ঝরণা কলম বললেই চলে আসে দোয়াতের কালির কথা। বঙ্গ জীবনে এই দোয়াতের কালি বলতেই যে নামটি আবশ্যিকভাবে উঠে আসে, তা হল সুলেখা কালি (Sulekha Ink)। স্বাধীনতার আগে ভারতবর্ষের বাজারে অজস্র কালি কোম্পানি থাকলেও সুলেখা কালির জনপ্রিয়তার ধারে কাছেও কেউ ছিল না ৷ কেবল লেখনীর একটি মাধ্যম হিসেবে নয়, এই কালি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসেও নিজের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছে। বিদেশি দ্রব্য বয়কটের আবহে মহাত্মা গান্ধীর অনুরোধে সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে প্রস্তুত এই কালি তৈরী করা হয়েছিল মূলত স্বদেশ চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়েই। একসময় এই সুলেখা কালির জনপ্রিয়তা এতটাই বৃদ্ধি পায় যে দেশের গন্ডি পেরিয়ে এই কালি বিদেশেও রপ্তানি হত।
ব্রিটিশ আমলে লেখার জন্য ফাউন্টেন পেন বা ঝর্ণা কলমের ব্যবহার সারা দেশেই বেশ প্রচলিত ছিল। এই ফাউন্টেন পেনে লেখার জন্য প্রয়োজন হত ভালো মানের কালির। সেই আমলে লেখার কালি হিসেবে বিদেশি কালি কোম্পানিগুলিরই একচেটিয়া বাজার ছিল ভারতে। ১৯৩০-এর দশকে যখন স্বদেশী আন্দোলন তুঙ্গে, ঠিক সেই সময়ে মহাত্মা গান্ধী দেশ জুড়ে বিদেশী পণ্য বয়কটের আহ্বান জানান। এই বয়কট অভিযানের প্রচারে নেমে গান্ধীজি অনুভব করেন বিদেশি কালি ব্যবহার করে বিদেশী পণ্য বয়কট করার জন্য প্রচারপত্র লিখতে হলে তা আন্দোলনের মূলনীতি বিরোধী হবে। তিনি বুঝতে পারেন ভারতের নিজস্ব ও দেশীয় পদ্ধতিতে তৈরি লেখার কালির প্রয়োজনীয়তা। গান্ধীজি এরপর বেঙ্গল কেমিক্যালসের প্রাক্তন রসায়নবিদ সতীশচন্দ্র দাশগুপ্তের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাঁর ব্যবহারের জন্য একটি স্বদেশী কালি প্রস্তুত করতে তাঁকে অনুরোধ করেন। সতীশচন্দ্র অনেক গবেষণার পর ‘কৃষ্ণধারা’ নামে একটি কালি তৈরি করেন এবং সেই কালি খাদি বস্ত্রের দোকানগুলিতে বিক্রি করা শুরু করেন। এরপর তিনি সেই কালি তৈরির সূত্রটি বাংলাদেশের রাজশাহী শহরের দুই ভাই ননীগোপাল মৈত্র এবং শঙ্করাচার্য মৈত্রকে হস্তান্তর করেন। মৈত্র ভাইদের সতীশচন্দ্র সেই কালি তৈরির কারখানা খুলতেও উৎসাহ দিয়েছিলেন। ননীগোপাল ও শঙ্করাচার্যের বাবা অম্বিকাচরণ মৈত্র তাঁর সারাজীবনের সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন এই কারখানা তৈরিতে। সতীশচন্দ্রই নাকি দুইভাইকে এই কালির নাম দিতে বলেন ‘সুলেখা’ তবে অন্য মতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি এই ‘সুলেখা’ নামকরণ করেছিলেন৷
১৯৩৪ সালে মৈত্র ভাইয়েরা রাজশাহীতে একটি অস্থায়ী কারখানা থেকে প্রথম এই কালি উৎপাদন শুরু করেছিলেন। এরপর কালি উৎপাদন, গবেষণা ও তার মানোন্নয়নের কাজগুলির জন্য ব্যারাকপুরে তাঁদের খুড়তুতো ভাই আশুতোষ ভট্টাচার্যের বাড়িতে কারখানা স্থানান্তরিত হয়। ১৯৩৫ -৩৬ সাল নাগাদ সুলেখার এই কারখানা আবার রাজশাহীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। মৈত্র পরিবারের মহিলারাও নেমে পড়েন একযোগে এই কালি তৈরিতে।
দুই ভাই দ্রুত বুঝতে পেরেছিলেন যে কলকাতায় স্বদেশী কালির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সেই কারণে ১৯৩৬ সালে ননীগোপাল মৈত্র কলকাতায় চলে আসেন এবং শিয়ালদার কাছে হ্যারিসন রোডে (বর্তমানে এমজি রোড) একটি দোকান খোলেন। এরপর ১৯৩৮ সালে বউবাজার অঞ্চলে ১৬, মদন দত্ত লেনে একটি নতুন সুলেখা কালির কারখানা খোলা হয় যা ১৯৩৯ সাল নাগাদ বালিগঞ্জের কসবায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আরও পরে ১৯৪৬ সালে সুলেখার কারখানাটি যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের দক্ষিণে লিজ নেওয়া জমিতে স্থানান্তর করা হয়।
১৯৪৬ সালে সুলেখা একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত হয় এবং ১৯৪৮ সালের শেষ নাগাদ এই কোম্পানির বার্ষিক আয় এক লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরে সুলেখা কালির বাংলাদেশের কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৪৯-৫০ সালে ভারত সরকার ওপেন জেনারেল লাইসেন্স (OGL) আইন কার্যকর করে। এই আইনে নিঃশুল্কে কালি আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে ছোট কালি কোম্পানিগুলি ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হলেও সুলেখা কালি কিন্তু নিজের আধিপত্য টিকিয়ে রাখে ঠিকই।
১৯৫২ সালে সুলেখা কোম্পানি সোদপুরে একটি বিশাল বাগানবাড়ি কেনে তাদের দ্বিতীয় কারখানা তৈরির জন্য। এ রাজ্যের বাইরে উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদেও সুলেখার একটি কারখানা তৈরি করা হয়েছিল। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৪ সালের মধ্যে সুলেখা ভারতের অন্য সব কালি কোম্পানিগুলির চেয়ে অনেক বেশি কালি বিক্রি করেছিল। ১৯৬০ সাল নাগাদ এই সুলেখার হাত ধরেই প্রথম কর্মী সমবায়ের ধারণাটির আমদানি হয় এই বাংলায়।
সেই সময় সুলেখার জনপ্রিয়তা এতই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে ১৯৬৮ সালের পর থেকে এই কালি দেশের বাইরেও রপ্তানি হতে শুরু করে। বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) সরকার একটি গ্লোবাল টেন্ডারের মাধ্যমে ইউরোপ, আমেরিকা ও চীনের বহুজাতিক কোম্পানিগুলির মধ্যে থেকে সুলেখাকে বেছে নিয়ে বিপুল পরিমাণ কালি আমদানির বরাত দেয়। এছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াতে এই সুলেখা কালি রপ্তানি হত নিয়মিত। ১৯৮১ সাল নাগাদ ইউনেস্কো (UNESCO) আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কালি কারখানা স্থাপনের বরাত দেয় সুলেখার ওপর। দেশের বাইরে আফ্রিকার কেনিয়াতে সুলেখা তাদের প্রথম আন্তর্জাতিক কারখানা স্থাপন করে। মানের দিক থেকে এই সুলেখা কালি এতটাই উচ্চমানের ছিল যে কেনিয়া সরকার অন্যান্য দেশ থেকে কালি আমদানিই বন্ধ করে দেয় সুলেখা কালি ব্যবহারের পর।
সুলেখা কেবল উচ্চমানের কালি তৈরিই করেনি, পাশাপাশি অনেক মানুষের কর্মসংস্থানও করেছিল। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে সুলেখা পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) থেকে পালিয়ে আসা দুইহাজার জনেরও বেশি উদ্বাস্তুকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়। এই পরিবারগুলির বেশিরভাগই দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর, বাঘাযতীন এবং গাঙ্গুলী বাগান এলাকায় সুলেখার কারখানার আশেপাশে বসতি স্থাপন করেছিল।
সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা এবং দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দুই শিফটে সুলেখার কারখানা পুরোদমে চলত। হাজারের বেশি অংশীদার ছিল সুলেখার। সত্তর-আশির দশকে সুলেখার জনপ্রিয়তা চরমে পৌঁছেছিল।
১৯৭৭ সালের পর থেকে সুলেখার ব্যবসার পরিমাণ ক্রমশ কমতে শুরু করে। বামফ্রন্টের আমলে ১৯৮৮ সালের শেষদিক থেকে সুলেখা কোম্পানির উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৯৯১ সালে সুলেখা কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে যায়।
সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলেও সুলেখা কালির সঙ্গে যে গৌরবময় অতীত জড়িয়ে আছে তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। জওহরলাল নেহেরু, কাজী নজরুল ইসলাম, সুভাষ চন্দ্র বসু, রাজেন্দ্র প্রসাদ, মোরারজি দেশাই এবং বিধান চন্দ্র রায়ের মতো মহান ব্যক্তিদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই কালির নাম। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখকদের অত্যন্ত প্রিয় কালি ছিল সুলেখার কালি। তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় তাঁর লেখা শুরু করার আগে প্রতিদিন সুলেখার কালি দিয়ে এক হাজার বার দেবী কালীর নাম লিখতেন। হাসান আজিজুল হক এই কালির কলম দিয়েই লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘আগুন পাখি’। বিশ্ববরেণ্য বাঙালি চিত্রপরিচালক সত্যজিৎ রায় এই কালিটি এতই পছন্দ করতেন যে তিনি তাঁর অনেক রচনায় এর উল্লেখ করেছিলেন যেমন তাঁর পরিচালিত সিনেমা ‘জন অরণ্য’ তেও এই কালির দোয়াত দেখিয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রথিতযশা সাহিত্যিক নির্মলেন্দু গুণ, হেলাল হাফিজ, কাজী আনোয়ার হোসেন এবং খসরু চৌধুরী প্রমুখের প্রথম পছন্দ ছিল সুলেখার কালি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার সুলেখা কালির বিজ্ঞাপন এই কালিকে ‘কলঙ্কের চেয়েও কালো’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
১৯৯১ সালের পর থেকে সুলেখা কোম্পানি বন্ধ হয়ে ছিল দীর্ঘদিন। পুনরায় ২০০৬ সালে আবার সুলেখা দরজা খোলে কিন্তু কালির বদলে তারা বিভিন্ন ঘরোয়া জিনিস তৈরি শুরু করে। ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারীর আবহে হঠাৎ সুলেখা কালির কয়েকজন ভক্ত ফেসবুকে ‘সুলেখা ইঙ্ক লাভার্স’ নামে একটি গ্রুপ তৈরি করে। নস্টালজিয়াকে উসকে দিয়ে এই কালির গৌরবময় অতীতের ছবি শেয়ার করতে থাকে তারা। সুলেখা কর্তৃপক্ষকে ক্রমাগত আবেদন করতে থাকে তাদের বিখ্যাত কালিকে পুনরায় ফিরিয়ে আনার জন্য। সেই গ্রুপে সুলেখা কালির ছবিতে গ্রীস, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ, নেপাল এবং নিঃসন্দেহে ভারত থেকে প্রভূত পরিমাণ লোক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাদের। সুলেখা কালির কর্তারা বুঝতে পারেন এখনও এই কালির একটা বিশাল বাজার রয়েছে বিশ্বব্যাপী। সেইকারণে পুনরায় এই কালি উৎপাদন শুরু করেন তারা এবং সেই নস্টালজিক ও ক্লাসিক স্বদেশী থিমে সাজিয়েই ফিরিয়ে আনেন সুলেখা কালিকে। এই সূত্র ধরে সুলেখা পুনরায় তার জন্মস্থান বাংলাদেশেও ফিরে আসে এতবছর পর।
সুলেখা কালির এই ফিরে আসা আমাদের গৌরবময় ইতিহাসকেই যেন পুনরায় একবার ফিরে দেখার স্বাদ দেয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান