সববাংলায়

মাদ্রাজ রাজ্য বনাম চম্পাকম দোরাইরাজন মামলা

বিভাগঃ , ,

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট যে কয়টি মামলায় যুগান্তকারী রায় দিয়েছিল তার মধ্যে মাদ্রাজ রাজ্য বনাম চম্পাকম দোরাইরাজন মামলা (State of Madras v. Champakam Dorairajan) হল একটি। এই মামলার রায়ের ফলে ভারতের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী হয়। ভারতের ইতিহাসে এই মামলা গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি ছিল প্রজাতান্ত্রিক ভারতে প্রথম বর্ণ-ভিত্তিক সংরক্ষণ (caste-based reservations) সম্পর্কিত রায়।

১৯৫০ সালে শুরু হয়ে এই মামলা চলেছিল প্রায় এক বছর। চম্পাকম দোরাইরাজন জাতি ও ধর্মের উপর ভিত্তি করে শিক্ষাকেন্দ্রে ভর্তি নিয়ে একটি পিটিশন জমা করেছিলেন মাদ্রাজ উচ্চ আদালতে। তার পরিপ্রেক্ষিতেই মামলা শুরু হয়। প্রথমে এই মামলা শুরু হয়েছিল মাদ্রাজ উচ্চ আদালতে। কিন্তু উচ্চ আদালতের রায় না মানতে পারায় বাদী পক্ষ শীর্ষ আদালতে আপিল করে। এরপর মামলা সুপ্রিম কোর্টে ওঠে। বিচারপতি এস আর দাসের (Justice S.R. Das) বেঞ্চ মামলার চূড়ান্ত রায় দেয় ১৯৫১ সালের ৯ এপ্রিল। সুধীরঞ্জন দাস ছাড়াও বেঞ্চের বাকি সদস্যরা ছিলেন হীরালাল কানিয়া (তৎকালীন প্রধানবিচারপতি), সঈদ ফযল আলি, এম পতঞ্জলি শাস্ত্রী, মেহ্‌র চাঁদ মহাজন, ভিভিয়ান বোস, বিকে মুখার্জি। শীর্ষ আদালত মামলায় এক যুগান্তকারী রায় দেয় ও হাইকোর্টের সিদ্ধান্তই বহাল রাখে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে জাতি ও ধর্মের উপর ভিত্তি করে শিক্ষাক্ষেত্রে ভর্তির জন্য ‘কমিউনাল গর্ভমেন্ট অর্ডার’ (Communal Government Order) বাতিল করা হয়। জি.ও. (গর্ভমেন্ট অর্ডার) আদতে সরকারি চাকরি এবং কলেজের আসনে বর্ণ ভিত্তিক সংরক্ষণের ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয় যে এই ধরনের সংরক্ষণ ভারতীয় সংবিধানের ২৯ (২) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে ১৫ (১), ২৯ (২) ধারা প্রয়োগ করা হয়েছিল এবং সংবিধানের মৌলিক অধিকারের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল।

১৯২৭ সালে রাজ্যের আওতাধীন ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিক্যাল কলেজগুলিতে শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিয়ে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে ‘কমিউনাল জি.ও.’ নামে একটি সরকারি নির্দেশিকা জারি হয়। সেই নির্দেশে বলা হয় যে ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিকেল কলেজগুলিতে আসন কিছু নির্দিষ্ট জাতি ও ধর্মের পড়ুয়াদের জন্য সংরক্ষিত করা হবে। সেই তালিকা অনুযায়ী অ-ব্রাহ্মণ হিন্দুদের জন্য ৬টি আসন, অনগ্রসর হিন্দুদের জন্য ২টি আসন, ব্রাহ্মণদের জন্য ২টি আসন, হরিজনদের জন্য ২টি আসন, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ও ভারতীয় খ্রিস্টানদের জন্য ১টি আসন এবং মুসলিমদের জন্য ১টি আসন সংরক্ষিত থাকবে। এর বিরোধিতা করে ১৯৫০ সালে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের এক শিক্ষার্থী শ্রীমতি চম্পাকম দোরাইজন মাদ্রাজ হাইকোর্টে একটি আবেদন দায়ের করেন। ভারতীয় সংবিধানের ২২৬ অনুচ্ছেদের অধীনে পিটিশন দায়ের করা হয় এবং রাজ্য কর্তৃক পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রক্রিয়ায় মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়।

মামলাটি যখন আদালতে ওঠে তখন মূল বক্তব্য যা আদালতের সামনে উঠে এসেছিল তা হল ১৯২৭ সালের ‘কমিউনাল জি.ও.’ অনুযায়ী আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা। ধর্ম, জাতি এবং বর্ণের ভিত্তিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে সংরক্ষণের এই নিয়মের মাধ্যমে চালু ছিল যা ভারতীয় সংবিধানের ১৫ (১) এবং ২৯ (২) অনুচ্ছেদের অধীনে ভারতের নাগরিকদের জন্য নিশ্চিত ও নির্ধারিত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে। ভারতীয় সংবিধানের ১৫ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী “রাষ্ট্র কেবলমাত্র ধর্ম, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, জন্মস্থান বা এদের মধ্যে যে কোন একটির ভিত্তিতে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করবে না (The State shall not discriminate against any citizen on grounds only of religion, race, caste, sex, place of birth or any of them)”। এছাড়া ভারতীয় সংবিধানের ২৯ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের যে কোনও অংশের নাগরিকদের স্বতন্ত্র ভাষা, লিপি বা সংস্কৃতি সংরক্ষণের অধিকার থাকে। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, “কোন নাগরিককে শুধুমাত্র ধর্ম, জাতি, বর্ণ, ভাষা বা তাদের যে কোন একটির ভিত্তিতে রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে বা রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে সাহায্য গ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা যাবে না (No citizen shall be denied admission into any educational institution maintained by the State or receiving aid out of State funds on grounds only of religion, race, caste, language or any of them.)”।

মাদ্রাজ রাজ্য যুক্তি দিয়েছিল যে এই অনুচ্ছেদের বিধানগুলি সংবিধানের অন্যান্য অনুচ্ছেদের সঙ্গে পড়তে হবে, বিশেষ করে ৪৬ অনুচ্ছেদ যেখানে বলা হয়েছে রাজ্য তফসিলি জাতি (SC), তফসিলি উপজাতি (ST) এবং অন্যান্য দুর্বল জাতিগুলির শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রচারের জন্য বিশেষ যত্ন নেবে এবং তাদের সামাজিক অবিচার ও সকল প্রকার শোষণ থেকে রক্ষা করবে। (Promotion of educational and economic interests of Scheduled Castes, Scheduled Tribes and other weaker sections- The State shall promote with special care the educational and economic interests of the weaker sections of the people, and, in particular, of the Scheduled Castes and the Scheduled Tribes, and shall protect them from social injustice and all forms of exploitation.)

তবে মাদ্রাজ রাজ্য সরকারের এই যুক্তি ধোপে টেকেনি। মাদ্রাজ হাইকোর্ট এই মামলায় চম্পাকম দোরাইজনের পক্ষে রায় দেয়। উচ্চ আদালতের এই রায়দানের পর মাদ্রাজ রাজ্য সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় এবং এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। মামলাটি ভারতের শীর্ষ আদালতে যাওয়ার পর ফের বিচার শুরু হয়। মামলার শেষে সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় ১৯২৭ সালে জারি হওয়া ‘কমিউনাল জি.ও.’ সংবিধানের ২৯ (২) অনুচ্ছেদ দ্বারা ভারতের নাগরিকদের জন্য নিশ্চিত মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন এবং সেই কারণেই সংবিধানেরই ১৩ অনুচ্ছেদের (Laws inconsistent with or in derogation of the fundamental rights) অধীনে এটি বাতিল ঘোষণা করে শীর্ষ আদালত। এই অনুচ্ছেদ দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারকে সম্মান এবং বাস্তবায়নের কথা বলে এবং মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে এটি আদালতকে একটি আইন বা আইনকে বাতিল ঘোষণা করার ক্ষমতা প্রদান করে। মামলায় শীর্ষ আদালত রায় দেয় যে সাম্প্রদায়িক জি.ও. আসলে ধর্ম, জাতি এবং বর্ণের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় এবং এটি সংবিধানের পরিপন্থী। পাশাপাশি আদালত এও স্পষ্ট করে যে এটি সংবিধানের ২৯ (২) অনুচ্ছেদের অধীনে নাগরিকদের জন্য নিশ্চিত মৌলিক অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। তার রায়ে, সুপ্রিম কোর্ট মাদ্রাজ হাইকোর্টের রায়কে বহাল রাখে যেখানে ১৯২৭ সালে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে পাস হওয়া ‘কমিউনাল জি.ও.’ বাতিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

এটি সরকারি চাকরি এবং কলেজে আসনে বর্ণ-ভিত্তিক সংরক্ষণের ব্যবস্থার কান্ডারি ছিল যার বিপক্ষে রায় দেয় প্রথমে উচ্চ এবং পরে শীর্ষ আদালত। সুপ্রিম কোর্টের তরফে বলা হয় যে রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যে নির্দেশমূলক নীতিগুলি মৌলিক অধিকারের অধ্যায়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং এর সহায়ক হিসাবে পরিচালিত হতে হবে। সংবিধানে ৩৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত DPSP (Directive Principles of State Policy)-গুলিকে আদালত স্পষ্টভাবে অপ্রয়োগযোগ্য করে তুলেছে। ভারতীয় সংবিধানের চতুর্থ ভাগে, বিশেষ করে ৩৬ থেকে ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রীয় নীতির নির্দেশমূলক নীতিমালা (DPSP) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদগুলিতে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্র অর্জনের জন্য সরকারের অনুসরণীয় নীতিমালার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। এই DPSP কেবল তখনই বাস্তবায়িত হতে পারে যতক্ষণ না তৃতীয় অংশে মৌলিক অধিকারের কোনও লঙ্ঘন না হয়।

ভারতীয় বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে মাদ্রাজ রাজ্য বনাম চম্পাকম দোরাইরাজন মামলা একটি যুগান্তকারী ঘটনা। কারণ এই মামলার মাধ্যমেই প্রথমবার সুপ্রিম কোর্ট প্রজাতান্ত্রিক ভারতে প্রথম বর্ণ-ভিত্তিক সংরক্ষণ সম্পর্কে রায়দান করে। এই মামলায় মাদ্রাজ সরকারকে হারিয়ে চম্পাকম দোরাইরাজন ইতিহাস সৃষ্টি করে। এই মামলা সংরক্ষণের বিরুদ্ধে গিয়ে প্রান্তিক সম্প্রদায়ের উন্নয়নের জন্য মেধা-ভিত্তিক নির্বাচনের পক্ষে রায় দেয় ও চম্পাকম দোরাইরাজনকে ন্যায়বিচার প্রদান করে। এই মামলা সংরক্ষণ নীতি এবং ব্যক্তি অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের মধ্যে ভারসাম্য করে এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকারকে গুরুত্ব আরোপ করে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading