সববাংলায়

সুধীর কুমার সেন ও বাঙালির বাইসাইকেল

বিভাগঃ ,

দু’চাকায় মানুষ দুনিয়া জয় করেছে। দু’চাকার এই সাইকেলই মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ওতপ্রোতভাবে। এমন পরিবেশবান্ধব একটি যান পরিবেশের জন্য যেমন ভাল তেমনই সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতেও তা সাহায্য করে। সাইকেল জিনিসটা তৈরি হয়েছিল বিদেশে, অথচ বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে তা ঢুকে পড়েছিল এই ভারতবর্ষে। যাঁর হাত ধরে ভারতবর্ষ বাইসাইকেলকে চিনেছিল তাঁর নাম সুধীর কুমার সেন (Sudhir Kumar Sen)। এই বাঙালির হাত ধরে ভারতে আরেকটি সম্ভাবনাময় শিল্পের পথ খুলে গিয়েছিল সেদিন। ভারতে প্রথম সাইকেল কারখানা তৈরি করেছিলেন তিনিই। সেদিন সুধীর কুমার সেন নিজে উদ্যোগ নিয়ে বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে বাইসাইকেলের সঙ্গে জুড়ে না থাকলে হয়ত এদেশে সাইকেলের অনুপ্রবেশ হত আরও দেরিতে। বাইসাইকেল সংক্রান্ত ম্যাগাজিনও করেছিলেন তিনি। অথচ যুগান্তকারী কাজ করা অনেক বাঙালির মতোই এই বাঙালি শিল্পপতির নাম প্রায় বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছে।

সুধীর কুমার সেন সম্পর্কে প্রথমে কিছু জেনে নেওয়া প্রয়োজন। ১৮৮৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত ভারতের বরিশালের (বর্তমান বাংলাদেশে) বাসন্ডা গ্রামের এক শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত পরিবারে  সুধীর কুমার সেনের জন্ম হয়। তা়ঁর বাবার নাম চন্ডীচরণ সেন এবং মা বামাসুন্দরী দেবী। সুধীর কুমার কিন্তু বিখ্যাত ও প্রথিতযশা কবি কামিনী রায়ের ভাই এবং পরবর্তীকালে তিনি বিখ্যাত ডাক্তার নীলরতন সরকারের জামাই হয়েছিলেন।

উচ্চশিক্ষার জন্য বরিশাল থেকে কলকাতায় চলে এসেছিলেন সুধীর। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন এবং অনার্স-সহ পাশ করেন তিনি। সেই সময় প্রেসিডেন্সিতে ইংরেজি পড়াতেন অধ্যাপক হ্যারিংটন হিউ মেলভিল পার্সিভাল। এই অধ্যাপকের দ্বারা তিনি দারুণভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। সুধীর কুমার যে একজন সফল মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছিলেন তার অনেকখানি কৃতিত্ব তিনি দেন অধ্যাপক পার্সিভালকে।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ এবং বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই ভারতীয় রাজনীতিতে যেমন বদল আসতে শুরু করে তেমনই শিল্পের পথও প্রশস্ত হতে শুরু করেছিল। বিশেষত বাঙালিরা যেভাবে বিদেশি প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বদেশী উপায়ে শিল্পপ্রসারের সম্ভাবনাকে গোটা দেশের সামনে দৃষ্টান্তের মতো তুলে ধরেছিল সেই পথেই সাহস করে এবং অদম্য উৎসাহ নিয়ে এগিয়েছিলেন সুধীর কুমার সেন৷ উনিশ শতকের শেষদিকে ৮০-এর দশকে ডাক্তার এস কে বর্মণ ভেষজ ওষুধ তৈরি করে এবং ডাবর কোম্পানির নির্মাণ করে চতুর্দিকে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। সেই ডাবর কোম্পানি গোটা ভারতবর্ষের অর্থনীতিতে যেমন দারুণ প্রভাব বিস্তার করেছিল তেমনই শিল্পের এক নবদিগন্ত উন্মোচিত করে দিয়েছিল। আরও কিছুদিন পর ১৯০৫ সাল থেকে সারা দেশ যখন বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলন নিয়ে উত্তাল সেসময় ভারতীয়দের আত্মনির্ভরশীল এক জাতি হিসেবে গড়ে তোলবার কথা জানিয়েছিলেন এবং উপলব্ধি করেছিলেন বিশেষ কিছু মানুষ। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় তখন বাঙালিকে আহ্বান জানাচ্ছেন ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করবার জন্য। নিজে তিনি ‘বেঙ্গল কেমিক্যালস’ তৈরি করে পথপ্রদর্শকের কাজও করেছিলেন। প্রফুল্লচন্দ্রের পাশাপাশি ‘ডাকব্যাগ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সুরেন্দ্রমোহন বসু, জি ডি ফার্মাসিউটিক্যালসের গৌরমোহন দত্ত প্রমুখ বাঙালি তখন গোটা দেশকে স্বয়ম্ভর হওয়ার জন্য শিল্পের পথে পরোক্ষে আহ্বান জানিয়েছিলেন। এছাড়াও সুধীর কুমারের কলেজের প্রাক্তন ছাত্র রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের মতো সফল শিল্পপতির দৃষ্টান্তও ছিল তাঁর সামনে। সুধীর কুমার সেনও এই তরঙ্গে নিজেকে সামিল করেছিলেন। তিনি নিজের সমস্ত মনোযোগ দিয়েছিলেন বিদেশে তৈরি এই আশ্চর্য পরিবেশবান্ধব যান বাইসাইকেলের দিকে। জার্মানির ব্যরন কার্ল ফন ড্রাইসকে সাইকেলের আবিষ্কর্তা বলা হয়ে থাকে। তিনি ১৮১৭ সালে প্যাডেলবিহীন সাইকেল আবিষ্কার করেন। পরে ১৮৮৫ সালে ইউরোপে সেফটি মডেল সাইকেলের নির্মাণ হয়েছিল৷

১৯০৯ সালে রামচন্দ্র পন্ডিতের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি মাত্র চারশো টাকা মুলধন নিয়ে শুরু করেছিলেন ‘সেন অ্যান্ড পন্ডিত কোং’। তবে কিছুদিনের মধ্যে সেই কোম্পানির একক মালিকানা পেয়ে যান সুধীর কুমার। ভারতে তিনিই সম্ভবত প্রথম সাইকেলের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তিনি ইউরোপ থেকে সাইকেল এবং সাইকেলের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি করে ভারতে বিক্রি করতেন। ঐতিহাসিক ডেভিড আর্নল্ডের মতে ১৯১০ সালে নাকি ভারতে প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার বাইসাইকেল বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছিল। ভারতীয়দের জীবনযাত্রার সঙ্গে সুধীর কুমার সেন সাইকেলের পরিচয় করিয়ে দিলেন এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই তুলনামুলক সস্তা এবং কার্যকরী দুচাকার বাহনটি অধিকাংশ ভারতবাসীর নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল।

১৯১২ সালে ইউরোপীয় সাইকেল নির্মাতাদের একটি ব্যবসায়িক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন সুধীর কুমার।  এছাড়াও তাঁর কোম্পানিকে বড় করে তুলবার জন্য, বিপণন কৌশল উন্নত করতে, ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ও ব্যবসার উন্নতি করতে প্রতি বছর ইংল্যান্ড, জার্মানি এবং আমেরিকায় ভ্রমণ করেন।

সস্তা অথচ কার্যকরী এবং পরিবেশবান্ধব এই পরিবহনটিকে আরও বেশি উৎসাহ দিতে, বাইসাইকেল সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জানাতে, কৌতুহলী করে তুলতে সুধীর কুমার ১৯১৭ সাল থেকে ‘ইন্ডিয়ান সাইকেল অ্যান্ড মোটর জার্নাল’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন। বাইসাইকেলের জন্য যখন তিনি ইংল্যান্ড, জার্মানি প্রভৃতি দেশে নিয়মিত যাতায়াত করছেন তখনই একবার ইংল্যান্ড সফরের সময় তিনি নটিংহ্যামে অবস্থিত র‍্যালে নামক সাইকেল প্রস্তুতকারক এক কোম্পানির সঙ্গে পরিচিত হন। র‍্যালে কোম্পানি ততদিনে নিজের পসার দারুণ বৃদ্ধি করেছে। আয়ারল্যান্ড পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়েছিল তারা। এমনকি অন্যান্য দেশের স্থানীয় কোম্পানি দ্বারা তারা নিজেদের কারখানাও স্থাপন করেছিল। সারা বিশ্বে র‍্যালে কোম্পানির বাইসাইকেল তখন বিখ্যাত। কিন্তু ১৯৫০ সালে যখন ব্রিটেনের মার্কেটে মোটর গাড়ির প্রবেশ ঘটে যায় তখন বাইসাইকেলের ব্রিটিশ বাজার হ্রাস পেতে থাকে। র‍্যালে কোম্পানির সাইকেলের যে জনপ্রিয়তা ছিল তা হ্রাস পেতে থাকে। র‍্যালে কোম্পানির এমনই এক টালমাটাল সময়েই সুধীর কুমার এই ব্র্যান্ডটিকে ভারতে আনার পরিকল্পনা করেছিলেন। তাছাড়া র‍্যালে কোম্পানি আগে থেকেই বিভিন্ন দেশের স্থানীয় কোম্পানির সহযোগিতায় সেই দেশে নিজেদের কোম্পানির শাখা খুলেছে। অতএব সুধীর কুমারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে সময় লাগল না। ১৯৫২ সালে আসানসোলের কন্যাপুরে স্বাধীন ভারতবর্ষের প্রথম সাইকেল কারখানা ‘সেন-র‍্যালে সাইকেল কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পর এমন একটি শিল্পের আমদানি ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতিতে সহায়তা করেছিল নিঃসন্দেহে। আসানসোলের সেই কারখানায় উন্নতমানের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হত। সেই কারখানাটি বার্ষিক প্রায় দুলক্ষ চাকা তৈরিতে সক্ষম ছিল। প্রথম প্রথম সাইকেল তৈরির যন্ত্রাংশ ইংল্যান্ড, জার্মানি প্রভৃতি দেশ থেকে আসত, কিন্তু ক্রমে সেইসব যন্ত্রপাতি এখানেই তৈরি হতে থাকে৷ এই কোম্পানিতে প্রায় সাড়ে চার হাজার কর্মী কাজ করেছিলেন। এখানে উল্লেখ্য যে, কারখানার কর্মীরা অধিকাংশই ছিলেন বাঙালি। এই কোম্পানি ‘র‍্যালে’, ‘রবিনহুড’, ‘হাম্বার’-এর মতো সাইকেল উপহার দিয়েছিল ভারতবাসীকে, যা প্রায় দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ হয়ে গিয়েছিল। শহরে তো বটেই গ্রামে গ্রামে ছোটখাটো সাইকেল কারখানা গড়ে উঠেছিল। মানুষ সাইকেলের সঙ্গে আরও বেশি ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করেছিল। সুধীর কুমার সেনের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘সেন-র‍্যালে অ্যাথলেটিক ক্লাব’ও গড়ে উঠেছিল। বিদেশেও রপ্তানি হত তাঁদের সাইকেল। বহু দশক ধরে সাইকেলের বাজারে প্রস্তুতকারক ও পরিবেশক হিসেবে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে ছিল এই সেন-র‍্যালে কোম্পানি।

১৯৫৮ সালে বাণিজ্যিক পরিষেবাঘটিত একটি বিষয়ের জন্য জার্মানিতে গিয়েছিলেন সুধীর কুমার। পরের বছরে অর্থাৎ ১৯৫৯ সালের ২৮ আগস্ট ৭১ বছর বয়সে জার্মানিতেই সুধীর কুমার সেনের মৃত্যু হয়। ১৯৭৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকার সেন-র‍্যালে কারখানাটি অধিগ্রহণ করে এবং তার নতুন নাম হয় ‘সাইকেল কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া লিমিটেড’। তবে কারখানা তারপর থেকে আর তেমনভাবে সফল হয়নি। অবশেষে ২০০১ সালে কারখানাটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। একদা বাঙালি তথা ভারতবাসীর জীবনে যে সেন-র‍্যালে কোম্পানির সাইকেল ছিল অপরিহার্য, ভারতের সেই প্রথম সাইকেল কোম্পানির নেপথ্য নায়ক সুধীর কুমার সেনই আজ বিস্মৃতির অন্ধকারে ডুবে গেছেন।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading