বাস্তিল দুর্গের পতন

বাস্তিল দুর্গের পতন

সভ্যতার ইতিহাসে যেসমস্ত ঘটনা কোনো নব্যযুগের সূচনার রণডঙ্কা বাজিয়েছে কালে কালে, সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হল অবশ্যই বাস্তিল দুর্গের পতন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফরাসী রাজতান্ত্রিক স্বৈরাচারী শাসনের প্রতীক মানা হত প্যারিসের পূর্বদিকে অবস্থিত মধ্যযুগীয় এই দুর্গটিকে। এটিকে মূলত রাষ্ট্রীয় কারাগার হিসেবে ব্যবহার করা হত। বিভিন্ন অপরাধে, এমনকি কখনও বিনা অপরাধেও অন্যায়ভাবে নির্দোষ জনগণকে এই দুর্গের কারাগারে বন্দী করে রাখতেন রাজতন্ত্রের ধারকবাহকের দল। প্রায় ১০০ ফুট উঁচু এবং আটটি পরিখা দ্বারা বেষ্টিত ছিল এই দুর্গ। নানা আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠা ফরাসী জনগণ যারা বিপ্লবের পথে পা বাড়িয়েছিল বাস্তিলে সঞ্চিত গোলাবারুদ ও অস্ত্র দাবি করার জন্য এগিয়ে আসে তারা। কিন্তু প্রহরীদের বাধা পেয়ে উন্মত্ত হয়ে তারা দুর্গ দখল করে নেয়, বন্দী সাতজন নিরাপরাধকে মুক্ত করে এবং বাস্তিলে অগ্নিসংযোগ করে রাজতন্ত্রের অবসান ঘোষণা করেছিল। ঐতিহাসিক ফরাসী বিপ্লবের সার্থকতা লাভে এবং প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বাস্তিল দুর্গের পতন ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফ্রান্সের বিক্ষুব্ধ জনতা যাঁদের অধিকাংশই কৃষক সম্প্রদায়ের মানুষ, তারা বাস্তিল দুর্গের পতন ঘটিয়ে রাজতান্ত্রিক শাসনের সমাপ্তি ঘোষণা করেছিল। আসলে ইংল্যান্ডের সঙ্গে শতবর্ষের যুদ্ধ চলাকালীন প্যারিস শহরের পূর্বদিকের প্রবেশপথটিকে ইংরেজদের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য ১৩৭০ থেকে ১৩৮০-এর মধ্যে বাস্তিল দুর্গ নির্মিত হয়েছিল। এটি বাস্তিল সেন্ট-অ্যান্টোইন নামেও পরিচিত ছিল। ১০০ ফুট উঁচু দেওয়াল, ৮০ জনেরও বেশি নিয়মিত সৈন্য, ৩০জন ভাড়াটে সুইস প্রহরী, চতুর্দিকে আটটি পরিখা, সব মিলিয়ে বেশ সুরক্ষিত এবং প্রায় দুর্ভেদ্য ছিল বলা যায় দুর্গটি। ১৪১৭ সালে এই দুর্গটিকে রাষ্ট্রীয় কারাগার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। দুর্গের এই ভূমিকা আরও জোরালো হয়েছিল প্রথমে ১৪২০, ১৪৩০-এর দশকে ইংরেজ দখলদারদের অধীনে। পরে ১৪৬০-এর দশকে একাদশ লুইয়ের অধীনে। চতুর্দশ লুই বাস্তিলকে ফরাসি সমাজের উচ্চশ্রেণীর সদস্যদের যাঁরা তাঁর বিরোধিতা করেছিল তাঁদের জন্য কারাগার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ১৬৫৯ সাল থেকে বাস্তিল প্রাথমিকভাবে একটি রাষ্ট্রীয় শাস্তিকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন মতাবলম্বীদেরও এই বাস্তিলের কারাগারে বন্দী রাখা হত। লেখক ও দার্শনিক ভলতেয়ারকে বাস্তিলেই আটক করে রাখা হয়েছিল। পঞ্চদশ এবং ষোড়শ লুইয়ের সময়ে বাস্তিল দুর্গটিকে আরও বিচিত্র কার্যসিদ্ধির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। সেসময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সরকারী সেন্সরশিপ জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার কাজে ফরাসি পুলিশের সক্রিয়তাকে জোরালো সমর্থন জানানো হয়েছিল বাস্তিল থেকে। প্রথমদিকে বাস্তিল দুর্গে বন্দীদের অবস্থা তুলনামূলক ভালো হলেও অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে সেঅবস্থার পরিবর্তন অর্থাৎ খারাপ হতে শুরু করেছিল, তা পরবর্তীকালে বন্দীদের আত্মজীবনীতে লক্ষ্য করা যাবে।

অষ্টাদশ শতাব্দী থেকেই ফ্রান্সের আবহাওয়া উত্তপ্ত হতে শুরু করে। জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি নানাকারণে অসন্তোষ জমা হতে থাকে। মূলত ষোড়শ লুইয়ের আমলে ফ্রান্স একটি বড়সড় আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হয়। আমেরিকার বিপ্লবে হস্তক্ষেপের কারণে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়ে যায়। তাছাড়া পূর্বসূরীদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঋণ সত্ত্বেও ষোড়শ লুই অযথা প্রচুর অর্থ খরচ করতেন। এছাড়াও ১৭৮৮ সালে কৃষিকার্যে অবনতি, উৎপাদন হ্রাস এবং ১৭৮৮-৮৯ নাগাদ প্রচন্ড শীতের কারণে ফ্রান্সে ভীষণ খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছিল। ফলত ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দুর্ভিক্ষের তাড়নায় অসংখ্যা মানুষ প্যারিসে চলে আসতে শুরু করেছিল। সেসময় সামান্য রুটির দাম এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, একজন শ্রমিককে তার মজুরির ৮৮শতাংশ শুধুমাত্র রুটির জন্যই ব্যয় করতে হতো। পাশাপাশি ছিল বেকারত্ব। শস্যভান্ডার এবং অন্যান্য খাদ্যসঞ্চয়স্থানে সহিংস খাদ্য দাঙ্গা শুরু হয়েছিল। ফ্রান্সের দিকে দিকে জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল সেইসময়।

এই পরিস্থিতিতে ষোড়শ লুইয়ের উদ্যোগে ১৭৮৯ সালের ৫ মে এস্টেট-জেনারেল আহ্বান করা হয়। এই সমাবেশে একেকটি শ্রেণী একেকটি এস্টেটের প্রতিনিধিত্ব করত। পাদরিরা ছিল প্রথম এস্টেটের অন্তর্ভুক্ত, অভিজাত সম্প্রদায়ের লোকজন দ্বিতীয় এবং তৃতীয় এস্টেট মূলত সাধারণ জনগণদের নিয়ে তৈরি। যদিও এই সমাবেশ ব্যর্থ হয়, মূলত দ্বিতীয় এস্টেটের রক্ষণশীলতার কারণেই।  এরপর ১৭৮৯ সালের ১৭ জুন তৃতীয় এস্টেট নিজেদেরকে জাতীয় পরিষদ হিসেবে ঘোষণা করে তার পুনর্গঠন করে। এরপর টেনিস কোর্টে তারা শপথ নেয় একটি ফরাসী সংবিধান তৈরি করার। এরই মধ্যে ১১ই জুলাই রাজা ষোড়শ লুই খুবই জনপ্রিয়, তৃতীয় এস্টেটের মানুষদের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং সংস্কার-বুদ্ধিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ জ্যাক নেকারকে বরখাস্ত করলে জনতা আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পরদিন প্যারিসের রাস্তায় প্রতিবাদী জনতার ঢল নেমে আসে। রাজসৈন্যদের সেই জনতা এতই হয়রান করে যে তারা দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়েছিল। বিক্ষুব্ধ জনগণ পণ্যের ওপর কর আরোপ করা, খাদ্য ও মদের দাম বৃদ্ধির জন্য দায়ী বেশিরভাগ শুল্ক পোস্টগুলি পুড়িয়ে দিতে থাকে। খাদ্য, বন্দুক ও রসদ মজুত থাকতে পারে এরকম যে-কোনো জায়গা লুঠ করতে শুরু করে প্যারিসের ক্ষুব্ধ জনগণ। অস্ত্রের ভান্ডারসহ আরও নানা জায়গায় লুঠতরাজ চালায় বহু মানুষ। রাজার সৈন্যরা চারদিকের এই সামাজিক বিশৃঙ্খলা রোধ করতে কিছুই করতে পারেনি তখন।

১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাইয়ের সকাল থেকেই শহরে উত্তেজনা লুঠতরাজ জারি ছিল। সেসময় বাস্তিলে সাতজন বন্দী অবস্থায় ছিল। হোটেল দেস ইনভালাইডস থেকে ৩২০০০ মাস্কেট এবং কিছু কামান বাজেয়াপ্ত করে বিক্ষোভকারীরা। হোটেলের কমান্ড্যান্ট ২৫০ ব্যারেল বারুদ নিরাপদে রাখবার জন্য বাস্তিলে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। পরে অসংখ্য ক্ষুব্ধ জনতা বাস্তিলে সঞ্চিত বিপুল পরিমাণ বারুদ এবং অস্ত্রশস্ত্র তাদেরকে সমর্পণ করে দেওয়ার আহ্বান জানায়। বাস্তিলের তৎকালীন গভর্নর বার্নার্ড-রেনে দে লাউনাই দেখেন ক্রমে বিপুল এক ভীড় দুর্গ ঘিরে ফেলতে থাকে। তিনি ভয় পান এবং মীমাংসার জন্য জনতার মধ্যে থেকে দুজন প্রতিনিধিকে দুর্গে আহ্বান জানান। রাজার তরফ থেকে কোনো নির্দেশ ছিল না, ফলে, লাউনাই সেই জমায়েতে গুলি না চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আলোচনা যখন দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে বাইরে জমা ভীড়ও অধৈর্য ও চঞ্চল হয়ে ওঠে এবং তারা মনে করতে থাকে হয়তো তাদের প্রতিনিধিদেরও গ্রেফতার করা হয়েছে। দুপুর দেড়টা নাগাদ ভীড়ের একাংশ বাইরের উঠোনে প্রবেশ করে। পুরুষদের একটি ছোট দল দুর্গের অভ্যন্তরীন উঠোনের গেটের পাশে এক বিল্ডিংয়ে উঠে একটি ড্রব্রিজ বা পরিখার সঙ্গে দুর্গের সংযোগস্থাপনকারি সেতুর শেকল ভেঙে তা নামিয়ে আনে। সেই ব্রিজ চাপা পড়ে একজন বিক্ষোভকারী প্রাণ হারিয়েছিলেন। সৈন্যরা জনগণকে থামবার নির্দেশ দিলেও বিক্ষোভের চিৎকারে সেই আদেশ হারিয়ে গিয়েছিল। জনতা দ্বিতীয় ড্রব্রিজ ভেঙে ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই দে লাউনাই তাঁর অঙ্গীকার ভেঙে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই গোলাগুলিতে প্রায় একশোজন আক্রমনকারী প্রাণ হারিয়েছিলেন। বেলা ৩টের সময় ফ্রেঞ্চ গার্ড রেজিমেন্টের সৈন্যরা দুটি কামান সহযোগে বিদ্রোহী জনতার পক্ষে রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়। ফলে বিবদমান দুই পক্ষই শক্তির পরীক্ষায় কেউ কাউকে জায়গা ছাড়ে না সহজে। অবশেষে বিকেল ৫টা নাগাদ পারস্পরিক হত্যাকান্ডের সম্ভাবনা স্পষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গভর্নর দে লাউনাই দুর্গের সৈন্যদের গুলি চালানো বন্ধ করার নির্দেশ দেন এবং তিনি আত্মসমর্পণ করেন। তিনি বুঝেছিলেন দুর্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল এবং খাদ্য মজুত নেই, এবং সৈন্যরা বিক্ষোভকারীদের বেশিক্ষণ আটকে রাখতে পারবে না। অবশেষে দুর্গের দ্বার খুলে দেওয়া হয় এবং আন্দোলনকারীরা ৫.৩০টা নাগাদ দুর্গের দখল নেয়।

লাউনাইকে আটক করে বিদ্রোহীরা হোটেল ডি ভিলের দিকে নিয়ে যায় টানতে টানতে। বিভৎসভাবে প্রহৃত হবার পরে নিজেই সে মৃত্যু কামনা করে ছটফট করতে থাকে। এরপর একেরপর এক ছুরিকাঘাতে লাউনাইয়ের মৃত্যু হয় এবং মুন্ডচ্ছেদ করে তার মাথা শূলে গেঁথে তুলে ধরা হয় উপরদিকে। বাস্তিলের গ্যারিসন সৈন্যের তিনজন অফিসারও ভীড়ের হাতেই নিহত হয়েছিল। পরদিন সকালে অর্থাৎ ১৫ই জুলাই ডিউক অব লা রোচেফৌকাল্ডের মাধ্যমে ষোড়শ লুই বাস্তিল পতনের খবর জানতে পারেন। রাজা জিজ্ঞেস করেছিলেন এটা কি কোনো বিদ্রোহ? উত্তরে ডিউক বলেন, না, এটা কোনো বিদ্রোহ নয়, এটা বিপ্লব। ডিউকের কথায় অত্যুক্তি ছিল না। পরবর্তীকালে ষোড়শ লুইকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয় এবং গিলোটিনে তাঁকে হত্যা করা হয়৷ দীর্ঘকালের যে স্বৈরাচারী রাজতান্ত্রিক শাসন তার অবসান ঘটেছিল রাজতন্ত্রের প্রতীক এই বাস্তিল দুর্গের পতনের মাধ্যমে এবং প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। ইতিহাসে এই যুগান্তকারী পরিবর্তন ফরাসী বিপ্লব নামে খ্যাত।

আজও ১৪ই জুলাই ফ্রান্সে বাস্তিল দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। ফ্রান্সে এইদিন সরকারী ছুটি থাকে। আতশবাজি, প্যারেডসহ সারা দেশে নানাভাবে এই দিনটি উদযাপন করেন সেখানকার মানুষ।

আপনার মতামত জানান