্যাপসুল। প্রায় ৬ মাস ধরে নানাবিধ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায় মহাকাশচারীরা এই মহাকাশ স্টেশনের মধ্যেই। পরীক্ষা পরিচালনা, মহাকাশ স্টেশন রক্ষণাবেক্ষণ এবং মেরামতির জন্য বহু সময় ব্যয় করেন তাঁরা এবং তার মাঝেই ঘন্টা দুয়েক সময় তাঁরা ঘুমান এবং নিজের শরীরের যত্ন নেন। কোনও কোনও সময় মহাকাশচারীরা মহাশূন্যে ভ্রমণ করেন, হেঁটে চলে বেড়ান যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘স্পেসওয়াক’ (Spacewalk) বলা হয়। এমনকি সেই মহাকাশ স্টেশনের ভিতরে থেকে প্রচারমূলক মাধ্যম কিংবা সমাজ-মাধ্যমেও যুক্ত থাকেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জাপান এবং ইউরোপের নিজস্ব পৃথক পৃথক গবেষণাগার রয়েছে এই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে। এই মহাকাশ স্টেশনের অনেকগুলি অংশ রয়েছে যেগুলিকে একেকটি মডিউল (Module) বলা হয়। প্রথম দিকের মডিউলগুলি মূলত এই মহাকাশ স্টেশনটিকে সক্রিয় রাখতে ব্যবহৃত হত। সেই মডিউলগুলিতে মহাকাশচারীরাও থাকতেন। কিছু বিশেষ প্রকারের মডিউল যেগুলি একটি অংশের সঙ্গে অপর অংশকে সংযুক্ত করে, তাদের বলা হয় ‘নোডস’ (Nodes)। এই মহাকাশ স্টেশনের মধ্যেই মহাকাশচারীদের জন্য নির্দিষ্ট গবেষণাগার রয়েছে। এই স্টেশনের পাশেই রয়েছে একটি সোলার অ্যারে (Solar Array) যা কিনা সূর্য থেকে শক্তি সংগ্রহ করে এবং সূর্যালোক থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এর বাইরে ‘রোবট বাহু’ (Robot Arms) যুক্ত থাকে যা কিনা এই মহাকাশ স্টেশনটি গড়ে তুলতে সহায়তা করে। মহাকাশচারীদের আশেপাশে ঘুরে বেড়াতে এবং বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালনা করার জন্য এই রোবট-বাহুগুলি অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। মহাকাশ স্টেশনে দরজার মতোই কতগুলি ‘এয়ার-লক’ (Air Lock) রয়েছে। এই এয়ার-লকগুলি সাধারণত স্পেস-ওয়াকের সময় মহাকাশচারীদের বাইরে বেরোতে কাজে লাগে। নতুন সদস্য এবং মহাকাশ স্টেশনের দর্শনার্থীরা ডকিং বন্দরের মাধ্যমে এই স্টেশনে প্রবেশ করেন। মহাকাশ স্টেশনের যে মডিউলগুলির কথা বলা হল সেগুলি টুকরো অবস্থাতেই মহাকাশে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং তারপরে সেখানেই দক্ষ মহাকাশচারীরা সেগুলি একটির সঙ্গে একটি জুড়ে এই মহাকাশ স্টেশন তৈরি হয়েছে। বেশিরভাগ সময় নাসার স্পেস শাটলই ব্যবহৃত হত এই মডিউলগুলিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য, কিন্তু অনেকক্ষেত্রে আবার কিছু কিছু মডিউলকে একক-ব্যবহারযোগ্য রকেটে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মহাকাশে।
১৯৯৮ সালের ২০ নভেম্বর প্রথম মডিউল রাশিয়া জারিয়া (Russia Zarya) মহাকাশে উৎক্ষেপিত হয়। এর কয়েক সপ্তাহ পরেই নাসার স্পেশ শাটলে করে মহাকাশে পাঠানো হয় ‘নোড-১’ অংশটি। এছাড়া মহাকাশ স্টেশনের অন্যান্য মডিউলগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ডেস্টিনি ল্যাবরেটরি মডিউল, হারমোনি বা নোড-২, কলম্বাস অরবিটাল ফেসিলিটি, ট্র্যাঙ্কুইলিটি বা নোড-৩ ইত্যাদি। খুব সম্প্রতি ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে উৎক্ষেপিত হয়েছে মাল্টিপারপাস ল্যাবরেটরি মডিউল।
কয়েক বছর ধরে মহাকাশে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কাজকর্ম করেছে এই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন ওরফে আইএসএস (ISS)। ২০১৫-১৬ সালে মার্কিন মহাকাশচারী স্কট কেলি প্রথম দীর্ঘ ৩৪০ দিন এই মহাকাশ স্টেশনে কাটিয়ে রেকর্ড গড়েছেন। আবার পেগি হুইটসন নামে এক মহিলা নভোশ্চর মহাকাশ স্টেশনে মোট ৬৬৫ দিন সময় কাটিয়ে নজির গড়েছেন। আইএসএসের একটি অ্যান্টেনা সারানোর জন্য ৫৪তম অভিযানের মাধ্যমে দীর্ঘতম স্পেস ওয়াক করে নজির গড়েছিলেন রাশিয়ান নভোশ্চর আলেকজান্ডার মিসুরকিন (Alexandar Misurkin) এবং আন্তন স্খাপ্লেরভ (Anton Skhaplerov)। ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান নভশ্চর সুনীতা উইলিয়ামস আইএসএস-এ প্রথম মহিলা হিসেবে ১৯৪ দিন কাটিয়ে রেকর্ড গড়েছিলেন।
তবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই মানুষের। এই অসীম মহাকাশে ঘটে চলা নিত্যদিনের ঘটনা এবং নতুন নতুন আবিষ্কারের পথে পরিকল্পনা করা আর নিত্য-নব গবেষণা নিয়ে মহাকাশচারীরা ব্যস্ত থাকেন এই মহাকাশ স্টেশনেই। একেই সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র বাসযোগ্য কৃত্রিম উপগ্রহ বলা চলে।
আপনি যদি আপনার এলাকায় আইএসএসকে প্রত্যক্ষ করতে চান তাহলে এখানে আপনার এলাকার তথ্য দিয়ে জেনে নিতে পারেন কখন আকাশে আইএসএসকে দেখতে পাবেন –
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান