ইতিহাস

আসফাকউল্লা খান

পরাধীন ভারতের এক অন্যতম স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন আসফাকউল্লা খান (Ashfaqulla Khan)। তাঁকেই ভারতের প্রথম মুসলিম শহীদ বলা হয়। কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলায় রামপ্রসাদ বিসমিলের সঙ্গে তাঁকেও ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। ‘হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন’ বিপ্লবী সংগঠনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা আসফাকউল্লা খান চেয়েছিলেন সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতা অর্জন করতে। কোনো সন্ত্রাসবাদ কিংবা নৈরাজ্যবাদী ভাবধারা তাঁর ছিল না। ২০০৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রঙ দে বসন্তী’ ছবিতে কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলার সঙ্গে যুক্ত পাঁচ জন বিপ্লবীদের মধ্যে আসফাকউল্লা খানের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন কুনাল কাপুর। ২০২০ সালে উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুরে একটি জুলজিক্যাল উদ্যানের নামকরণ করা হয়েছে শহীদ আসফাকউল্লা খানের নামে।

১৯০০ সালের ২২ অক্টোবর তৎকালীন যুক্ত প্রদেশের (অধুনা উত্তরপ্রদেশ) শাহজাহানপুর জেলায় এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে আসফাকউল্লা খানের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম শফিকুল্লাহ খান এবং মায়ের নাম মাজ্‌হারুন্নিসা। তিনি মূলত খাইবার উপজাতিভুক্ত মুসলিম পাঠান পরিবারের সন্তান ছিলেন। শফিকুল্লাহ এবং মাজ্‌হারুন্নিসার পাঁচটি সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ।

সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই ১৯১৮ সালের মৈনপুরী ষড়যন্ত্র মামলার পরে আসফাকউল্লা খান গভীরভাবে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেবার জন্য অনুপ্রাণিত হন। ইতিমধ্যে বাংলার বিপ্লবীদের মধ্যে কানাইলাল দত্ত এবং ক্ষুদিরাম বসুর আত্মবলিদানের কথা তিনি শুনেছিলেন যা তাঁকে আরো বেশি প্রভাবিত করে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন ইংরেজিতে ওয়াল্টার স্কটের কবিতা ‘লাভ ফর কান্ট্রি’ পড়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁর স্কুলের শিক্ষক তাঁকে ‘প্যাট্রিয়টস অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি বই দিয়েছিলেন যা পড়ে তাঁর অনুভূতি হয় যে বিশ্বে দেশের জন্য যারা প্রাণ দেয় তারাই একমাত্র অমরত্ব লাভ করেন। একবার তাঁর স্কুলেই মৈনপুরী ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার জন্য তাঁরই এক বন্ধু রাজারাম ভার্তিয়কে গ্রেপ্তার করার জন্য স্কুলে পুলিশি তদন্ত হয়। আর ঠিক এই সময় থেকেই যুক্ত প্রদেশের কোথায় কোথায় স্বাধীনতাকামী বিপ্লবী সংগঠন আছে তার খোঁজ করতে শুরু করেন তিনি। মৈনপুরী ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িত ও অভিযুক্ত রামপ্রসাদ বিসমিলের সঙ্গে দেখা করানোর কথা আসফাকউল্লা বলেন তাঁর এক বন্ধু বানারসিলালকে। এই রামপ্রসাদ বিসমিলই পরবর্তীকালে তাঁর সঙ্গে কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯২০ সালে ব্রিটিশ সরকারের মার্জনায় মৈনপুরী ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত সকলকে মুক্ত করে দেওয়া হয়। সেই সময় ১৯২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রামপ্রসাদ বিসমিল উত্তরপ্রদেশের শাহজাহানপুরে আসেন। সেই সূত্রেই তাঁর সঙ্গে আসফাকউল্লার পরিচয় ও গভীর সখ্যতা তৈরি হয় এবং আমৃত্যু তাঁদের বন্ধুত্ব অটুট ছিল। পরবর্তী সাত বছরের মধ্যে উভয়ের এক হৃদ্যতাপূর্ণ বন্ধন গড়ে ওঠে। গান্ধীজির পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন তাঁরা। স্বরাজ দলের হয়ে প্রচারকার্যেও নিযুক্ত ছিলেন আসফাকউল্লা এবং বিসমিল। চৌরিচৌরার ঘটনার পরে ১৯২২ সালে গান্ধীজি এই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলে হতাশ হয়ে পড়েন তিনি। ১৯২৪ সালে সমমনস্ক কয়েকজন স্বাধীনতাকামী বিপ্লবী বন্ধুদের নিয়ে একত্রে আসফাকউল্লা গড়ে তোলেন ‘হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন’। ১৯২৫ সালে এই সংগঠন কর্তৃক প্রকাশিত ‘দ্য রেভলিউশনারি’ নামে একটি ইস্তাহারে বলা হয়, স্বাধীন ভারত গড়ার লক্ষ্যে এই সংগঠনের কাজ ছিল বিভিন্ন জায়গায় সশস্ত্র বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা। বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলা-বারুদ সংগ্রহ করার প্রয়োজন ছিল আর সেই জন্যে এই সংগঠনের সকলে ১৯২৫ সালের ৮ আগস্ট শাহজাহানপুরে সম্মিলিত হয়। ঐ সভাতেই ঠিক হয় কাকোরিতে ট্রেন লুঠ করে অর্থ সংগ্রহ করা হবে এই অস্ত্র-শস্ত্র কেনার জন্য। এই পরিকল্পনা অনুসারে ১৯২৫ সালের ৯ আগস্ট আসফাকউল্লা খান সহ রামপ্রসাদ বিসমিল, রাজেন্দ্র লাহিড়ী, ঠাকুর রোশান সিং, শচীন্দ্র বক্সী, চন্দ্রশেখর আজাদ, কেশব চক্রবর্তী, বনোয়ারী লাল, মুরারী লাল গুপ্তা, মুকুন্দি লাল এবং মন্মথনাথ গুপ্ত একত্রে লক্ষ্ণৌয়ের কাছে কাকোরিতে ব্রিটিশদের ট্রেন লুঠ করেন। সেই ট্রেনেই বস্তাবন্দি ভারতীয় টাকার সম্ভার ছিল এই সংবাদ আগে থেকেই জানতে পেরেছিলেন তারা। এই ঘটনার পরেই গা ঢাকা দিতে আসফাকউল্লা নেপালে পালিয়ে যান। সেখান থেকে কানপুরে এসে ‘প্রতাপ’ পত্রিকার সম্পাদক এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী গণেশ শঙ্কর বিদ্যার্থীর সঙ্গে দেখা করেন, তারপর তিনি ঝাড়খণ্ডের ডালগটনগঞ্জে চলে যান। ছদ্মনামে একজন কেরানি হিসেবে ছয় মাস কাজ করেছিলেন আসফাকউল্লা। কিন্তু কিছুতেই থিতু হতে পারছিলেন না তিনি, এরপরেই আবার দিল্লি চলে যান আসফাকউল্লা। কথা ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং শেখার উদ্দেশে বিদেশে পাড়ি দেবেন তিনি , কিন্তু তার মাঝেই এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি। এর মধ্যে ১৯২৫ সালের ২৬ অক্টোবর রামপ্রসাদ বিসমিলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ এবং ১৯২৬ সালের ১৭ জুলাই দিল্লিতে তাঁর বাসস্থান থেকে আসফাকউল্লাহকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ফৈজাবাদ জেলে তাঁকে বন্দী করে রাখা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের করা হয়। কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলা শুরু হলে জেলে থাকাকালীন আসফাকউল্লা নিয়ম করে কোরান পাঠ করতেন এবং রমজানের দিনগুলিতে কঠোরভাবে উপবাসে কাটাতেন।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


শুধুই স্বাধীনতা সংগ্রাম বা সশস্ত্র বিপ্লব নয়, ‘হাসরাত’ এবং ‘ওয়ারসি’ ছদ্মনামে বহু কবিতাও লিখেছেন আসফাকউল্লা খান। নিজের একটি স্কুল খোলার স্বপ্ন ছিল তাঁর। পরবর্তীকালে তাঁর বহু লেখাপত্র প্রকাশ পেয়েছে। মৃত্যুর আগে দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি একটি চিঠিতে জানিয়েছেন স্বাধীন ভারতে অর্থনৈতিক এবং সমাজ-রাজনৈতিক সাম্যের কথাই চিন্তা করেন তিনি। স্বাধীন ভারতে যাতে শ্রমিক-কৃষকেরা, সকল দরিদ্র নিরন্ন মানুষেরা দুবেলা দু-মুঠো খেতে পেয়ে শান্তিতে থাকে সেই স্বপ্ন থেকেই স্বাধীনতা সংগ্রামে এসেছিলেন তিনি। জমিদার ও পুঁজিপতিদের শোষণের হাত থেকে শ্রমিক-কৃষকদের মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন তিনি। একটি চিঠি থেকে জানা যায় রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মহামতি লেনিনকে চিঠি লিখতেও চেয়েছিলেন তিনি। এমনকি তাঁর চিঠি থেকে জানা যায় তিনি চেয়েছিলেন ভারতে সাম্য না আসার আগে যেন ভারত স্বাধীনতা না পায়, কারণ স্বাধীনতার চেয়েও জরুরি সর্বপ্রকার বৈষম্য দূর করা।

শুধুই একজন বিপ্লবী শহীদ ছিলেন না তিনি, আসফাকউল্লা ছিলেন প্রকৃতই একজন বিপ্লবী চিন্তক। তাঁকে অনেকে ভারতের প্রথম মুসলিম শহীদ বলে চিহ্নিত করেন। কিন্তু আসফাকউল্লার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভারতে বিদ্যমান সকল প্রকার সাম্প্রদায়িক বৈষম্য দূরীকরণ করা। স্কুলে পড়াকালীনই তিনি লক্ষ করেছিলেন তাঁর শিক্ষকেরা ছাত্রদের মধ্যে হিন্দু-মুসলিমের বিভাজন করতেন যা তাঁর একেবারেই পছন্দ ছিল না। বিশ শতকের প্রথমার্ধে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি যখন দানা বাঁধছে ভারতের বুকে, সেই সময় এর তীব্র সমালোচনা করেন আসফাকউল্লা। বলকান যুদ্ধ এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের ফলে সমগ্র বিশ্ব জুড়ে ইসলাম বনাম খ্রিস্ট ধর্মের একটা বিবাদ দেখা দেয় আর এই বিবাদের সূত্র ধরেই পরে ব্রিটিশ বিরোধিতায় ইসলাম-সামগ্রিকতার বন্ধন লক্ষ করা যায়। আসফাকউল্লাকেও এই ভাবধারা প্রভাবিত করেছিল কিন্তু তাঁর মধ্যে শুধুই ইসলামি চেতনা নয়, তা রূপ পায় পূর্ণ দেশপ্রেমে। নিজের সংক্ষিপ্ত একটি আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন যে হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান আর্মি দলে তাঁর যোগদান এবং সম্ভাব্য কর্মকান্ড বিষয়ে রামপ্রসাদ বিসমিলও প্রথমদিকে যথেষ্ট সন্দিহান ছিলেন কারণ আসফাকউল্লা ছিলেন একজন মুসলিম। আর্যসমাজের শুদ্ধি আন্দোলন এবং এর বিপরীতে মুসলমানদের তবলিজ্‌-এর ধর্মান্তকরণের প্রক্রিয়াকে সমালোচনা করেছেন তিনি। এই সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের ফলেই ব্রিটিশরা ভারতে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে অতি সহজে ভাঙন ধরাতে সক্ষম হয়েছে বলেই তাঁর বিশ্বাস ছিল।

২০১৪ সালে ডিডি উর্দু চ্যানেলে ‘মুজাহিদ-ই-আজাদি- আসফাকউল্লা খান’ নামের একটি টেলিভিশন ধারাবাহিকে আসফাকউল্লা খানের চরিত্রে অভিনয় করেন গৌরব নন্দা।

১৯২৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত রামপ্রসাদ বিসমিল এবং রোশান সিংয়ের সঙ্গে আসফাকউল্লা খানের ফাঁসি হয়।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও