অমরনাথ ভ্রমণ

অমরনাথ ভ্রমণ

তীর্থস্থানের মাহাত্ম্য এবং পার্বত্য সৌন্দর্য—এই দুই একত্রে উপভোগ করতে যারা চান, তাদের অনেকেই অমরনাথ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। পর্বতসঙ্কুল দুর্গম পথ বেয়ে মহাদেবের দরবারে হাজির হতে ভক্তরা সমস্ত ক্লেশ অগ্রাহ্য করে পাড়ি দেন অমরনাথে। তবে শুধু মহাদেবের ভক্তেরাই নয়, সৌন্দর্যপিপাসু এবং অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় হলেই অমরনাথ তাঁর জন্য উপযুক্ত হবে নিঃসন্দেহেই। বরফের স্বয়ম্ভু শিবলিঙ্গ বছরের যে বিশেষ সময়টিতে দেখা যায়, আস্তিক মানুষের বিনম্র ভক্তি এবং প্রকৃতির অদ্ভুত লীলা প্রত্যক্ষ করে নাস্তিক মানুষের অপার বিস্ময় সেসময় অমরনাথের প্রাঙ্গনে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আট থেকে আশি, সব বয়সের মানুষের কাছেই যেন অমরনাথের কোনো বিকল্প নেই। মেঘ-কুয়াশার আলোছায়ায় অমরনাথ যাত্রা এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা হতে পারে।

জম্মু এবং কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলায় অমরনাথ মন্দির অবস্থিত। অনন্তনাগ শহর থেকে ১৬৮ কিলোমিটার এবং  জম্মু-কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর থেকে ১৪১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত অমরনাথে যাওয়ার জন্য পহেলগাও শহর অতিক্রম করতে হয়। অমরনাথ পর্বতের দক্ষিণের থেকে মূল গুহাটি সমুদ্রতল থেকে ৩,৮৮৮ মিটার অর্থাৎ ১২,৭৫৬ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। গুহাটি লিডার উপত্যকায় অবস্থিত, যেটি পর্বতদ্বারা বেষ্টিত এবং বছরের অধিকাংশ সময়ই তুষারে আবৃত থাকে।

প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে, পঞ্চদশ শতকে বুটা মালিকিনি নামে এক মেষপালক এই গুহাটি আবিষ্কার করেছিলেন। আবার কিংবদন্তী অনুসারে ঋষি ভৃগুই প্রথম অমরনাথ আবিষ্কার করেন।  এটি বিশ্বাস করা হয় যে, বহুকাল আগে কাশ্মীর উপত্যকা জলের নীচে নিমজ্জিত ছিল এবং ঋষি কশ্যপ একাধিক নদীর মাধ্যমে সেই জল নিষ্কাশন করেছিলেন। ফলস্বরূপ, জল নিষ্কাশিত হলে, ভৃগুই প্রথম অমরনাথে শিবের দর্শন পেয়েছিলেন। পুরাণ অনুযায়ী শিব পার্বতীকে অমরত্বের শিক্ষা প্রদানের জন্য এই স্থানে নিয়ে এসেছিলেন। খুব গভীরভাবে ধ্যানমগ্ন হওয়ার জন্য নাকি শিব কৈলাস ত্যাগ করে অমরনাথের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন। এছাড়া আরও বলা হয় যে, এখানে এসে পৌঁছতে মাঝপথে বিভিন্ন জায়গায় তিনি নিজের সবকিছু ত্যাগ করে আসেন। পহেলগাঁওতে ছেড়ে আসেন ষাঁড় নন্দীকে, চন্দনওয়াড়িতে মাথায় থাকা চন্দ্রকে ত্যাগ করেন, শেশনাগ হ্রদের তীরে নিজের কন্ঠ থেকে সাপটিকে খুলে ছেড়ে দেন এবং পুত্র গণেশকে রেখে আসেন মহাগণেশ পর্বতে। বায়ু, অগ্নি, জলও ত্যাগ করেন পথে। এই অমরনাথে পৌঁছে পার্বতীকে অমরত্বের অর্থ বুঝিয়েছিলেন মহাদেব। ভগিনী নিবেদিতার নোটবইতে স্বামী বিবেকানন্দের অমরনাথ ভ্রমণের কথা পাওয়া যায়।

অমরনাথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য স্বয়ং প্রত্যক্ষ না করলে তা কতখানি অপরূপ লিখে বোঝানো দুঃসাধ্য। একদিকে বরফাবৃত পাহাড়ের নৈসর্গিক দৃশ্য অন্যদিক থেকে ভেসে আসা মন্দিরের ঘন্টাধ্বনি দর্শনার্থীদের এক আধ্যাত্মিক স্বপ্নালোকে নিয়ে যায়। অমরনাথ গুহায় যাওয়ার চড়াই-উতরাই পথটি ধরে এগোলে রোমাঞ্চ তো হবেই তারই সঙ্গে অমরাবতী নদীর রেখা, রহস্যময় শেশনাগ লেক এবং অসংখ্য পাহাড়ী ঝরণার নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে বাধ্য পর্যকটের দল। চন্দনওয়াড়ীর মতো আধ্যাত্মিক মায়ায় আচ্ছন্ন প্রশান্ত পার্বত্য অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে ট্রেক করে আসার সময় আলাদা রোমাঞ্চ অনুভূত হয়। পর্যটকরা সেই তুষারময় বিরাটের সামনে দাঁড়িয়ে মোহিত হয়ে যান, গায়ে কাঁটা দেওয়া এক অনুভূতি তাঁদেরকে জড়িয়ে রাখে সবসময়। তারপর দুর্গম পথ অতিক্রম করে বরফানি বাবার (বরফের শিব, যা প্রকৃতির এক অবিশ্বাস্য লীলা) দর্শন লাভ করে ভক্তদের মনে হয় জীবন ধন্য হয়ে গেল। তবে ভক্ত না হলেও শুধু অ্যাডভেঞ্চারের নেশাতেই হিমালয় এবং ভূস্বর্গ কাশ্মীরের সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর সুন্দর রূপ দেখতে অমরনাথ আসা যায়।

অমরনাথে যাওয়ার জন্য প্রথমে শ্রীনগর পৌঁছনো প্রয়োজন। কলকাতা থেকে বিমানে সরাসরি শ্রীনগরে পৌঁছে যাওয়া যায়। কেউ যদি খরচ একটু কমাতে চায়, তাহলে প্রথমে কলকাতা থেকে ট্রেনে নিউ দিল্লি পৌঁছে সেখান থেকে বিমানে করে শ্রীনগর যাওয়া যেতে পারে৷ আবার জম্মু পর্যন্ত বিমানে যাওয়ার পর সেখান থেকে বাসে করেও শ্রীনগর পর্যন্ত যাওয়া যাবে। অমরনাথের নিকটবর্তী রেল স্টেশন হল জম্মু-তাওয়াই। মুম্বই, চেন্নাই, হায়দ্রাবাদ ইত্যাদি জায়গা থেকে হিমগিরি এক্সপ্রেস, সর্বোদয় এক্সপ্রেস, ঝিলম এক্সপ্রেসের মতো কয়েকটি ট্রেনে জম্মু-তাওয়াই যাওয়া যেতে পারে। জম্মু বা শ্রীনগর থেকে অমরনাথে পৌঁছনোর দুটি রুট খুবই জনপ্রিয়। একটি রুট বড় এবং অন্যটি অপেক্ষাকৃত ছোট। ছোট রুটটি বালতাল থেকে শুরু হয়ে ডোমালি, বরারি এবং সঙ্গম হয়ে অমরনাথে পৌঁছায়৷ তবে ছোট হলেও এই রাস্তা ভীষণই দুর্গম। এই পথ এক থেকে দুইদিন লাগে সম্পূর্ণ করতে। বালতাল থেকে অমরনাথের গুহার দূরত্ব ১৪ কিমি। এই রুট বয়স্কদের জন্য বেছে না নেওয়াই ভালো, কারণ এই পথ বড়ই বন্ধুর। অন্য আরেকটি পথ হল শ্রীনগর হয়ে পহেলাগাঁও পেরিয়ে যাওয়া। এই পথে পড়ে চন্দনওয়াড়ি, পিসু টপ, নাগাকোটি, শেশনাগ হ্রদ প্রভৃতি মনোমুগ্ধকর সব স্থান। বালতালের তুলনায় এই পথ দীর্ঘ হলেও সহজ ও মনোরম হওয়ায় অধিকাংশ যাত্রী এটিকেই বেছে নেয়৷ পহেলগাঁও থেকে গুহার দূরত্ব ৩৬ থেকে ৪৮ কিমি। এই পথ সম্পূর্ণ করতে তিন থেকে পাঁচদিন সময় লাগে যাত্রীদের। যাদের পায়ে হেঁটে যাওয়ায় অসুবিধা আছে, তাঁরা বালতাল এবং পহেলগাঁও দু-জায়গা থেকেই হেলিকপ্টার পরিষেবা পেতে পারেন। অমরনাথ ভ্রমণে অংশ নেওয়ার জন্য আগে থেকে ফর্ম ফিলাপ করে আবেদন করতে হয়। এই গোটা ভ্রমণটি বর্তমানে শ্রী অমরনাথজী শ্রাইন বোর্ড সংস্থা (SASB) সংস্থা দক্ষ হাতে পরিচালনা করে।

যাঁরা অমরনাথের পথে যাত্রা করেন তাঁরা রাত্রিবাসের জন্য বালতাল, শেশনাগ, নুনওয়ান, পাঁচতার্নির মতো বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্প পাবেন। এইসব ক্যাম্পে প্রতিরাতের জন্য খরচ হতে পারে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। এই পুরো যাত্রাপথে বহুস্থানে বিনামূল্যেই খাবার, জল ইত্যাদি পাওয়া যাবে। এমনকি স্থানে স্থানে খাওয়ার জন্য লঙ্গরের ব্যবস্থাও আছে। বালতাল হেলিপ্যাডে ক্যাফেটেরিয়াও পাওয়া যাবে। যাত্রাপথে যাত্রীদের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসার বন্দোবস্তও রয়েছে। এছাড়াও সোনমার্গ, পহেলগাঁওয়ের দিকেও পর্যটকদের জন্য থাকবার সুব্যবস্থা রয়েছে। সোনমার্গে রয়েছে হোটেল মুঘল ইন্ডিয়া, আবার পহেলগাঁওতে পাওয়া যাবে হোটেল অ্যালপাইন কেটু, আক্সা রিসর্ট ইত্যাদি। এছাড়াও হোটেল সন্তুর প্যালেস, হোটেল হেভেন, ইত্যাদি নানারকম ও বিবিধ মূল্যের থাকার ব্যবস্থা ছড়িয়ে রয়েছে পর্যটকদের জন্য।

অমরনাথ ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য অবশ্যই ভগবান শিবের সেই অলৌকিক গুহা পরিদর্শন হলেও কাছেই যেহেতু শ্রীনগর তাই সেদিকেও ঘুরে আসা যায় স্বচ্ছন্দেই। এছাড়াও অমরনাথ পর্বতের উপর অবস্থিত মহামায়া শক্তিপীঠ আরেকটি দ্রষ্টব্য জিনিস এখানকার। খুব সহজেই উপভোগ করে আসা যায় গুলমার্গের সৌন্দর্য। অনন্তনাগ শহরের কাছে অবস্থিত একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির মার্তন্ডের সূর্য মন্দিরও অবশ্য দ্রষ্টব্য।  এছাড়াও বৈষ্ণোদেবী মন্দির, কোকেরনাগ বোটানিক্যাল গার্ডেন, আইশমুকাম মাজার, মত্তন মন্দির, বাবা দাউদ খাকি মসজিদের মতো বেশকিছু দর্শনীয় স্থান রয়েছে সেখানে। তাছাড়া অমরনাথের পথে শেশনাগ লেক বা চন্দনওয়াড়ির মতো পার্বত্য অঞ্চল তো রয়েইছে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান হল জোজিলা পাশ।

জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসই হল অমরনাথ ভ্রমণের উপযুক্ত সময় কারণ মূলত এই সময়েই, এই শ্রাবণ মাসেই অমরনাথ যাত্রা সংগঠিত হয়ে থাকে। এসময় সেখানে গেলে শ্রাবণী মেলায় অংশ নিতে পারবেন পর্যটকেরা। এছাড়াও মে-জুন মাসে গ্রীষ্মের সময়তেও অমরনাথের আবহাওয়া ভীষণই মনোরম থাকে। কিন্তু গ্রীষ্মের সময় খুব স্বল্প সময়ের জন্যই গুহা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। শীতকালে অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডা থাকে অমরনাথে। চারিদিক তুষারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় বরফে। এই সময়টি অমরনাথ ভ্রমণের জন্য বেছে না নেওয়াই ভালো৷ গ্রীষ্ম এবং বর্ষাই উপযুক্ত সময় অমরনাথ উপভোগের জন্য।


ট্রিপ টিপস

  • কীভাবে যাবেন – আকাশপথে আসুন শ্রীনগর। সেখান থেকে বালতাল বা পহেলগাঁওয়ের পথ ধরে ট্রেক করে অমরনাথ গুহায় যাওয়া যায়। অথবা মুম্বাই, হায়দ্রাবাদ, ইত্যাদি শহর থেকে হিমগিরি এক্সপ্রেস, সর্বোদয় এক্সপ্রেস, ঝিলম এক্সপ্রেসের মতো ট্রেনগুলিতে জম্মু-তাওয়াই চলে গিয়ে সেখান থেকে অমরনাথ যাওয়া যেতে পারে।
  • কোথায় থাকবেন – অমরনাথের পথে বালতাল, শেশনাগ, নুনওয়ান প্রভৃতি স্থানে রাত্রিবাসের জন্য ক্যাম্প পাওয়া যায়। এছাড়া সোনমার্গ, পহেলগাঁওয়ের দিকে অনেক হোটেল রয়েছে।
  • কী দেখবেন –  অমরনাথে ভগবান শিবের আধ্যাত্মিক গুহাটিই এখানকার মূল আকর্ষণ। এছাড়াও বৈষ্ণোদেবী মন্দির, কাছেই শ্রীনগর, গুলমার্গ, মার্তন্ডের সূর্য মন্দির, কোকেরনাগ বোটানিক্যাল গার্ডেন, জোজিলা পাশ, শেশনাগ হ্রদ, চন্দনওয়াড়ি, মহাগণেশ পর্বত ইত্যাদি এখানকার অবশ্য দ্রষ্টব্য সব স্থান।
  • কখন যাবেন –  জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরই অমরনাথ যাওয়ার উপযুক্ত সময় কারণ এই সময়েই অর্থাৎ শ্রাবণ মাসেই অমরনাথ গুহা ভ্রমণ সংগঠিত হয়। তাছাড়া মে-জুন নাগাদ গ্রীষ্মকালেও অমরনাথের পরিবেশ অত্যন্ত মনোরম থাকে।
  • সতর্কতা –  
    • অমরনাথ ভ্রমণের ক্ষেত্রে শীতকালটা এড়িয়ে যাওয়াই ভালো, কারণ চতুর্দিক বরফাবৃত হয়ে অনেকসময় রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। তাছাড়া আবহাওয়াও মাত্রাতিরিক্ত শীতল থাকে।
    • অমরনাথ যাত্রাকালে সঙ্গে বয়স্ক মানুষ থাকলে বালতালের পথ বেছে না নেওয়াই ভালো কারণ সেপথ অত্যন্ত কঠিন
    • এই ভ্রমণের পরিকল্পনার আগে নিজের শরীরের ডাক্তারি পরীক্ষা করে নেওয়াই ভালো।
    • ট্রেকে মহিলাদের শাড়ি পরে যেতে নিষেধ করা হয়।
  • বিশেষ পরামর্শ
    • যদি শরীর শক্তসমর্থ থাকে, অবশ্যই হেলিকপ্টারের সুবিধা না নিয়ে পহেলগাঁওয়ের পথ ধরে পাঁচদিনব্যপী পদব্রজে অমরনাথ গুহাভিমুখে যাত্রায় অংশ নিতে পারলে ভরপুর অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ পাওয়া যাবে, সেই সঙ্গে মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে চোখ জুড়িয়ে যাবে।


আপনার মতামত জানান