সববাংলায়

শ্রীধর আচার্য

ভারতীয় গণিতশাস্ত্র সেই পুরাকাল থেকেই বহু বিখ্যাত গণিতবিদের অবদানে সমৃদ্ধ হয়ে এসেছে। সেইসব কিংবদন্তি গণিতবিদের তালিকায় অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে শ্রীধর আচার্যের (Sridhar Acharya) নাম। শ্রীধর আচার্য কেবল একজন প্রথিতযশা গণিতবিদই ছিলেন না, সেই সঙ্গে একজন দার্শনিক হিসেবেও ছিল তাঁর পরিচয়। পাটিগণিত সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করে গণিতশাস্ত্রের ভান্ডারকে তিনি ঋদ্ধ করে গেছে। তিনি শূন্য সংখ্যাটির বিশদ ব্যাখা করেছিলেন এমনকি যোগ, বিয়োগ, গুণ এবং ভাগে শূন্যের সঙ্গে অন্যান্য সংখ্যার সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করেছিলেন। তিনি পাটিগণিতকে বীজগণিতের থেকে আলাদা করে তাকে একটি স্বতন্ত্র মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দ্বিঘাত সমীকরণের অঙ্কে শ্রীধর আচার্যের সমীকরণ গণিতশাস্ত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। ‘পাটিগণিত’ এবং ‘পাটিগণিত সার’ নামে দুটি বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা তিনি।

পরবর্তী গণিতবিদদের রচনা থেকে শ্রীধর আচার্যের গাণিতিক কাজকর্ম সম্পর্কে জানা গেলেও তাঁর ব্যক্তিজীবন নিয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ তথ্য পাওয়া যায় না। ফলত নিশ্চিতভাবে তাঁর জন্ম তারিখ বা সাল বলা যায় না। তবে, গবেষকেরা অনুমান করেন যে, আনুমানিক ৮৭০ সালে (মতান্তরে আনুমানিক ৭৫০ সালে) শ্রীধর আচার্যের জন্ম হয়েছিল। তাঁর জন্মস্থান সম্পর্কে অনেকেরই মত, যে, দক্ষিণ রাঢ় অঞ্চলের ভূরিশ্রেষ্ঠতে তাঁর জন্ম হয়, যেটি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত হুগলী নামে পরিচিত। অনেকের মতে তিনি দক্ষিণ ভারতের মানুষ। নীহাররঞ্জন রায়ের লেখা থেকে জানা যায় শ্রীধর আচার্যের পিতার নাম ছিল বলদেব এবং মাতার নাম অভ্রোকা বা আব্বোকা। এই প্রসঙ্গে একটা সংশয়ের কথা তোলা যাক। নীহাররঞ্জন রায় তাঁর ‘বাঙালির ইতিহাস : আদি পর্ব’ বইটিতে লিখেছিলেন শ্রীধর আচার্য অধ্যাত্মচিন্তা ও দর্শনশাস্ত্রের ওপর গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। দার্শনিক হিসেবে পরিচয় দিলেও নীহাররঞ্জন কিন্তু শ্রীধর আচার্যের কোন গণিত গ্রন্থ রচনার কথা উল্লেখ করেননি। তাই সংশয় তৈরি হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক যে, যে গণিতবিদ হিসেবে পরিচিত শ্রীধর আচার্য এবং নীহাররঞ্জন কথিত ‘ন্যায়কুন্ডলী’ নামক দর্শনগ্রন্থ ও চারখানি বেদান্ত ও মীমাংসা বিষয়ক পুঁথির প্রণেতা শ্রীধর আচার্য আদতে একই ব্যক্তি কিনা! নীহাররঞ্জন রায় জানিয়েছেন যে, ‘ন্যায়কুন্ডলী’ গ্রন্থটির রচনাকাল ৯১০ বা ৯১৩ শকাব্দে। অনেকেই এই দার্শনিক শ্রীধর এবং গণিতবিদ শ্রীধর আচার্যকে ভিন্ন লোক বলে মনে করেছেন। এ নিয়ে ধোঁয়াশা কিন্তু রয়ে গেছে।

এক নজরে শ্রীধর আচার্য:

  • জন্ম: আনুমানিক ৮৭০ সালে, মতান্তরে ৭৫০ সালে
  • মৃত্যু: আনুমানিক ৯৩০ সালে
  • কেন বিখ্যাত: শ্রীধর আচার্য ভারতের এক বিখ্যাত গণিতবিদ ও দার্শনিক। তাঁর আবিষ্কৃত দ্বিঘাত সমীকরণের সূত্র আজও ব্যবহৃত হয়। বীজগণিত, পাটিগণিতকে পৃথক করেন তিনি। তাঁর লেখা দুটি প্রধান গ্রন্থ ‘পাটিগণিত’ এবং ‘পাটিগণিত সার’।

শ্রীধর আচার্যের লেখা ‘পাটিগণিতসার’ বা ‘ত্রিশতিকা’ গ্রন্থের শুরুর দিকের একটি শ্লোকে দেখা যায় গ্রন্থটি শিবকে উৎসর্গিকৃত। এই তথ্যটি থেকে সিদ্ধান্ত করা হয় যে শ্রীধর আচার্য ছিলেন একজন শৈব। তবে এ-নিয়েও বিতর্কের অবকাশ তৈরি হয়েছিল, যখন এন. সি. জৈন নামে এক ব্যাক্তি কর্ণাটকের জৈন গ্রন্থাগার থেকে ‘ত্রিশতিকা’র কন্নড় ভাষায় লেখা তালপাতার একটি পুঁথি আবিষ্কার করেন এবং বলেন সেই সংস্করণের শুরুর শ্লোকে ‘শিবম’ শব্দের স্থলে রয়েছে ‘জিনম’ অতএব শৈব নয় বরং শ্রীধর আচার্য ছিলেন একজন জৈন। তিনি বলেছিলেন উত্তর ভারতে প্রকাশিত এই ত্রিশতিকা বইয়ের সম্পাদক সুধাকর দুবে জোর করে জিনম-এর জায়গায় শিবম শব্দটি ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। তবে সেই এন.সি. জৈন নামক ব্যাক্তির এই দাবীকে আবার যুক্তি সহকারে খন্ডন করেছিলেন কৃপাশঙ্কর শুক্লা। তিনি বলেন কর্নাটকের জৈন লাইব্রেরির সংস্করণটি ছাড়া ত্রিশতিকার আর প্রায় সমস্ত সংস্করণেই শিবের উল্লেখ রয়েছে, অতএব কন্নড় ভাষার পুঁথিটিকে ব্যতিক্রমই ধরা চলে। তিনি আরও বলেন যে, মূল ‘পাটিগণিত’ বইটিতে এক ‘অজাত ভগবান’-এর কথা উল্লেখ করেছিলেন শ্রীধর এবং সেই ভগবানের যে পাঁচটি ক্রিয়ার কথা তিনি বলেছেন, সেগুলি হল: সৃষ্টি, স্থিতি, সংহার, অনুগ্রহ এবং তিরোধর৷ কৃপাশঙ্কর শুক্লার মতে এই ভগবানকে মহাদেবের সঙ্গেই তুলনা করা যেতে পারে। এছাড়াও মূল পাটিগণিত বইতে একস্থানে পাটিগণিত অধ্যয়নকে শিবের পঞ্চমুখের উপাসনার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন শ্রীধর। এছাড়াও কৃপাশঙ্কর বলেছেন, কন্নড় ভাষার পুঁথিটিতে অনেক সূত্র সংযুক্ত করা হয়েছিল, যেগুলি মূল ত্রিশতিকায় ছিল না। এই গন্ডগোলের জন্য সেই পু়থিটিকে নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করাও চলে না।
অধ্যাপক সি.গুপ্ত এই বিতর্কের একটা মীমাংসা করবার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বলেন, হতে পারে গাণিতিক কাজগুলি করবার সময় শ্রীধর শৈব ছিলেন, পরবর্তীকালে জৈন ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। শোনা যায় যে, পাণ্ডুদাস নামের একজন কায়স্থ রাজা শ্রীধর আচার্যের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন।

শ্রীধর আচার্যের রচিত দুটি প্রধান গ্রন্থ হল ‘পাটিগণিত’ এবং ‘পাটিগণিত সার’। এই শেষোক্ত গ্রন্থটি আবার ‘ত্রিশতিকা’ নামে পরিচিত ছিল কারণ গ্রন্থটিতে ৩০০টি শ্লোক ছিল। পাটিগণিতসার গ্রন্থটি মূলত পূূর্বোক্ত ‘পাটিগণিত’ গ্রন্থটিরই সংক্ষিপ্ত রূপ৷ বিশ্বাস করা হয় যে, পাটিগণিত বইটিতে প্রায় ৯০০টি স্তবক ছিল, কিন্তু তার অধিকাংশই কালের অতলে তলিয়ে গিয়েছিল এবং অবশিষ্ট ছিল ২৫১টি মতো৷ সেই গ্রন্থের বিষয়সূচীতে উল্লিখিত অনেক কিছুই মূল গ্রন্থের মধ্যে থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। সেই কারণেই ৩০০ শ্লোকবিশিষ্ট ‘পাটিগণিত সার’ বা ‘ত্রিশতিকা’ গ্রন্থটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই গ্রন্থটিতে গণনা, স্বাভাবিক সংখ্যা, শূন্য, পরিমাপ, গুণ, ভগ্নাংশ, ভাগ, বর্গ, ক্ষেত্রফল, আয়তন, ঘনক, সুদ-গণনা ইত্যাদি গাণিতিক তত্ত্ব নিয়ে বিশদে আলোচনা রয়েছে। ‘ত্রিশতিকা’ বইতে এমন কিছু অঙ্ক রয়েছে যা থেকে আবার সেই অষ্টম-নবম শতাব্দীর সমাজের একটা চিত্রও পাওয়া সম্ভব। শ্রীধর আচার্য পাটিগণিতকে বীজগণিত থেকে আলাদা করেছিলেন। জানা যায় তিনি ‘বীজগণিত’ নামে একটি গ্রন্থও রচনা করেন যার অস্তিত্ব আজ নেই, অথবা হয়ত আছে কিন্তু আজও অনাবিষ্কৃত। শ্রীধর আচার্যের এই গ্রন্থ এবং বীজগাণিতিক তত্ত্বগুলির কথা তাঁর পরবর্তী গণিতবিদ দ্বিতীয় আর্যভট্ট, শ্রীপতি মিশ্র, নারায়ণ, দ্বিতীয় ভাস্করাচার্য, রাঘব ভট্ট, মাক্কি ভট্ট প্রমুখের রচনা থেকে জানতে পারা যায়। ঐতিহাসিকদের বিশ্বাস যে, শ্রীধর আচার্য ‘গণিতপঞ্চবিশী’ নামক আরও একটি গাণিতিক গ্রন্থ প্রণয়ন করেছিলেন।

দ্বিঘাত সমীকরণ সমাধানের যে সূত্র শ্রীধর আচার্য তৈরি করেছিলেন তা গণিত জগতে শ্রীধরাচার্যের সূত্র নামে খ্যাত। ‘ত্রিশতিকা’ গ্রন্থে এই সূত্রটি নেই, তা ছিল ‘বীজগণিত’ গ্রন্থে। শ্রীধরের সমীকরণের প্রথম উল্লেখ পাওয়া গিয়েছিল দ্বিতীয় ভাস্করাচার্যের লেখা ‘বীজগণিত’ নামের গ্রন্থে। পরবর্তীকালে অবশ্য এই সূত্রটির উল্লেখ আরও অনেক গণিতবিদের গ্রন্থে পাওয়া যায়।

দ্বিঘাত সমীকরণ সমাধানের সূত্র ছাড়াও গণিতশাস্ত্রে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন শ্রীধর আচার্য। শূন্যের একটি বিশদ গাণিতিক ব্যাখা করেছিলেন তিনি। লিখেছিলেন যে, যদি কোন সংখ্যার সঙ্গে শূন্য যোগ করা হয় তবে যোগফল হবে সেই একই সংখ্যা ; কোন সংখ্যার থেকে শূন্য বিয়োগ করা হলেও সংখ্যাটি অপরিবর্তিত থাকে ; আবার কোন সংখ্যাকে যদি শূন্য দিয়ে গুণ করা হয় তবে গুণফল হয় শূন্য। তবে কোন সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে কী হবে তা তিনি বলেননি।

এছাড়াও শ্রীধর আচার্য কোন ভগ্নাংশকে ভাগের ক্ষেত্রে ভাজকের অন্যোন্যক দ্বারা ভগ্নাংশকে গুণ করবার পদ্ধতি বের করেছিলেন। শোনা যায় জ্যামিতি বিষয়ক বেশ কিছু তত্ত্বও আলোচনা করেছিলেন তিনি।

যেহেতু তাঁর জীবনকাল সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায় না, তাই ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেছিলেন আনুমানিক ৯৩০ সাল পর্যন্তই শ্রীধর আচার্যের অস্তিত্ব ছিল।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading