সববাংলায়

সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ | লাট সাহেব কা গির্জা

বিভাগঃ , ,

কলকাতার মতো পুরাতন শহরে যে বহু ঐতিহাসিক স্থাপত্যের নিদর্শন থাকবে তা খুবই স্বাভাবিক। এখানে পুরনো মন্দির, মসজিদ যেমন রয়েছে, তেমনই অসংখ্য গির্জাও ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে এই শহরের বুকে। ধর্মতলার ডালহৌসিতে বিবাদি বাগ চত্বরে তেমনই একটি প্রাচীন গির্জাকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, যেটি সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ (St. Andrew’s Church) নামে পরিচিত। এই গির্জাটির অবশ্য আরও দুটি নাম রয়েছে, সেগুলি হল, স্কচ কার্ক (Scotch Kirk) এবং লাট সাহেব কা গির্জা। এইসব নামও নির্দিষ্ট কিছু ইতিহাস ধারণ করে রয়েছে। এই চার্চের সঙ্গে স্কটিশদের একটা নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। এই গির্জার ইতিহাসের গভীরে ঢুকলে ব্রিটেন এবং স্কটল্যান্ডের মধ্যেকার সম্পর্কের দিকটিও বেরিয়ে আসবে। এমনকি ব্রিটিশদের একটি চার্চের সঙ্গে সামান্য একটা দ্বন্দের ইতিহাসও রয়েছে। অতএব বুঝতেই পারা যাচ্ছে উনিশ শতকের গোড়ার দিকে নির্মিত এই সেন্ট অ্যান্ড্রুজ গির্জাটি কলকাতা শহরের তৎকালীন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের একটা স্মারক হিসেবেও কতখানি গুরুত্বপূর্ণ।

ডালহৌসি স্কোয়ারের উত্তর-পূর্ব কোণে সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ অবস্থিত। এই গির্জাটি এখন যে স্থানে দাঁড়িয়ে রয়েছে তা একসময়ে ওল্ড কোর্ট হাউসের দখলে ছিল। এই চার্চ থেকে ময়দানে যাওয়ার রাস্তাটি আজও ওল্ড কোর্ট হাউস রোড নামে পরিচিত। উল্লেখ্য যে এই কোর্ট হাউসেই ১৭৭৫ সালে ব্রিটিশ মহারাজা নন্দকুমারকে ফাঁসির সাজা শুনিয়েছিল। যদিও সেটা অন্য ইতিহাস৷ ১৭৯২ সালে ওল্ড কোর্ট হাউসটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল।

যে-সময়ের কথা হচ্ছে ভারতবর্ষে তখন ব্রিটিশ রাজ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন যখন তুঙ্গে তখন কলকাতা ছিল তাদের প্রশাসনিক রাজধানী। প্রারম্ভিক দিনগুলিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কোন নিজস্ব ধর্মীয় স্থাপনা ছিল না। বছরের পর বছর ধরে ভারতে ক্লডিয়াস বুকানন এবং ইংল্যান্ডে উইলিয়াম উইলবারফোর্সের মতো মানুষেরা খ্রিস্টান মিশনারি কাজের প্রতি কোম্পানির সীমাবদ্ধ মনোভাবের বিরোধিতা করে এসেছেন। অবশেষে ১৮১৩ সালে পার্লামেন্ট কোম্পানি যাতে ভারতে মিশনারিদের অবাধে কাজ করবার সুযোগ প্রদান করে তার ওপরে জোর দেয়। ১৮১৩ সালের সনদ দ্বারা অ্যাংলো ইন্ডিয়া এপিস্কোপেটের সঙ্গে অ্যাংলো ইন্ডিয়া প্রেসবিটারি তৈরি হয়েছিল। সেই সময়ে, ১৮১৪-১৫ সাল নাগাদ কলকাতার ইউরোপীয় জনসংখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল স্কটিশ সম্প্রদায়। সেনাবাহিনীতেও স্কটিশদের অভাব ছিল না। ১৭০৭ সালে স্কটল্যান্ড এবং ইংল্যান্ডের মিলনের পর অনেক স্কট বাণিজ্যের স্বার্থে এবং প্রশাসনিক সম্প্রসারণের সুযোগ খুঁজতে ভারতে এসেছিলেন। সৈনিক ছাড়াও তারা কেউ ডাক্তার, কেউ ব্যবসায়ী ইত্যাদি নানারকম পেশায় নিযুক্ত ছিলেন। এমনই এক প্রেক্ষাপটে রেভারেন্ড জেমস ব্রাইসকে বেঙ্গল ইক্লিসিয়েস্টিক্যাল এস্টাবলিশমেন্টে একজন চ্যাপলেন বা যাজক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। ক্রমবর্ধমান স্কটিশ জনসংখ্যার সেবার জন্য তিনি একটি চার্চের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। সরকার চার্চ নিমাণের জন্য ওল্ড কোর্ট হাউসের জমিটি বরাদ্দ করে এবং সেই সঙ্গে এক লক্ষ টাকাও দিয়েছিল। অনেক ধনী ব্যক্তিও চার্চ স্থাপনের জন্য অর্থ প্রদান করেছিলেন।

১৮১৫ সালে সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ নির্মাণ শুরু হয়। মেসার্স বার্নস, কুরি অ্যান্ড কোং-এর ওপর চার্চ নির্মাণের দায়িত্ব ছিল। ১৮১৫ সালের ৩০ নভেম্বর সেন্ট অ্যান্ড্রু দিবসে গভর্নর জেনারেলের স্ত্রী চার্চের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। সেই কারণেই গির্জাটি ‘লাট সাহেব কা গির্জা’ বা ‘চার্চ অব দ্য গভর্নর’ নামেও পরিচিত। যদিও এর আরেকটি নাম হল ‘স্কচ কার্ক’, স্কটিশে ‘কার্ক’ শব্দের অর্থ হল চার্চ। ১৮১৮ সালের শুরুর দিকে চার্চ নির্মাণ সমাপ্ত হয় এবং সেবছর ১৮ মার্চ হয় এর উদ্বোধন।

ব্রাইস চেয়েছিলেন তাঁদের এই চার্চের চূড়াটি নিকটেই অবস্থিত অ্যাংলিকান সম্প্রদায়ের সেন্ট জনসের থেকেও যেন উঁচু হয়। তাঁর এমন ইচ্ছের কারণে সেন্ট জনস চার্চের প্রধান যাজক এবং কলকাতা শহরের প্রথম বিশপ মিডলটনের সঙ্গে ব্রাইসের বিরোধ দেখা দিয়েছিল। মিডলটন বিশ্বাস করতেন একমাত্র ব্রিটিশ চার্চই এই ধরনের কাঠামো তৈরি করতে পারে। বিরোধিতা সত্ত্বেও ব্রাইস সমস্তরকম প্রয়োজনীয় অনুমতি পেয়ে গিয়েছিলেন এবং সেন্ট জনসের মতোই চূড়া নির্মাণ করলেন। শুধু তাই নয়, মিডলটনকে আরও উত্যক্ত করবার জন্য ব্রাইস সেন্ট অ্যান্ড্রুজের চূড়ায় একটি কালো মোরগ স্থাপন করে দিয়েছিলেন। সেটি যেন ব্রাইসের দম্ভের একটি প্রতীক। সেই ঐতিহাসিক বিতর্কের এই নিদর্শনটি বজায় রাখতে মোরগটিকে আজও চূড়াতেই যত্নে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।
১৮৪৩ সালে একটি গুরুতর বিভেদ চার্চ অব স্কটল্যান্ডকে বিভক্ত করেছিল। প্রেসবিটারিয়ানরা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে যায় এবং স্কটল্যান্ডের একটি নতুন ফ্রি চার্চের জন্ম হয়। ১৯৪২ সাল থেকে দুটি ধর্মীয় মন্ডলী একত্রে যোগদান করে সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চকে তাদের উপাসনার স্থল হিসেবে বেছে নেয়। পরবর্তীকালে চার্চ অব নর্থ ইন্ডিয়ার ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিল সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ।

সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চের স্থাপত্যশৈলীও যে-কোনও মানুষের নজর কাড়বে। সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি এই চার্চটির শঙ্কু আকৃতির চূড়া দূর থেকেই চোখে পড়ে। লন্ডনের সেন্ট-মার্টিন-ইন-দ্য-ফিল্ডস চার্চের নকশার অনুসরণে এই চার্চটি নির্মিত। এটি সাত ফুট উঁচু এক স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। চার্চের মূল বর্গাকৃতি কাঠামোটির ওপর অনেকটা পেন্সিলের মতো দেখতে গ্রিসিয়ান শৈলীতে নির্মিত চূড়াটি বেশ আকর্ষণীয়। ১৮৩৫ সালে এই স্পায়ারে (Spire) একটি কমলা ডায়ালের ঘড়ি যুক্ত করা হয়েছিল। গির্জার ত্রিভুজাকৃতি সম্মুখভাগে চারটি ডরিক স্তম্ভ লক্ষ করা যায়। গির্জার বহির্ভাগের অন্যান্য দিকগুলিতে সারি সারি আয়তাকার এবং আর্কযুক্ত জানালা। গির্জার অভ্যন্তরেও দুপাশে সারিবদ্ধ অনেকগুলি স্তম্ভ দেখা যায়। বসবার সারি সারি কালো বেঞ্চও দুভাগে বিভক্ত করে সাজানো। মূল বেদীর দিক থেকে দেখলে ছাদে একটি ইংরেজি ‘ইউ’ আকৃতির নকশা দেখতে দেখতে পাওয়া যাবে। তার মধ্যে আবার রয়েছে বিশেষ একধরনের ডিজাইন। আকাশী নীল রঙের উপস্থিতি সেখানে। ওপর থেকে ঝুলন্ত আলোগুলি বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো রয়েছে গোটা প্রার্থনাকক্ষ জুড়ে। নীচের প্রার্থনাকক্ষটির ওপরেই রেলিং ঘেরা দ্বিতলটি গির্জার দেয়াল বরাবর চারদিক ঘিরে অবস্থিত। বেদীর দিকে সেই দ্বিতলে তাকালেই যীশুর ক্রস চোখে পড়ে।

স্কটিশ প্রবাসীদের সংখ্যা কমে গেলেও ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে আগত প্রবাসীদের কাছে, এমনকি তারা প্রেসবিটেরিয়ান না হলেও এই চার্চ তাদের উপাসনার স্থান হয়ে ওঠে।

বছরের বিভিন্ন সময়ে বিশেষ বিশেষ কিছু উৎসবও জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয় এখানে। বিশেষত ২৫ ডিসেম্বর ক্রিসমাস বা বড়দিন এখানে ধুমধাম করে উদযাপন করা হয়। রঙিন নানা আলোয় গোটা গির্জা সজ্জিত করা হয়। ক্রিসমাসের সকালে গির্জায় বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয় এবং উপস্থিত সকলের জন্য নানা শুভ বার্তা প্রদান করা হয়। এছাড়াও প্রভু যীশুর জন্মের মুহূর্তটি ছোট ছোট পুতুলের মাধ্যমে প্রদর্শিত হয় এখানে। কলকাতার নানা প্রান্ত এবং কলকাতার বাইরে থেকেও বড়দিনের সময় এই চার্চে অগুনতি মানুষ এসে ভিড় জমান।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading